📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আহলে বায়তের প্রতি আবূ বকর (রা)-এর মূল্যায়ন ও সৌহার্দ্য

📄 আহলে বায়তের প্রতি আবূ বকর (রা)-এর মূল্যায়ন ও সৌহার্দ্য


নবী পরিবারের সকল সদস্যের, বিশেষভাবে নবী দৌহিত্র হাসান-হুসায়নের সঙ্গে খলীফাতুল মুসলিমীন আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর ছিলো অতি সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক যা উভয় পক্ষের জন্যই যথোপযুক্ত। হযরত উকবা ইব্‌দুল হারিস (রা)-এর সূত্রে ইমাম বুখারী (র) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আবূ বকর (রা) একবার আসর নামায শেষে বের হলেন, তখন হাসান (রা) সমবয়সীদের সঙ্গে ক্রীড়ারত ছিলেন। তিনি তাঁকে দেখতে পেয়ে কাঁধে তুলে নিলেন আর বললেন, আমার পিতা তোমার জন্যে উৎসর্গীকৃত হোন! ইনি তো নানাজীর আদল পেয়েছেন, বাবাজীর নয়। আলী (রা) তখন মৃদু হাসছিলেন। [কিতাবুল মানাকিব, অনুচ্ছেদ সিফাতুন্নাবী]

অন্যদিকে হযরত আলী (রা) স্বয়ং মুহম্মদ ইব্‌ন আবূ বকরকে প্রতিপালন করেছিলেন, এমন কি খিলাফতের জন্য তাঁর নাম প্রস্তাব করে মানুষের সমালোচনাও শুনেছেন। তাছাড়া সিদ্দীকে আকবরের স্মৃতি স্মরণ করে এক পুত্রের নাম আবূ বকর রেখেছিলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৩২]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 এক নযরে খিলাফতকালের সিদ্দীকী জীবন

📄 এক নযরে খিলাফতকালের সিদ্দীকী জীবন


এখানে আমরা প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর (রা)-এর চিরবিদায় ও আলী (রা)-এর শোকবাণী উল্লেখ করে আলোচ্য অধ্যায়ের ইতি টানবো। তবে তার আগে দু'বছরের সংক্ষিপ্ত খিলাফতকালে কেমন ছিলো তাঁর জীবন সে সম্পর্কেও সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চাই। বস্তুত শুধু সরলতা ও অনাড়ম্বরতাই নয়, বরং চূড়ান্ত যুহদ, নির্মোহতা, সংযম ও কৃচ্ছের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনই ছিলো তাঁর জীবন ও চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। দুনিয়া ও দুনিয়া ভোগ সম্পর্কে তিনি নবী-জীবনের পূর্ণ পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন।

ড. ফিলিপ হিট্টি তাঁর সুবিখ্যাত "A Short History of the Arabs" গ্রন্থে লিখেছেন, ধর্মত্যাগের ফিতনা দমনপূর্বক আরব উপদ্বীপকে ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধকারী আবূ বকর (রা) একান্ত অনাড়ম্বর ও ভাবগম্ভীর জীবন যাপন করতেন। সংক্ষিপ্ত খিলাফতকালের প্রথম ছয় মাস তিনি মদীনার অদূরবর্তী 'সানাহ' এলাকায় অতি সাধারণ এক ঘরে সস্ত্রীক বাস করতেন এবং সেখান থেকে প্রতিদিন রাজধানী মদীনায় আসতেন। কোন বেতনভাতা তখন তিনি গ্রহণ করতেন না। কেননা নবীন রাষ্ট্রের তেমন কোন আয় ছিলো না। মসজিদে নববীর অঙ্গনে থেকেই যাবতীয় সরকারী দায়িত্ব তিনি পরিচালনা করতেন।

ইসলাম ও ইসলামের নবীর প্রতি বিদ্বেষের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুনামের (?) অধিকারী স্যার উইলিয়াম ম্যুর পর্যন্ত তার "প্রথম খিলাফতের ঘটনাবলী" গ্রন্থে লিখেছেন, আবু বকরের মজলিস ছিলো খুবই অনাড়ম্বর, যেমন ছিলো মুহম্মদ ﷺ-এর মজলিস। সেখানে কোন সেবক প্রহরী ছিলো না এবং ছিলো না এমন কিছু যাতে শাসকের প্রতাপ ও খিলাফতের জৌলুস প্রকাশ পায়। খিলাফতের কাজে অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। সংক্ষিপ্ত খিলাফতকালের বহু ঘটনা প্রমাণ করে যে, যাবতীয় বিষয়ের খুঁটি-নাটি ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিক সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিলো। অভাবী ও মজলুম মানুষের খোঁজে রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতেন। প্রশাসক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে 'ব্যক্তিচিন্তা' থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন এবং প্রতিটি পদক্ষেপে সুগভীর চিন্তা ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রাখতেন।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 কুরআন সংকলন

📄 কুরআন সংকলন


ধর্মত্যাগীদের দমনের সফল অভিযানগুলো ছাড়াও তাঁর যে অমর কীর্তি ইসলামের 'রূপ ও স্বরূপ' অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখেছে তা হলো কুরআন সংকলনের শুভ প্রচেষ্টায় তাঁর আত্মনিয়োগ, মুরতাদবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে¹ বহু হাফিযে কুরআনের শাহাদত বরণের প্রেক্ষিতে তিনি কুরআন সংকলন ও অনুলিপি প্রস্তুতকরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। প্রসিদ্ধতম মতে তাঁর খিলাফতকালে এ মহাগুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিলো।

টিকাঃ
১. মুরতাদবিরোধী ইয়ামামা যুদ্ধে সত্তরজন (বা আরো বেশি) হাফিয সাহাবীর শাহাদত বরণের ঘটনায় ভীষণ বিচলিত হযরত উমর (রা) খলীফ আবূ বকর (রা)-কে কুরআন সংকলন ও অনুলিপি প্রস্তুতকরণের পরামর্শ দিয়েছিলেন যাতে বিলুপ্তির আশংকা থেকে কুরআন নিরাপদ থাকে। কেননা পরবর্তীতেও ইয়ামামা- বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তির আশংকা ছিলো। কিন্তু আল্লাহর নবী যা করেন নি তাতে হাত দেয়া আবু বকর (রা)-এর কাছে ভয়ঙ্কর মনে হলো। তবে পরবর্তীতে আল্লাহ্ তা'আলা এ বিষয়ে তাঁর বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 সিদ্দীকে আকবরের ইন্তিকাল ও আলী (রা)-এর শোক প্রকাশ

📄 সিদ্দীকে আকবরের ইন্তিকাল ও আলী (রা)-এর শোক প্রকাশ


নবী ﷺ-এর ইন্তিকালের মাত্র দু'বছর পর প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর (রা)-এর ইন্তিকাল গোটা উম্মাহর জন্য ছিলো সবচেয়ে শোকাবহ ঘটনা। আর উম্মাহর এক নিবেদিতপ্রাণ সদস্য হিসেবে হযরত আলী (রা)-ও দারুণভাবে শোকাভিভূত হয়েছিলেন। সে সময় তিনি যে মর্মস্পর্শী ভাষায় তাঁর শোক প্রকাশ করেছিলেন তা এখানে তুলে ধরে আমরা আলোচ্য অধ্যায়ের ইতি টানছি।²

বর্ণনামতে ইন্তিকালের সংবাদ শুনে হযরত আলী (রা) ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়লেন এবং ক্রন্দনরত অবস্থায় ছুটে এলেন এবং অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় শ্রদ্ধা নিবেদন করে বললেন,

"আবূ বকর! আল্লাহ্ আপনার প্রতি রহম করুন, ইসলাম গ্রহণে আপনি ছিলেন সবার আগে। ঈমানের পূর্ণতায়, তাকওয়ার উচ্চতায় ও নবীর প্রতি সজাগ সতর্কতায় আপনি ছিলেন সবার ওপরে। সত্যনিষ্ঠায়, চরিত্রের পবিত্রতায় এবং ভাবগম্ভীরতা ও গুণ বিশিষ্টতায় আপনিই ছিলেন আল্লাহর নবীর নিকটতম এবং সবার মাঝে তাঁর আস্থাভাজন ও প্রিয়তম। সুতরাং ইসলামের পক্ষ হতে আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন, মানুষ যখন মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে আপনি তখন সত্য বলে রাসূলকে গ্রহণ করেছিলেন। তাই আল্লাহ আপনাকে সিদ্দীক বলে উল্লেখ করেছেন।

وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ أُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ .
"যারা সত্য এনেছে এবং যারা সত্যকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে তারাই তো মুত্তাকী।" [সূরা যুমার: ৩৩]

সবাই যখন পিছিয়েছিলো এবং বসে পড়েছিলো আপনি তখন সান্ত্বনা হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, কঠিন মুহূর্তে সবাই যখন সরে গিয়েছিলো আপনি তখন দরদী হয়ে তাঁকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। আর তা ছিলো দু'জনের দ্বিতীয় জন হিসেবে মহত্তম সঙ্গ। গারে ছাওরে আপনি তাঁর সঙ্গী এবং হিজরতের সাথী। সর্বোপরি আপনি ছিলেন তাঁর হৃদয়ের প্রশান্তি। উম্মতের মাঝে আপনি তাঁর সর্বোত্তম খলীফা হয়েছিলেন। আপনার সাথীদের দুর্বলতা ও ভেঙ্গে পড়ার মুখেও আপনি অনমনীয় দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলেন। যখন তারা হিমশিম খেয়ে থেমে গেছে তখন আপনি নিজ কাঁধে দায়িত্ব তুলে নিয়ে দৃঢ় পদে এগিয়ে গিয়েছিলেন। যেমন দীর্ঘ নীরবতায় তেমনি বাকনৈপুণ্যে আপনি ছিলেন অনন্য। হিম্মতে ও মনোবলে অতুলনীয় এবং আখলাকে ও আমলে সবার অনুকরণীয়। আল্লাহ্র রাসূল যেমন বলেছেন, তুমি ছিলে শারীরিকভাবে দুর্বল কিন্তু আল্লাহ্র ব্যাপারে অতি সবল। নিজের চোখে নিজে তুচ্ছ কিন্তু আল্লাহর কাছে অতি উচ্চ। আসমানে ও যমীনে সবার প্রিয়। সুতরাং আমাদের পক্ষ হতে ও ইসলামের পক্ষ হতে আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।

[আল-জাওহিরাহ ফী নাসাবিন নাবী ওয়া আসহাবিহিল আশারা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১২৬]

টিকাঃ
২. আল মুহিত আততাবারী রচিত 'আর রিয়াদুন নাদরা' গ্রন্থে হযরত আলী (রা)-এর নামে একটি দীর্ঘ শোক ভাষণ বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তাৎক্ষণিকতা ও অতি দীর্ঘতার কারণে এর শাব্দিক হুবহুতা ও বর্ণনার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে 'প্রশ্ন' হতে পারে ভেবে 'আল জাওহিরাহ ফী নাসাবিন নাবী ওয়া আসহাবিহিল আশারা" গ্রন্থের বর্ণনা পেশ করেছি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px