📄 হযরত উমর (রা)-এর শাহাদাত
হযরত উমর (রা) যুবক ও তরুণ বয়সের কোন যিম্মীকে মদীনায় প্রবেশের অনুমতি দিতেন না। কিন্তু হযরত মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা) কুফায় অবস্থানকালে একবার ফিরোষ ওরফে আবু লুলু নামক এক তরুণ গোলামের ব্যাপারে হযরত উমর (রা)-এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করলেন। পারস্যের অগ্নিপূজক কিংবা খ্রীস্টান এই দাস যুবক ছিলো নেহাবন্দের বাসিন্দা এক দক্ষ কারিগর। প্রথমে সে রোমকদের হাতে বন্দী হয়েছিলো, পরবর্তীতে মুসলমানরা তাকে রোমকদের হাত থেকে নিয়ে নেয়। ২১ হিজরীতে নেহাবন্দের বন্দীরা যখন মদীনায় আগমন করেছিলো তখন আবূ লুলু বন্দীদলের কোন ছোট শিশুকে দেখতে পেলেই তার মাথায় হাত বুলিয়ে কেঁদে ফেলতো এবং তাকে লক্ষ্য করে বলতো, উমর আমার কলজে জ্বালিয়ে ফেলেছে। সে একাধারে কামার, ছুতার ও কারুকার ছিলো। তদুপরি অতি উত্তম যাঁতা প্রস্তুত করতে পারতো। তাই হযরত মুগীরা (রা) তার থেকে প্রতিদিন চার দিরহাম হিসেবে গ্রহণ করতেন।
একদিন সে হযরত উমর (রা)-এর কাছে গিয়ে অভিযোগ করলো, মুগীরা আমার ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়েছেন। আমার পক্ষ হয়ে আপনি তাকে বলুন, তিনি যেন আমার ভার কিছুটা লাঘব করে দেন। হযরত উমর (রা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি কি কাজ তুমি ভালো পারো? সে কাজের ফিরিস্তি দিলো, তখন হযরত উমর (রা) তাকে বললেন, তোমার ‘করের’ পরিমাণ বেশি নয়। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং মনিবের প্রতি সদাচরণ করে যাও। কিন্তু হযরত উমর (রা)-এর মনে মনে ইচ্ছা ছিলো যে, মুগীরার সঙ্গে দেখা করে তাকে তিনি করের পরিমাণ লাঘব করার কথা বলবেন। দাস আবু লুলু তখন ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেলো এবং দুই মাথাওয়ালা এক খঞ্জর তৈরি করে তাতে বিষ মাখালো। অতঃপর পারসিক যুগের বহু পুরনো নেতা হরমুযানকে তা দেখিয়ে বললো, এটা কেমন মনে হয় আপনার? সে বললো, আমার তো মনে হয় এটা দ্বারা কাউকে তুমি আঘাত করা মাত্র তার মৃত্যু অবহারিত। মোটকথা, এটা ছিলো অগ্নিপূজকদের একটা ষড়যন্ত্র যাতে ব্যক্তি ক্রোধ এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক জিঘাংসা কার্যকর ছিলো।
উমর (রা)-এর শহীদ হওয়ার দিন সকালে হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আবু বকর (রা) বলেছেন, গতকাল সন্ধ্যায় হরমুযান, আবু লুলু ও জাফীনাকে গোপন আলাপরত অবস্থায় দেখতে পেয়েছি। তারা যখন সটকে পড়লো তখন তাদের হাত থেকে ঐ খঞ্জরটি পড়ে গিয়েছিলো যা দ্বারা উমর (রা)-কে আঘাত করা হয়েছে। এ কারনেই বহু গবেষক এই মতামতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন যে, উমর (রা)-এর হত্যা একটি পূর্ব পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রেরই ফল ছিলো, যাতে অনারব ও ইহুদীদের সম্মিলিত হাত ছিলো। অবশ্য বিজিত জাতিবর্গের পক্ষ হতে এ ধরনের সন্ত্রাসী পদক্ষেপ অস্বাভাবিক নয়। কেননা যারা স্বাধীনতা হারিয়েছে এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থ লাভের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, সুযোগ-সুবিধা মতো তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হতেই পারে। ঘটনার দিন হযরত উমর (রা) ফজরের নামায পড়াতে দাঁড়ালেন। কিন্তু তাকবীর বলা মাত্র মানুষ শুনতে পেল তিনি চিৎকার করে বলছেন, আমাকে মেরে ফেলা হয়েছে অথবা কুকুর আমাকে কামড় বসিয়েছে। আবূ লুলু সে সময় তাঁকে কাঁধে ও পিঠে (এক বর্ণনা মতে) ছয়টি আঘাত করেছিলো। অতঃপর ঘাতক দু’ধারী ছুরি হাতে ছুটে বেরিয়ে যেতে লাগলো এবং ডানে বামে যাকে পেলো তাকেই আঘাত করলো। এভাবে মোট তেরোজনকে জখম করে ফেললো।
হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা) এ অবস্থা দেখে তাকে কাবু করার জন্য তার ওপর নিজের চাদর ছুঁড়ে ফেললো। ঘাতক যখন দেখলো যে, সে ফাঁদে পড়ে গেছে, নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে দিলো। এদিকে হযরত উমর (রা) এই আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে লুটিয়ে পড়লেন : وكان امر الله قدراً مقدوراً "আল্লাহ্র ফায়সালা অটল।” [ইবন সা'দ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫২-২৫৩] পরে হযরত উমর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, কে তাকে ছুরিকাঘাত করেছে? যখন তাঁকে মুগীরা (রা)-এর গোলামের কথা বলা হলো তখন তিনি বললেন, আলহামদুলিল্লাহ্, আমার ঘাতক এমন কেউ নয়, কখনো কোন সিজদা করেছে, যা দ্বারা সে আল্লাহ্র নিকট আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। কোন আরব আমাকে হত্যা করবে এমন হতে পারে না। [উসদুল গাবাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৭]
পুত্র আবদুল্লাহকে তিনি বললেন, উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা (রা)-এর নিকট গিয়ে বলো, উমর আপনাকে সালাম বলেছেন। আমীরুল মু'মিনীন বলো না। কেননা আমি আজ মু'মিনদের আমীর নই। তাঁকে গিয়ে বলো, উমর ইবনুল খাত্তাব তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পাশে দাফন হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করছে। হযরত আবদুল্লাহ গিয়ে সালাম করলেন এবং অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি দেখতে পেলেন, হযরত আয়েশা (রা) বসে বসে কাঁদছেন। তখন তিনি সালাম পেশ করে বললেন, উমর ইবনুল খাত্তাব আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং আপন সঙ্গীদ্বয়ের পাশে দাফন হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করছেন। হযরত আয়েশা (রা) বললেন, এটা তো আমি নিজের জন্য আশা করছিলাম। তবে আজ আমি তাঁকে আমার ওপর অগ্রাধিকার দেব।
হযরত আবদুল্লাহ্ (রা) ফিরে গেলে উমর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, কি খবর এনেছো? তিনি বললেন, হে আমীরুল মু'মিনীন, আপনি যা আকাঙ্ক্ষা করছেন, তিনি অনুমতি প্রদান করেছেন। উমর (রা) বললেন, আলহামদু লিল্লাহ, আমার কাছে ঐ শয়নস্থলটুকুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছুই ছিলো না। তবে দেখো, আমার মৃত্যুর পর খাটিয়ায় বহন করে আমাকে নিয়ে যাবে। অতঃপর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে, উমর ইবনুল খাত্তাব অনুমতি প্রার্থনা করছে, যদি তিনি অনুমতি দেন তবেই শুধু আমাকে প্রবেশ করাবে। আর যদি ফিরিয়ে দেন তবে মুসলমানদের সাধারণ কবরস্থানে আমাকে নিয়ে যাবে। কেননা আমার আশংকা এই যে, হয়তো বা শাসকের প্রতি সমীহ তাঁর অনুমতি প্রদানের কারণ হতে পারে।
যখন তাঁকে খাটিয়ায় তোলা হলো তখন মনে হচ্ছিলো যে, সেদিন ছাড়া আর কখনো মুসলমানদের ওপর কোন মুসীবত নাযিল হয়নি। হযরত আয়েশা (রা) তাঁকে পুনঃঅনুমতি প্রদান করলেন। ফলে তাঁকে সেখানেই দাফন করা হলো এবং আল্লাহ্ তাঁকে নবী ﷺ ও আবূ বকর (রা)-এর সান্নিধ্যে বিশ্রাম লাভের মহাসৌভাগ্য দান করলেন। [ইবন সা'দ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৪৪] বিদগ্ধ লেখক সৈয়দ আমীর আলী তাঁর 'আরব জাতির ইতিহাস' নামক গ্রন্থে হযরত উমর (রা)-এর মৃত্যুর ওপর মন্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, ইসলামের জন্য হযরত উমর (রা)-এর মৃত্যু ছিলো এক বিরাট শোকাবহ ঘটনা ও অপূরণীয় ক্ষতি। [A Short History of the Saracens, P-43-44] ২৩ হিজরীর ২৯ যিলহজ্জ তেষট্টি বছর বয়সে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর ওপর হামলা হয়েছিলো ২৬ যিলহজ্জ তারিখে অর্থাৎ ঘটনার তিন দিন পর তিনি শাহাদাত বরণ করেছিলেন এবং ২৪ হিজরীর ১ মুহররম রোজ শনিবার তিনি সমাধিস্থ হয়েছিলেন।
📄 হযরত আলী (রা)-এর শোক প্রকাশ ও শ্রদ্ধা নিবেদন
হযরত আবূ জুহায়ফা (র) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হযরত উমর (রা)-এর জানাযার নিকট ছিলাম। জানাযা চাদরে আচ্ছাদিত ছিলো। এমন সময় হযরত আলী (রা) উপস্থিত হলেন এবং মুখমণ্ডল হতে কাপড় সরিয়ে এক নজর দেখে বললেন, "হে আবূ হাফস! আল্লাহ্ তোমাকে রহম করুন। আল্লাহ্র শপথ! রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর পর তুমি ছাড়া এমন কেউ নেই যার আমলনামা নিয়ে আল্লাহ্র দরবারে হাযির হওয়া আমার নিকট অধিকতর প্রিয় হতে পারে।" [মুসনাদে আহমাদ ও মুসনাদে আলী ইব্ন আবূ তালিব]
হযরত উমর (রা)-এর শাহাদাত বরণ করার সময় হযরত আলী (রা) অস্বাভাবিকভাবে কেঁদেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, উমরের মৃত্যুতেই আমি কাঁদছি। কেননা তাঁর মৃত্যু ইসলামের প্রাসাদে এমন এক ফাটল সৃষ্টি করেছে যা কিয়ামত পর্যন্ত আর মেরামত করা যাবে না। [আল-ফুতুহাতুল ইসলামিয়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪২৯]