📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 প্রথম পরীক্ষা ও অবিচলতা

📄 প্রথম পরীক্ষা ও অবিচলতা


শুরুতেই হযরত আলী (রা) এমন এক নাযুক অবস্থার সম্মুখীন হলেন যাতে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি তাঁর আন্তরিকতা, খলীফা ও খিলাফতের প্রতি তাঁর আনুগত্য এবং জাহিলিয়াতের অহংবোধ ও গোত্রপ্রীতি থেকে তাঁর পবিত্রতার কঠিন পরীক্ষা হয়ে গেলো এবং তাতে তিনি সফলভাবে উত্তীর্ণও হলেন। সুয়াঈদ ইব্‌ন গাফলাহ-এর সূত্রে ইব্‌ন আসাকির বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আবু সুফিয়ান (রা) হযরত আলী ও আব্বাস (রা)-কে বললেন, হে আলী! আর তুমি হে আব্বাস! বলো দেখি, খিলাফতের এ কেমন দুর্গতি যে, কুরায়শের হীনতম এক গোত্রে তা কুক্ষিগত হলো! আল্লাহর কসম! যদি চাও তাহলে অশ্বদল ও পদাতিক দলের পদভারে তাঁকে কাঁপিয়ে দেবো। কিন্তু আলী (রা) বললেন, না, আল্লাহর কসম! আমি তা চাই না। কেননা আবূ বকর উপযুক্ত না হলে আমরা তাঁকে ছাড় দিতাম না। হে আবূ সুফিয়ান, মু'মিনগণ হিতাকাঙ্ক্ষী সম্প্রদায়। দেশ ও গোত্রের ঊর্ধ্বে পরস্পরের প্রতি তারা সম্প্রীতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে সুনাফিকেরা হলো ধূর্ত সম্প্রদায়। পরস্পরের প্রতি প্রতারণা তাদের জন্মগত।

নাহজুল বালাগা-এর ব্যাখ্যা গ্রন্থে ইব্‌ন আবিল হাদীদ বলেন, আবু সুফিয়ান হযরত আলী (রা)-এর হাতে বায়'আত হওয়ার অনুমতি চাইলেন। হযরত আলী (রা) তখন বললেন, তুমি এমন বিষয় আবদার করছো যা আমাদের জন্য নয়। তাছাড়া আল্লাহর রাসূল আমাকে এক ওয়াদায় আবদ্ধ করে গিয়েছেন, আমি তাতে অবিচল থাকতে চাই। আবু সুফিয়ান তখন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের ঘরে তাঁর সাথে দেখা করে বললেন, হে আবূ ফাযল, আপন ভ্রাতুষ্পুত্রের উত্তরাধিকারের আপনিই অধিক হকদার। সুতরাং হস্ত প্রসারিত করুন, আমি বায়আত হবো। আমার বায়আতের পর কেউ আপনার বিরুদ্ধাচরণ করবে না। আব্বাস (রা) হেসে বললেন, হে আবু সুফিয়ান! আলী যা অগ্রহণ করছেন আমি তা গ্রহণ করবো? আবূ সূফয়ান তখন নিরাশ হয়ে ফিরে গেলেন। [ইব্‌ন আবুল হাদীদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮।]

ইব্‌ন আবীল হাদীদের বর্ণনায় আরো আছে যে, ফযল ইব্‌ন আব্বাস যখন বললেন, হে বন্ধু তায়ম! নবুয়তের কল্যাণেই তোমরা খিলাফত পেয়েছো, অথচ তোমরা নও, আমরাই তার হকদার। আবু লাহব ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবের এক পুত্র এ সম্পর্কে কবিতাও রচনা করলো। হযরত যোবায়ের (রা) বলেন, তখন আলী (রা) লোক পাঠিয়ে তাকে বারণ করলেন এবং পূর্ণ সংযম পালনের আদেশ করে বললেন, আমাদের কাছে দীনের নিরাপত্তা অন্য সব কিছুর ঊর্ধ্বে।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 প্রথম খলীফার প্রতি আন্তরিক সহযোগিতা

📄 প্রথম খলীফার প্রতি আন্তরিক সহযোগিতা


দুই বছরের পূর্ণ খিলাফতকালে হযরত আবূ বকর (রা)-এর প্রতি হযরত আলী (রা)-এর আচরণ ছিলো খুবই আন্তরিক ও হিতাকাঙ্ক্ষীপূর্ণ। কেননা তাঁর কাছে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ চিন্তাই ছিলো একক অগ্রাধিকারের বিষয়। অবশ্য তাঁর 'বংশ গরিমা ও স্বভাব মহিমা' কাছে এটাই ছিলো প্রত্যাশিত। এই আন্তরিকতা, কল্যাণ চিন্তা এবং উম্মাহর ঐক্য ও খিলাফতের অস্তিত্বের প্রশ্নে তাঁর সংবেদনশীলতার প্রমাণ পাওয়া যায় যিল-কিসসার ঘটনায়। হযরত আবূ বকর (রা) স্বয়ং ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, এমন কি যিল-কিসসা অভিমুখে যাত্রাও করেছিলেন। কিন্তু এতে একদিকে যেমন ছিলো খলীফার প্রাণের ঝুঁকি, তেমনি ছিলো খিলাফতের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

দারে কুতনির নিজস্ব সনদের বর্ণনায় ইন্ন কাছীর (র) বলেন, হযরত ইবন উমর (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, আবূ বকর (রা) যখন যিল-কিসসা অভিমুখে যাত্রা করলেন তখন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব উটের লাগাম ধরে বললেন, হে খলীফাতুর রাসূল! কোথায় চলেছেন? ওহুদের দিন আল্লাহর রাসূল আপনাকে যা বলেছিলেন আমিও তাই বলি, হে আবূ বকর! তোমার শোকে আমাদের বিদ্ধ করো না। হে খলীফাতুর রাসূল! মদীনায় ফিরে আসুন। আল্লাহ্র কসম! আপনাকে হারালে আর কখনো ইসলামের কোন শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে না। তখন আবূ বকর (রা) মদীনায় ফিরে এলেন। যাকারিয়া আস-সাজী ও যুহরী হযরত আয়েশা (রা) হতে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৪-৩১৫]

আল্লাহ্ না করুন, তিনি যদি আবূ বকর (রা)-এর প্রতি 'প্রসন্ন' না হতেন এবং তাঁর বায়'আত যদি আন্তরিক না হতেন তাহলে এটা তো ছিলো এক সুবর্ণ সুযোগ। একটি 'দুর্ঘটনা' আশায় তিনি তো খলীফাকে তাঁর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিতে পারতেন! এতে তাঁর খিলাফত লাভের পথ নিষ্কণ্টক হওয়ার একটা সুযোগও থাকতো। হযরত আবূ বকর (রা)-এর প্রতি তাঁর ঘৃণা ও বিদ্বেষ এতই যদি ফেনায়িত হয়ে থাকে এবং এই 'বিপদ' থেকে নিস্তার লাভের চিন্তা এতই যদি প্রবল হয়ে থাকে (আল্লাহ্র সাক্ষী, এমন নীচতা থেকে তিনি পবিত্র) তাহলে অতি সহজেই তো ঐ যুদ্ধে তিনি গুপ্তঘাতকের আশ্রয় নিতে পারতেন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যেমন করে থাকে ক্ষমতা ও রাজনীতির 'কুশলী' খেলোয়াড়রা!

মুসলমানদের শাসক ও আল্লাহর রাসূলের খলীফা হযরত আবূ বকর (রা)-এর প্রতি তাঁর অসাধারণ আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা এবং উম্মাহর কল্যাণ সাধন ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর সর্বোচ্চ সহযোগিতার কথা বাদ দিলেও ইতিহাসের পাতায় চোখ রেখে স্থির প্রত্যয়ের সাথে আমরা বলতে পারি যে, সুখে-দুঃখে ও সুসময়ে-দুঃসময়ে সর্বাবস্থায় উভয়ের মাঝে প্রীতি ও সম্পৃতির এক সুনিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আহলে বায়তের প্রতি আবূ বকর (রা)-এর মূল্যায়ন ও সৌহার্দ্য

📄 আহলে বায়তের প্রতি আবূ বকর (রা)-এর মূল্যায়ন ও সৌহার্দ্য


নবী পরিবারের সকল সদস্যের, বিশেষভাবে নবী দৌহিত্র হাসান-হুসায়নের সঙ্গে খলীফাতুল মুসলিমীন আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর ছিলো অতি সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক যা উভয় পক্ষের জন্যই যথোপযুক্ত। হযরত উকবা ইব্‌দুল হারিস (রা)-এর সূত্রে ইমাম বুখারী (র) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আবূ বকর (রা) একবার আসর নামায শেষে বের হলেন, তখন হাসান (রা) সমবয়সীদের সঙ্গে ক্রীড়ারত ছিলেন। তিনি তাঁকে দেখতে পেয়ে কাঁধে তুলে নিলেন আর বললেন, আমার পিতা তোমার জন্যে উৎসর্গীকৃত হোন! ইনি তো নানাজীর আদল পেয়েছেন, বাবাজীর নয়। আলী (রা) তখন মৃদু হাসছিলেন। [কিতাবুল মানাকিব, অনুচ্ছেদ সিফাতুন্নাবী]

অন্যদিকে হযরত আলী (রা) স্বয়ং মুহম্মদ ইব্‌ন আবূ বকরকে প্রতিপালন করেছিলেন, এমন কি খিলাফতের জন্য তাঁর নাম প্রস্তাব করে মানুষের সমালোচনাও শুনেছেন। তাছাড়া সিদ্দীকে আকবরের স্মৃতি স্মরণ করে এক পুত্রের নাম আবূ বকর রেখেছিলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৩২]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 এক নযরে খিলাফতকালের সিদ্দীকী জীবন

📄 এক নযরে খিলাফতকালের সিদ্দীকী জীবন


এখানে আমরা প্রথম খলীফা হযরত আবূ বকর (রা)-এর চিরবিদায় ও আলী (রা)-এর শোকবাণী উল্লেখ করে আলোচ্য অধ্যায়ের ইতি টানবো। তবে তার আগে দু'বছরের সংক্ষিপ্ত খিলাফতকালে কেমন ছিলো তাঁর জীবন সে সম্পর্কেও সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চাই। বস্তুত শুধু সরলতা ও অনাড়ম্বরতাই নয়, বরং চূড়ান্ত যুহদ, নির্মোহতা, সংযম ও কৃচ্ছের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনই ছিলো তাঁর জীবন ও চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। দুনিয়া ও দুনিয়া ভোগ সম্পর্কে তিনি নবী-জীবনের পূর্ণ পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন।

ড. ফিলিপ হিট্টি তাঁর সুবিখ্যাত "A Short History of the Arabs" গ্রন্থে লিখেছেন, ধর্মত্যাগের ফিতনা দমনপূর্বক আরব উপদ্বীপকে ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধকারী আবূ বকর (রা) একান্ত অনাড়ম্বর ও ভাবগম্ভীর জীবন যাপন করতেন। সংক্ষিপ্ত খিলাফতকালের প্রথম ছয় মাস তিনি মদীনার অদূরবর্তী 'সানাহ' এলাকায় অতি সাধারণ এক ঘরে সস্ত্রীক বাস করতেন এবং সেখান থেকে প্রতিদিন রাজধানী মদীনায় আসতেন। কোন বেতনভাতা তখন তিনি গ্রহণ করতেন না। কেননা নবীন রাষ্ট্রের তেমন কোন আয় ছিলো না। মসজিদে নববীর অঙ্গনে থেকেই যাবতীয় সরকারী দায়িত্ব তিনি পরিচালনা করতেন।

ইসলাম ও ইসলামের নবীর প্রতি বিদ্বেষের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুনামের (?) অধিকারী স্যার উইলিয়াম ম্যুর পর্যন্ত তার "প্রথম খিলাফতের ঘটনাবলী" গ্রন্থে লিখেছেন, আবু বকরের মজলিস ছিলো খুবই অনাড়ম্বর, যেমন ছিলো মুহম্মদ ﷺ-এর মজলিস। সেখানে কোন সেবক প্রহরী ছিলো না এবং ছিলো না এমন কিছু যাতে শাসকের প্রতাপ ও খিলাফতের জৌলুস প্রকাশ পায়। খিলাফতের কাজে অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। সংক্ষিপ্ত খিলাফতকালের বহু ঘটনা প্রমাণ করে যে, যাবতীয় বিষয়ের খুঁটি-নাটি ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিক সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিলো। অভাবী ও মজলুম মানুষের খোঁজে রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতেন। প্রশাসক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে 'ব্যক্তিচিন্তা' থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন এবং প্রতিটি পদক্ষেপে সুগভীর চিন্তা ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রাখতেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px