📄 বিজেতা আরবদের স্বভাব সরলতা, কষ্টসহিঞ্চুতা ও শৌর্যগুণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা
ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বিভিন্ন জাতি বহু নাযুক সময় সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করেছে। কিন্তু আরব মুসলিম উম্মাহ তখন নাযুকতম এক সময় সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছিলো। কেননা তারা মরুভূমির তাঁবুর ছায়ায় উট-রাখালির অভ্যস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে এমন দু'টি সভ্যতার সংস্পর্শে এসেছিলো যাদের ভোগ-বিলাস ও জীবন-জৌলুস ছিলো চরমে। উট বকরীর দুধ-গোশতই ছিলো যাদের প্রধান খাদ্য তাদের কাছে রোম ও পারস্যের ভোজন বিলাস ও খাদ্য বৈচিত্র্য ও ছিলো অকল্পনীয়। ফলে জীবন জৌলুসের এই আচমকা চমকে ও ঝলকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত ও অভিভূত হওয়া এবং রুচি সৌন্দর্যের নামে জীবন যাত্রায় পরিবর্তনের হাতছানিতে সাড়া দেয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের সামনে হযরত উমর (রা) ছিলেন সহজ-সরল ও কৃষ্ণ জীবনের উজ্জ্বলতম নমুনা। অব্যাহত বিজয়াভিযান ও সম্পদ স্রোতের মুখে উম্মাহর জীবন যাত্রায় ও মন-মানসে সূচিত পরিবর্তনের প্রতি ছিলো তাঁর সজাগ দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। সেই সাথে ছিলো উম্মাহর অভিভাবক হিসেবে কঠোর শাসন।
হযরত উমর (রা)-এর বায়তুল মুকাদ্দাস সফরের বিবরণ প্রসঙ্গে আল বিদায়ায় বর্ণিত হয়েছে যে, বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থানকারী সাহাবা কিরামের গায়ে রেশমী বস্ত্র দেখে তিনি তাঁদের প্রতি পাথর ছুঁড়তে উদ্যত হলেন। আর তাঁরা এই বলে কৈফিয়ত পেশ করলেন যে, অস্ত্র বহন ও রণাঙ্গনে বিচরণের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন রয়েছে। তখন তিনি শান্ত হলেন। [৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৬]
তারিক ইব্ন শিহাব বলেন, সিরিয়া সফরকালে হযরত উমর (রা) একটি অগভীর খাল পার হলেন মোজা খুলে উটসহ পানিতে নেমে। এতে আবূ উবায়দা (রা) অনুযোগের সুরে বললেন, স্থানীয় লোকদের সামনে আপনি আজ অবাক কাণ্ড করেছেন! তখন উমর (রা) তাঁর বুক চাপড়ে বললেন, হায়, আবু উবায়দা! অন্য কেউ যদি বলতো, তাহলে সান্ত্বনা খুঁজে পেতাম। তোমরা না ছিলে হীনতম, তুচ্ছতম ও ক্ষুদ্রতম এক জাতি! এরপর কুরআনের মর্যাদায় আল্লাহ্ তোমাদের উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। সুতরাং যতই তোমরা অন্য মর্যাদার প্রত্যাশী হবে আল্লাহর ইচ্ছায় ততই অপদস্থ হবে। [ইবনে কাছীর, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৬০]
অনারব অঞ্চলের আরব প্রশাসকদের নামে তিনি এই উপদেশ-পত্র প্রেরণ করেছিলেন: অনারব জীবনের ভোগ বিলাস ও বেশভূষা পরিহার করো এবং রোদ ভোগ করো। কেননা রোদ হলো আরবদের 'স্থান'। সুঠাম ও সবলদেহী হও এবং আহারেপোশাকে পূর্ণ কৃষ্ণমুখী হও। কষ্টসহিষ্ণু ও দৃঢ়চেতা হও এবং সওয়ারি পশুগুলোর যত্ন নাও। আর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী হও এবং অবিচলভাবে অগ্রসর হও।
নীচের বক্তব্যেও তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ কঠোর শাসননীতি ও নৈতিকতার প্রতি তাঁর সদাসতর্ক দৃষ্টির প্রমাণ রয়েছে। তিনি বলেছেন, 'ইসলাম এখন পরিপক্বতা লাভ করেছে। সাবধান, কুরায়শ চায় আল্লাহ্র মাল ইবাদতরূপে নয়, সাহায্যরূপে গ্রহণ করতে। কিন্তু খাত্তাবের পুত্রের জীবদ্দশায় তা হবে না। আমি হাররা উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আছি এবং কুরায়শের মাথা ও নিতম্ব ধরে রেখেছি যাতে তারা জাহান্নামে গিয়ে না পড়ে।
তাঁর সুগভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মানব স্বভাব ও মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে প্রখর জ্ঞানের আরেকটি প্রমাণ এই যে, নেতৃস্থানীয় সাহাবীদের এই বলে তিনি মদীনায় ধরে রেখেছিলেন যে, বিভিন্ন অঞ্চলে তোমাদের ছড়িয়ে পড়াই হলো উম্মাহর ব্যাপারে আমার বেশি আশংকার বিষয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, এ বিষয়ে সামান্য শৈথিল্য বিজিত এলাকায় ফিতনার কারণ হতে পারে। কেননা স্থানীয় জনগণ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে কেন্দ্র করে জড়ো হবে এবং বিভিন্ন রকম সংশয় দানা বাঁধবে এবং 'বহু নেতৃত্বে, ফলে চরম নৈরাজ্য ও অরাজকতা শুরু হবে।
শিয়া পন্থী বিশিষ্ট আইনবিশারদ ও ইসলাম সম্পর্কে ইংরেজী ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক সাইয়েদ আমীর আলী ফারুকী খিলাফত সম্পর্কে অত্যন্ত সারগর্ভ কথা বলেছেন। দেখুন: সংক্ষিপ্ত সিদ্দীকী খিলাফত মরুচারী বেদুইন গোত্রে শান্তি ও স্থিতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেই কেটে গিয়েছিলো। ইসলামী সালতানাতের নব শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের কোন সুযোগ তাঁর ছিলো না। কিন্তু উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) ছিলেন প্রকৃতই একজন মহান শাসক। খিলাফত লাভ করে বিজিত অঞ্চলের সুখ-শান্তি ও শাসন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার কাজে তিনি তাঁর বিপুল কর্ম প্রচেষ্টা অব্যাহতভাবে নিয়োজিত করেছিলেন। আর এটাই ছিলো প্রাথমিক যুগের ইসলামী সালতানাতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। [The Spirit of Islam, P. 278]
অন্যত্র তিনি বলেন, ইসলামের জন্য ফারুকী খিলাফত ছিলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধিশালী। তাঁর নৈতিকতা এবং স্বভাব ও মনোভাব ছিলো সুদৃঢ়। ন্যায় নীতি ছিলো অতি কঠোর এবং অনুভূতি ছিলো প্রখর, যা জীবনের পরিপক্বতা ও কর্ম শক্তির বৈশিষ্ট্যে ছিলো ভাস্বর। [A Short History of the Saracens, P. 27]
অন্যত্র লিখেছেন- তিনি যেমন ছিলেন কঠোর, তেমনি ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ ও দূরদর্শী। আরব জাতির জীবন, চরিত্র ও স্বভাব সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিলো ব্যাপক ও বিস্তৃত। তিনি নৈরাজ্যপূর্ণ ও দুর্বিনীত জীবন যাপনে অভ্যস্ত একটি জাতিকে নেতৃত্ব দানের যোগ্যতম ব্যক্তি ছিলেন। অপরাধ ও অপরাধী দমনের স্বভাব ক্ষমতাবলে তিনি যাযাবর গোত্রবর্গের স্বভাবপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিলেন, যাদের অধিকাংশ ছিলো প্রায় 'বন্য জীবনে' অভ্যস্ত। পরবর্তীতে এই আরব বেদুইনরা যখন উন্নত অনারব শহরে জনপদে বিলাস-প্রাচুর্যের বিচিত্র উপকরণ এবং আয়েশি ও জৌলুস জীবনের সাথে পরিচিত হল তখন খলীফা হযরত উমরের কঠোর শাসনই তাদেরকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করেছিলো। সালতানাতের সাধারণতম মানুষটিরও নাগালের মধ্যে তিনি বাস করতেন এবং রক্ষী ও প্রহরী ছাড়া রাতের অন্ধকারে 'অনুসন্ধান সফরে' বের হতেন। এমনই এক সাধারণ ও অনন্যসাধারণ জীবন যাপন করেছেন তাঁর যুগের সর্বাধিক প্রতাপশালী শাসক ব্যক্তিটি। [A Short History of the Saracens. P. 34-44]
স্যার উইলিয়াম ম্যুর লিখেছেন, ইসলামী সালতানাতে নবীর পরে উমরই ছিলেন শ্রেষ্ঠতম। তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা ও সত্যনিষ্ঠারই ফলে খিলাফতের এই দশ বছরে সিরিয়া, মিসর ও পারস্যের সমগ্র অঞ্চল ইসলামের শাসনবলয়ে এসে গিয়েছিলো এবং এখনো ইসলামী অঞ্চলরূপে চিহ্নিত হয়ে আছে। বিশাল সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র শাসক হয়েও প্রজ্ঞা ও প্রশান্তির এবং সর্বক্ষেত্রে ন্যায় ও সত্যপ্রীতির আকাল হয়নি কখনো তাঁর সুমহান ব্যক্তিত্বে। আমীরুল মু'মিনীন- এই একটিমাত্র সাধারণ উপাধি ছাড়া বড় কোন খেতাব নিজের জন্য তিনি পছন্দ করেন নি, অথচ তিনি ছিলেন আরবের অবিসংবাদিত নেতা! বিভিন্ন দূর প্রদেশ থেকে আগমনকারী প্রতিনিধি দল তাঁর সাক্ষাতপ্রার্থী হয়ে জিজ্ঞাসা করতো, আমীরুল মু'মিনীন মসজিদে উপস্থিত আছেন কিনা, অথচ তিনি তখন মসজিদ চত্বরে কিংবা আশেপাশেই বসে আছেন অতি সাধারণ বেশে।
📄 হযরত উমর (রা)-এর যুগে ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি
তদানীন্তন পৃথিবীর শাসন ক্ষমতা ও সমাজ সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কুক্ষিগতকারী দু'টি বিশ্ব শক্তির মুকাবিলায় যে অভাবনীয় বিজয় ফারুকী খিলাফত আমলে সম্পন্ন হয়েছিলো এবং প্রাচীন দেশ বিজেতাদের সামনে অপরাজেয়রূপে স্বীকৃত শহর ও জনপদগুলো একের পর এক যেভাবে খিলাফতে রাশেদার করতলগত হয়েছিলো এবং নতুন নতুন শহর ও সভ্যতা- কেন্দ্রের যেভাবে গোড়াপত্তন হয়েছিলো সেগুলোর, এমন কি অতি সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক পর্যালোচনা পেশ করাও এখানে সম্ভব নয়। ইসলামের সাধারণ ইতিহাস কিংবা হযরত উমর (রা) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের জীবনচরিতই হলো তার উপযুক্ত ক্ষেত্র।
📄 ফারুকে আযমের পাশে হযরত আলী (রা)
তবে হযরত উমর (রা) ও আলী (রা)-এর মাঝে পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধার, তাকওয়া ও পুণ্যের ক্ষেত্রে সহযোগিতার যে সুমধুর সম্পর্ক ছিলো এবং খিলাফতের কাজে আন্তরিক পরামর্শ দানের যে আদর্শ হযরত আলী (রা) স্থাপন করেছেন সে সম্পর্কে দু'একটি নমুনা এখানে আমরা অবশ্যই পেশ করবো।
হযরত নাফে আল-আব্ক্সী (র) বলেন, একবার আমি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) ও হযরত আলী (রা)-এর সঙ্গে সাদাকার উট রাখার 'আস্তাবলে' প্রবেশ করলাম। হযরত উসমান (রা) ছায়ায় বসে বিবরণ লিখে যাচ্ছিলেন। হযরত আলী (রা) তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে উমর (রা)-এর বক্তব্য তাঁকে বলে দিচ্ছিলেন। হযরত উমর (রা)-এর গায়ে ছিলো দু'টি কালো চাদর। একটি পরিধানে, অন্যটি মাথায় পেঁচানো। তিনি প্রচণ্ড রোদ ও গরমে দাঁড়িয়ে গণনা করছিলেন এবং রং ও দাঁতের বিবরণ লিখে যাচ্ছিলেন। এ পটভূমিতে আলী (রা) উসমান (রা)-কে বললেন, আল্লাহর কিতাবে রয়েছে: يا ابت استاجره ان خير من استاجرت القوى الامين . "হে পিতা, তাকে মজদুর রাখুন। কেননা সবল ও বিশ্বস্তই মজদুরির জন্য উত্তম।" অতঃপর তিনি হযরত উমর (রা)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, আমাদের মাঝে ইনিই হলেন 'সবল ও বিশ্বস্ত'। [তারীখে কামিল, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৫-৫৬]
এই সুগভীর আন্তরিকতা ও হিতাকাঙ্ক্ষার কারণেই বিভিন্ন সমস্যা ও সংকটকালে হযরত আলী (রা) তাঁকে সুচিন্তিত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছেন। একবার তো হযরত উমর (রা) এমনও বলেছেন, لو لا على لهلك عمر "আলী না হলে উমর হালাক হয়ে যেতো।" [ইস্তিআব, পৃষ্ঠা ১৫-২০] আর ইতিহাস ও সাহিত্য গ্রন্থের একটি স্বীকৃত প্রবাদ হলো, قضية ولا أبا حسن لها (এমন সংকট, অথচ কোন আবুল হাসান নেই!) সর্বোপরি নবী বলেছেন, বিচার জ্ঞানে আলী তাদের সর্বোত্তম। বায়তুল মাকদিস গমনকালে উমর (রা) তাঁকে স্থলাভিষিক্ত করে যান। আর হযরত আলী (রা) কর্তৃক উমর (রা)-এর কাছে তাঁর কন্যা উম্মু কুলসুমকে বিবাহ দানের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সম্পর্ক গড়ার বিষয়টি ফুটে ওঠে।
তবে ভাগ্য-নির্ধারণী নেহাবন্দ যুদ্ধের সময় হযরত আলী (রা) দিক-নির্দেশনামূলক যে সুচিন্তিত পরামর্শ প্রদান করেছিলেন, সেটাই হলো ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি ও খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর (রা)-এর প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও কল্যাণকামিতার উজ্জ্বলতম প্রমাণ। ঘটনার বিশদ বিবরণ শুনুন। আঠারো কিংবা উনিশ হিজরীতে অনুষ্ঠিত নেহাবন্দ যুদ্ধ এ কারণে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো যে, মুসলিম বাহিনী যখন পারস্যের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আহওয়াজ শহর দখল করে নিলো তখন পারসিক বাহিনী 'আরব' -এ অবস্থানরত সম্রাট 'ইয়াজদাজারদ'-কে পরিস্থিতি জানিয়ে ত্বরিৎ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানালো, আর সম্রাটের ফরমান পেয়ে খোরাসান, হালওয়ান ও সিন্ধুর রাজন্যবর্গ সাজ সাজ রবে সাড়া দিলো। এভাবে নেহাবন্দ যুদ্ধক্ষেত্রে দেড় লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী জড়ো হলো।
পারস্য সম্রাট সমগ্র জাতির অন্তরে ধর্মীয় উন্মাদনা, জাতীয় চেতনা ও সুপ্রাচীন সাসানী সাম্রাজ্য রক্ষায় প্রাণ বিসর্জনের উদ্দীপনা জাগ্রত করার জন্য সর্বপ্রকার কৌশল অবলম্বন করলেন। তার সাথে ছিলো 'দুরকিশ কাবিয়ানী' নামক কারুকার্যপূর্ণ ও রত্নখচিত জাতীয় পতাকা। পারসিকদের চোখে যা ছিলো তাদের জাতীয় সৌভাগ্যের প্রতীক। উপাস্য অগ্নিকুণ্ডও ছিলো পতাকার সঙ্গে। হরমুজ-পুত্র মরদান শাহকে বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করে সম্রাট তাকে অবিলম্বে নেহাবন্দ অভিমুখে যাত্রার নির্দেশ দিলেন।
ওদিকে মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাস (রা) প্রথমে পত্র-যোগে এবং পরে সশরীরে উপস্থিত হয়ে হযরত উমর (রা)-কে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বললেন, কুফাবাসী অগ্রাভিযানের জন্য আপনার অনুমতিপ্রার্থী যাতে প্রথম আঘাতের সুযোগে শত্রুশিবিরে ত্রাস সৃষ্টি করা যায়। হযরত উমর (রা) মজলিশ ডেকে বিশিষ্ট সাহাবা-কিরামের পরামর্শ চাইলেন এবং স্বাগত বক্তব্য রেখে বললেন, এ যুদ্ধের গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী। তাই আমার পরিকল্পনা এই যে, যতটা সম্ভব সৈন্য সংগ্রহ করে পশ্চাদ্শক্তিরূপে আমি শহরদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান গ্রহণ করি। তারপর অগ্রাভিযানের নির্দেশ প্রদান করি যেন আল্লাহ্ প্রত্যাশিত বিজয় দান করেন। হযরত তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ্ (রা) বললেন, সিদ্ধান্তের পূর্ণ এখতিয়ার আপনার। সুতরাং আপনি আদেশ করুন, আমরা পালন করবো এবং আহ্বান করুন আমরা লাব্বাইক বলবো।
হযরত উমর (রা) আরো মতামত চাইলেন। তখন উসমান (রা) অগ্রসর হয়ে বললেন, হে আমীরুল মু'মিনীন! আমার মতামত এই যে, সিরিয়াবাসীদের নিকট পত্র প্রেরণ করুন যেন তারা সিরিয়া থেকে অভিযান বের করে। তদ্রূপ ইয়ামানবাসীর নিকট পত্র প্রেরণ করুন যেন তারা ইয়ামান থেকে অভিযান বের করে। অতঃপর আপনি হারামাইনবাসীদের নিয়ে অভিযানে বের হোন, এভাবে সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী নিয়ে সমন্বিত মুশরিক বাহিনীর মুকাবিলা করুন। হযরত উমর (রা) আরো পরামর্শ চাইলেন। তখন হযরত আলী (রা) উভয়ের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে হযরত উমর (রা)-কে যুদ্ধের দায়িত্ব কোন স্থলবর্তীর হাতে ছেড়ে দিয়ে তাঁকে মদীনায় অবস্থান করার পরামর্শ দিলেন এবং বসরাবাসীদের নামে পত্র প্রেরণপূর্বক মুসলিম বাহিনীকে ইরাক অভিমুখে প্রেরণের পক্ষে মত প্রকাশ করলেন। তদুপরি প্রশাসকগণকে নিজ নিজ প্রদেশে বহাল রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি এই মর্মে আশংকা প্রকাশ করলেন যে, আমীরুল মু'মিনীনের কোন দুর্ঘটনা হয়ে গেলে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর অটুট শক্তি এমনভাবে বিধ্বস্ত হবে যে, তার ক্ষতিপূরণ সম্ভব হবে না। অতঃপর তার কোন মর্যাদা অবশিষ্ট থাকবে না এবং পুনঃঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপায়ও থাকবে না। হযরত উমর (রা) বললেন, এটাই সঠিক মত। অতঃপর তিনি এ মত গ্রহণ করে বললেন, অভিযানের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে এমন কারো নাম বলুন। তবে তিনি ইরাকের অধিবাসী হলে ভালো হয়। তাঁরা বললেন, আপনার বাহিনী সম্পর্কে আপনিই ভালো জানেন। তিনি নোমান ইবনুল মুকরন আল মুযানীকে নির্বাচিত করলেন। তখন সকলে সায় দিয়ে বললেন, ইনি এ দায়িত্বের উপযুক্ত।
আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী ইব্ন আবু তালিবের বক্তৃতা ও পত্র সংকলন 'নাহজুল বালাগাহ' গ্রন্থে তাঁর উপরোক্ত পরামর্শমূলক বক্তব্য ও মতামত সুস্পষ্ট ও বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে, হযরত উমর (রা) যখন পারসিকদের বিরুদ্ধে স্বয়ং যুদ্ধযাত্রার ব্যাপারে হযরত আলী (রা)-এর নিকট পরামর্শ চাইলেন তখন হযরত আলী (রা) বললেন, ইসলামের জয়-পরাজয় সংখ্যাধিক্য ও সংখ্যাল্পতা দ্বারা নির্ধারিত হয়নি। কেননা ইসলাম হলো আল্লাহ্ দীন, যাকে আল্লাহ্ বিজয়ী করেছেন। আর মুজাহিদগণ হলেন আল্লাহ্র সৈনিক, যাদেরকে আল্লাহ্ প্রস্তুত করে রেখেছেন এবং সাহায্য করেছেন। ফলে তারা এত দূর-দূরান্তে পৌঁছেছে এবং এত দিগ- দিগন্তে তাদের সৌভাগ্যসূর্য উদিত হয়েছে। আমরা আল্লাহর পক্ষ হতে প্রতিশ্রুতিপ্রাপ্ত আর আল্লাহ্ তাঁর প্রতিশ্রুতি অবশ্যই পূর্ণ করবেন এবং তাঁর সৈনিকদের অবশ্যই সাহায্য করবেন।
শাসক ও তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা হলো মুক্তার মালায় সুতার মতো যা সকল মুক্তাকে একত্রে গেঁথে রাখে কিন্তু সেই সুতা একবার ছিঁড়ে গেলে সকল মুক্তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। আর কখনো তা একত্র হতে পারে না। আরবরা আজ সংখ্যা অল্প হলেও ইসলামের কল্যাণে তারা বহু গুণ বেশি ঐক্যের বলে বলীয়ান। সুতরাং আপনি মেরুকেন্দ্রের ভূমিকা পালন করুন এবং আরবদের মাঝে যুদ্ধের চাকা ঘোরান এবং নিজে দূরে থেকে তাদেরকে যুদ্ধের আগুনে উত্তপ্ত করুন। কেননা আপনি কেন্দ্রভূমি থেকে দূরে গেলে চারদিক থেকে আরবরা আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। ফলে সম্মুখবর্তী শত্রু শিবিরের চেয়ে পশ্চাতে ছেড়ে আসা অরক্ষিত এলাকাই আপনার জন্য অধিক চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
আগামীকাল অনারবরা আপনাকে দেখলে বলে উঠবে, ইনি হলেন আরবদের মূল শিকড়। তাঁকে উপড়ে ফেলতে পারলেই তোমরা নিশ্চিন্ত হতে পারবে। ফলে আপনার প্রতি তাদের লোলুপ দৃষ্টি নিবদ্ধ হবে এবং সর্বশক্তি নিয়ে আপনার ওপর তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তাদের বিশাল অভিযানের যে কথা আপনি বলেছেন সে সম্পর্কে আমার বক্তব্য এই যে, তাদের অভিযান আপনার চেয়েও আল্লাহ্ বেশি অপছন্দনীয়। আর আল্লাহ্ তাঁর অপছন্দের বিষয় পরিবর্তনে অধিক সক্ষম। আর তাদের সংখ্যাধিক্যের যে কথা আপনি বলেছেন, সে সম্পর্কে আমার বক্তব্য এই যে, অতীতে আমরা সংখ্যাধিক্যের বলে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করিনি, বরং আল্লাহ্র মদদ ও সাহায্যের বলে লড়াই করেছি। [নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা ২০৩-৩৪]
একই ঘটনা ঘটেছিলো ইয়ারমুক যুদ্ধের পূর্বে যখন হযরত উমর (রা) স্বয়ং রোম অভিযানে গমনের বিষয়ে হযরত আলী (রা)-এর পরামর্শ চেয়েছিলেন। ইয়ারমুক যুদ্ধ ছিলো সিরিয়ার বৃহত্তম যুদ্ধ, যার ওপর সিরিয়ার বিজয়াভিযানে মুসলিম বাহিনীর ভাগ্য নির্ভর করছিলো। সিরিয়ায় মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক হযরত আবূ ওবায়দা (রা) দূত প্রেরণ করে হযরত উমর (রা)-কে অবহিত করলেন যে, জল ও স্থল- উভয় পথে রোমক বাহিনী বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো এগিয়ে আসছে। তখন হযরত উমর (রা) মুহাজির ও আনসারদের জমায়েত করে হযরত আবু ওবায়দা (রা)-এর পত্র পড়ে শোনালেন। পত্রের মর্ম অবগত হয়ে সাহাবা কিরামের পক্ষে আত্মসংবরণ করা সম্ভব হলো না। ভাবাতিশয্যে তাঁরা কেঁদে ফেললেন এবং আবেগোদ্দীপ্ত ভাষায় আহ্বান জানিয়ে বললেন, আমীরুল মু'মিনীনকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, তিনি আমাদেরকে সিরিয়া অভিমুখে অভিযানের অনুমতি প্রদান করুন। আমরা সিরিয়ায় জিহাদরত আমাদের ভাইদের জন্য রক্তের শেষ বিন্দুটুকু উৎসর্গ করতে চাই। এভাবে আনসার মুহাজিরদের জোশউদ্দীপনা উত্তরোত্তর বেড়েই চললো। অবশেষে হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা) প্রস্তাব করলেন, আমীরুল মু'মিনীন স্বয়ং যেন সিরিয়ার মুজাহিদীনদের সমর্থনে সাহায্যকারী বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং আপন উপস্থিতি দ্বারা তাদের মনোবল ও শক্তি বৃদ্ধি করেন।
কিন্তু হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) এ মতের বিরোধিতা করে বললেন, এই দীনের অনুসারীদেরকে আল্লাহ্ কেন্দ্রের সুরক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ করেছেন। আর যে আল্লাহ্ তাদেরকে এমন কঠিন সময়েও সাহায্য করেছেন যখন তারা ছিলো অতি অল্প এবং বিজয় ছিলো অকল্পনীয়, তাদেরকে সুরক্ষিত করেছেন যখন তারা ছিলো নগণ্য এবং তাদের সুরক্ষা ছিলো অসম্ভব। সেই আল্লাহ্ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। আপনি যখন এই শত্রুবাহিনীর মুকাবিলায় উপস্থিত হবেন তখন অতি বিপজ্জনক অবস্থা সৃষ্টি হবে। মুসলমানদের ভূখণ্ডের শেষ সীমানায় গিয়ে তাদের আশ্রয় কেন্দ্র হওয়া আপনার উচিত নয়। কেননা আপনার পরে তাদের আশ্রয় গ্রহণের আর কোন স্থান থাকবে না। সুতরাং সিরিয়া অভিমুখে একজন অভিজ্ঞ সেনাপতিকে প্রেরণ করুন এবং তাঁর সাথে নিবেদিতপ্রাণ ও পরীক্ষিত যোদ্ধাদের প্রেরণ করুন। অতঃপর আল্লাহ্ যদি বিজয় দান করেন তাহলে তো আপনার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হলো! আর অন্য কিছু হলে আপনি তখন হবেন মুসলমানদের আশ্রয় ও অবলম্বন। [নাহজুল বালাগা, পৃষ্ঠা ১৯২-১৯৩]
বলা বাহুল্য, হযরত আলী (রা) যদি হযরত উমর (রা)-এর প্রতি অহিতাকাঙ্খী হতেন কিংবা বিদ্বেষ পোষণ করতেন, খিলাফত জবরদখলকারী ভেবে তাঁকে বিপদে ফেলার আকাঙ্ক্ষী হতেন, তাঁর হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন যাতে তাঁর পথ নিষ্কণ্টক হয়ে যায় এবং তাঁর অনুকূলে খিলাফতের বায়'আত গ্রহণ সম্পন্ন হতে পারে, তাহলে তো কোন রকম দায়-দায়িত্ব ছাড়াই তাঁর হাত থেকে রেহাই লাভের এটা ছিলো অতি মোক্ষম সুযোগ। কেননা যুদ্ধে হযরত উমর (রা)-এর কোন দুর্ঘটনা হতে পারতো কিংবা আলী (রা) তাঁকে গুপ্তহত্যা করার ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু এ সকল নীচতার বহু ঊর্ধ্বে থেকে মুসলমানদের প্রতি ও খলীফাতুল মুসলিমীনের প্রতি তিনি পূর্ণ আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছেন। বস্তুত তাঁর এ পরামর্শ ছিলো এমন সুচিন্তিত, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও নিঃস্বার্থ যা এমন ব্যক্তির পক্ষ হতেই সম্ভব যার অন্তর স্বচ্ছ ও পবিত্র, চিন্তা-ভাবনা হলো সুমহান এবং দৃষ্টি হলো সুদূর প্রসারী। ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ হতে আল্লাহ্ তাঁকে ঐ সর্বোত্তম বিনিময় দান করুন যা তিনি আপন প্রিয় ও নিষ্ঠাবান বান্দাদের দান করে থাকেন। সোনার খনিতে সোনা হলে তাতে আশ্চর্য কি! এ আরবী প্রবাদ তাঁর জীবনে ছিলো ধ্রুব সত্য।
পক্ষান্তরে খ্রীস্টান শক্তি যখন আবেদন জানাল যে, হযরত উমর (রা) বায়তুল মুকাদ্দাসে উপস্থিত হয়ে স্বহস্তে সন্ধিপত্র লিখে দিন। তারা তাঁর হাতেই পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাসের চাবি অর্পণ করবে। এদিকে মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক হযরত আবূ ওবায়দা (রা) পত্রযোগে আমীরুল মু'মিনীনকে জানালেন যে, তাঁর শুভাগমনের ওপর বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয় নির্ভর করছে। তখন তিনি এ বিষয়ে পরামর্শের জন্য বিশিষ্ট সাহাবা-কিরামকে একত্র করলেন। হযরত উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর পরামর্শ ছিলো এই যে, (পরাজিত শত্রুর দাবি মেনে) আমীরুল মু'মিনীনের সেখানে গমন করা উচিত হবে না, যাতে তারা অধিক অপদস্থ এবং অধিক শায়েস্তা প্রাপ্ত হয়।
কিন্তু হযরত আলী (রা) বায়তুল মুকাদ্দাস সফরের পক্ষে মত প্রকাশ করলেন। কেননা এটা ইতিহাসের এমন এক অমর মর্যাদা যা সব সময় সবার ভাগ্যে জোটেনি। তদুপরি এতে মুসলিম বাহিনীও স্বস্তি লাভ করবে। উমর (রা) হযরত আলী (রা)-এর পরামর্শ পছন্দ করলেন এবং সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। ১৬ হিজরীর রজব মাসে হযরত আলী (রা)-কে খিলাফতের যাবতীয় বিষয়ে স্থলবর্তী করে তিনি সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা করলেন। [তারীখে কামিল, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৯-৪০২]
📄 হযরত উমর (রা)-এর বায়তুল মুকাদ্দাস সফর
সম্ভবত প্রিয় পাঠক জানতে একান্ত উদগ্রীব যে, রোম ও পারস্যের সম্রাট যাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত সেই আমীরুল মু'মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) কিভাবে কোন্ সাজে বায়তুল মুকাদ্দাস সফর করেছিলেন, পরিবেশ-পরিস্থিতি তো রাজকীয় জাঁকজমক ও জৌলুস দাবি করছিলো, যাতে বিজিত জাতির হৃদয় খলীফাতুল মুসলিমীনের প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধার পূর্ণ অনুভূতিতে আলোড়িত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। কিন্তু পাঠকবর্গ, আলোচ্য সফরের আসল চিত্র প্রত্যক্ষ করুন।
মেটে রংগের এক উটে চড়ে তিনি জাবিয়া এসে পৌঁছলেন। টুপি ও পাগড়ীবিহীন তাঁর খোলা মাথা রোদে ঝলসে যাচ্ছিলো। পা-দানি গাড়া বাহনের দু'পাশে ছিলো দু'পা। এক পশমী চাদর ছিলো যা আরোহণের গদিরূপে এবং বিশ্রামের সময় বিছানারূপে ব্যবহৃত হতো। খেজুর ছোবড়াপূর্ণ একটি থলে ছিলো তোশাদান। সফরের এই তোশাদানই ছিলো তাঁর বিশ্রামকালের বালিশ। গায়ে ছিলো খসখসে কাপড়ের জামা যার এক পার্শ্ব ছিলো ছেঁড়া। তিনি বললেন, এখানকার নেতাকে আমার কথা বলে ডেকে আনো। তখন জুলুমুসকে ডেকে আনা হলো। হযরত উমর (রা) বললেন, আমার জামাটা সেলাই করে ধুয়ে দাও। আর তোমাদের একটা জামা বা কাপড় আমাকে ধার দাও। তারা কাতানের জামা হাযির করলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি কাপড়? তারা বললো, এটা কাতান। তিনি কাতানের পরিচয় জানতে চাইলেন। তারা কাতানের পরিচয় বললো, তখন তিনি গায়ের জামা খুলে দিলেন এবং তা ধুয়ে রিপু করে তাঁর সামনে পেশ করা হলো। তখন তিনি তাদের দেয়া জামা খুলে দিলেন এবং নিজের জামা পরিধান করলেন।
জুলুমুস তখন তাকে বললেন, আপনি আরবের বাদশাহ। আর এ ভূখণ্ড উটের উপযোগী নয়। সুতরাং আপনি যদি এ ছাড়া অন্য কোন পোশাক গ্রহণ করতেন এবং তুর্কী ঘোড়ায় আরোহণ করতেন তাহলে রোমকদের চোখে তা অধিক সম্ভ্রমের বিষয় হতো। তিনি বললেন, আমরা এমন কাওম যাদেরকে আল্লাহ্ ইসলাম দ্বারা মর্যাদাবান করেছেন। সুতরাং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে আমরা চাই না। অতঃপর তাঁর খিদমতে তুর্কী ঘোড়া পেশ করা হলো। আর তিনি জ্বিন ও গদি ছাড়া শুধু নিজের একটা চাদর ঘোড়ার পিঠে ফেলে তার ওপর চড়ে বসলেন, (ঘোড়া গর্বিত চালে চলতে শুরু করলো)। আর তিনি বলে উঠলেন, ধরো, ধরো, মানুষ শয়তানের পিঠে সওয়ার হয় এর আগে আমি তো দেখিনি! তখন তাঁর উট আনা হলো এবং তাতে তিনি স্বস্তির সঙ্গে আরোহণ করলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৯-৬০]
১৮ হিজরীতে হযরত উমর (রা)-এর দ্বিতীয় দফা সিরিয়া সফরের সংক্ষিপ্ত চিত্র অবলোকন করুন। আল্লামা তাবারী বর্ণনা করেছেন: হযরত উমর (রা) হযরত আলী (রা)-কে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে একদল সাহাবা-কিরামসহ রওয়ানা হলেন এবং লোহিত সাগরের তীর ঘেঁষে আয়লার পথ ধরে কিছু দূরে গেলেন। গোলাম তাঁকে অনুসরণ করলো। তিনি বাহন থেকে নেমে পেশাব করলেন এবং ফিরে এসে গোলামের উটে আরোহণ করলেন। সে বাহনের পিঠে লোমের উল্টানো চাদর ছিলো। গোলামকে তিনি নিজের বাহন এগিয়ে দিলেন।
স্বাগত জাননোর জন্য আগত লোকদের অগ্রগামী অংশের সাথে দেখা হলে তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলো। আমীরুল মু'মিনীন কোথায়? তিনি (নিজেকে বুঝিয়ে) বললেন, তোমাদের সামনে। তখন তারা ভুল বুঝে তাঁকে অতিক্রম করে আরো সামনে চলে গেলো। এদিকে তিনি নিজে আয়লাতে গিয়ে অবতরণ করলেন। আর সাক্ষাতকারীদেরকে বলা হলো, আমীরুল মু'মিনীন তো আয়ালাতে পৌছে গেছেন! তখন তারা তাঁর নিকট ফিরে এলো। [আত-তাবারী, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৩-২০৪]