📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 ফাতিমাতুয যোহরা (রা)

📄 ফাতিমাতুয যোহরা (রা)


নবীজীর কলিজার টুকরা ও জান্নাতী নারী সমাজের সভানেত্রী হযরত ফাতিমা (রা) সম্পর্কে এখানে কিছু না লিখে কলম যেন অগ্রসর হতে চায় না। আল্লাহ্ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন। তিনি ছিলেন নবী ﷺ -এর সর্বকনিষ্ঠা ও প্রিয়তমা দুহিতা। ওয়াকিদীর বর্ণনায় আবু জাফর আল-বাকির-এর সূত্রে হযরত আব্বাস (রা) বলেছেন,
নবীজীর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে কা'বা ঘর পুনর্নিমাণকালে ফাতিমা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মাদায়েনী এ বিষয়ে অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন যে, নবুয়ত লাভের মাত্র দু'এক বছর পূর্বে তাঁর জন্ম এবং দ্বিতীয় হিজরীর মুহররমের মাথায় হযরত আলী (রা)-এর সাথে তাঁর বিবাহ। কিতাবুল আমালী গ্রন্থে শায়খ আবু জাফর তৃসী প্রমাণ করেছেন যে, নবী-কন্যার বিবাহ, যৌতুক পছন্দ ও সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে আবূ বকর (রা) সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। [১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৯]

অনুরূপভাবে নববধূর 'সাজসজ্জা' ও নব দম্পতির 'বাসর শয্যা আয়োজনের ক্ষেত্রে হযরত আয়েশা ও উম্মে সালমা (রা)-এর বিশেষ ভূমিকা ছিলো। [ইবনে মাজাহ, অধ্যায়: নিকাহ]

একমাত্র হযরত ফাতিমা (রা) দ্বারাই রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর বংশধারা বিস্তার লাভ করেছে, তাঁর বিবাহ হয়েছিলো আঠারো বছর বয়সে। এক বর্ণনামতে তাঁর বয়স হয়েছিলো পনের কিংবা পনের বছর ছয় মাস।
হযরত আয়েশা (রা) বলেন, ফাতিমার আব্বাকে ছাড়া তাঁর চেয়ে উত্তম কোন মানুষ আমি দেখিনি। [তাবারানী]

আবদুর রহমান ইব্‌ন আবূ নাঈম হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) হতে মারফু হাদীস বর্ণনা করেন। "ফাতিমা হলেন জান্নাতের নারীকুলের সভানেত্রী, অবশ্য মারয়াম বিনতে ইমরানের কিছু স্বাতন্ত্র্য রয়েছে।"

বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে মিসওয়ার ইব্‌ন মাখরামাহ (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -কে মিম্বরে থাকা অবস্থায় বলতে শুনেছি:
فاطمة بضعة منى ، يؤذيني ما اذاه ويريبني مارابها .
"ফাতিমা আমার সত্তার অংশ, তার যাতে কষ্ট, আমারও তাতে কষ্ট এবং তার যা পছন্দ, আমারও তা পছন্দ।"

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, একবার দেখলাম, ফাতিমার হাঁটার ভঙ্গিটা ঠিক যেন আল্লাহর রাসূলের মতো!
আবু উমর বলেন, তিনি হাসান, হুসায়ন, উম্মে কুলসুম ও যায়নাবের আম্মা, তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত হযরত আলী (রা) দ্বিতীয় বিবাহ করেন নি।
আবূ সা'লাবা আল খাশানী-এর সূত্রে উকবা বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ জায়গা বা সফর থেকে ফিরে প্রথমে মসজিদে দু'রাকাত সালাত আদায় করতেন। তারপর কন্যা ফাতিমা (রা)-এর সাথে দেখা করে স্ত্রীদের ঘরে যেতেন। আয়েশা বিনতে তালহার বর্ণনায় উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা (রা) বলেন:
মা رأيت احدا كان اشبه كلامًا وحديثا برسول الله صلى الله عليه وسلم من فاطمة .
"বচনে ও বাচনে আল্লাহর রাসূলের সাথে ফাতিমার চেয়ে অধিক মিল কারো দেখিনি।" [ইস্তিআব, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৪-৩৭৭]

সর্বউপায়ে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর তুষ্টি ও সন্তুষ্টি সাধনই ছিলো তাঁর সর্ব সময়ের চিন্তা। সন্তানের স্বাভাবিক ভালোবাসা ছাড়াও তাঁর প্রতি ছিলো তাঁর এক প্রকার 'মাতৃমমতা'। এখানে এমন কতিপয় ঘটনার নমুনা তুলে ধরছি।

১. হযরত ইবনে উমর (রা) বলেন, নবী ﷺ সফরে যাওয়ার সময় শেষ দেখা এবং ফিরে আসার পর প্রথম দেখা হযরত ফাতিমার সঙ্গে করতেন। তাবুক অভিযান থেকে ফেরার পর যথারীতি তিনি ফাতিমাকে দেখতে গেলেন। ফাতিমা নতুন কাপড়ে জাফরান মেখে দরজায় পর্দা ঝুলিয়েছিলেন কিংবা চাদর বিছিয়েছিলেন। এটা দেখে নবী চলে এলেন এবং মসজিদে বসে থাকলেন। ফাতিমা (রা) তখন বিলাল (রা)-কে খবর পাঠালেন, খোঁজ নিয়ে দেখুন, কেন তিনি আমার দরজা থেকে ফিরে গেলেন? বিলাল (রা) বিষয়টি আল্লাহ্ রাসূলকে অবহিত করলেন। তখন তিনি বললেন, ফাতিমাকে কী সমস্ত করতে দেখলাম। একথা শুনে হযরত ফাতিমা (রা) পর্দাসহ নতুন যা কিছু তৈরি করেছিলেন তা ছিঁড়ে ফেললেন এবং নতুন সাজ-পোশাক ফেলে পুরনো সাধারণ পোশাক পরিধান করলেন। হযরত বিলাল (রা)-এর মাধ্যমে ঘটনা জেনে নবী হযরত ফাতিমার গৃহে প্রবেশ করলেন এবং বললেন, আমার পিতা-মাতা তোমার প্রতি উৎসর্গীকৃত! এমনভাবেই থেকো না! [বুখারী ও আবূ দাউদ]

২. হযরত ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ দেখা করতে এসে হযরত ফাতিমা (রা)-এর গৃহে প্রবেশ না করেই ফিরে গেলেন। পরে হযরত আলী (রা) ঘরে এসে ঘটনা জানলেন এবং দরবারে নববীতে হাযির হয়ে বিষয়টি আরয করলেন। তখন তিনি বললেন, ফাতিমার দরজায় পর্দা ঝোলানো দেখলাম। দুনিয়ার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক বলো!
বর্ণনাকারী বলেন, পর্দাটা ছিলো নকশাদার। হযরত আলী (রা)-এর মুখে ঘটনা শুনে ফাতিমা (রা) বললেন, তিনি যা ইচ্ছা আদেশ করুন। তখন নবী বলে পাঠালেন, এটা অমুক পরিবারকে দিয়ে দাও, তাদের প্রয়োজন রয়েছে। [আহমাদ]

৩. রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর মুক্ত দাস হযরত সাওবান (রা) বলেন, সফরে বের হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ্ পরিবার- পরিজনের মধ্যে সবার শেষে ফাতিমা (রা)-এর সঙ্গে দেখা করতেন এবং ফেরার পর সর্বপ্রথম তাঁর ঘরে যেতেন। একবার তিনি এক অভিযান থেকে মদীনায় ফিরে এলেন। এদিকে ফাতিমা (রা) ঘরের দরজায় পর্দা ঝুলিয়েছিলেন এবং হাসান ও হুসায়ন (রা)-কে রূপোর বালা পরিয়েছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে দেখা না করেই চলে এলেন। ফাতিমা (রা) ভাবলেন, আর কিছু নয়, এগুলোই তাঁর অপ্রসন্নতার কারণ। তাই তিনি পর্দা ছিঁড়ে ফেললেন এবং বালা খুলে ফেললেন, তাতে বাচ্চাদের কান্না শুরু হলো। তখন তিনি বালা দু'টি তাদের হাতে দিয়ে দিলেন আর তারা কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর কাছে গেলেন। তিনি বালা দু'টি নিয়ে মদীনার একটি পরিবারের নাম করে বললেন, হে সাওবান, এটা অমুককে দিয়ে দাও। এরা আমার আহলে বায়ত। নিজেদের উত্তম বস্তুগুলো দুনিয়ার জীবনেই এরা ভোগ করে ফেলবে- এটা আমার পছন্দ নয়। হে সাওবান! ফাতিমার জন্য একটি পুঁতির হার ও হাতির দাঁতের দু টি বালা খরিদ করো। [আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদ]

পিতার প্রতি, যিনি ছিলেন তাঁর ও সমগ্র মানব জাতির নবী ﷺ ভালোবাসা ও 'মাতৃমমতার' পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছিলো হৃদয় বিদীর্ণকারী সেই একটিমাত্র শোক- বাক্যে পৃথিবীর সেরা শোকগাথাও যার সমতুল্য হতে পারে না। নবী ﷺ -এর জানাযার পর চিরবিদায়ের সময় তিনি বলেছিলেন,
ইয়া আনাস! আতাবাত আনফুসিকুম আন তাহছু আলা রাসূলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত-তুরাব।
"হে আনাস! আল্লাহর রাসূলের ওপর মাটি ছড়িয়ে দিতে মন তোমাদের সায় দিলো কীভাবে?" [বুখারী, অনুচ্ছেদ: মারাদুন্নাবী ওয়া ওয়াফাতিহ।]

প্রসিদ্ধতম মতে, নবী-এর ইন্তিকালের ছয় মাস পর হযরত ফাতিমার ইন্তিকাল হয়েছিলো। মৃত্যুশয্যায় আল্লাহর রাসূল তাঁকে কথা দিয়েছিলেন যে, নবী-পরিবারে সবার আগে তিনিই তাঁর সঙ্গে মিলিত হবেন। আর বলেছিলেন,
আমাতুর দ্বিনা আনতাকুনি সাইয়্যিদাতা নিসা আহলিল জান্নাহ।
"মা, তুমি কি 'তুষ্ট' নও যে, জান্নাতের নারীকুলে তুমি হবে সভানেত্রী!" [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৩২]

ইব্‌ন জোরায়হ-এর সূত্রে আবদুর রাযযাক বলেন, চার কন্যার মাঝে বয়সে ফাতিমা (রা) ছিলেন সর্বকনিষ্ঠা কিন্তু নবীর আদর-সোহাগে সবার 'ওপরে।'
আবু উমর বলেন, মন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এদিকেই সায় দেয় যে, যায়নাব সবার বড়, এরপর যথাক্রমে রোকাইয়াহ, উম্মে কুলছুম ও ফাতিমা (রা)-(মুসনাদে ফাতিমাতুয-যাহরা)। তাঁর মৃত্যু তারিখ ১১ হিজরীর ৩ রামাযান, রোজ মঙ্গলবার। [আল-ইসাবা, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৮০]

হযরত আলী ইব্‌ন হুসায়ন হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে তাঁর ইন্তিকাল হয়েছিলো। হযরত আবূ বকর, উমর, উসমান, যোবায়র ও আবদুর রহমান ইব্‌ন আউফ (রা) জানাযায় শরীক হয়েছিলেন।
জানাযার নামাযের সময় হযরত আলী (রা) বললেন, হে আবু বকর, অগ্রসর হোন। তিনি বললেন, হে আবুল হাসান, আপনার উপস্থিতিতে আমি নামায পড়াবো! হযরত আলী (রা) বললেন, অবশ্যই, আগে বাড়ুন। আল্লাহ্র কসম! আপনি ছাড়া অন্য কেউ নন। তখন হযরত আবূ বকর (রা) জানাযা পড়ালেন এবং রাতেই তাঁকে দাফন করা হলো। [মুসনাদে ফাতিমাতুয যাহরা।]

তাবাকাত গ্রন্থে ইবন সা'দ নিজস্ব সনদে বলেন, নবী-কন্যা হযরত ফাতিমার জানাযা আবূ বকর (রা) পড়িয়েছেন এবং চার তাকবীর বলেছেন। তাঁর সন্তানেরা হলেন হযরত হাসান, হুসায়ন, মুহসিন ও উম্মে কুলছুম। [ইবন সা'দের তাবাকাত কুবরা, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৯]
নবী-দুলালী ফাতিমার প্রতি আল্লাহ্ সন্তুষ্ট হোন এবং তাঁকে তুষ্ট করুন।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত আলী (রা)-এর বায়'আত গ্রহণ

📄 হযরত আলী (রা)-এর বায়'আত গ্রহণ


হযরত আলী (রা)-এর বায়আত গ্রহণের সময়কাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ বিভিন্ন অভিমত দিয়েছেন। হাকিম আবু বকর আল-বায়হাকী নিজস্ব সনদে আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, আবু বকর (রা) মিম্বরে দাঁড়িয়ে সমবেত লোকদের মাঝে আলী (রা)-কে দেখতে না পেয়ে তাঁকে ডেকে পাঠালেন এবং অভিযোগের সুরে বললেন, হে নবীর পিতৃব্য পুত্র ও তাঁর কন্যার জামাতা! আপনি কি মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল দেখতে চান? তিনি বললেন, হে খালীফাতুর রাসূল! কোন তিরস্কার নয়। এরপর তিনি আবূ বকর (রা)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৪৯]

আল্লামা ইব্‌ন কাছীর (র) অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন যে, বিশুদ্ধতম মতে নবী ﷺ-এর ইন্তিকালের প্রথম বা দ্বিতীয় দিনেই হযরত আলী (রা) বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। জীবনের কোন মুহূর্তেই আবু বকর (রা)-কে সঙ্গ দান ও তাঁর পেছনে নামায আদায় হতে তিনি বিরত থাকেন নি। [প্রাগুক্ত, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৪৯]

তবে প্রসিদ্ধতম মত এই যে, ফাতিমা (রা)-এর কিছুটা মন রক্ষার জন্য প্রথম দিকে তিনি বায়আত গ্রহণ করেন নি। নবী-এর ইন্তিকালের ছয় মাস পর যখন তাঁর ইন্তিকাল হলো তখন তিনি জনসমক্ষে বায়'আত করেছেন। তবে ইব্‌ন কাছীর ও অন্যান্য বহু 'আহলে ইলম' মনে করেন যে, এটা ছিলো প্রথম বায়আতের নবায়নমাত্র। বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে এর অনুকূলে কিছু বর্ণনাও রয়েছে। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২৪৬]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 প্রথম পরীক্ষা ও অবিচলতা

📄 প্রথম পরীক্ষা ও অবিচলতা


শুরুতেই হযরত আলী (রা) এমন এক নাযুক অবস্থার সম্মুখীন হলেন যাতে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি তাঁর আন্তরিকতা, খলীফা ও খিলাফতের প্রতি তাঁর আনুগত্য এবং জাহিলিয়াতের অহংবোধ ও গোত্রপ্রীতি থেকে তাঁর পবিত্রতার কঠিন পরীক্ষা হয়ে গেলো এবং তাতে তিনি সফলভাবে উত্তীর্ণও হলেন। সুয়াঈদ ইব্‌ন গাফলাহ-এর সূত্রে ইব্‌ন আসাকির বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আবু সুফিয়ান (রা) হযরত আলী ও আব্বাস (রা)-কে বললেন, হে আলী! আর তুমি হে আব্বাস! বলো দেখি, খিলাফতের এ কেমন দুর্গতি যে, কুরায়শের হীনতম এক গোত্রে তা কুক্ষিগত হলো! আল্লাহর কসম! যদি চাও তাহলে অশ্বদল ও পদাতিক দলের পদভারে তাঁকে কাঁপিয়ে দেবো। কিন্তু আলী (রা) বললেন, না, আল্লাহর কসম! আমি তা চাই না। কেননা আবূ বকর উপযুক্ত না হলে আমরা তাঁকে ছাড় দিতাম না। হে আবূ সুফিয়ান, মু'মিনগণ হিতাকাঙ্ক্ষী সম্প্রদায়। দেশ ও গোত্রের ঊর্ধ্বে পরস্পরের প্রতি তারা সম্প্রীতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে সুনাফিকেরা হলো ধূর্ত সম্প্রদায়। পরস্পরের প্রতি প্রতারণা তাদের জন্মগত।

নাহজুল বালাগা-এর ব্যাখ্যা গ্রন্থে ইব্‌ন আবিল হাদীদ বলেন, আবু সুফিয়ান হযরত আলী (রা)-এর হাতে বায়'আত হওয়ার অনুমতি চাইলেন। হযরত আলী (রা) তখন বললেন, তুমি এমন বিষয় আবদার করছো যা আমাদের জন্য নয়। তাছাড়া আল্লাহর রাসূল আমাকে এক ওয়াদায় আবদ্ধ করে গিয়েছেন, আমি তাতে অবিচল থাকতে চাই। আবু সুফিয়ান তখন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের ঘরে তাঁর সাথে দেখা করে বললেন, হে আবূ ফাযল, আপন ভ্রাতুষ্পুত্রের উত্তরাধিকারের আপনিই অধিক হকদার। সুতরাং হস্ত প্রসারিত করুন, আমি বায়আত হবো। আমার বায়আতের পর কেউ আপনার বিরুদ্ধাচরণ করবে না। আব্বাস (রা) হেসে বললেন, হে আবু সুফিয়ান! আলী যা অগ্রহণ করছেন আমি তা গ্রহণ করবো? আবূ সূফয়ান তখন নিরাশ হয়ে ফিরে গেলেন। [ইব্‌ন আবুল হাদীদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮।]

ইব্‌ন আবীল হাদীদের বর্ণনায় আরো আছে যে, ফযল ইব্‌ন আব্বাস যখন বললেন, হে বন্ধু তায়ম! নবুয়তের কল্যাণেই তোমরা খিলাফত পেয়েছো, অথচ তোমরা নও, আমরাই তার হকদার। আবু লাহব ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবের এক পুত্র এ সম্পর্কে কবিতাও রচনা করলো। হযরত যোবায়ের (রা) বলেন, তখন আলী (রা) লোক পাঠিয়ে তাকে বারণ করলেন এবং পূর্ণ সংযম পালনের আদেশ করে বললেন, আমাদের কাছে দীনের নিরাপত্তা অন্য সব কিছুর ঊর্ধ্বে।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 প্রথম খলীফার প্রতি আন্তরিক সহযোগিতা

📄 প্রথম খলীফার প্রতি আন্তরিক সহযোগিতা


দুই বছরের পূর্ণ খিলাফতকালে হযরত আবূ বকর (রা)-এর প্রতি হযরত আলী (রা)-এর আচরণ ছিলো খুবই আন্তরিক ও হিতাকাঙ্ক্ষীপূর্ণ। কেননা তাঁর কাছে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ চিন্তাই ছিলো একক অগ্রাধিকারের বিষয়। অবশ্য তাঁর 'বংশ গরিমা ও স্বভাব মহিমা' কাছে এটাই ছিলো প্রত্যাশিত। এই আন্তরিকতা, কল্যাণ চিন্তা এবং উম্মাহর ঐক্য ও খিলাফতের অস্তিত্বের প্রশ্নে তাঁর সংবেদনশীলতার প্রমাণ পাওয়া যায় যিল-কিসসার ঘটনায়। হযরত আবূ বকর (রা) স্বয়ং ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, এমন কি যিল-কিসসা অভিমুখে যাত্রাও করেছিলেন। কিন্তু এতে একদিকে যেমন ছিলো খলীফার প্রাণের ঝুঁকি, তেমনি ছিলো খিলাফতের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

দারে কুতনির নিজস্ব সনদের বর্ণনায় ইন্ন কাছীর (র) বলেন, হযরত ইবন উমর (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, আবূ বকর (রা) যখন যিল-কিসসা অভিমুখে যাত্রা করলেন তখন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব উটের লাগাম ধরে বললেন, হে খলীফাতুর রাসূল! কোথায় চলেছেন? ওহুদের দিন আল্লাহর রাসূল আপনাকে যা বলেছিলেন আমিও তাই বলি, হে আবূ বকর! তোমার শোকে আমাদের বিদ্ধ করো না। হে খলীফাতুর রাসূল! মদীনায় ফিরে আসুন। আল্লাহ্র কসম! আপনাকে হারালে আর কখনো ইসলামের কোন শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে না। তখন আবূ বকর (রা) মদীনায় ফিরে এলেন। যাকারিয়া আস-সাজী ও যুহরী হযরত আয়েশা (রা) হতে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৪-৩১৫]

আল্লাহ্ না করুন, তিনি যদি আবূ বকর (রা)-এর প্রতি 'প্রসন্ন' না হতেন এবং তাঁর বায়'আত যদি আন্তরিক না হতেন তাহলে এটা তো ছিলো এক সুবর্ণ সুযোগ। একটি 'দুর্ঘটনা' আশায় তিনি তো খলীফাকে তাঁর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিতে পারতেন! এতে তাঁর খিলাফত লাভের পথ নিষ্কণ্টক হওয়ার একটা সুযোগও থাকতো। হযরত আবূ বকর (রা)-এর প্রতি তাঁর ঘৃণা ও বিদ্বেষ এতই যদি ফেনায়িত হয়ে থাকে এবং এই 'বিপদ' থেকে নিস্তার লাভের চিন্তা এতই যদি প্রবল হয়ে থাকে (আল্লাহ্র সাক্ষী, এমন নীচতা থেকে তিনি পবিত্র) তাহলে অতি সহজেই তো ঐ যুদ্ধে তিনি গুপ্তঘাতকের আশ্রয় নিতে পারতেন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যেমন করে থাকে ক্ষমতা ও রাজনীতির 'কুশলী' খেলোয়াড়রা!

মুসলমানদের শাসক ও আল্লাহর রাসূলের খলীফা হযরত আবূ বকর (রা)-এর প্রতি তাঁর অসাধারণ আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা এবং উম্মাহর কল্যাণ সাধন ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর সর্বোচ্চ সহযোগিতার কথা বাদ দিলেও ইতিহাসের পাতায় চোখ রেখে স্থির প্রত্যয়ের সাথে আমরা বলতে পারি যে, সুখে-দুঃখে ও সুসময়ে-দুঃসময়ে সর্বাবস্থায় উভয়ের মাঝে প্রীতি ও সম্পৃতির এক সুনিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো।

ফন্ট সাইজ
15px
17px