📄 খিলাফত পরিচালনায় হযরত উসমান (রা)-এর পরীক্ষা
এই ব্যাপক বিজয় ও সাম্রাজ্য বিস্তারের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে ইসলামী উম্মাহর মাঝে সম্পদ সচ্ছলতার যে ঢল নেমেছিলো এবং নাগরিক জীবনযাত্রার আরাম-আয়েশ ও বিলাস উপকরণের যে নিত্য নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হচ্ছিলো সেগুলোর কিছু নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ফলাফল দেখা দেয়া ছিলো খুবই স্বাভাবিক। দেশ, জাতি ও সভ্যতার ইতিহাসে এ সকল অবস্থার চড়া মাশুলও আদায় করতে হয় অনিবার্যভাবেই। তাই দেখা যায়, হযরত উসমান (রা) খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে না করতেই ইসলামী সমাজে পরিবর্তন শুরু হয়ে গেলো এবং যে জীবনধারার ওপর নবী ﷺ তাঁর সাহাবাগণকে গড়ে তুলেছিলেন এবং যে শিক্ষা-দীক্ষার ওপর তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন সেই পবিত্র জীবনধারা থেকে তাদের গতিমুখ ক্রমশ সরে যাচ্ছিলো। উক্ত আদর্শ জীবন ধারণ ও তারবিয়াতের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলো এই যে, দুনিয়ার জিন্দেগী ও তার চাকচিক্যকে আখিরাতের লাভ-লোকসানের মাপকাঠিতে বিচার করা হতো। ফলে দুনিয়া তাদের অন্তরে এমনভাবে কখনো প্রবেশ করতে পারেনি যাতে দুনিয়া নিয়ে কাড়াকাড়ি ও হানাহানি দেখা দিতে পারে।
নববী প্রশিক্ষণের সকল রেখা থেকে জীবনের গতিধারার এই পরিবর্তন হযরত উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর খিলাফত আমলে গুরুতর আকার ধারণ করেছিলো। এর কারণ ছিলো বিজয়ের অব্যাহত ধারা এবং অভাবিতপূর্ণ সম্পদ প্রাচুর্য। বলা বাহুল্য, এটাই হলো বস্তুর ধর্ম এবং বাস্তবতার দাবি যদি না তার দমন ও নিয়ন্ত্রণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় যেমনটি করেছিলেন হযরত উমর (রা)।
হযরত উসমান (রা)-এর যুগে ইসলামী সাম্রাজ্যের উপাদান'সমূহই ছিলো বিভিন্ন ফিতনার ঝড়ো হাওয়া প্রবেশের বাতায়ন পথ। তবে হযরত উসমান (রা) তাঁর নিজের জীবন ও আচার-আচরণে কিন্তু সত্য থেকে চুল পরিমাণও বিচ্যুত হন নি এবং খিলাফত পরিচালনার ক্ষেত্রেও সরল পথ থেকে সরে দাঁড়ান নি এবং প্রজা শাসনের ক্ষেত্রেও ন্যায় ও ইনসাফের নীতি পরিত্যাগ করেন নি। কিন্তু বাস্তব সত্য এই যে, মানুষের স্বভাব ও প্রবৃত্তি যখন জীবনের আয়েশ ও প্রাচুর্যের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয় এবং সম্পদের চোরাবালিতে আটকা পড়ে, তদুপরি আত্মসংশোধনের প্রচেষ্টা অনুপস্থিত থাকে, তখন সে এমনই অন্ধ হয়ে পড়ে যে, সত্যের আভাস মাত্র দেখতে পায় না এবং এমনই ভ্রষ্ট হয় যে, তার আকল-বুদ্ধি সম্পূর্ণ লোপ পেয়ে যায়।
বিদগ্ধ গবেষক আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ চমৎকার বলেছেন, "সামনে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাবো যে, হযরত উসমান (রা)-এর জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো এই যে, তিনি তাঁর খিলাফতকালে এমন কোন কাজ করেন নি যার পূর্ব নযীর বিদ্যমান ছিলো না। কিন্তু উভয়ের মাঝে সর্ববিষয়ে মিল ও সাদৃশ্য থাকলেও পরিবেশ ও পরিস্থিতির ক্ষেত্রে কোন মিল ছিলো না। কেননা সময়ের আমূল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিলো, কিন্তু পরিবর্তন ধারার সঙ্গে সংগতি রক্ষা করে পদক্ষেপ গ্রহণই ছিলো আসল সমস্যা। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৭৬১]
তিনি আরও বলেন, হযরত উসমান (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ হতে খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ পর্যন্ত আরব সমাজের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিলো এবং ইসলামী ধারা প্রকৃতি এক ধরনের আন্তর্জাতিক ধারা প্রকৃতির রূপ ধারণ করেছিলো। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতার সকল জাতির জীবন পদ্ধতি অতি কাছাকাছি এসে গিয়েছিলো। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৭৭০]
এখান থেকেই শুরু হয়েছিলো খলীফা উসমান (রা)-এর প্রতি বিদ্বেষীদের পক্ষ হতে খিলাফতের কঠোর সমালোচনা, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ। আল-আক্কাদ বলেন, "নিজেদের জীবন যাপন ও চাহিদা ও দাবি পূরণের ক্ষেত্রে তো মানুষ অন্যান্য রাজ্যের প্রজাবর্গের অনুসরণ করবে। কিন্তু শাসকের নিকট তাদের দাবি ছিলো, তাদের ব্যাপারে তিনি খিলাফতের শাসন নীতি অনুসরণ করবেন। তৃতীয় খলীফার কাছে তাদের প্রত্যাশা ছিলো, কোন ক্ষেত্রেই তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফার নীতি ও কর্মপন্থা থেকে চুল পরিমাণও সরে আসতে পারবেন না, অথচ তারা নিজেরাই প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফার প্রজাবর্গের জীবনধারা থেকে সম্পূর্ণরূপে সরে গিয়েছিলো।
এ বিষয়ে অবশ্য বিতর্কের কোন অবকাশ নেই যে, উসমান (রা) শক্তি ও যোগ্যতার বিচারে হযরত আবূ বকর ও উমর (রা)-এর সমপর্যায়ের ছিলেন না, কিন্তু স্বয়ং হযরত উমর (রা)-ও তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের প্রভাব সত্ত্বেও জীবনের শেষ দিকে যুগের ব্যবধানের চাপ অনুভব করেছিলেন। তাই তিনি এভাবে দু'আ করতেন:
"হে আল্লাহ্! আমার বয়স বেড়ে গেছে এবং আমার শক্তি দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার প্রজাবর্গ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং কোন অনিষ্ট ব্যতীত আমাকে তুলে নিন।" [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭১৭]
উসমান (রা) নিজের উভয় যুগের এ বিরাট পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং ব্যাধির ক্রমবিস্তারের কারণে শংকিত ছিলেন। তাই বিভিন্ন আলোচনা প্রসঙ্গে ও বিভিন্ন ভাষণে তিনি বলতেন, "এ উম্মত যে অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে তা অবশ্যম্ভাবী তাকদীর যা রোধ করা সম্ভব নয়। কেননা দুনিয়ার মোহ মানুষের অন্তর এমনভাবে আচ্ছন্ন করেছে যে, কোন কৌশল ও প্রচেষ্টাই অতঃপর সফল হতে পারে না।" [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা, ৭৯৯]
গবেষক আল-আক্কাদ বলেন, "আগাগোড়া সংকট এই ছিলো যে, এ ক্রান্তিকাল কখনো খিলাফতের পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা বোধ করতো আবার কখনো (কিংবা একই সময়ে) বাদশাহী ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন অনুভব করতো। কিন্তু কোনটাই পাওয়া যায়নি। আর যে শাসন ব্যবস্থা নিজস্ব স্থানে খিলাফতের পৃষ্ঠপোষকতা ও নিজস্ব স্থানে ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন অনুভব করে কিন্তু এটা বা সেটা কোনটাই লাভ করতে পারে না সে শাসন ব্যবস্থা নিরাপদ থাকতে পারে না।" [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮২৬]
তা সত্ত্বেও আল-আক্কাদের মন্তব্য হলো, "খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণের পর উদ্ভূত বৈদেশিক সমস্যার যে সার্থক মুকাবিলা তিনি করেছেন তার চেয়ে উত্তম কিছু সে সময় দায়িত্ব গ্রহণকারী কোন খলীফার পক্ষে করা সম্ভব হতো না।" স্থির সংকল্প, যথোপযুক্ত পদক্ষেপ, সতর্কতা ও সহনশীলতার সঙ্গে ক্ষিপ্রতা ও শাসনকার্যে আপন-পর সকলের সঙ্গে নম্র আচরণ এই ছিলো তাঁর বৈশিষ্ট্য। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৮০৪]
উসমান (রা)-এর বিরুদ্ধে প্রথম অসন্তোষ দেখা দিয়েছিলো প্রশাসকদের নিযুক্তিকে কেন্দ্র করে। কেননা তাদের অনেকেরই অতীত জীবনে বিশেষ কোন ইসলামী অবদান ও সমাজের বুকে উচ্চ দীনী মর্যাদা ছিলো না। তাছাড়া কারো কারো এমন কিছু কার্যকলাপ প্রকাশ পেয়েছিলো যা সমালোচনা ও অসন্তোষের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কেননা অনেকে প্রশাসকদেরকে তখনও সেই দৃষ্টিতেই দেখতো, যে দৃষ্টিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও হযরত আবূ বকর ও হযরত উমর (রা)-এর প্রশাসকদের দেখতো। তাই তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন ঘটনা শ্রুত হতে লাগলো এবং সমালোচনার ঝড় উঠতে লাগলো, অথচ খলীফা ও শাসকের দৃষ্টিতে এমন কিছু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিচার-বিবেচনা থাকে যা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না। কিন্তু সকলের পক্ষে তা মেনে নেয়া সম্ভব হয় না। ওস্তাদ কুরদ আলী তাঁর 'ইসলামী প্রশাসন' শীর্ষক প্রবন্ধমালায় তারিখে তাবারীর উদ্ধৃতিতে লিখেছেন:
"নবী ﷺ-এর প্রশাসকগণের তিন-চতুর্থাংশই ছিলেন বনূ উমাইয়া গোত্রীয়। কেননা দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি যোগ্য ও সমর্থ লোকদেরই ডেকেছেন। প্রশাসনিক বিষয়ে অজ্ঞ, অনভিজ্ঞ ও দুর্বল লোকদের ডাকেন নি। এটা এ বিষয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ যে, বাহিনীর নেতৃত্ব, শাসন ও প্রশাসন পরিচালনার সবকিছু ইমাম বা প্রধান শাসকেরই ইখতিয়ারভুক্ত। এ বিষয়ে তিনি সম্পদশালী হওয়া, গোত্রীয় আভিজাত্য, ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কের প্রাচীনতা কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠত্বের দিকে তাকাবেন না, বরং তিনি দেখবেন জ্ঞান ও যোগ্যতার বিষয়টি অর্থাৎ অর্পিত দায়িত্ব পালনের এবং ন্যায় ও প্রজ্ঞাপূর্ণ শাসন পরিচালনার সামর্থ্য কি পরিমাণ আছে।" [আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-১০২]
প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে হযরত উসমান (রা)-এর অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার সমর্থনে প্রধান বিচারপতি আবদুল জাব্বার যে বক্তব্য পেশ করেছেন তার উদ্ধৃতি দিয়ে ইব্ন আবুল হাদীদ বলেন,
"এ কথা দাবি করা সম্ভব নয় যে, প্রশাসকদেরকে নিয়োগ করার সময় হযরত উসমান (রা) তাদের মাঝে সততা ও পবিত্রতা ছাড়া অন্য কোন অবস্থার কথা জানতেন। কেননা তাদের যেসব মন্দ আচরণের কথা বলা হয়েছে তা পরবর্তীতে প্রকাশ পেয়েছে। আর পরবর্তীতে মন্দ প্রকাশ পাওয়ার কারণে এটা অসম্ভব নয় যে, প্রথম দিকে প্রকৃতপক্ষেই তাদের অবস্থা অজ্ঞাত ছিলো। কিন্তু অন্তত তাঁর নিকট অজ্ঞাত ছিলো।" [শরহে নাহজুল বালাগা, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১২]
ওস্তাদ কুরদ আলী বলেন, "এটাই কি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক নয় যে, প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে হযরত উসমান আপন গোত্র ও গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করবেন যারা তাঁর পূর্ণ আস্থাভাজন ছিলেন এবং (স্বভাবতই) তাঁর সফলতা লাভের ব্যাপারে সর্বাধিক আগ্রহী ও উৎসাহী ছিলেন। [আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-১০৩]
প্রশাসক নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে হযরত উসমান (রা)-এর পক্ষ সমর্থনে কৈফিয়তমূলক যা কিছু বলা সম্ভব সেগুলো সত্ত্বেও আমরা তাঁকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করি না, বরং আমরা তাঁকে একজন মুজতাহিদ মনে করি যিনি কখনো ভুল করেন, কখনো নির্ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে থাকেন। তাছাড়া আল্লাহর সামনে কারো পবিত্রতা ঘোষণা করতে চাই না। মারওয়ান ইবনুল হাকাম, ওয়ালীদ ইব্ন উকবা ও আবদুল্লাহ ইবন সা'দ ইব্ন আবী সারাহএর কার্যকলাপ ও খলীফার সাথে তাদের নিকট আত্মীয়তার স্পর্শ ও খলীফার দরবারে তাদের প্রভাব ও মর্যাদায় অপব্যবহার সম্পর্কেও কোন কৈফিয়ত পেশ করতে চাই না কিংবা তাঁদের প্রশাসনিক দক্ষতা, যোগ্যতা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সম্পর্কেও কিছু বলতে চাই না। তবে একথা আমরা নির্দ্বিধায় বলতে চাই, উসমান (রা)-এর প্রতি অসন্তোষ ও বিদ্রোহ পোষণকারীদের অধিকাংশ ই আন্তরিক ছিলো না এবং ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকেও মুক্ত ছিলো না।
বিদগ্ধ গবেষক আব্বাস মাহমূদ আল-আক্কাদ উসমানবিরোধী অসন্তোষ ও বিদ্রোহের বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে ইনসাফপূর্ণ অতি উত্তম বক্তব্য পেশ করেছেন। তিনি বলেন, খলীফার নীতি ও কর্মপন্থার সমালোচনা ও কৈফিয়ত তলব করার ক্ষেত্রে অতিশয় বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন করা হয়েছে। ইসলামী উম্মাহর সদস্যদেরকে ইসলাম যে বাক স্বাধীনতা প্রদান করেছে তার যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। উসমান (রা)-এর সমালোচনায় যারা সোচ্চার হয়েছিলো তারা ছিলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একদল লোক। কথায় ও কাজে তাদের কোন মিল ছিলো না। যা বলতো তা করতো না, বরং বিপরীতটাই করতো। তাদের মাঝে এমন লোকও ছিলো যার ওপর হযরত উসমান (রা) হদ্দ কায়েম করেছিলেন কিংবা কোন গুরুতর অপরাধে তার পিতাকে আটক করেছিলেন কিংবা তার ও তার অবৈধ স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদের আদেশ জারি করেছেন কিংবা প্রশাসনিক পদে তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আর খলীফা এ সকল পদক্ষেপ শুধু এজন্যই গ্রহণ করেছেন যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দুষ্কর্ম প্রবৃত্ত ছিলো। এ সকল স্বার্থই খলীফার নীতি ও কর্মের সমালোচনায় আন্দোলনকে দানা বাঁধিয়ে তুলেছিলো। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৭০৬]
📄 ফিতনা চরমে
এখানে আমরা আল্লামা ইব্ন কাছীর লিখিত আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভূত ফিতনার চরম পর্যায়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরবো যা স্বগৃহে অবরুদ্ধ অবস্থায় উসমান (রা)-এর মর্মান্তিক শাহাদাত পর্যন্ত গড়িয়েছিলো। মিসরে একটি দল হযরত উসমান (রা)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতো এবং তাঁর সম্পর্কে অশালীন কথাবার্তা বলতো। একদল বিশিষ্ট সাহাবাকে বরখাস্ত করে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য কিংবা অযোগ্য লোকদেরকে প্রশাসনে নিযুক্ত করেছেন বলে তাঁর তীব্র সমালোচনা করতো। তাছাড়া হযরত আমর ইবনুল আ'স (রা)-এর স্থলে নিযুক্ত হযরত আবদুল্লাহ ইবন সা'দ ইব্ আবূ সারাহ-এর প্রতিও মিসরবাসী ক্ষুব্ধ ছিলো। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবন সা'দ পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ও বারবারীদের এলাকাসহ স্পেন ও আফ্রিকা বিজয়ের কাজে ব্যতিব্যস্ত থাকার কারণে বিক্ষোভ সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে অমনোযোগী ছিলেন। ইত্যবসরে সাহাবা তনয়দের একটি দল মিসরে আত্মপ্রকাশ করলো যাঁরা মানুষকে তাঁর বিরোধিতার জন্য ঐক্যবদ্ধ ও প্ররোচিত করতে লাগলেন। এ বিষয়ে মুহাম্মদ ইব্ন আবূ বকর ও মুহাম্মদ ইব্ন হোযায়ফা ছিলেন সর্বাধিক তৎপর। অবশেষে তাঁরা ছয়'শ সওয়ারের একটি দলকে রজব মাসে উমরার বেশে মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা করিয়ে দিলেন যাতে তারা উসমান (রা)-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। এদিকে আবদুল্লাহ্ ইবন সা'দ (সরকারি পত্রযোগে) হযরত উসমান (রা)-কে জানিয়েছিলেন যে, এ সমস্ত লোক তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে উমরার বেশে মদীনায় এসেছে।
তারা যখন মদীনার নিকটবর্তী হলো তখন উসমান (রা) হযরত আলী (রা)-কে নির্দেশ দিলেন যেন তিনি মদীনায় প্রবেশ করার পূর্বেই তাদেরকে বুঝিয়ে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেন। এমনও কথিত আছে, বরং উসমান (রা) বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে এ দায়িত্ব পালনের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন হযরত আলী (রা) নিজেকে পেশ করলেন। হযরত উসমান (রা) তাঁকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন। বিশিষ্ট লোকদের একটি জামাতও তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন। আলী (রা) জুহফা এলাকায় তাদের সাথে মিলিত হলেন। তারা তাঁকে অতিমাত্রায় ভক্তি ও শ্রদ্ধা করতো। তিনি তাদেরকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে ফিরিয়ে দিলেন। তখন তারা আত্মতিরস্কার করে বলতে লাগলো, এই ব্যক্তির জন্য তোমরা আমীর-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছো এবং তার বিরুদ্ধে এর নাম ব্যবহার করছো (অথচ ইনি তা থেকে মুক্ত)। আলী (রা) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর বিরুদ্ধে তোমাদের অসন্তোষের কারণ কি? তখন তারা কিছু কিছু বিষয় উল্লেখ করলো আর তিনি হযরত উসমান (রা)-এর পক্ষ হতে কৈফিয়তমূলক উত্তর দিলেন। তাদেরকে আপন সম্প্রদায়ের নিকট ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। এভাবে তারা বিফলমনোরথ হয়ে যেখান থেকে এসেছিলো সেখানেই ফিরে গেলো। তাদের আশা ও উদ্দেশ্য বিন্দুমাত্র পূরণ হলো না। হযরত আলী (রা) ফিরে এসে হযরত উসমান (রা)-কে তাদের চলে যাওয়ার সংবাদ দিলেন এবং তাঁকে কিছু পরামর্শ দিলেন। হযরত উসমান (রা) তাঁর আন্তরিক পরামর্শ মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করলেন এবং অম্লান বদনে মেনে নিলেন।
এরপর মিসর, কুফা ও বসরাবাসীরা পরস্পর চিঠি চালাচালি করলো এবং মদীনায় অবস্থানকারী সাহাবা কিরামের নাম স্বাক্ষরে বহু জাল চিঠি তৈরি করে বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হলো। ৩৫ হিজরীর শাওয়াল মাসে মিসরীয়দের একটি দল মানুষের কাছে হজ্জের কথা বলে বের হলো এবং মদীনায় এসে অবরোধ করে বসলো। সাহাবা কিরাম অবরোধকারীদের কাছে গিয়ে তাদের আবার ফিরে আসার কারণে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করলেন। আলী (রা) তাদের বললেন, তোমাদের চলে যাওয়ার পর আবার মত পরিবর্তন করে ফিরে আসার কারণ কি? তারা বলল, ডাক বাহকের নিকট আমরা আমাদেরকে হত্যা করার আদেশ সম্বলিত একটি পত্র পেয়েছি। বসরা ও কুফা থেকে আগত দলটিও একই কথা বললো। প্রতিটি শহর থেকে আগত লোকেরা বললো, আমরা শুধু আমাদের সাথীদের সাহায্য করার জন্য এসেছি। তখন সাহাবা কিরাম তাদেরকে বললেন, তোমাদের সাথীদের বিপদের কথা তোমরা জানলে কি করে, অথচ তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে কয়েক মঞ্জিলের দূরত্বে চলে গিয়েছো? নিশ্চিতই এটা তোমাদের পূর্ব পরিকল্পিত বিষয়।
কথিত আছে, মিসরীয়রা যখন স্বদেশে ফিরে যাচ্ছিলো তখন পথে তারা একজন ডাকবাহককে দেখতে পেয়ে তাকে আটক করলো। তার দেহ তল্লাশী করে হযরত উসমান (রা)-এর যবানীতে লেখা একটি পত্র পাওয়া গেলো, যাতে তাদের একদলকে হত্যা করার, একদলকে শূলে দেয়ার এবং একদলকে হাত-পা কর্তন করার আদেশ দেয়া হয়েছে। পত্রে হযরত উসমান (রা)-এর আংটির মোহর অংকিত ছিলো। আর ডাকবাহক ছিলো হযরত উসমান (রা)-এর গোলাম, তার নিজস্ব উটের ওপর সওয়ার। মিসরীয় দলটি ফিরে এসে ঘুরে ঘুরে লোকজনকে পত্রটি দেখাতে লাগলো। আর লোকজনও আমীরুল মু'মিনীনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলো। তখন তিনি বললেন, আমার বিরুদ্ধে এ সম্পর্কে সাক্ষী পেশ করো। অন্যথায় আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি নিজেও লিখিনি, কাউকে দিয়ে লেখাইওনি এবং এ সম্পর্কে কিছুই জানি না। আর আংটির অনুরূপ আংটি জাল করা অসম্ভব নয়। কিন্তু যাদের বিশ্বাস করার তারা আমীরুল মু'মিনীনের কথা বিশ্বাস করলো। আর যাদের মিথ্যা মনে করার তারা মিথ্যা মনে করলো। আল্লামা ইব্ কাছীর বলেন, এ পত্র হযরত উসমানের নামে জাল করা হয়েছিলো। কেননা তিনি এমন আদেশ করেন নি, এমন কি এ সম্পর্কে তিনি কিছু জানতেনও না।
আল্লামা ইব্ন জারীর তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে নিজস্ব সনদে বর্ণনা করেন যে, মিসরীয়রা ঐ পত্র মিসরের প্রশাসকের কাছে প্রেরিত ডাকবাহকের নিকট পেয়েছিলো। তাতে তাদের কারো সম্পর্কে হত্যার এবং কারো সম্পর্কে শূলে চড়ানোর আর অন্যদের সম্পর্কে হাত-পা কর্তনের আদেশ ছিলো। পত্রটি মারওয়ান ইবনুল হাকাম উসমান (রা)-এর নামে লিখেছিলো। সে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের সমর্থন গ্রহণ করেছিলো: إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُسَارِبُونَ اللهَ وَرَسُولُهُ وَيَسْعَوْনَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا الى آخر الآية .
"যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং যমিনে ফাসাদ সৃষ্টির অপচেষ্টা করে"....। কোন সন্দেহ নেই যে, মিসরীয় দলটি অনুরূপই ছিলো কিন্তু মারওয়ানের কোন অধিকার ছিলো না হযরত উসমানের নামে মনগড়া কিছু করার এবং তাঁর অজ্ঞাতসারে তাঁর যবানীতে পত্র লিখে তাঁর মোহর জাল করে তাঁর গোলামকে তাঁর উটের ওপর সওয়ার করে মিসরে প্রেরণ করার। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৬]
তবে কতিপয় গবেষক লেখক মনে করেন, হযরত উসমানের পক্ষ হতে পত্র প্রেরণের বিষয়টি সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিলো। 'তারীখে তাবারী'তেও প্রায় একই ধরনের বর্ণনা রয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর মিসরীয়রা ফিরে গেলো। পথিমধ্যে তারা এক সওয়ারের দেখা পেলো। একবার সে তাদের কাছে ভেড়ে, আবার দূরে সরে যায়। আবার ফিরে আসে, আবার দূরে সরে যায় এবং তাদের দিকে সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকায়। (তার সন্দেহজনক গতিবিধি দেখে) তারা তাকে জিজ্ঞেস করলো, বলো দেখি, তোমার ব্যাপার কি? তোমাকে নিরাপত্তা দেয়া হলো। নির্ভয়ে বলো। সে বললো, আমি মিসরের প্রশাসকের উদ্দেশে প্রেরিত আমীরুল মু'মিনীনের দূত। তখন তারা তাকে তল্লাশী করে হযরত উসমান (রা)-এর যবানীতে মিসরের প্রশাসকের নামে লেখা একটি পত্র পেয়ে গেলো যাতে হযরত উসমান (রা)-এর আংটির মোহর অংকিত ছিলো। আর তাতে সশ্লিষ্ট লোকদের শূলে চড়ানোর কিংবা হাত-পা কর্তন করার আদেশ ছিলো। তখন তারা পত্রসহ মদীনায় ফিরে এলো এবং হযরত আলী (রা)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করে বললো, দেখুন না, আল্লাহর দুশমন আমাদের সম্পর্কে কী কী আদেশ লিখে পাঠিয়েছে। এখন আল্লাহ্ আমাদের জন্য তার রক্ত হালাল করে দিয়েছেন। সুতরাং আপনি আমাদের সঙ্গে তার কাছে চলুন। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের সঙ্গে যাবো না। তারা বললো, তাহলে আমাদের কাছে পত্র লিখেছিলেন কেন? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি তোমার নামে কখনো কোন পত্র লিখিনি। তখন তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বললো, এরই জন্য কি তোমরা লড়াই করছো? এরই জন্য তোমরা উদ্দীপ্ত হচ্ছো?
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আলী (রা) বলেছিলেন, হে বসরাবাসি! তোমরা কিভাবে মিসরীয়দের অবস্থা জানতে পারলে, অথচ তোমরা কয়েক মঞ্জিল চলে গিয়েছিলে? এরপরই না তোমরা আমাদের কাছে ফিরে এসেছ। আল্লাহ্র শপথ! মদীনাতেই এ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
📄 আমীরুল মু'মিনীন হযরত উসমান (রা)-এর শাহাদাত ও তাঁকে রক্ষায় আলী (রা)-এর প্রশংসনীয় ভূমিকা
এরপর খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উসমান (রা)-এর বিরুদ্ধে এমন কিছু 'দাঙ্গা-হাঙ্গামা' হলো যা খিলাফাতের অত্যুচ্চ মর্যাদা, নবুয়তের নিকটবর্তী, আবূ বকর ও উমর (রা) এই দুই মহান খলিফার সংলগ্ন যুগের পবিত্রতার সাথে মোটেও উপযোগী ছিলো না। কিন্তু গবেষক আল-আক্কাদের ভাষায় তা ছিলো এমন জঘন্য একটি চক্রের সৃষ্ট গোলযোগ, যাদের পক্ষে এ ধরনের কোন কাজই অসম্ভব ছিলো না। বিদ্রোহীরা তাঁকে আপন বাসগৃহে আশ্রয় নিতে বাধ্য করলো এবং কঠোর অবরোধ আরোপ করে তাঁর জীবন ধারণ দুর্বিষহ করে ফেললো।
সাহাবা কিরামের অনেকেই স্ব স্ব গৃহে বসে গেলেন। হযরত হাসান-হুসায়ন, আবদুল্লাহ ইব্ন যুবায়র ও আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা)-সহ সাহাবা-তনয়গণের একটি দল তাঁদের পিতাগণের নির্দেশে হযরত উসমান (রা)-এর বাসগৃহে পৌঁছে গেলেন। বিদ্রোহীদেরকে তারা তাঁর পক্ষ হতে বোঝাতে চেষ্টা করলেন এবং প্রাণপণ সংগ্রামে নিয়োজিত হলেন যাতে কেউ তাঁর নিকটেও পৌঁছতে না পারে। এভাবে উসমান (রা) মসজিদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। আর এ অবরোধ যিলকাদ মাসের শেষ ভাগ হতে যিলহজ্জ মাসের আঠারো তারিখ রোজ শুক্রবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকলো। এর একদিন পূর্বে উসমান (রা) বাসগৃহে তাঁর নিকট উপস্থিত প্রায় সাত শ' আনসার-মুহাজিরকে লক্ষ্য করে বললেন, তাঁদের মাঝে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর, আবদুল্লাহ ইব্ন যুবায়র, হাসান-হুসায়ন ও আবূ হুরায়রা (রা) তাঁর একদল আযাদকৃত গোলামসহ উপস্থিত ছিলেন। হযরত উসমান (রা) তাঁদেরকে সুযোগ দান করলে অবশ্যই তাঁরা তাঁকে রক্ষা করতে সক্ষম হতেন। কিন্তু তিনি তাঁদেরকে স্পষ্ট ভাষায় বললেন, যাদের ওপর আমার কোন-না-কোন হক রয়েছে তাঁদেরকে আমি শপথ দিয়ে বলছি, তারা যেন নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখে এবং নিজ নিজ গৃহে ফিরে যায়, অথচ তখনও তাঁর নিকট বিশিষ্ট সাহাবা ও তাঁদের পুত্রদের এক বিরাট জামাত উপস্থিত ছিলো, এমন কি হযরত উসমান আপন গোলামদের উদ্দেশে বললেন, যে তার তলোয়ার খাপবদ্ধ রাখবে সে স্বাধীন। বর্ণিত আছে, হযরত উসমান (রা) এভাবে চলে যাওয়ার কসম দেয়ার পর সর্বশেষে যিনি হযরত উসমান (রা)-এর বাসগৃহ ত্যাগ করেছেন তিনি হলেন হযরত হাসান ইব্ন আলী (রা)। [ইব্ন কাছীর, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮১]
হযরত আলী (রা) তাঁর পক্ষে অস্ত্র ধারণ করার অনুমতি প্রার্থনা করলেন, তখন উসমান (রা) বললেন, যে কেউ তার ওপর আল্লাহ্র হক রয়েছে বলে মনে করে এবং তার ওপর আমার হকও স্বীকার করে তাকে আমি আল্লাহ্র দোহাই দিয়ে বলি, আমার জন্য যেন নিজের কিংবা অন্যের এক ফোঁটা রক্তও প্রবাহিত না করে। হযরত আলী (রা) পুনঃ আবেদন জানালে তিনি একই জবাব দিলেন। অতঃপর নামাযের সময় আলী (রা) মসজিদে প্রবেশ করলেন। তখন লোকেরা বললো, হে আবুল হাসান! অগ্রসর হোন এবং নামায পড়ান। আলী (রা) বললেন, ইমাম অবরুদ্ধ অবস্থায় আমি তোমাদের নামায পড়াতে পারি না, বরং আমি একা নামায পড়বো। অতঃপর তিনি একা একা নামায পড়ে ঘরে ফিরে গেলেন। [উসমান ইব্ন আফফান যুন্নুরাইন, পৃষ্ঠা ২১৮-২১৯]
এদিকে হযরত উসমান (রা)-এর সংকটাবস্থা চরমে পৌঁছলো এবং সঞ্চিত পানি ফুরিয়ে গেলো। তিনি মুসলমানদের নিকট পানির ফরিয়াদ জানালেন। তখন হযরত আলী (রা) স্বয়ং পানির মশক নিয়ে উটে সাওয়ার হলেন এবং অনেক চেষ্টার পর তাঁর নিকট পানির মশকগুলো পৌঁছালেন। এজন্য তাঁকে অবরোধকারী মূর্খদের বহু অশালীন কথা ও আচরণের মুকাবিলা করতে হয়েছে, এমন কি তারা তাঁর উটকে তাড়া করার স্পর্ধাও প্রদর্শন করেছে।
বর্ণিত আছে, মু'আবিয়া (রা) হযরত উসমান (রা)-কে বলেছিলেন, "প্রবল শত্রুদের হামলার আগেই আপনি আমার সঙ্গে সিরিয়ায় চলুন। কেননা তখন আপনি তাদের প্রতিহত করতে পারবেন না। কিন্তু উসমান (রা) তাঁকে বললেন, কোন কিছুর বিনিময়ে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর প্রতিবেশ বিসর্জন দিতে পারি না, এমন কি তাতে যদি আমার ঘাড়ের রগ কাটা যায় তবুও না।"
তখন মু'আবিয়া (রা) তাঁকে বললেন, তাহলে সিরীয় বাহিনীর একটি অংশ আপনার নিকট প্রেরণ করি, যারা সম্ভাব্য গোলযোগের মুকাবিলার জন্য মদীনাবাসীদের মাঝে অবস্থান করবে। উসমান (রা) বলেন, আমি কি বহিরাগত বাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়ে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর প্রতিবেশীদেরকে খাদ্য সংকটে ফেলতে পারি এবং আনসার ও মুহাজিরদের জীবন দুর্বিষহ করতে পারি? তখন মু'আবিয়া (রা) বলেন, আল্লাহ্র শপথ! হে আমীরুল মু'মিনুন! হয় আপনি ঘাতকের হাতে নিহত হবেন কিংবা হানাদার বাহিনীর শিকার হবেন। উসমান (রা) বলেন, আল্লাহ্ আমার জন্য যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম ব্যবস্থাপক। [আবূ জাফর তাবারী, তারীকুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০১]
সে সময় বাসগৃহের কতিপয় লোক শহীদ হলেন, সেই পাপাচারীদের কতিপয় লোকও নিহত হলো। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনুয যুবায়র (রা) ক্ষত বিক্ষত হলেন এবং হাসান ইব্ন আলী (রা)-ও আহত হন। দুষ্কৃতিকারীরা উসমান (রা)-কে লক্ষ্য করে তীর বর্ষণ করলো, এমন কি হাসান ইব্ন আলীও দোরগোড়ায় রক্তাক্ত হয়ে গেলেন এবং আলী (রা)-র মুক্ত দাস কানবারও মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। আবূ মুহম্মাদ আল-আনসারী বলেন, আমি উসমান (রা)-কে তাঁর বাসভবনে অবরুদ্ধ অবস্থায় দেখেছি। হাসান ইব্ন আলী (রা) তাঁকে রক্ষার জন্য লড়াই করছিলেন। শেষে তিনি আহত হন। যারা তাঁকে আহত অবস্থায় বহন করে নিয়ে গিয়ে ছিলো আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। [আনসাবুল আশরাফ, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯২-৯৫]
আলী (রা)-র কাছে এ খবর পৌঁছলে তিনি তাঁর জন্য তিন মশকপূর্ণ পানি পাঠান। তা তার ঘরে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো। পানি পৌঁছাতে গিয়ে বনু হাশিম ও বনু উমাইয়ার কয়েকজন মাওয়ালী (মুক্ত দাস) আহত হন। তবে শেষ পর্যন্ত পানি পৌঁছেছিলো। দুষ্কৃতিকারীরা হযরত উসমান (রা)-র নিকট খিলাফত পরিত্যাগের দাবি জানালো। কিন্তু তিনি পরিষ্কার বলে দিলেন, এটা তোমাদের বিষয়। সুতরাং তোমরা যাকে ইচ্ছা নির্বাচন করো। কিন্তু তাদের কথা মতো দায়িত্ব পরিত্যাগ করা, সে অসম্ভব। কেননা আল্লাহ্ আমাকে যে পোশাক পরিধান করিয়েছেন তা আমি নিজে খুলে ফেলতে পারি না। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৪]
হযরত উসমান (রা)-র এ সিদ্ধান্ত ছিলো রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর একটি উপদেশের আলোকে। কেননা তিরমিযী শরীফে হযরত আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী ﷺ বলেন: يَا عُثْمَانُ أَنَّهُ لَعَلَّ اللهُ يُقَمَصُكَ قَمِيصًا فَإِنَّ أَرَادُোকَ عَلَى خَلْعِه فَلَا تَخْلَعْهُ لَهُمْ . "হে উসমান! আল্লাহ্ হয়তো তোমাকে একটি জামা পরিধান করাবেন। লোকেরা যদি তোমাকে তা খুলে ফেলতে চাপ দেয় তবে তুমি তা খুলো না।"
উসমান (রা)-এর স্ত্রী নায়েলা বলেন, অবরোধকালে যেদিন তাঁকে শহীদ করা হয় সেদিন তিনি রোযাদার ছিলেন। [বিদায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৩] নাফে (র) ইবনে উমর (রা) হতে বর্ণিত আছে, ভোরে হযরত উসমান (রা) লোকদের নিকট বর্ণনা করছিলেন, আমি স্বপ্নযোগে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-এর দর্শন লাভ করেছি। তিনি আমাকে বলেছেন, হে উসমান! আমাদের কাছে এসে ইফতার করো। তাই তিনি ভোর থেকে রোযা রাখলেন এবং সেদিনই শহীদ হন (পূর্বোক্ত বরাত)। তাঁর সামনে ছিলো কুরআন শরীফ এবং তিনি তা তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর শাহাদাতের দিনটি ছিলো ৩৫ হিজরীর ১৮ যিলহজ্জ, রোজ শুক্রবার। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৪-১৮৫]
টিকাঃ
১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৮
📄 উসমান (রা)-এর দৃঢ় ঈমান, নৈতিকতা ও ইসলামে তাঁর উচ্চ মর্যাদা
ইসলামের ইতিহাসের চরম লজ্জাজনক ও মর্মান্তিক এ অধ্যায়টি আমরা বিদগ্ধ গবেষক আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদের মন্তব্যের মাধ্যমে সমাপ্ত করতে চাই। বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগকালে হযরত উসমান (রা)-এর অবস্থান ও তাঁর জীবন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল-আক্কাদ বলেন, একজন ব্যক্তি হিসেবে খলীফা হযরত উসমান (রা)-এর জীবনে ঈমান ও বিশ্বাসের প্রভাব ঐ সকল গোষ্ঠীর তুলনায় অধিকতর প্রোজ্জ্বল ছিলো, যারা তাঁর সাথে বিবাদ করার জন্য ও তার কৈফিয়ত তলব করার জন্য বিভিন্ন শহর থেকে এসে জড়ো হয়েছিলো। অথচ তিনি ছিলেন সেই স্বল্প সংখ্যক লোকদের একজন, যাঁদের সম্পর্কে সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির পক্ষে এমন ধারণাও করা সম্ভব নয় যে, ইসলাম গ্রহণের পর যে অত্যুচ্চ চরিত্র-মহিমায় তাঁরা সুশোভিত হয়েছেন তারপর জাহিলিয়াত তাদেরকে সামান্যই স্পর্শ করতে পারে। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যা, পৃষ্ঠা-৭০৮]
আত্মারবিচার ও আত্মসমালোচনায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়। নিজের ও নিজ প্রিয়তম ব্যক্তির জীবন রক্ষার বিনিময়ে হলেও সাধারণ মানুষের প্রাণহানি না করার সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল। নিজে নিহত হওয়ার ব্যাপারে তিনি যখন নিশ্চিন্ত হলেন, তখন তাঁর হত্যা প্রচেঠায় অবরোধ আরোপকারীদের প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে তাঁর সাহাবায়ে কিরামের অবস্থান গ্রহণের আবেদন তিনি দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। খিলাফতের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর দাবি জানালে তাও তিনি দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু এ প্রত্যাখ্যান কোন মোহ বা আপত্তির কারণে ছিলো না। কেননা জীবনের চেয়ে প্রিয়তর কিছু তো হতে পারে না! আর সেই জীবনটাই ছিলো তাঁর কাছে তুচ্ছ। তদ্রূপ কেউ যেনো একথাও না ভাবে যে, খিলাফত থেকে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। কেননা সকল ঐতিহাসিক এই বিষয়ে একমত যে, দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণের দিন তাঁর সম্পদের পরিমাণ ছিলো খিলাফতের দায়িত্বভার লাভের দিনের তুলনায় কম।
খিলাফতের দায়িত্ব ত্যাগে তার অস্বীকৃতির কারণ ছিলো এই আশংকায় যে, তিনি পদত্যাগ করলে তা থেকে উদ্ভূত সংঘাত-সংঘর্ষের দায়ভাগ তাঁকেই বহন করতে হবে। একাধিকবার স্পষ্ট ভাষায় তিনি তা প্রকাশও করেছেন। তিনি বলেছেন, আজ যারা তাঁর শাসনকালকে অসহনীয় দীর্ঘ মনে করছে, হয়তো তারাই পরবর্তীতে আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তাঁর শাসনকাল যদি এক শত বছর দীর্ঘ হতো! সুতরাং স্বেচ্ছায় তিনি অশুভ পরিণতির পথ খুলে দিতে পারেন না।
তাছাড়া ঘটনা প্রবাহকে এক পাশে রেখে যদি আমরা আদর্শ ও বিশ্বাসের ধারক হিসেবে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে একথা বলা যায় যে, আমরা এমন একটি আঘাতের সম্মুখীন হবো, আকীদা ও বিশ্বাসের প্রভাব ও পর্যালোচনাকারী ব্যক্তি মাত্রকেই যার মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু যদি আমরা আদর্শ ও বিশ্বাসের মানদণ্ডে ঘটনা প্রবাহের বিচার করি এবং একথা মনে রাখি যে, ঘটনা-দুর্ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত থেকে ইতিহাস মুক্ত হতে পারে না এবং মানব সম্প্রদায় ও তার বিবেকের জন্য বিরোধ ও সংঘাতের ঘটনাবলীই সবচেয়ে বড় বিপদ নয়, তাহলেই এটা আর কোন মর্মান্তিক আঘাত নয়। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যা, পৃষ্ঠা-৭০৯]
আল-আক্কাদ তাঁর "আবকারিয়াত উসমান" গ্রন্থের শেষ দিকে লিখেছেন, হযরত উসমান (রা)-এর হত্যাকাণ্ড যদি এক চরম মন্দ ও অকল্যাণকর হয়ে থাকে তাহলে বলতেই হবে, জগতের অন্যান্য অকল্যাণের ন্যায় এই অকল্যাণের মাঝেও বিভিন্ন কল্যাণ নিহিত ছিলো, যা দুর্যোগের কালো ছায়া সরে যাওয়ার পর ব্যক্তি ও জাতির জীবন আজও অম্লান হয়ে আছে।
এ মর্মান্তিক ঘটনার একটি কল্যাণ হলো, এই সত্যের প্রতিষ্ঠা যে, চীনের সীমান্ত থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র শাসক যিনি তিনিও জনসাধারণের নিকট জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নন। অবশ্য দুষ্কৃতিকারীরা উক্ত অধিকারের অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে অপব্যবহার করেছিলো। আরেকটি কল্যাণ হলো, ঈমান ও বিশ্বাসের সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যা নব্বই বছরের নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধ চরম দুর্যোগ মুহূর্তে আপন বাসগৃহে অবরুদ্ধ ও পিপাসার্ত অবস্থায় উম্মতের সামনে রেখেছেন, অথচ তখন তিনি ইচ্ছা করলে হাজার হাজার সাহায্যকারী রক্তের নদী বইয়ে দিতো যেখানে এক ফোঁটা পানিও ছিলো দুষ্প্রাপ্য।
আলহাফেয তাকীউদ্দীন সাবকী (মৃ. ৭৫৬ হি.) বলেন, আমাদের আকীদা হচ্ছে এই যে, হযরত উসমান (রা) ছিলেন ইমামে হক। তিনি মজলুম অবস্থায় শহীদ হয়েছিলেন, তবে সাহাবা-কিরামকে আল্লাহ্ তাঁর হত্যাকাণ্ডে জড়িত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন। বরং এক অবাধ্য অভিশপ্ত শয়তানের হাতে হযরত উসমানের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিলো। তদুপরি এমন একজন সাহাবীর কথাও আমাদের জানা নেই যিনি এ ঘৃণ্য কাজ বিন্দুমাত্র সমর্থন করেছেন, বরং তাদের প্রত্যেকের পক্ষ হতেই কঠোর নিন্দা সুপ্রমাণিত হয়েছে।