📄 হযরত উমর (রা)-এর বায়তুল মুকাদ্দাস সফর
সম্ভবত প্রিয় পাঠক জানতে একান্ত উদগ্রীব যে, রোম ও পারস্যের সম্রাট যাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত সেই আমীরুল মু'মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) কিভাবে কোন্ সাজে বায়তুল মুকাদ্দাস সফর করেছিলেন, পরিবেশ-পরিস্থিতি তো রাজকীয় জাঁকজমক ও জৌলুস দাবি করছিলো, যাতে বিজিত জাতির হৃদয় খলীফাতুল মুসলিমীনের প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধার পূর্ণ অনুভূতিতে আলোড়িত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। কিন্তু পাঠকবর্গ, আলোচ্য সফরের আসল চিত্র প্রত্যক্ষ করুন।
মেটে রংগের এক উটে চড়ে তিনি জাবিয়া এসে পৌঁছলেন। টুপি ও পাগড়ীবিহীন তাঁর খোলা মাথা রোদে ঝলসে যাচ্ছিলো। পা-দানি গাড়া বাহনের দু'পাশে ছিলো দু'পা। এক পশমী চাদর ছিলো যা আরোহণের গদিরূপে এবং বিশ্রামের সময় বিছানারূপে ব্যবহৃত হতো। খেজুর ছোবড়াপূর্ণ একটি থলে ছিলো তোশাদান। সফরের এই তোশাদানই ছিলো তাঁর বিশ্রামকালের বালিশ। গায়ে ছিলো খসখসে কাপড়ের জামা যার এক পার্শ্ব ছিলো ছেঁড়া। তিনি বললেন, এখানকার নেতাকে আমার কথা বলে ডেকে আনো। তখন জুলুমুসকে ডেকে আনা হলো। হযরত উমর (রা) বললেন, আমার জামাটা সেলাই করে ধুয়ে দাও। আর তোমাদের একটা জামা বা কাপড় আমাকে ধার দাও। তারা কাতানের জামা হাযির করলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি কাপড়? তারা বললো, এটা কাতান। তিনি কাতানের পরিচয় জানতে চাইলেন। তারা কাতানের পরিচয় বললো, তখন তিনি গায়ের জামা খুলে দিলেন এবং তা ধুয়ে রিপু করে তাঁর সামনে পেশ করা হলো। তখন তিনি তাদের দেয়া জামা খুলে দিলেন এবং নিজের জামা পরিধান করলেন।
জুলুমুস তখন তাকে বললেন, আপনি আরবের বাদশাহ। আর এ ভূখণ্ড উটের উপযোগী নয়। সুতরাং আপনি যদি এ ছাড়া অন্য কোন পোশাক গ্রহণ করতেন এবং তুর্কী ঘোড়ায় আরোহণ করতেন তাহলে রোমকদের চোখে তা অধিক সম্ভ্রমের বিষয় হতো। তিনি বললেন, আমরা এমন কাওম যাদেরকে আল্লাহ্ ইসলাম দ্বারা মর্যাদাবান করেছেন। সুতরাং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে আমরা চাই না। অতঃপর তাঁর খিদমতে তুর্কী ঘোড়া পেশ করা হলো। আর তিনি জ্বিন ও গদি ছাড়া শুধু নিজের একটা চাদর ঘোড়ার পিঠে ফেলে তার ওপর চড়ে বসলেন, (ঘোড়া গর্বিত চালে চলতে শুরু করলো)। আর তিনি বলে উঠলেন, ধরো, ধরো, মানুষ শয়তানের পিঠে সওয়ার হয় এর আগে আমি তো দেখিনি! তখন তাঁর উট আনা হলো এবং তাতে তিনি স্বস্তির সঙ্গে আরোহণ করলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৯-৬০]
১৮ হিজরীতে হযরত উমর (রা)-এর দ্বিতীয় দফা সিরিয়া সফরের সংক্ষিপ্ত চিত্র অবলোকন করুন। আল্লামা তাবারী বর্ণনা করেছেন: হযরত উমর (রা) হযরত আলী (রা)-কে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে একদল সাহাবা-কিরামসহ রওয়ানা হলেন এবং লোহিত সাগরের তীর ঘেঁষে আয়লার পথ ধরে কিছু দূরে গেলেন। গোলাম তাঁকে অনুসরণ করলো। তিনি বাহন থেকে নেমে পেশাব করলেন এবং ফিরে এসে গোলামের উটে আরোহণ করলেন। সে বাহনের পিঠে লোমের উল্টানো চাদর ছিলো। গোলামকে তিনি নিজের বাহন এগিয়ে দিলেন।
স্বাগত জাননোর জন্য আগত লোকদের অগ্রগামী অংশের সাথে দেখা হলে তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলো। আমীরুল মু'মিনীন কোথায়? তিনি (নিজেকে বুঝিয়ে) বললেন, তোমাদের সামনে। তখন তারা ভুল বুঝে তাঁকে অতিক্রম করে আরো সামনে চলে গেলো। এদিকে তিনি নিজে আয়লাতে গিয়ে অবতরণ করলেন। আর সাক্ষাতকারীদেরকে বলা হলো, আমীরুল মু'মিনীন তো আয়ালাতে পৌছে গেছেন! তখন তারা তাঁর নিকট ফিরে এলো। [আত-তাবারী, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৩-২০৪]
📄 নবী পরিবারের প্রতি হযরত উমর (রা)-এর আচরণ ও মনোভাব
প্রবল প্রতাপশালী শাসকরূপে মানুষের মাঝে ইনসাফপূর্ণ শাসন পরিচালনা ও খিলাফতের দায়িত্ব পালনে তাঁর সার্বক্ষণিক ব্যস্ততা ও আত্মনিয়োগ সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর পরিবার-পরিজনকে তিনি যথাযোগ্য শ্রদ্ধা করতেন, এমন কি আপন পরিবার ও সন্তানদের মুকাবিলায়ও তাঁদেরকে তিনি অগ্রাধিকার দিতেন। নমুনাস্বরূপ দু'একটি মাত্র ঘটনা উল্লেখ করছি:
হুসায়ন ইব্ন আলী (রা) বর্ণিত রেওয়ায়েতে আছে। তিনি বলেন, উমর (রা) একদিন আমাকে বললেন, হে বৎস! যদি আমাদের এখানে বেড়াতে আসতে তাহলে ভালো হতো। তাই একদিন আমি গেলাম। তিনি তখন মুআবিয়া (রা)-এর সঙ্গে একান্তে ছিলেন। ইব্ন উমর (রা) দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁর ভেতরে যাওয়ার অনুমতি ছিলো না। এ অবস্থায় আমি ফিরে চলে এলাম। পরে আমার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হলো। তখন তিনি বললেন, হে বৎস! তোমাকে যে আমাদের ওখানে যেতে দেখলাম না। আমি বললাম, গিয়েছিলাম। আপনি তখন মুআবিয়া (রা)-এর সঙ্গে একান্তে ছিলেন। তখন ইবন উমর (রা)-কে ফিরে যেত দেখে আমিও ফিরে গিয়েছিলাম। হযরত উমর (রা) বললেন, তুমি তো উমরের পুত্র আবদুল্লাহর চেয়ে অনুমতি লাভের অধিক হকদার! আমাদের মাথায় যে গুরু দায়িত্ব চেপেছো, তা তো দেখতেই পাচ্ছো। কিন্তু আল্লাহ্! তাই বলে তোমাদের ব্যাপারেও। অতঃপর তিনি তাঁর মাথায় হাত বুলালেন।
হযরত জাফর সাদিক (রা)-এর সূত্রে ইবন সা'দ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উমর (রা)-এর খিদমতে ইয়ামান থেকে কিছু পোশাক এলো। তিনি লোকদের মাঝে তা বণ্টন করে দিলেন। মানুষ সেই পোশাক পরে চলাফেরা করতে লাগলো। উমর (রা) কবর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানে বসা ছিলেন। লোকেরা তাঁর খিদমতে হাযির হয়ে সালাম পেশ করতে লাগলো এবং তাঁকে দু'আ দিতে লাগলো। এমন সময় হাসান ও হুসায়ন (রা) তাঁদের আম্মা হযরত ফাতিমা (রা)-এর ঘর থেকে বের হলেন এবং লোকজনের মধ্য দিয়ে চলতে লাগলেন। তাঁদের গায়ে ইতিপূর্বে বণ্টিত কোন পোশাক ছিলো না। উমর (রা)-এর মুখমণ্ডল মলিন হয়ে গেলো। তিনি বললেন, আল্লাহ্র শপথ! তোমাদেরকে পোশাক দান করে আমার মন খুশি হয়নি। সকলে বললো, হে আমীরুল মু'মিনীন! আপন প্রজাবর্গকে পোশাক দান করে আপনি উত্তম অনুগ্রহ করেছেন (তবে কিসে আপনার অসন্তোষ?) তিনি বললেন, (আমার অশান্তি হলো) এ দুই বালকের কারণে, যারা লোকজনের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছে, অথচ তাদের গায়ে (বণ্টনকৃত) কোন পোশাক নেই। কেনা পোশাকগুলো তাদের চেয়ে বড় আর তারা পোশাকগুলোর চেয়ে ছোট ছিলো। অতঃপর তিনি ইয়ামানে খবর পাঠালেন যে, অবিলম্বে হাসান ও হুসায়নের জন্য দুই জোড়া পোশাক প্রেরণ করো। আদেশমতো পোশাক প্রেরণ করা হলো। আর তিনি উভয়কে পোশাক পরিয়ে দিলেন।
হযরত আবু জাফর (রা) হতে বর্ণিত, আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত উমর (রা)-কে বিভিন্ন বিজয় (ও বিজয়লব্ধ সম্পদ) দান করলেন তখন তিনি নবী ﷺ -এর সাহাবাগণের এক জামাতকে জমায়েত করলেন। তখন আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা) বললেন, (অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারে) আপনাকে দিয়ে শুরু করুন। তিনি বললেন, না, আল্লাহর শপথ, বরং রাসূলুল্লাহ-এর নিকটতমকে দিয়ে ও তার খান্দান বনী হাশেমকে দিয়ে শুরু করবো। অতঃপর তিনি যথাক্রমে আব্বাস ও আলী (রা)-এর জন্য ভাতা নির্ধারণ করলেন। এভাবে পাঁচটি গোত্র হয়ে বনী আদী ইব্ন কা'ব পর্যন্ত উপনীত হলেন। প্রথমে বনী হাশিমের বদরী সাহাবীগণের জন্য, অতঃপর বনু উমাইয়া ইব্ন আবদে শামসের বদরী সাহাবীগণের জন্য, অতঃপর পর্যায়ক্রমে নিকটতরদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করলেন এবং রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে হাসান ও হুসায়ন (রা)-এর জন্যও ভাতা নির্ধারণ করলেন।
ইবন সা'দ (রা)-এর তাবাকাত গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে এবং হাফিয ইব্ন আসাকির (র) ও তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) যখন দিওয়ান (ভাতাপ্রাপ্তদের তালিকা) তৈরি করলেন তখন নবী ﷺ -এর নৈকট্যের কারণে হাসান-হুসায়ন উভয়কে বদরী সাহাবীগণের সঙ্গে তাঁদের পিতার সমপরিমাণ ভাতা প্রদান করলেন এবং উভয়ের জন্য পাঁচ হাজার দিরহাম করে নির্ধারণ করলেন।
আল ফারূক গ্রন্থে 'আহলে বায়তের হক ও আদব রক্ষা' শিরোনামে আল্লামা শিবলী নোমানী (র) বলেন, উমর (রা) গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে হযরত আলী (রা)-এর সঙ্গে পরামর্শ না করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না। পক্ষান্তরে হযরত আলী (রা)-ও পূর্ণ ইখলাস ও আন্তরিকতা সহকারে পরম হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পরামর্শ দিতেন। বায়তুল মুকাদ্দাস সফরের সময় হযরত উমর (রা) হযরত আলী (রা)-কে মদীনায় খিলাফতের যাবতীয় বিষয়ে স্থলাভিষিক্ত করে গিয়েছিলেন। তবে উভয়ের মাঝে প্রীতির ও সম্পৃতির পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। হযরত আলী (রা) যখন হযরত উমর (রা)-এর সাথে তাঁর ও ফাতিমার কন্যা সৈয়দা উম্মে কুলসুম (রা)-কে বিবাহ দিয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি তাঁর তিন পুত্রের নাম উমর, আবূ বকর ও উসমান রেখেছিলেন। বলা বাহুল্য, মানুষ তাঁর প্রিয়তম ব্যক্তির নামেই আপন পুত্রের নাম রেখে থাকে যাকে সে পূর্ণ আদর্শ ব্যক্তিত্ব মনে করে।
📄 হিজরী বর্ষ গণনার সূচনা
ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব যতদিন পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান থাকবে ততদিন হযরত আলী (রা)-এর একটি কীর্তি ও স্মৃতি অমর হয়ে থাকবে। হযরত উমর (রা)-এর যামানায় দিন, তারিখ ও বর্ষ গণনার বিষয়ে মানুষের মাঝে মতভেদ দেখা দিলো। একদল পারসিকের রাজপরিবারকেন্দ্রিক বর্ষ গণনার অনুরূপ কিম্বা রোমকদের বর্ষ গণনার অনুরূপ বর্ষ গণনা শুরু করতে চাইলো। অন্য দল বললো, রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর জন্ম লাভ বা নবুয়ত প্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে বর্ষ গণনা শুরু করো। কিন্তু আলী (রা) পরামর্শ দিলেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্ষ গণনা করা হোক।
হযরত উমর (রা) ও অন্যান্য সাহাবা-কিরাম এ মতামত পছন্দ করলেন এবং হিজরতের ঘটনা থেকে বর্ষ গণনার আদেশ জারি করলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৫] এভাবেই ইসলামী বর্ষপঞ্জীকে কোন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিবর্তে হোক না তা স্বয়ং নবী ﷺ এর সুমহান ব্যক্তিত্ব যা আল্লাহ্ ও আল্লাহর বান্দাদের নিকট মানব সমাজের মাঝে প্রিয়তম ব্যক্তিত্ব এবং যুদ্ধ ও বিজয়ের কোন ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পরিবর্তে এমন একটি বড় ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে যার রয়েছে নিজস্ব ভাব ও মর্মবাণী এবং নিজস্ব চেতনা ও দিকনির্দেশনা।
বস্তুত হিজরতের সঙ্গে ইসলামী বর্ষপঞ্জীর সংযোগের নিগূঢ় তত্ত্ব ও মর্ম এই যে, এর ফলে ইসলামী বর্ষপঞ্জী দাওয়াত ও রিসালাতের এক সুস্পষ্ট ও স্থায়ী ছাপ গ্রহণ করেছে। ফলে মুসলমানদের নিকট ও সকল চিন্তাশীল মানুষের নিকট এ সত্য দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, ঈমান, আকীদা ও বিশ্বাসই হলো ইজ্জত ও মর্যাদার উৎস তথা উন্নতি ও অগ্রগতির সূচক। স্বদেশের ও স্বজনদের সকল প্রীতি বন্ধন ও অভ্যস্ত জীবনের সকল আকর্ষণ হতে ঈমান ও আকীদার দাবি অনেক বড়। তাছাড়া তাতে গোটা বিশ্ব মানবতার জন্য নিহিত ছিলো একটি শুভ ইঙ্গিত। কেননা হিজরতের মহান ঘটনা ছিলো মানব জাতির ইতিহাসে ও মানব সভ্যতার যাত্রাপথে এক নবযুগের সূচনা। বিশ্বাস ও আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার এবং বিপদসংকুল ও সংগ্রামমুখর জীবনে সর্বোচ্চ ত্যাগ ও কুরবানী পেশ করার অনুপ্রেরণা লাভের এক অফুরন্ত উৎস।
📄 হযরত উমর (রা)-এর শাহাদাত
হযরত উমর (রা) যুবক ও তরুণ বয়সের কোন যিম্মীকে মদীনায় প্রবেশের অনুমতি দিতেন না। কিন্তু হযরত মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা) কুফায় অবস্থানকালে একবার ফিরোষ ওরফে আবু লুলু নামক এক তরুণ গোলামের ব্যাপারে হযরত উমর (রা)-এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করলেন। পারস্যের অগ্নিপূজক কিংবা খ্রীস্টান এই দাস যুবক ছিলো নেহাবন্দের বাসিন্দা এক দক্ষ কারিগর। প্রথমে সে রোমকদের হাতে বন্দী হয়েছিলো, পরবর্তীতে মুসলমানরা তাকে রোমকদের হাত থেকে নিয়ে নেয়। ২১ হিজরীতে নেহাবন্দের বন্দীরা যখন মদীনায় আগমন করেছিলো তখন আবূ লুলু বন্দীদলের কোন ছোট শিশুকে দেখতে পেলেই তার মাথায় হাত বুলিয়ে কেঁদে ফেলতো এবং তাকে লক্ষ্য করে বলতো, উমর আমার কলজে জ্বালিয়ে ফেলেছে। সে একাধারে কামার, ছুতার ও কারুকার ছিলো। তদুপরি অতি উত্তম যাঁতা প্রস্তুত করতে পারতো। তাই হযরত মুগীরা (রা) তার থেকে প্রতিদিন চার দিরহাম হিসেবে গ্রহণ করতেন।
একদিন সে হযরত উমর (রা)-এর কাছে গিয়ে অভিযোগ করলো, মুগীরা আমার ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়েছেন। আমার পক্ষ হয়ে আপনি তাকে বলুন, তিনি যেন আমার ভার কিছুটা লাঘব করে দেন। হযরত উমর (রা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি কি কাজ তুমি ভালো পারো? সে কাজের ফিরিস্তি দিলো, তখন হযরত উমর (রা) তাকে বললেন, তোমার ‘করের’ পরিমাণ বেশি নয়। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং মনিবের প্রতি সদাচরণ করে যাও। কিন্তু হযরত উমর (রা)-এর মনে মনে ইচ্ছা ছিলো যে, মুগীরার সঙ্গে দেখা করে তাকে তিনি করের পরিমাণ লাঘব করার কথা বলবেন। দাস আবু লুলু তখন ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেলো এবং দুই মাথাওয়ালা এক খঞ্জর তৈরি করে তাতে বিষ মাখালো। অতঃপর পারসিক যুগের বহু পুরনো নেতা হরমুযানকে তা দেখিয়ে বললো, এটা কেমন মনে হয় আপনার? সে বললো, আমার তো মনে হয় এটা দ্বারা কাউকে তুমি আঘাত করা মাত্র তার মৃত্যু অবহারিত। মোটকথা, এটা ছিলো অগ্নিপূজকদের একটা ষড়যন্ত্র যাতে ব্যক্তি ক্রোধ এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক জিঘাংসা কার্যকর ছিলো।
উমর (রা)-এর শহীদ হওয়ার দিন সকালে হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আবু বকর (রা) বলেছেন, গতকাল সন্ধ্যায় হরমুযান, আবু লুলু ও জাফীনাকে গোপন আলাপরত অবস্থায় দেখতে পেয়েছি। তারা যখন সটকে পড়লো তখন তাদের হাত থেকে ঐ খঞ্জরটি পড়ে গিয়েছিলো যা দ্বারা উমর (রা)-কে আঘাত করা হয়েছে। এ কারনেই বহু গবেষক এই মতামতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন যে, উমর (রা)-এর হত্যা একটি পূর্ব পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রেরই ফল ছিলো, যাতে অনারব ও ইহুদীদের সম্মিলিত হাত ছিলো। অবশ্য বিজিত জাতিবর্গের পক্ষ হতে এ ধরনের সন্ত্রাসী পদক্ষেপ অস্বাভাবিক নয়। কেননা যারা স্বাধীনতা হারিয়েছে এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থ লাভের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, সুযোগ-সুবিধা মতো তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হতেই পারে। ঘটনার দিন হযরত উমর (রা) ফজরের নামায পড়াতে দাঁড়ালেন। কিন্তু তাকবীর বলা মাত্র মানুষ শুনতে পেল তিনি চিৎকার করে বলছেন, আমাকে মেরে ফেলা হয়েছে অথবা কুকুর আমাকে কামড় বসিয়েছে। আবূ লুলু সে সময় তাঁকে কাঁধে ও পিঠে (এক বর্ণনা মতে) ছয়টি আঘাত করেছিলো। অতঃপর ঘাতক দু’ধারী ছুরি হাতে ছুটে বেরিয়ে যেতে লাগলো এবং ডানে বামে যাকে পেলো তাকেই আঘাত করলো। এভাবে মোট তেরোজনকে জখম করে ফেললো।
হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা) এ অবস্থা দেখে তাকে কাবু করার জন্য তার ওপর নিজের চাদর ছুঁড়ে ফেললো। ঘাতক যখন দেখলো যে, সে ফাঁদে পড়ে গেছে, নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে দিলো। এদিকে হযরত উমর (রা) এই আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে লুটিয়ে পড়লেন : وكان امر الله قدراً مقدوراً "আল্লাহ্র ফায়সালা অটল।” [ইবন সা'দ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫২-২৫৩] পরে হযরত উমর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, কে তাকে ছুরিকাঘাত করেছে? যখন তাঁকে মুগীরা (রা)-এর গোলামের কথা বলা হলো তখন তিনি বললেন, আলহামদুলিল্লাহ্, আমার ঘাতক এমন কেউ নয়, কখনো কোন সিজদা করেছে, যা দ্বারা সে আল্লাহ্র নিকট আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। কোন আরব আমাকে হত্যা করবে এমন হতে পারে না। [উসদুল গাবাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৭]
পুত্র আবদুল্লাহকে তিনি বললেন, উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা (রা)-এর নিকট গিয়ে বলো, উমর আপনাকে সালাম বলেছেন। আমীরুল মু'মিনীন বলো না। কেননা আমি আজ মু'মিনদের আমীর নই। তাঁকে গিয়ে বলো, উমর ইবনুল খাত্তাব তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পাশে দাফন হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করছে। হযরত আবদুল্লাহ গিয়ে সালাম করলেন এবং অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি দেখতে পেলেন, হযরত আয়েশা (রা) বসে বসে কাঁদছেন। তখন তিনি সালাম পেশ করে বললেন, উমর ইবনুল খাত্তাব আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং আপন সঙ্গীদ্বয়ের পাশে দাফন হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করছেন। হযরত আয়েশা (রা) বললেন, এটা তো আমি নিজের জন্য আশা করছিলাম। তবে আজ আমি তাঁকে আমার ওপর অগ্রাধিকার দেব।
হযরত আবদুল্লাহ্ (রা) ফিরে গেলে উমর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, কি খবর এনেছো? তিনি বললেন, হে আমীরুল মু'মিনীন, আপনি যা আকাঙ্ক্ষা করছেন, তিনি অনুমতি প্রদান করেছেন। উমর (রা) বললেন, আলহামদু লিল্লাহ, আমার কাছে ঐ শয়নস্থলটুকুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছুই ছিলো না। তবে দেখো, আমার মৃত্যুর পর খাটিয়ায় বহন করে আমাকে নিয়ে যাবে। অতঃপর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে, উমর ইবনুল খাত্তাব অনুমতি প্রার্থনা করছে, যদি তিনি অনুমতি দেন তবেই শুধু আমাকে প্রবেশ করাবে। আর যদি ফিরিয়ে দেন তবে মুসলমানদের সাধারণ কবরস্থানে আমাকে নিয়ে যাবে। কেননা আমার আশংকা এই যে, হয়তো বা শাসকের প্রতি সমীহ তাঁর অনুমতি প্রদানের কারণ হতে পারে।
যখন তাঁকে খাটিয়ায় তোলা হলো তখন মনে হচ্ছিলো যে, সেদিন ছাড়া আর কখনো মুসলমানদের ওপর কোন মুসীবত নাযিল হয়নি। হযরত আয়েশা (রা) তাঁকে পুনঃঅনুমতি প্রদান করলেন। ফলে তাঁকে সেখানেই দাফন করা হলো এবং আল্লাহ্ তাঁকে নবী ﷺ ও আবূ বকর (রা)-এর সান্নিধ্যে বিশ্রাম লাভের মহাসৌভাগ্য দান করলেন। [ইবন সা'দ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৪৪] বিদগ্ধ লেখক সৈয়দ আমীর আলী তাঁর 'আরব জাতির ইতিহাস' নামক গ্রন্থে হযরত উমর (রা)-এর মৃত্যুর ওপর মন্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, ইসলামের জন্য হযরত উমর (রা)-এর মৃত্যু ছিলো এক বিরাট শোকাবহ ঘটনা ও অপূরণীয় ক্ষতি। [A Short History of the Saracens, P-43-44] ২৩ হিজরীর ২৯ যিলহজ্জ তেষট্টি বছর বয়সে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর ওপর হামলা হয়েছিলো ২৬ যিলহজ্জ তারিখে অর্থাৎ ঘটনার তিন দিন পর তিনি শাহাদাত বরণ করেছিলেন এবং ২৪ হিজরীর ১ মুহররম রোজ শনিবার তিনি সমাধিস্থ হয়েছিলেন।