📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 উসমান (রা)-এর বায়'আত

📄 উসমান (রা)-এর বায়'আত


গুপ্তঘাতকের হাতে গুরুতর জখম হওয়ার পর উমর (রা) যখম মৃত্যুশয্যায় শায়িত তখন তাঁর মৃত্যুর পর খিলাফতের বিষয়টি তিনি ছয়জন বিশিষ্ট সাহাবীর পরামর্শের ওপর ছেড়ে দিলেন। তাঁরা হলেন উসমান ইব্‌ন আফফান, আলী ইব্‌ন আবূ তালিব, তালহা ইব্‌ন ওবায়দুল্লাহ, যুবায়র ইবনুল আওয়াম, সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস ও আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা)।

ছয়জনের কোন একজনকে সুনির্দিষ্টভাবে মনোনীত করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে হযরত উমর (রা) বললেন, জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় আমি এ দায়িত্বভার বহন করতে রাজী নই। আল্লাহ্ যদি তোমাদের কল্যাণ চান তবে এঁদের সর্বোত্তম জনের পাশে তোমাদেরকে একত্র করবেন, যেমন তোমাদের নবী ﷺ-এর ইন্তিকালের পর তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির পাশে তোমাদেরকে একত্র করেছিলেন।

তাঁর পূর্ণ তাকওয়া ও সতর্কতার অবস্থা এই ছিলো যে, হযরত সাঈদ ইব্‌ন যায়দ ইব্‌ন ওমায়র ইব্‌ নুফায়ল (রা)-কে তিনি মজলিসে শুরার নামভুক্ত করেন নি। কেননা তিনি ছিলেন তাঁর চাচাত ভাই। ফলে তাঁর আশংকা হয়েছিলো যে, নিকট সম্পর্কের বিষয় বিবেচনা করে হয়তো তাঁকেই খিলাফতের দায়িত্বভার প্রদান করা হতে পারে। তাই শুরা থেকেই তাঁকে বাদ দিয়েছিলেন, অথচ তিনি ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবার অন্যতম। শুরা সদস্যদের উপদেশ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, তোমাদের পরামর্শ সভায় আবদুল্লাহ্ ইবন উমর উপস্থিত থাকবে। কিন্তু খিলাফতের কোন দায়িত্ব তার হাতে যাবে না। শুরার সিদ্ধান্ত হওয়া পর্যন্ত তিনদিন হযরত সুহায়ব ইবন সিনান রোমীকে তিনি সালাত আদায়ের অসিয়ত করলেন এবং মজলিসে শুরাকে লোকদের সঙ্গে পরামর্শপূর্বক ছয়জনের ঐকমত্যের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অসিয়ত করলেন। সেই সাথে তিনি এও বললেন, আমি মনে করি না, মানুষ উসমান ও আলী (রা)- এর সমতুল্য কাউকে মনে করবে।

হযরত উমর (রা)-এর কাফন-দাফন হতে যখন অবসর পাওয়া গেলো তখন হযরত মিকদাদ ইব্‌ন আসওয়াদ (রা) তাঁদেরকে এক ঘরে একত্র করলেন। কিন্তু সেখানে অনেক কথা হলো এবং শোরগোল উঠলো। অতঃপর পরিস্থিতি এই পর্যায়ে উপনীত হলো যে, তাঁদের তিনজন নিজেদের অধিকার অপর তিনজনের অনুকূলে সোপর্দ করলেন। হযরত যুবায়র (রা) তাঁর খিলাফত লাভের অধিকার হযরত আলী (রা)-এর হাতে সোপর্দ করলেন। হযরত সা'দ (রা) আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা)-এর হাতে সোপর্দ করলেন। পক্ষান্তরে হযরত তালহা (রা) আপন অধিকার হযরত উসমান (রা)-এর অনুকূলে সোপর্দ করলেন। তখন হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) হযরত আলী ও উসমান (রা)-কে বললেন, আপনাদের দু'জনের কে এ বিষয় থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেবেন? তখন তাঁর হাতেই আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব অর্পণ করবো। আর তিনি আল্লাহ্ ও ইসলামকে সাক্ষী রেখে অবশিষ্ট দু'জনের শ্রেষ্ঠ জনকে খিলাফতের দায়িত্ব প্রদান করবেন। এ প্রশ্নের জবাবে হযরত আলী ও উসমান (রা) উভয়ে নীরবতা অবলম্বন করলেন। তখন হযরত আবদুর রহমান (রা) বললেন, দেখুন, আমি আমার অধিকার পরিত্যাগ করছি। এখন আমি আল্লাহ্ ও ইসলামকে সাক্ষী রেখে ইজতিহাদ করবো এবং আপনাদের উভয়ের মাঝে যোগ্যতর ব্যক্তিকে দায়িত্ব অর্পণ করবো। এ প্রস্তাবে উভয়ে সম্মতি প্রকাশ করলেন। অতঃপর তিনি উভয়ের গুণ ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে সম্বোধন করলেন এবং এই প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন যে, তাঁর হাতে শাসনভার অর্পণ করলে তিনি ইনসাফ করবেন, পক্ষান্তরে অপরজনকে মনোনীত করা হলে তিনি তাঁর পূর্ণ আনুগত্য করবেন। তাঁরা উভয়ে হ্যাঁ বলে প্রতিশ্রুতি দান করলেন।

অতঃপর হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) উভয়ের ব্যাপারে মানুষের পরামর্শ গ্রহণ করতে লাগলেন এবং একত্রভাবে ও আলাদাভাবে, দু'জন দু'জন ও একজন একজন করে একান্তে ও প্রকাশ্যে মুসলমানদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের মতামত সংগ্রহ করতে লাগলেন, এমন কি পর্দার ভেতরের নারীগণের মতামত চেয়ে পাঠালেন। মক্তবের বালকদেরও জিজ্ঞেস করলেন এমন কি মদীনায় আগত সওয়ার ও বেদুঈনদেরও বাদ দিলেন না। তিন দিন তিন রাত এটা চললো। এর মধ্যে উসমান ইব্‌ন আফফান (রা)-এর অগ্রগণ্যতার বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশকারী কাউকে তিনি পেলেন না। এই মধ্যবর্তী সময়ে খুব সামান্যই তিনি ঘুমিয়েছেন। পুরো সময় তাঁর কেটেছে নামায, দু'আ ও ইসতিখারায় কিংবা বিচক্ষণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে যোগ জিজ্ঞাসায়।

অতঃপর হযরত উমর (রা)-এর শাহাদাত বরণের চতুর্থ দিন তিনি সেই ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন, যেখানে শুরার সদস্যগণ একত্র হয়েছিলেন। অতঃপর তিনি হযরত আলী ও উসমান (রা)-কে ডেকে পাঠালেন। উভয়ে উপস্থিত হলে তিনি তাঁদের লক্ষ্য করে বললেন, আপনাদের উভয় সম্পর্কে আমি মানুষের মতামত গ্রহণ করেছি, এমন কাউকে আমি দেখিনি, যে অন্য কাউকে আপনাদের সমতুল্য মনে করে। অতঃপর তিনি উভয়ের নিকট থেকে পুনঃপ্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন, তাঁকে শাসনভার প্রদান করলে তিনি ইনসাফ করবেন। পক্ষান্তরে অপরজনকে তাঁর ওপর শাসক নিযুক্ত করা হলে তিনি তাঁর পূর্ণ আনুগত্য করবেন। অতঃপর উভয়কে নিয়ে তিনি মসজিদে গেলেন। সে সময় তিনি ঐ পাগড়ী মোবারক পরিধান করেছিলেন, যা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ তাঁকে পরিয়ে দিয়েছিলেন এবং একটি তরবারিও ধারণ করেছিলেন।

বিশিষ্ট আনসার ও মুহাজিরগণকে তিনি ডেকে পাঠালেন এবং জনসাধারণ্যে নামাযের এলান করলেন। ফলে মসজিদ লোকে লোকারণ্য হয়ে গেলো। মানুষ গায়ে গায়ে লেগে বসলো। তারপরও হযরত উসমান (রা) সবার পেছনে বসার জায়গা পেলেন। কেননা তিনি খুব লাজুক প্রকৃতির লোক ছিলেন (আল্লাহ্ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন)।

অতঃপর হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর মিম্বরে আরোহণ করলেন এবং দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে নীচু স্বরে বহু দু'আ করলেন। উপস্থিত লোকেরা তা শুনতে পেলো না। অতঃপর আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) বক্তব্য শুরু করে বললেন,
"হে লোক সকল! আমি একান্তে ও প্রকাশ্যে তোমাদেরকে তোমাদের মনের কথা জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু এমন কাউকে খুঁজে পাইনি, যে এ দু'জনের মুকাবিলায় কাউকে যোগ্য মনে করে হয় আলী কিংবা উসমান। সুতরাং হে আলী! আপনি উঠে আসুন।"
হযরত আলী (রা) উঠে এসে পাশে মিম্বরের নীচে দাঁড়ালেন। হযরত আবদুর রহমান (রা) তাঁর হাত ধরে বললেন, আপনি কি আল্লাহ্র কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নত এবং আবূ বকর ও উমর (রা)-এর নীতি ও কর্মের ওপর আমার বায়'আত গ্রহণ করবেন? তিনি বললেন, আল্লাহ্ রহম করুন, তা করবো না, তবে আমার সাধ্য ও ক্ষমতা অনুযায়ী চেষ্টা করার শর্তে করতে পারি।
হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) তখন তাঁর হাত ছেড়ে দিয়ে বললেন, "হে উসমান! আপনি আমার কাছে উঠে আসুন।" অতঃপর তিনি তাঁর হাত ধরে বললেন, আপনি কি আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নত এবং আবূ বকর ও উমর (রা)-এর নীতি ও কর্ম অনুসরণের শর্তে আমার বায়'আত গ্রহণ করতে সম্মত আছেন? তিনি বললেন, আল্লাহ্ রহম করুন, আমি সম্মত আছি।

তখন হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) হযরত উসমান (রা)-এর হাত নিজের হাতে ধারণ করে মসজিদের ছাদের দিকে মাথা তুললেন এবং ঘোষণা করলেন, "হে আল্লাহ্! শুনুন এবং সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ্! শুনুন এবং সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ! শুনুন এবং সাক্ষী থাকুন। আমার কাঁধে খিলাফতের যে দায়িত্ব ছিলো তা আমি উসমান (রা)-এর কাঁধে অর্পণ করলাম।"

উপস্থিত লোকেরা তখন উপচে পড়ে হযরত উসমান (রা)-এর হাতে বায়'আত হতে লাগলো, এমন কি মিম্বরের নীচে তারা তাঁকে ঢেকে ফেললো। তখন হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) নবী ﷺ-এর বসার স্থানে বসলেন এবং হযরত উসমান (রা)-কে নীচে মিম্বরের দ্বিতীয় ধাপে বসালেন আর লোকেরা তাঁর নিকট এসে বায়'আত হতে লাগলো। হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) প্রথমে বায়'আত হলেন। কোন কোন মতে তিনি শেষে বায়'আত হয়েছিলেন। [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৪-৪৭]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত উসমান (রা)-এর ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদা

📄 হযরত উসমান (রা)-এর ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদা


বলা বাহুল্য, এ দায়িত্বভার হযরত উসমান (রা)-এর বয়স, গুণ, বৈশিষ্ট্য ও আরব ইসলামী সমাজে তাঁর অশেষ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে পূর্ণ সংগতিপূর্ণ ছিলো। হস্তিবাহিনীর ঘটনার ষষ্ঠ বছর তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর চেয়ে প্রায় পাঁচ বছরের ছোট ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ দারুল আরকামে প্রবেশ করার পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং হিজরতের পূর্বে মক্কায় রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর কন্যা হযরত রুকাইয়া (রা)-কে বিয়ে করেছিলেন।

কুরায়শের নির্যাতন ও নিপীড়ন যখন ভীষণ রূপ ধারণ করলো তখন তিনি নবী ﷺ -এর নিকট সস্ত্রীক হিজরতের অনুমতি প্রার্থনা করলেন এবং অনুমতি প্রাপ্ত হয়ে হযরত রুকাইয়া (রা)-সহ হাবশায় হিজরত করলেন। এ দু'জন সম্পর্কেই রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন, "এ দু'জনই সর্বপ্রথম আল্লাহর দিকে হিজরত করেছে...।" অতঃপর নবী ﷺ ও সাহাবা-কিরাম মদীনায় হিজরত করার পর তিনি হাবশা থেকে প্রত্যাবর্তন করে মদীনায় হিজরত করলেন।

হযরত রুকাইয়া (রা)-এর ইন্তিকালের পর রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর অপর কন্যা উম্মে কুলসুম (রা)-কে তাঁর সঙ্গে বিয়ে দেন। এ এমন অনন্য সৌভাগ্য যা হযরত উসমান (রা) ছাড়া অন্য কারো ভাগ্যে জোটেনি। এ কারণে তাঁর উপাধি হয়েছিলো "যিনুরাঈন" (দুই নূরের অধিকারী)।

সমগ্র কুরায়শ গোত্রেও তিনি শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি ছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ্ ﷺ যখন হযরত উমর (রা)-কে হুদায়বিয়ার সন্ধি প্রসঙ্গে কুরায়শের নিকট দূত রূপে প্রেরণ করতে মনস্থ করলেন তখন উমর (রা) বলেছিলেন, আমি আপনাকে এমন লোকের কথা বলবো যিনি কুরায়শের মাঝে আমার চেয়ে অধিক মর্যাদার অধিকারী। তিনি হলেন উসমান ইব্‌ন আফফান। তখন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ উসমান ইব্‌ন আফফান (রা)-কে ডেকে আবু সুফিয়ানসহ কুরায়শের নেতৃস্থানীয় লোকদের নিকট পাঠালেন। উসমান (রা) মক্কায় আগমনপূর্বক আবু সুফিয়ানসহ বিশিষ্ট কুরায়শ নেতৃবর্গের সঙ্গে দেখা করলেন এবং তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ্-এর বার্তা পৌঁছে দিলেন। তখন কুরায়শ নেতৃবর্গ তাঁকে বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করতে পার। কিন্তু তিনি এক কথায় তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ না করা পর্যন্ত আমি তা করতে পারি না। [সীরাতে ইব্‌ন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩১৫]

উসমান (রা) ফিরে আসার পর মুসলমানগণ তাকে বললেন, হে আবু আবদুল্লাহ্! আপনি তো মন ভরে বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করে নিয়েছেন! তখন তিনি বললেন, আমার প্রতি খুবই খারাপ ধারণা করেছ তোমরা। যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সেই মহান সত্তার শপথ! যদি এক বছরও আমি সেখানে থাকতাম আর রাসূলুল্লাহ্ ﷺ হুদায়বিয়ায় অবস্থান করতেন তাহলেও তিনি তাওয়াফ না করা পর্যন্ত আমি তাওয়াফ করতাম না। কুরায়শরা তো আমাকে তাওয়াফ করার আহ্বান জানিয়ে ছিলো কিন্তু আমি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। [যাদুল মা'আদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৮২]

এদিকে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর নিকট এই মর্মে সংবাদ পৌঁছলো যে, উসমান (রা) নিহত হয়েছেন। তখন তিনি জিহাদের বায়'আত গ্রহণের আহ্বান জানালেন। তিনি বৃক্ষের ছায়ায় বসেছিলেন আর মুসলমানগণ তাঁর কাছে এসে এই শর্তে বায়'আত হচ্ছিলেন যে, যুদ্ধ থেকে তাঁরা পলায়ন করবেন না। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ তখন নিজের হাতে হাত রেখে বললেন, এ হাত উসমান-এর পক্ষ হতে। এভাবে বায়'আতে রিযওয়ান সম্পন্ন হলো।

হযরত উমর (রা)-এর নিকটও হযরত উসমান (রা) বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। মানুষ যখন কোন বিষয়ে হযরত উমর (রা)-এর কাছে কোন নিবেদন পেশ করতে চাইতো তখন তারা হযরত উসমান ও আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা)-কে সুপারিশ ধরতো। তাছাড়া তাঁকে 'রাদীফ' বলে ডাকা হতো। আরবী ভাষায় রাদীফ ঐ ব্যক্তিকেই বলা হয় যাকে প্রধান ব্যক্তির দক্ষিণ হস্তরূপে মনে করা হয়। এ দু'জনকে দিয়ে কার্যোদ্ধার না হলে লোকেরা হযরত আব্বাস (রা)-কে গিয়ে ধরতো। [তারীখে তাবারী, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৩]

তাবুক অভিযানের দুর্যোগপূর্ণ ও সংকটকালীন সময়ে হযরত উসমান (রা)-ই মুসলিম বাহিনীর সামান ও রসদ সরবরাহ করেছিলেন। তাছাড়া বীরে রূমা নামক মিঠা পানির কূপ খরিদ করে মুসলমানদের জন্য ওয়াক্‌ফ করে দিয়েছিলেন।

হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন খাব্বাব (রা) হতে ইমাম তিরমিযী (র) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি দেখেছি, তাবুক অভিযানের বাহিনী প্রস্তুত করার জন্য নবী ﷺ সকলকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। তখন উসমান (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি হাওদা ও গদিসহ এক'শ উট আল্লাহর রাস্তায় দান করলাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ আবার উৎসাহ প্রদান করলেন। তখন হযরত উসমান (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যাবতীয় সামানসহ দু'শ উট আল্লাহ্র রাস্তায় দান করলাম। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ আবার উৎসাহ প্রদান করলেন। তখন হযরত উসমান (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যাবতীয় সামানসহ তিন'শ উট আল্লাহর রাস্তায় দান করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এই বলে মিম্বর থেকে নেমে এলেন, "এ ঘটনার পর উসমান আর কোন আমল না করলেও ক্ষতি নেই।"

হযরত আনাস (রা) হতে ইমাম তিরমিযী (র) বর্ণনা করেছেন এবং হাকিম (র) হযরত আবদুর রহমান ইবন জামুরাহ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন এবং বর্ণিত হাদীসকে বিশুদ্ধ বলে অভিমত দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন তাবুক অভিযানের সংকটকালীন বাহিনী প্রস্তুত করছিলেন তখন উসমান (রা) নবী ﷺ -এর নিকট এক হাজার দীনার পেশ করলেন এবং সেগুলো তাঁর কোলে ঢেলে দিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ সেগুলো গ্রহণ করে দু'বার বললেন: "আজকের পর উসমান যা কিছু করুক তার ক্ষতি নেই।"

হাকিম (র) হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হযরত উসমান নবী ﷺ হতে দু'বার জান্নাত খরিদ করেছিলেন। কেননা তিনি বীরে রূমা খরিদ করেছিলেন এবং সংকটকালীন (তাবুক অভিযানের) বাহিনীকে রসদ দান করেছিলেন।

হযরত উসমান (রা) বীরে রূমা বা রূমা কূপটি বিশ হাজার দিরহাম মূল্যে খরিদ করে মুসলমানদের জন্য ওয়াক্ফ করেছিলেন। কূপটি জনৈক ইহুদীর মালিকানাধীন ছিলো। সে সময় মুসলমানদের জন্য প্রচুর মিঠা পানির ব্যবস্থা করার ভীষণ প্রয়োজন ছিলো। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ আবার বললেন: "যে ব্যক্তি বীরে রূমা খরিদ করে মুসলমানদের জন্য ওয়াক্ফ করে দেবে, অবশ্য সেও অন্যদের ন্যায় তা থেকে পানি তুলতে পারবে। এর বিনিময়ে জান্নাতে সে একটি 'আশরাব' বা 'পানীয় উৎস' লাভ করবে।"

ইসাঈ হিসেবে ৬৮ বছর ও হিজরী হিসেবে ৭০ বছর বয়সে হযরত উসমান (রা) খিলাফতের দায়িত্বভার লাভ করেছিলেন।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত উসমান (রা)-এর আমলে বিজয়াভিযান ও ইসলামী সালতানাতের বিস্তার

📄 হযরত উসমান (রা)-এর আমলে বিজয়াভিযান ও ইসলামী সালতানাতের বিস্তার


হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফতকালে ইসলামী বিজয়াভিযান শীর্ষ শিখরে উপনীত হয়েছিলো। অবশ্য এর পেছনে ঐ সকল কার্যকারণই সক্রিয় ছিলো, যা ইসলাম মুসলমানদের অন্তরে শুরু থেকে সৃষ্টি করে দিয়েছিলো; যথা: আল্লাহ্ রাস্তায় জিহাদ ও শাহাদাতের মাধ্যমে জান্নাত লাভের আকাঙ্ক্ষা, দুনিয়ার জিন্দেগীর ক্ষণস্থায়ী স্বাদ-আহ্লাদের প্রতি তুচ্ছতা, সংখ্যা ও শক্তির প্রতি পরোয়াহীন, অসাধারণ শৌর্যবীর্য ও সাহসিকতা এবং সর্বোপরি আল্লাহর সাহায্য প্রত্যক্ষ অবলোকন। এ সকল কার্যকারণের চূড়ান্ত প্রকাশরূপে রোম, পারস্য ও উত্তর আফ্রিকার সুবিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইসলামী বিজয়াভিযানের বাঁধ ভাঙ্গার স্রোত দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছিলো এবং সে স্রোতের প্রবল তোড়ে ভেঙ্গে গিয়েছিলো দেশের পর দেশ এবং শহরের পর শহর, যেমন খড়কুটা ভেঙ্গে যায়।

সম্ভবত খলীফারূপে হযরত উসমান (রা) হযরত উমর (রা)-এর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পেছনে আল্লাহ্র এই হিকমত ও উম্মতের এই কল্যাণ নিহিত ছিলো যে, হযরত উমর (রা)-এর আমলে ইসলামী বিজয়াভিযানের যে শুভ সূচনা হয়েছিলো এবং ক্রমশ সুবিন্যস্ত ও বিস্তৃত হয়ে চলেছিলো হযরত উসমান (রা)-এর হাতে তার পূর্ণতা লাভ সহজ হবে। কেননা নতুন বিজিত এলাকার অধিকাংশ প্রশাসক ও ইসলামী বাহিনীর অধিকাংশ বিজয়ী সেনাপতির হযরত উসমানের সঙ্গে সুনিবিড় সম্পর্ক ছিলো। উদাহরণস্বরূপ মু'আবিয়া ইব্‌ন আবু সুফিয়ান, আমর ইবনুল 'আস, আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সা'দ ইব্‌ন আবী সারাহ, মারওয়ান ইবনুল হাকাম, ওয়ালীদ ইবনুল হাকাম প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। আর এ বিজয়াভিযান লক্ষ লক্ষ মানুষের ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণের কারণ হয়েছিলো যা নিঃসন্দেহে অতি বিরাট কল্যাণকর বিষয়।

উসমান (রা)-এর যুগেই আজারবাইজান ও তাবারিস্তান বিজিত হয়েছিলো এবং আবদুর রহমান ইব্‌ন রাবীয়া বাহেলী ক্যাসপিয়ান সাগরের সুবিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলের গভীরে প্রবেশ করেছিলেন। বালাজার, কুহিস্তান থেকে নিশাপুর, তাগারিস্তান থেকে মার্ক্স, বলখ ও খাওয়ারিযম এবং আরমেনিয়া থেকে তালিক্লিয়া পর্যন্ত সমগ্র ভূভাগ এর আওতাভুক্ত ছিলো। এভাবে অব্যাহত বিজয় যাত্রা 'তাফ্লীগ' পর্যন্ত গিয়ে উপনীত হয়েছিলো। তাঁর খিলাফত আমলেই মু'আবিয়া (রা) সাইপ্রাস দ্বীপ জয় করেছিলেন এবং ত্রিপোলী থেকে তাঞ্জা পর্যন্ত আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর উপকূলীয় অঞ্চল বিজিত হয়েছিলো।

উসমান (রা)-এর খিলাফত আমলেই ইসলামী খিলাফত নৌশক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করেছিলো। রোমকদের যুদ্ধ জাহাজগুলো দখল করার পাশাপাশি হযরত মু'আবিয়া আবদুল্লাহ্ ইবন সা'দ নতুন নতুন যুদ্ধ জাহাজ তৈরি করেছিলেন। ইসলামী সীমান্তে রোমকদের ক্রমাগত হামলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য একটি মজবুত নৌশক্তির অপরিহার্য প্রয়োজনও ছিলো। [তারীখুল উমাম আল-ইসলামিয়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭-৩০]

হযরত উমর (রা)-এর খিলাফত আমলে ইসলামী বাহিনী পারস্য ও সিরিয়ার সমগ্র অঞ্চল ও মিসর বিজয় সম্পন্ন করেছিলো বটে, কিন্তু কিছু কিছু বিজিত এলাকায় খিলাফতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং কোন না কোন ফিতনা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা মাত্র স্থানীয় অধিবাসীরা তাতে সাড়া দিতো এবং ইসলামী খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসতো। উসমান (রা)-এর যুগে ইসলামী বাহিনী বিদ্রোহ কবলিত এলাকায় অশান্তি দমন এবং ইসলামের শাসন ও নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার কাজে ব্যস্ত ছিলো। সুতরাং বিদ্রোহকবলিত এলাকাগুলোকে পুনরায় খিলাফতের আনুগত্যে ফিরিয়ে আনা নতুনভাবে জয় করারই নামান্তর ছিলো। তাছাড়া এমন বহু এলাকা উসমান (রা)-এর আমলে বিজিত হয়েছিলো যেখানে এর পূর্বে মুসলিম মুজাহিদগণের পদধ্বনি শ্রুত হয়নি। [আল খুলাফা আর-রাশিদূন, পৃষ্ঠা ২৭০]

উসমান (রা)-এর আমলেই মুসলমানগণ বলখ, হেরাত, কাবুল, বাদাখশান দখল করেছিলো এবং দক্ষিণ ইরানের বিদ্রোহী কিরআন ও সিজিস্তান বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলো। বিজিত রাষ্ট্র, বিজিত এলাকার উন্নয়ন প্রচেঠাতেও পূর্ণ মনোনিবেশ করেছিলো। নদী ও খাল খনন, রাস্তাঘাট নির্মাণ, বৃক্ষ রোপণ যেমন ব্যাপক পর্যায়ে করা হয়েছিলো তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপদ পরিবেশ তৈরির জন্য পুলিশ ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীও সৃষ্টি করা হয়েছিলো। এদিকে রোমকদের অব্যাহত হামলা এশিয়া মাইনর ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের দিকে অগ্রাভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রস্তুত করে দিয়েছিলো এবং আফ্রিকা মহাদেশের পশ্চিম ত্রিপোলী, বারকিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপদেশ সাইপ্রাসও এ সময় মুসলিম অধিকারে এসেছিলো এবং মিসর জয়ের উদ্দেশে রোমানদের তৈরী নৌবহর আলেকজান্দ্রিয়ার উপকূলে মুসলমানদের হাতে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছিলো। [তারীখে আরব, পৃষ্ঠা ৪৩-৪৪]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 সৎ পথপ্রাপ্ত উসমান (রা)-এর খিলাফত

📄 সৎ পথপ্রাপ্ত উসমান (রা)-এর খিলাফত


ইনসাফ ও সাম্যের প্রতিষ্ঠা, ইসলামী শরীয়তের পূর্ণ বাস্তবায়ন, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ, জনসাধারণের পূর্ণ নিরাপত্তার বিধান ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে উসমান (রা)-এর খিলাফত ছিলো পূর্বসূরি দুই খলীফার খিলাফতের আদর্শানুসারী।

তারীখে তাবারী ও সালিম ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ হতে বর্ণিত হয়েছে, উসমান (রা) খিলাফত গ্রহণের পর শেষ ক'বছর ব্যতীত সব ক'বছর হজ্জ করেছিলেন। তিনি জনসাধারণের পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিলেন এবং সকল প্রদেশে এই মর্মে ফরমান পাঠিয়েছিলেন যে, প্রতি হজ্জ মৌসুমে প্রশাসকগণ ও তাদের বিরুদ্ধে যাদের অভিযোগ রয়েছে তারা যেন তাঁর সামনে উপস্থিত হয়।

এই উপদেশবাণী ও তিনি বিভিন্ন প্রদেশে লিখে পাঠিয়েছিলেন, তোমরা পরস্পর সৎ কাজের আদেশ দান করো এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করো। কোন মুমিন যেন নিজেকে অপদস্থ না করে! কেননা আল্লাহ চাহে তো আমি সবলের বিরুদ্ধে ও দুর্বলের পক্ষে থাকব, যতক্ষণ সে মজলুম থাকবে।

মানুষ এ নীতির সুফল ভোগ করে চলেছিলো, কিন্তু এক সময় কিছু লোক এটাকে উম্মতের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির হাতিয়াররূপে ব্যবহার করা শুরু করলো। আল বিদায়া ওয়া নিহায়ার বর্ণনায় এসেছে, "হযরত উসমান (রা) তাঁর অধীনস্থ প্রশাসকগণকে প্রতি বছর হজ্জে উপস্থিত হওয়া বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলেন। প্রজাসাধারণের মাঝে তিনি ঘোষণা জারি করতেন যে, কোন প্রশাসকের বিরুদ্ধে কারো কোন ফরিয়াদ থাকলে সে যেন হজ্জে উপস্থিত হয়! আমি আমার প্রশাসকের নিকট হতে তার হক আদায় করে দেব।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৮]

ফন্ট সাইজ
15px
17px