📄 হযরত উসমান (রা)-এর আমলে বিজয়াভিযান ও ইসলামী সালতানাতের বিস্তার
হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফতকালে ইসলামী বিজয়াভিযান শীর্ষ শিখরে উপনীত হয়েছিলো। অবশ্য এর পেছনে ঐ সকল কার্যকারণই সক্রিয় ছিলো, যা ইসলাম মুসলমানদের অন্তরে শুরু থেকে সৃষ্টি করে দিয়েছিলো; যথা: আল্লাহ্ রাস্তায় জিহাদ ও শাহাদাতের মাধ্যমে জান্নাত লাভের আকাঙ্ক্ষা, দুনিয়ার জিন্দেগীর ক্ষণস্থায়ী স্বাদ-আহ্লাদের প্রতি তুচ্ছতা, সংখ্যা ও শক্তির প্রতি পরোয়াহীন, অসাধারণ শৌর্যবীর্য ও সাহসিকতা এবং সর্বোপরি আল্লাহর সাহায্য প্রত্যক্ষ অবলোকন। এ সকল কার্যকারণের চূড়ান্ত প্রকাশরূপে রোম, পারস্য ও উত্তর আফ্রিকার সুবিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইসলামী বিজয়াভিযানের বাঁধ ভাঙ্গার স্রোত দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছিলো এবং সে স্রোতের প্রবল তোড়ে ভেঙ্গে গিয়েছিলো দেশের পর দেশ এবং শহরের পর শহর, যেমন খড়কুটা ভেঙ্গে যায়।
সম্ভবত খলীফারূপে হযরত উসমান (রা) হযরত উমর (রা)-এর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পেছনে আল্লাহ্র এই হিকমত ও উম্মতের এই কল্যাণ নিহিত ছিলো যে, হযরত উমর (রা)-এর আমলে ইসলামী বিজয়াভিযানের যে শুভ সূচনা হয়েছিলো এবং ক্রমশ সুবিন্যস্ত ও বিস্তৃত হয়ে চলেছিলো হযরত উসমান (রা)-এর হাতে তার পূর্ণতা লাভ সহজ হবে। কেননা নতুন বিজিত এলাকার অধিকাংশ প্রশাসক ও ইসলামী বাহিনীর অধিকাংশ বিজয়ী সেনাপতির হযরত উসমানের সঙ্গে সুনিবিড় সম্পর্ক ছিলো। উদাহরণস্বরূপ মু'আবিয়া ইব্ন আবু সুফিয়ান, আমর ইবনুল 'আস, আবদুল্লাহ্ ইব্ন সা'দ ইব্ন আবী সারাহ, মারওয়ান ইবনুল হাকাম, ওয়ালীদ ইবনুল হাকাম প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। আর এ বিজয়াভিযান লক্ষ লক্ষ মানুষের ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণের কারণ হয়েছিলো যা নিঃসন্দেহে অতি বিরাট কল্যাণকর বিষয়।
উসমান (রা)-এর যুগেই আজারবাইজান ও তাবারিস্তান বিজিত হয়েছিলো এবং আবদুর রহমান ইব্ন রাবীয়া বাহেলী ক্যাসপিয়ান সাগরের সুবিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলের গভীরে প্রবেশ করেছিলেন। বালাজার, কুহিস্তান থেকে নিশাপুর, তাগারিস্তান থেকে মার্ক্স, বলখ ও খাওয়ারিযম এবং আরমেনিয়া থেকে তালিক্লিয়া পর্যন্ত সমগ্র ভূভাগ এর আওতাভুক্ত ছিলো। এভাবে অব্যাহত বিজয় যাত্রা 'তাফ্লীগ' পর্যন্ত গিয়ে উপনীত হয়েছিলো। তাঁর খিলাফত আমলেই মু'আবিয়া (রা) সাইপ্রাস দ্বীপ জয় করেছিলেন এবং ত্রিপোলী থেকে তাঞ্জা পর্যন্ত আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর উপকূলীয় অঞ্চল বিজিত হয়েছিলো।
উসমান (রা)-এর খিলাফত আমলেই ইসলামী খিলাফত নৌশক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করেছিলো। রোমকদের যুদ্ধ জাহাজগুলো দখল করার পাশাপাশি হযরত মু'আবিয়া আবদুল্লাহ্ ইবন সা'দ নতুন নতুন যুদ্ধ জাহাজ তৈরি করেছিলেন। ইসলামী সীমান্তে রোমকদের ক্রমাগত হামলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য একটি মজবুত নৌশক্তির অপরিহার্য প্রয়োজনও ছিলো। [তারীখুল উমাম আল-ইসলামিয়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭-৩০]
হযরত উমর (রা)-এর খিলাফত আমলে ইসলামী বাহিনী পারস্য ও সিরিয়ার সমগ্র অঞ্চল ও মিসর বিজয় সম্পন্ন করেছিলো বটে, কিন্তু কিছু কিছু বিজিত এলাকায় খিলাফতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং কোন না কোন ফিতনা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা মাত্র স্থানীয় অধিবাসীরা তাতে সাড়া দিতো এবং ইসলামী খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসতো। উসমান (রা)-এর যুগে ইসলামী বাহিনী বিদ্রোহ কবলিত এলাকায় অশান্তি দমন এবং ইসলামের শাসন ও নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার কাজে ব্যস্ত ছিলো। সুতরাং বিদ্রোহকবলিত এলাকাগুলোকে পুনরায় খিলাফতের আনুগত্যে ফিরিয়ে আনা নতুনভাবে জয় করারই নামান্তর ছিলো। তাছাড়া এমন বহু এলাকা উসমান (রা)-এর আমলে বিজিত হয়েছিলো যেখানে এর পূর্বে মুসলিম মুজাহিদগণের পদধ্বনি শ্রুত হয়নি। [আল খুলাফা আর-রাশিদূন, পৃষ্ঠা ২৭০]
উসমান (রা)-এর আমলেই মুসলমানগণ বলখ, হেরাত, কাবুল, বাদাখশান দখল করেছিলো এবং দক্ষিণ ইরানের বিদ্রোহী কিরআন ও সিজিস্তান বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলো। বিজিত রাষ্ট্র, বিজিত এলাকার উন্নয়ন প্রচেঠাতেও পূর্ণ মনোনিবেশ করেছিলো। নদী ও খাল খনন, রাস্তাঘাট নির্মাণ, বৃক্ষ রোপণ যেমন ব্যাপক পর্যায়ে করা হয়েছিলো তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপদ পরিবেশ তৈরির জন্য পুলিশ ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীও সৃষ্টি করা হয়েছিলো। এদিকে রোমকদের অব্যাহত হামলা এশিয়া মাইনর ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের দিকে অগ্রাভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রস্তুত করে দিয়েছিলো এবং আফ্রিকা মহাদেশের পশ্চিম ত্রিপোলী, বারকিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপদেশ সাইপ্রাসও এ সময় মুসলিম অধিকারে এসেছিলো এবং মিসর জয়ের উদ্দেশে রোমানদের তৈরী নৌবহর আলেকজান্দ্রিয়ার উপকূলে মুসলমানদের হাতে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছিলো। [তারীখে আরব, পৃষ্ঠা ৪৩-৪৪]
📄 সৎ পথপ্রাপ্ত উসমান (রা)-এর খিলাফত
ইনসাফ ও সাম্যের প্রতিষ্ঠা, ইসলামী শরীয়তের পূর্ণ বাস্তবায়ন, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, জনসাধারণের পূর্ণ নিরাপত্তার বিধান ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে উসমান (রা)-এর খিলাফত ছিলো পূর্বসূরি দুই খলীফার খিলাফতের আদর্শানুসারী।
তারীখে তাবারী ও সালিম ইব্ন আবদুল্লাহ্ হতে বর্ণিত হয়েছে, উসমান (রা) খিলাফত গ্রহণের পর শেষ ক'বছর ব্যতীত সব ক'বছর হজ্জ করেছিলেন। তিনি জনসাধারণের পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিলেন এবং সকল প্রদেশে এই মর্মে ফরমান পাঠিয়েছিলেন যে, প্রতি হজ্জ মৌসুমে প্রশাসকগণ ও তাদের বিরুদ্ধে যাদের অভিযোগ রয়েছে তারা যেন তাঁর সামনে উপস্থিত হয়।
এই উপদেশবাণী ও তিনি বিভিন্ন প্রদেশে লিখে পাঠিয়েছিলেন, তোমরা পরস্পর সৎ কাজের আদেশ দান করো এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করো। কোন মুমিন যেন নিজেকে অপদস্থ না করে! কেননা আল্লাহ চাহে তো আমি সবলের বিরুদ্ধে ও দুর্বলের পক্ষে থাকব, যতক্ষণ সে মজলুম থাকবে।
মানুষ এ নীতির সুফল ভোগ করে চলেছিলো, কিন্তু এক সময় কিছু লোক এটাকে উম্মতের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির হাতিয়াররূপে ব্যবহার করা শুরু করলো। আল বিদায়া ওয়া নিহায়ার বর্ণনায় এসেছে, "হযরত উসমান (রা) তাঁর অধীনস্থ প্রশাসকগণকে প্রতি বছর হজ্জে উপস্থিত হওয়া বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলেন। প্রজাসাধারণের মাঝে তিনি ঘোষণা জারি করতেন যে, কোন প্রশাসকের বিরুদ্ধে কারো কোন ফরিয়াদ থাকলে সে যেন হজ্জে উপস্থিত হয়! আমি আমার প্রশাসকের নিকট হতে তার হক আদায় করে দেব।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৮]
📄 উসমান (রা)-এর অমর কীর্তি
হযরত উসমান (রা)-এর অন্যতম মহান কীর্তি, সমগ্র মুসলিম জাহানকে তিনি কুরআনের অভিন্ন অনুলিপি ও অভিন্ন গঠনের ওপর ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং অনুলিপির অসংখ্য নোসখা বা কপি তৈরি করে ইসলামী খিলাফতের সকল অঞ্চলে বিতরণের ফরমান জারি করেছিলেন। নিঃসন্দেহে এটা ছিলো হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফতের শ্রেষ্ঠ কীর্তি এবং উম্মতের ওপর তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান।
ইমাম বদরুদ্দীন মুহম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ যারকাশী (র) বলেন, "বিভিন্ন কিরাত যা মানুষের মুখস্থ ছিলো তাই তাদেরকে পড়ার অনুমতি দিয়ে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু এক সময় ফাসাদের আশংকা দেখা দিলো, তখন উম্মতকে ঐ 'পঠন'-এর ওপর ঐক্যবদ্ধ করা হলো যা এখন আমরা অনুসরণ করছি। সাধারণভাবে এটাই প্রচলিত যে, হযরত উসমান (রা) ছিলেন কুরআন সংকলক। কিন্তু প্রকৃত বিষয় তা নয়। তিনি শুধু এতটুকু করেছিলেন যে, তিনি ও উপস্থিত আনসার মুহাজির সাহাবা-কিরাম সর্বসম্মতভাবে কুরআনের প্রচলিত বিভিন্ন পঠনরীতির একটির ওপর উম্মতের সকলকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, কেননা ইরাক ও সিরিয়ার অধিবাসীদের মাঝে কুরআনের বিভিন্ন ক্বিরাত বিষয়ে মতভেদ দেখা দেয়ার কারণে ফিতনার আশংকা উপস্থিত হয়েছিলো।
এর পূর্বে কুরআনের অনুলিপি ও মাসহাফগুলো কিরাতের বিভিন্ন পঠন অনুযায়ী লিখিত ছিলো। কেননা কুরআন সাত কিরাতের ওপরই নাযিল হয়েছিলো। পক্ষান্তরে কুরআন সংকলনের ক্ষেত্রে হযরত আবূ বকর (রা)-ই হলেন অগ্রগামী ব্যক্তি। বর্ণিত আছে, হযরত আলী (রা) বলেছেন, "আবু বকর (রা)-কে আল্লাহ্ রহম করুন। তিনিই প্রথম কুরআন সংকলন করেছিলেন।"
হযরত আবূ বকর ও উমর (রা)-এর যামানায় সাহাবা-কিরাম এ ধরনের (অভিন্ন) সংকলনের প্রয়োজন অনুভব করেন নি যা হযরত উসমান (রা) করেছিলেন। কেননা তাঁর যুগে যে ধরনের মতভেদ দেখা দিয়েছিলো তেমনটি পূর্ববর্তী খলীফাদ্বয়ের যামানায় দেখা দেয়নি। বস্তুত আল্লাহ্ অতি বিরাট একটি পদক্ষেপের তাওফিক তাঁকে দান করেছিলেন। কেননা তিনি মতভেদ নিরসনে ও একতাবদ্ধকরণের মাধ্যমে উম্মতকে স্বস্তি দান করেছিলেন। [আল বুরহান, পৃষ্ঠা-২৩৯]
আলী (রা) আরো বলেছেন, "উসমানকে যে দায়িত্বভার প্রদান করা হয়েছিলো আমাকে তা করা হলে আমিও মাসহাফ সম্পর্কে তাই করতাম যা তিনি করেছিলেন।" [আল-বুরহান, পৃষ্ঠা-২৪০]
সুয়াইদ ইব্ন গাফালাহ (র)-এর সূত্রে আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, আলী (রা) বলেছেন, "হে লোক সকল! উসমান (রা) সম্পর্কে মুখ খুলতে সাবধানতা অবলম্বন করো। তোমরা বলে থাকো, উসমান (রা) সকল মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলেছেন। আল্লাহ্র কসম, তিনি মুহাম্মাদ ﷺ-এর সাহাবাগণের এক বিরাট জামা'আতের সম্মুখেই পুড়িয়েছেন। যে দায়িত্বভার তাঁর ওপর অর্পণ করা হয়েছিলো তা আমার ওপর অর্পণ করা হলে আমিও তাই করতাম যা তিনি করেছেন।” [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২১৮]
হযরত উসমান (রা)-এর আরেকটি কীর্তি হলো মসজিদে নববীর ব্যাপক সম্প্রসারণ। নবী ﷺ-এর যামানায় মসজিদ ছিলো ইটের গাঁথুনির। ছাদ ছিলো খেজুর পাতার। আর খুঁটি ছিলো খেজুর বৃক্ষের কাণ্ড। আবু বকর (রা) তাতে কোন পরিবর্তন করেন নি। উমর (রা) রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর যামানায় মসজিদের যে ভিত্তি ছিলো সে অনুসারেই ইটের গাঁথুনি ও খেজুর পাতার ছাউনি দিয়ে পুননির্মাণ করেছিলেন এবং খেজুর বৃক্ষের নতুন খুঁটি লাগিয়েছিলেন। পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা) তাতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন। কারুকার্য করা পাথর ও চুনা দ্বারা দেয়াল তুলেছিলেন, কারুকার্য করা পাথর দ্বারা খুঁটি তৈরি করেছিলেন এবং মূল্যবান কাঠ দ্বারা ছাদ দিয়েছিলেন।
📄 খিলাফত পরিচালনায় হযরত উসমান (রা)-এর পরীক্ষা
এই ব্যাপক বিজয় ও সাম্রাজ্য বিস্তারের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে ইসলামী উম্মাহর মাঝে সম্পদ সচ্ছলতার যে ঢল নেমেছিলো এবং নাগরিক জীবনযাত্রার আরাম-আয়েশ ও বিলাস উপকরণের যে নিত্য নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হচ্ছিলো সেগুলোর কিছু নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ফলাফল দেখা দেয়া ছিলো খুবই স্বাভাবিক। দেশ, জাতি ও সভ্যতার ইতিহাসে এ সকল অবস্থার চড়া মাশুলও আদায় করতে হয় অনিবার্যভাবেই। তাই দেখা যায়, হযরত উসমান (রা) খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে না করতেই ইসলামী সমাজে পরিবর্তন শুরু হয়ে গেলো এবং যে জীবনধারার ওপর নবী ﷺ তাঁর সাহাবাগণকে গড়ে তুলেছিলেন এবং যে শিক্ষা-দীক্ষার ওপর তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন সেই পবিত্র জীবনধারা থেকে তাদের গতিমুখ ক্রমশ সরে যাচ্ছিলো। উক্ত আদর্শ জীবন ধারণ ও তারবিয়াতের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলো এই যে, দুনিয়ার জিন্দেগী ও তার চাকচিক্যকে আখিরাতের লাভ-লোকসানের মাপকাঠিতে বিচার করা হতো। ফলে দুনিয়া তাদের অন্তরে এমনভাবে কখনো প্রবেশ করতে পারেনি যাতে দুনিয়া নিয়ে কাড়াকাড়ি ও হানাহানি দেখা দিতে পারে।
নববী প্রশিক্ষণের সকল রেখা থেকে জীবনের গতিধারার এই পরিবর্তন হযরত উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর খিলাফত আমলে গুরুতর আকার ধারণ করেছিলো। এর কারণ ছিলো বিজয়ের অব্যাহত ধারা এবং অভাবিতপূর্ণ সম্পদ প্রাচুর্য। বলা বাহুল্য, এটাই হলো বস্তুর ধর্ম এবং বাস্তবতার দাবি যদি না তার দমন ও নিয়ন্ত্রণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় যেমনটি করেছিলেন হযরত উমর (রা)।
হযরত উসমান (রা)-এর যুগে ইসলামী সাম্রাজ্যের উপাদান'সমূহই ছিলো বিভিন্ন ফিতনার ঝড়ো হাওয়া প্রবেশের বাতায়ন পথ। তবে হযরত উসমান (রা) তাঁর নিজের জীবন ও আচার-আচরণে কিন্তু সত্য থেকে চুল পরিমাণও বিচ্যুত হন নি এবং খিলাফত পরিচালনার ক্ষেত্রেও সরল পথ থেকে সরে দাঁড়ান নি এবং প্রজা শাসনের ক্ষেত্রেও ন্যায় ও ইনসাফের নীতি পরিত্যাগ করেন নি। কিন্তু বাস্তব সত্য এই যে, মানুষের স্বভাব ও প্রবৃত্তি যখন জীবনের আয়েশ ও প্রাচুর্যের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয় এবং সম্পদের চোরাবালিতে আটকা পড়ে, তদুপরি আত্মসংশোধনের প্রচেষ্টা অনুপস্থিত থাকে, তখন সে এমনই অন্ধ হয়ে পড়ে যে, সত্যের আভাস মাত্র দেখতে পায় না এবং এমনই ভ্রষ্ট হয় যে, তার আকল-বুদ্ধি সম্পূর্ণ লোপ পেয়ে যায়।
বিদগ্ধ গবেষক আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ চমৎকার বলেছেন, "সামনে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাবো যে, হযরত উসমান (রা)-এর জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো এই যে, তিনি তাঁর খিলাফতকালে এমন কোন কাজ করেন নি যার পূর্ব নযীর বিদ্যমান ছিলো না। কিন্তু উভয়ের মাঝে সর্ববিষয়ে মিল ও সাদৃশ্য থাকলেও পরিবেশ ও পরিস্থিতির ক্ষেত্রে কোন মিল ছিলো না। কেননা সময়ের আমূল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিলো, কিন্তু পরিবর্তন ধারার সঙ্গে সংগতি রক্ষা করে পদক্ষেপ গ্রহণই ছিলো আসল সমস্যা। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৭৬১]
তিনি আরও বলেন, হযরত উসমান (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ হতে খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ পর্যন্ত আরব সমাজের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিলো এবং ইসলামী ধারা প্রকৃতি এক ধরনের আন্তর্জাতিক ধারা প্রকৃতির রূপ ধারণ করেছিলো। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতার সকল জাতির জীবন পদ্ধতি অতি কাছাকাছি এসে গিয়েছিলো। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৭৭০]
এখান থেকেই শুরু হয়েছিলো খলীফা উসমান (রা)-এর প্রতি বিদ্বেষীদের পক্ষ হতে খিলাফতের কঠোর সমালোচনা, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ। আল-আক্কাদ বলেন, "নিজেদের জীবন যাপন ও চাহিদা ও দাবি পূরণের ক্ষেত্রে তো মানুষ অন্যান্য রাজ্যের প্রজাবর্গের অনুসরণ করবে। কিন্তু শাসকের নিকট তাদের দাবি ছিলো, তাদের ব্যাপারে তিনি খিলাফতের শাসন নীতি অনুসরণ করবেন। তৃতীয় খলীফার কাছে তাদের প্রত্যাশা ছিলো, কোন ক্ষেত্রেই তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফার নীতি ও কর্মপন্থা থেকে চুল পরিমাণও সরে আসতে পারবেন না, অথচ তারা নিজেরাই প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফার প্রজাবর্গের জীবনধারা থেকে সম্পূর্ণরূপে সরে গিয়েছিলো।
এ বিষয়ে অবশ্য বিতর্কের কোন অবকাশ নেই যে, উসমান (রা) শক্তি ও যোগ্যতার বিচারে হযরত আবূ বকর ও উমর (রা)-এর সমপর্যায়ের ছিলেন না, কিন্তু স্বয়ং হযরত উমর (রা)-ও তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের প্রভাব সত্ত্বেও জীবনের শেষ দিকে যুগের ব্যবধানের চাপ অনুভব করেছিলেন। তাই তিনি এভাবে দু'আ করতেন:
"হে আল্লাহ্! আমার বয়স বেড়ে গেছে এবং আমার শক্তি দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার প্রজাবর্গ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং কোন অনিষ্ট ব্যতীত আমাকে তুলে নিন।" [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭১৭]
উসমান (রা) নিজের উভয় যুগের এ বিরাট পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং ব্যাধির ক্রমবিস্তারের কারণে শংকিত ছিলেন। তাই বিভিন্ন আলোচনা প্রসঙ্গে ও বিভিন্ন ভাষণে তিনি বলতেন, "এ উম্মত যে অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে তা অবশ্যম্ভাবী তাকদীর যা রোধ করা সম্ভব নয়। কেননা দুনিয়ার মোহ মানুষের অন্তর এমনভাবে আচ্ছন্ন করেছে যে, কোন কৌশল ও প্রচেষ্টাই অতঃপর সফল হতে পারে না।" [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা, ৭৯৯]
গবেষক আল-আক্কাদ বলেন, "আগাগোড়া সংকট এই ছিলো যে, এ ক্রান্তিকাল কখনো খিলাফতের পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা বোধ করতো আবার কখনো (কিংবা একই সময়ে) বাদশাহী ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন অনুভব করতো। কিন্তু কোনটাই পাওয়া যায়নি। আর যে শাসন ব্যবস্থা নিজস্ব স্থানে খিলাফতের পৃষ্ঠপোষকতা ও নিজস্ব স্থানে ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন অনুভব করে কিন্তু এটা বা সেটা কোনটাই লাভ করতে পারে না সে শাসন ব্যবস্থা নিরাপদ থাকতে পারে না।" [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮২৬]
তা সত্ত্বেও আল-আক্কাদের মন্তব্য হলো, "খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণের পর উদ্ভূত বৈদেশিক সমস্যার যে সার্থক মুকাবিলা তিনি করেছেন তার চেয়ে উত্তম কিছু সে সময় দায়িত্ব গ্রহণকারী কোন খলীফার পক্ষে করা সম্ভব হতো না।" স্থির সংকল্প, যথোপযুক্ত পদক্ষেপ, সতর্কতা ও সহনশীলতার সঙ্গে ক্ষিপ্রতা ও শাসনকার্যে আপন-পর সকলের সঙ্গে নম্র আচরণ এই ছিলো তাঁর বৈশিষ্ট্য। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৮০৪]
উসমান (রা)-এর বিরুদ্ধে প্রথম অসন্তোষ দেখা দিয়েছিলো প্রশাসকদের নিযুক্তিকে কেন্দ্র করে। কেননা তাদের অনেকেরই অতীত জীবনে বিশেষ কোন ইসলামী অবদান ও সমাজের বুকে উচ্চ দীনী মর্যাদা ছিলো না। তাছাড়া কারো কারো এমন কিছু কার্যকলাপ প্রকাশ পেয়েছিলো যা সমালোচনা ও অসন্তোষের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কেননা অনেকে প্রশাসকদেরকে তখনও সেই দৃষ্টিতেই দেখতো, যে দৃষ্টিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও হযরত আবূ বকর ও হযরত উমর (রা)-এর প্রশাসকদের দেখতো। তাই তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন ঘটনা শ্রুত হতে লাগলো এবং সমালোচনার ঝড় উঠতে লাগলো, অথচ খলীফা ও শাসকের দৃষ্টিতে এমন কিছু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিচার-বিবেচনা থাকে যা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না। কিন্তু সকলের পক্ষে তা মেনে নেয়া সম্ভব হয় না। ওস্তাদ কুরদ আলী তাঁর 'ইসলামী প্রশাসন' শীর্ষক প্রবন্ধমালায় তারিখে তাবারীর উদ্ধৃতিতে লিখেছেন:
"নবী ﷺ-এর প্রশাসকগণের তিন-চতুর্থাংশই ছিলেন বনূ উমাইয়া গোত্রীয়। কেননা দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি যোগ্য ও সমর্থ লোকদেরই ডেকেছেন। প্রশাসনিক বিষয়ে অজ্ঞ, অনভিজ্ঞ ও দুর্বল লোকদের ডাকেন নি। এটা এ বিষয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ যে, বাহিনীর নেতৃত্ব, শাসন ও প্রশাসন পরিচালনার সবকিছু ইমাম বা প্রধান শাসকেরই ইখতিয়ারভুক্ত। এ বিষয়ে তিনি সম্পদশালী হওয়া, গোত্রীয় আভিজাত্য, ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কের প্রাচীনতা কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠত্বের দিকে তাকাবেন না, বরং তিনি দেখবেন জ্ঞান ও যোগ্যতার বিষয়টি অর্থাৎ অর্পিত দায়িত্ব পালনের এবং ন্যায় ও প্রজ্ঞাপূর্ণ শাসন পরিচালনার সামর্থ্য কি পরিমাণ আছে।" [আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-১০২]
প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে হযরত উসমান (রা)-এর অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার সমর্থনে প্রধান বিচারপতি আবদুল জাব্বার যে বক্তব্য পেশ করেছেন তার উদ্ধৃতি দিয়ে ইব্ন আবুল হাদীদ বলেন,
"এ কথা দাবি করা সম্ভব নয় যে, প্রশাসকদেরকে নিয়োগ করার সময় হযরত উসমান (রা) তাদের মাঝে সততা ও পবিত্রতা ছাড়া অন্য কোন অবস্থার কথা জানতেন। কেননা তাদের যেসব মন্দ আচরণের কথা বলা হয়েছে তা পরবর্তীতে প্রকাশ পেয়েছে। আর পরবর্তীতে মন্দ প্রকাশ পাওয়ার কারণে এটা অসম্ভব নয় যে, প্রথম দিকে প্রকৃতপক্ষেই তাদের অবস্থা অজ্ঞাত ছিলো। কিন্তু অন্তত তাঁর নিকট অজ্ঞাত ছিলো।" [শরহে নাহজুল বালাগা, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১২]
ওস্তাদ কুরদ আলী বলেন, "এটাই কি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক নয় যে, প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে হযরত উসমান আপন গোত্র ও গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করবেন যারা তাঁর পূর্ণ আস্থাভাজন ছিলেন এবং (স্বভাবতই) তাঁর সফলতা লাভের ব্যাপারে সর্বাধিক আগ্রহী ও উৎসাহী ছিলেন। [আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-১০৩]
প্রশাসক নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে হযরত উসমান (রা)-এর পক্ষ সমর্থনে কৈফিয়তমূলক যা কিছু বলা সম্ভব সেগুলো সত্ত্বেও আমরা তাঁকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করি না, বরং আমরা তাঁকে একজন মুজতাহিদ মনে করি যিনি কখনো ভুল করেন, কখনো নির্ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে থাকেন। তাছাড়া আল্লাহর সামনে কারো পবিত্রতা ঘোষণা করতে চাই না। মারওয়ান ইবনুল হাকাম, ওয়ালীদ ইব্ন উকবা ও আবদুল্লাহ ইবন সা'দ ইব্ন আবী সারাহএর কার্যকলাপ ও খলীফার সাথে তাদের নিকট আত্মীয়তার স্পর্শ ও খলীফার দরবারে তাদের প্রভাব ও মর্যাদায় অপব্যবহার সম্পর্কেও কোন কৈফিয়ত পেশ করতে চাই না কিংবা তাঁদের প্রশাসনিক দক্ষতা, যোগ্যতা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সম্পর্কেও কিছু বলতে চাই না। তবে একথা আমরা নির্দ্বিধায় বলতে চাই, উসমান (রা)-এর প্রতি অসন্তোষ ও বিদ্রোহ পোষণকারীদের অধিকাংশ ই আন্তরিক ছিলো না এবং ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকেও মুক্ত ছিলো না।
বিদগ্ধ গবেষক আব্বাস মাহমূদ আল-আক্কাদ উসমানবিরোধী অসন্তোষ ও বিদ্রোহের বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে ইনসাফপূর্ণ অতি উত্তম বক্তব্য পেশ করেছেন। তিনি বলেন, খলীফার নীতি ও কর্মপন্থার সমালোচনা ও কৈফিয়ত তলব করার ক্ষেত্রে অতিশয় বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন করা হয়েছে। ইসলামী উম্মাহর সদস্যদেরকে ইসলাম যে বাক স্বাধীনতা প্রদান করেছে তার যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। উসমান (রা)-এর সমালোচনায় যারা সোচ্চার হয়েছিলো তারা ছিলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একদল লোক। কথায় ও কাজে তাদের কোন মিল ছিলো না। যা বলতো তা করতো না, বরং বিপরীতটাই করতো। তাদের মাঝে এমন লোকও ছিলো যার ওপর হযরত উসমান (রা) হদ্দ কায়েম করেছিলেন কিংবা কোন গুরুতর অপরাধে তার পিতাকে আটক করেছিলেন কিংবা তার ও তার অবৈধ স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদের আদেশ জারি করেছেন কিংবা প্রশাসনিক পদে তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আর খলীফা এ সকল পদক্ষেপ শুধু এজন্যই গ্রহণ করেছেন যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দুষ্কর্ম প্রবৃত্ত ছিলো। এ সকল স্বার্থই খলীফার নীতি ও কর্মের সমালোচনায় আন্দোলনকে দানা বাঁধিয়ে তুলেছিলো। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৭০৬]