📄 ইসলামের শুরা ব্যবস্থা ও আবূ বকর (রা)-এর খিলাফত
প্রাচীন পৃথিবীতে রাজবংশীয় শাসন ও উত্তরাধিকারসূত্রীয় আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব ধারা প্রচলিত ছিলো। বস্তুত এ দ্বৈত শাসনের যাঁতাকলে মানব সম্প্রদায় নিষ্পেষিত হচ্ছিলো। একটি হলো রাজবংশের স্বেচ্ছাচারমূলক রাজনৈতিক শাসন যা পিতা থেকে পুত্রের কিংবা রাজপরিবারের অন্য কোন সদস্যের হাতে হাত বদল হতো। কখনো শান্তিপূর্ণ উপায়ে, কখনো বা রক্তপিচ্ছিল পথে। যোগ্যতা কিংবা রাজা ও প্রজার স্বার্থ-চিন্তার কোন অবকাশ ছিলো না সেখানে রাজ্য ও রাজ্যের সম্পদ রাজা ও রাজপরিবারের ভোগ দখলে। রৌপ্য ও হীরা কাঞ্চন ও বল্লাহীন ভোগ বিলাস ও বিনোদনই ছিলো রাজা ও রাজপরিবারের একমাত্র লক্ষ্য। রাজদণ্ডের প্রতাপ ও ঐশ্বর্যের উত্তাপ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাদের যা কিছু কীর্তিকলাপ তা আজকের মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। সেই শাসন-শোষণ ও আনন্দ-বিনোদনের ইতিহাস যারা পড়েছেন তারাই শুধু তা কল্পনা করতে পারেন। প্রজাসাধারণও তাদেরকে অতিমানব বলে বিশ্বাস করতো। কেননা তাদের শিরায় ঈশ্বরের পবিত্র রক্ত প্রবাহিত এবং রাজ্য শাসন ও প্রজা শোষণের ক্ষমতা ঈশ্বরপ্রদত্ত ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত।
পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষের অভাব ও দুঃখ-কষ্টের চিত্র ছিলো বড়ই করুণ। পাষাণ হৃদয়ও তাতে বিগলিত হতো এবং নির্দয় চক্ষুও অশ্রুসিক্ত হতো। ক্ষুধার এক মুঠো অন্ন ও লজ্জার এক টুকরো বস্ত্র লাভের জন্যও তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রাণান্ত হতো। হাজারো কর ও খাজনার ভারে তারা ভারাক্রান্ত হতো এবং চাবুকের আঘাতে আর্তনাদ করতো। দৃশ্য-অদৃশ্য বহু শৃঙ্খলে তাদের চলৎশক্তি ছিলো রহিত। এক কথায় মানুষ ছিলো তারা, কিন্তু জীবন ছিলো মানবেতর। মর্যাদায় ছিলো পশুরও অধম। রাজা ও রাজপরিবারের ভোগস্পৃহা ও সম্পদ চাহিদা চরিতার্থ করাই যেন ছিলো তাদের জন্মের সার্থকতা। [সীরাতুন্নবী, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬]
দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকারভিত্তিক ধর্মীয় ক্ষমতা ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব, যা বিশেষ বংশ বা সম্প্রদায়ের হাতে কুক্ষিগত ছিলো যুগ যুগ ধরে বংশ-পরম্পরায়। পূজনীয় পর্যায়ের যে আধ্যাত্মিক অবস্থান ও ধর্মীয় মর্যাদা তারা ভোগ করত সেটাকে জাগতিক স্বার্থসিদ্ধি ও ইন্দ্রিয় চাহিদা চরিতার্থের হাতিয়াররূপে ব্যবহার করতো। এক কথায় তারা ছিলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে নিরংকুশ মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণী, যাদের হালাল-হারাম নির্ধারণের এবং বিধান ও ব্যবস্থা প্রবর্তনের একচ্ছত্র ক্ষমতা ছিলো। ধর্মীয় মধ্যস্বত্বভোগী ও সম্প্রদায়ের যে চিত্র আল-কুরআন পেশ করেছে তার চেয়ে নিখুঁত ও বাস্তবানুগ চিত্র আর কী হতে পারে!
ইরশাদ হয়েছে, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِلِ اللَّهِ .
"হে ঈমানদারগণ! বহু (ইহুদী) ধর্মনেতা ও (খ্রীস্টান) পাদরী মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে।" [সূরা তাওবা: ৩৪]
খ্রীস্ট সমাজে উপরোক্ত শ্রেণীর জন্য ব্যবহৃত শব্দটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সুপ্রসিদ্ধ আরব খ্রীস্টান পণ্ডিত বুতরুস বুস্তানী তাঁর বিশ্বকোষ গ্রন্থে বলেন,
শব্দটি এ ধারণার ইঙ্গিতবাহী যে, এরা হলো প্রভুর উত্তরাধিকারী, মূসার ধর্ম বিধানে লেবীয় সম্প্রদায় যেমন সদাপ্রভুর উত্তরাধিকারী ছিলো। হিব্রু, মিশরীয় ও অন্যান্য প্রাচীন জাতিবর্গের বিধি ব্যবস্থায় উপাসনা ও উপাসনালয় পরিচালনার জন্য বিশেষশ্রেণী ছিলো। খ্রীস্টান গির্জার প্রতিষ্ঠা লগ্নেও অনুরূপ সেবায়েতশ্রেণী গড়ে উঠেছিলো, গির্জা যখন দারিদ্র্যের আবর্ত থেকে উদ্ধার পেলো তখন থেকেই তথা যাজকশ্রেণীর প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার শুরু হলো। ফলে শুধু ধর্মসেবক নয়, বরং সমকালীন জ্ঞান ও শিক্ষায় একক প্রাধান্যের মাধ্যমে তারাই হয়ে উঠেছিলো সমাজের একক নিয়ন্ত্রক শক্তি। রোমান শাসনামলে যাজক সম্প্রদায় বহুবিধ কর ও খাজনা থেকে মুক্ত ছিলো। তদুপরি 'জনস্বার্থ' সম্পর্কেও তাদের কোন দায়বদ্ধতা ছিলো না। বরং তাদের কায়েমী ক্ষমতা নিজস্ব পরিমণ্ডল অতিক্রম করে প্রজা সাধারণের ওপরও বিস্তৃত ছিলো। [বুস্তানীর বিশ্বকোষ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৬]
প্রাচীন ইরান তথা পারস্যের অবস্থাও ছিলো অভিন্ন। পারসিক ধর্মীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব কোন-না-কোন সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণে থাকতো। গোড়ার দিকে 'মায়দায়া' সম্প্রদায়ের ও জরথুস্ত্র'-এর অনুসারীদের যুগে 'আল-মাগান' সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটেছিলো। ধর্মীয় সম্প্রদায় ছিলো পৃথিবীতে বিধাতার ছায়া এবং তার সেবা প্রযত্নের জন্যই তাদের সৃষ্টি। শাসক এ গোত্রের সদস্য হওয়া অপরিহার্য। কেননা ঈশ্বরের সত্তা তার মাঝেই মূর্ত হয়। সুতরাং এ পরিবারই হবে 'অগ্নিগৃহের' সেবা দায়িত্বের মর্যাদার অধিকারী। [সাসানী যুগের ইরান, আর্থার ক্রিস্টিয়ান]
হিন্দু-ভারতের ধর্মব্যবস্থায় 'ব্রাহ্মণ সমাজ' ছিলো ধর্মীয় ক্ষমতার নিরংকুশ অধিকারী। মর্যাদা ও পবিত্রতার এমন শীর্ষবিন্দুতে ছিলো তাদের অবস্থান যেখানে অন্য কারো 'উত্তরণ' সম্ভব ছিলো না। সেখানে ব্রাহ্মণের 'পাপ' ত্রিভুবন বিনাশ করলেও তিনি ক্ষমাযোগ্য এবং 'ব্রাহ্মণ হত্যা' সর্বাবস্থায় মহাপাপ। ব্রাহ্মণের ওপর কর ধার্য করা যায় না এবং ব্রাহ্মণ ছাড়া উপাসনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান হতে পারে না।
এ উভয় ক্ষেত্রেই ইসলাম বংশপরম্পরা ও উত্তরাধিকার ধারা বিলুপ্ত করেছিলো। কেননা যুগ যুগ ধরে মানবতার বিরুদ্ধে তা 'মহাঅপরাধ' সংঘটন করেছে যার অসংখ্য প্রমাণ রোম, পারস্য ও ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসে রয়েছে। [সীরাতুন্নবী, পৃষ্ঠা-৩৮]
খলীফা নির্বাচনের দায়িত্ব মুসলিম উম্মাহর ওপর এবং ইলম ও প্রজ্ঞা, ইখলাস ও বিচক্ষণতার অধিকারী শুরার হাতে অর্পণ করেছে। এ কারণেই আল্লাহর রাসূল তাঁর স্থলাভিষিক্ত খলীফা সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ রেখে যান নি। বলা বাহুল্য, এ সম্পর্কে ঘোষণা প্রদান 'শরীয়ত কর্তব্য' হলে অবশ্যই তিনি তা কার্যকর করে যেতেন। কেননা তাঁর প্রতি আল্লাহ্র নির্দেশ হলো,
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلَغَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَّমْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ، وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ .
“হে রাসূল, আপনার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আপনার ওপর যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দিন। এ যদি না করেন তাহলে আপনি তো প্রতিপালকের বার্তা পৌঁছালেন না! আর আল্লাহ্ আপনাকে 'শত্রু' থেকে রক্ষা করবেন।" [সূরা মায়িদা: ৬৭]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
سُنَّةَ اللهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلُ وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ قَدَرًا مقْدُورَانِ الَّذِينَ يُবَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللهَ وَكَفَى بِاللهِ حَسِيبًا .
"ইতোপূর্বে বিগত নবীগণের ক্ষেত্রে এ-ই ছিলো আল্লাহ্র বিধান। আর আল্লাহর বিধান পূর্ব নির্ধারিত। তারা ঐ সকল লোক যারা আল্লাহর বাণীসমূহ পৌঁছে দিতেন এবং শুধু আল্লাহকে ভয় করতেন। আল্লাহ্ ছাড়া কাউকে ভয় করতেন না। আর হিসেবে গ্রহণের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" [সূরা আহযাব: ৩৮-৩৯]
সহীহ বুখারী শরীফে ওবায়দুল্লাহ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন উতবার বর্ণনায় হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ যেদিন অন্তিম শয্যায় শায়িত হলেন সেদিন ঘরে কয়েকজন লোক ছিলো। তিনি তাদের বললেন,
هلموا اكتب لكم كتابا لا تضلوا بعده .
'এসো, তোমাদের আমি একটি ফরমান লিখে দিই, যার পরে তোমরা আর 'বিচ্যুত' হবে না।
কিন্তু কেউ কেউ বললেন, এখন তিনি রোগ যন্ত্রণায় কাতর। আমাদের কাছে তো কুরআন রয়েছে। সুতরাং আল্লাহ্র কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তখন ঘরের লোকেরা মতানৈক্য ও বিবাদ করলো। একদল বলে, কাগজ পেশ করো, তোমাদের জন্য তিনি কোন ফরমান লিখুন, যার পর তোমরা 'বিচ্যুত' হবে না। কিন্তু অন্য দল অন্য রকম বলে। বাদানুবাদ বৃদ্ধির মুখে আল্লাহর রাসূল বলেছিলেন, "তোমরা উঠে যাও।" [মাগাযী অধ্যায়, অনুচ্ছেদ: মাবাদুন্নাবী ওয়া ওয়াফাতিহ]
কাগজ তলবের পর তিন দিন তিনি হায়াতে ছিলেন। কিন্তু পুনঃতলব করেন নি। খিলাফত সম্পর্কেও স্পষ্ট কিছু বলেন নি, অথচ সেদিন ও তার পরে বিভিন্ন অসিয়ত করেছেন। তখন তাঁর অন্যতম অসিয়ত ছিলো- "নামায ও ক্রীতদাসদাসী সম্পর্কে সতর্ক থেকো।"
হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ নামায, যাকাত ও ক্রীতদাসদাসী সম্পর্কে অসিয়ত করেছিলেন। [বায়হাকী ও আহমাদ]
আরেকটি অসিয়ত ছিলো এই,
قاتل الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور انبيائهم مساجد لا يبقين دينান على ارض العرب .
"ইহুদী ও নাসারাদের আল্লাহ্ নিপাত করুন, তারা তাদের নবীদের কবরকে সিজদাস্থল বানিয়েছিলো। আরব ভূমিতে দুই ধর্ম যেন না থাকে।" [মুআত্তা মালিক]
হযরত আয়েশা ও ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, অসুস্থতার সময় আল্লাহ্র রাসূল পবিত্র মুখমণ্ডলের ওপর একটি কাপড় টেনে টেনে দিতেন কিন্তু শ্বাস ভারি হয়ে এলে তা সরিয়ে ফেলতেন। এ অবস্থায় তিনি বললেন,
"ইহুদী নাসারাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। তারা তাদের নবীদের কবরকে 'সিজদাস্থল' বানিয়েছিলো। (উম্মতকে) তিনি এ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। [বুখারী, অনুচ্ছেদ: মাবাদুন্নাবী ওয়া ওয়াফাতিহ।
কাগজ তলবের হাদীস প্রসঙ্গে গবেষক আল আক্কাদ বলেন,
"আলী (রা)-এর অনুকূলে খিলাফতের অসিয়তের পথে হযরত উমরই আল্লাহ্র রাসূলের সামনে অন্তরায় হয়েছিলেন।" এটা এমনই দায়িত্ববিবর্জিত মন্তব্য যা হযরত উমর ও তাঁর মত সমর্থনকারীদের নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সকলেরই মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। বস্তুত নবী-এর কাগজ তলব কারো অনুকূলে খিলাফত ঘোষণার জন্য ছিলো না। কেননা সে ক্ষেত্রে তাঁর একটিমাত্র শব্দ বা ইঙ্গিতই যথেষ্ট ছিলো। যেমন ইমামতির আদেশ থেকে সাহাবাগণ আবু বকর (রা)-এর অগ্রাধিকারের প্রতি ইঙ্গিত বুঝে নিয়েছিলেন।
তাছাড়া কাগজ তলবের পর (তিন দিন) হায়াতে থেকেও তিনি তা পুনঃতলব করেন নি, অথচ হযরত আলী ও তাঁর মাঝে অন্তরঙ্গ সাক্ষাতে কোন বাধা ছিলো না। কেননা হযরত আলী (রা)-এর স্ত্রী ফাতিমা (রা) শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত 'সান্নিধ্যে' ছিলেন। সুতরাং ইচ্ছা করলেই তাঁকে ডেকে নিয়ে তিনি খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করতে পারতেন।
এই সম্পূর্ণ 'স্বেচ্ছা নীরবতা' ছাড়াও প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইতোপূর্বের নববী সুন্নাত ও নীতি পর্যালোচনা করলে দেখতে পাওয়া যায় যে, পরিবারকে তিনি শাসনপদ থেকে দূরেই রাখতেন এবং নবীগণের উত্তরাধিকার ধারা জোরদারভাবে রদ করতেন। সুতরাং এই নীতি, সুন্নত ও স্বেচ্ছা নীরবতা মোটেই প্রমাণ করে না যে, মুহম্মদ ﷺ হযরত আলী (রা)-এর খিলাফত চেয়েছিলেন কিন্তু ইচ্ছা প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়া, পৃষ্ঠা-৬১৯]
খিলাফতুন্নবী ও উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে গবেষক আল আক্কাদ অতি উত্তম কথা বলেছেন। তাঁর মতে খিলাফতের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার যদি আল্লাহ্র কোন বিধান হতো তাহলে 'পুত্রহীন' অবস্থায় তাঁর তিরোধান যেমন আশ্চর্যতম বিষয় হতো তেমনি আহলে বায়তের খিলাফত সম্পর্কিত সুস্পষ্ট আয়াত ছাড়া নুযুলে কুরআনের সমাপ্তি ঘটাও অদ্ভুত বিষয় হতো।
তদ্রূপ এই উত্তরাধিকার যদি দীনের অপরিহার্য কোন বিষয় কিংবা তাকদীরের অলংঘনীয় কোন ফায়সালা হতো তাহলে দুনিয়াতে তা অবশ্যই কার্যকর হতো, অকাট্য তাকদীর যেমন কার্যকর হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী যে কোন খিলাফত ব্যর্থ হতো, বিশ্বজগতের নিয়মবিরুদ্ধ যে কোন উদ্দেশ্য যেমন ব্যর্থ হয়।
মোটকথা, শরীয়তের সুস্পষ্ট বাণী কিংবা ঘটনা প্রবাহের ইঙ্গিত কিংবা আসমানী ইচ্ছা কোন কিছুই চরমপন্থীদের খিলাফত প্রশ্নে নিকটাত্মীয়তার অগ্রাধিকার কিংবা হাশেমী পরিবারের একক অধিকার সম্পর্কিত মতামত সমর্থন করে না। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৯৩৬]
📄 হযরত আবূ বকর (রা)-এর বায়'আত
মদীনার আনসার-মুহাজির সাহাবীগণ, যাঁরা সংকট সমাধানে যোগ্য অধিকারী, যাঁদের সর্বসম্মত যে কোন সিদ্ধান্ত আরব উপদ্বীপে ও সকল মুসলিম জনপদে সমান কার্যকর, নবী ﷺ-এর ইন্তিকালের পর তাঁরা এক নাযুক সময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিলেন। যদি তারা এমন এক ব্যক্তির হাতে বায়'আত গ্রহণে একমত হতে পারেন যাঁর অগ্রগণ্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব সর্বজনস্বীকৃত এবং যার প্রতি আল্লাহর রাসূলের সন্তুষ্টির মনোভাব ও বিভিন্ন নাযুক পরিস্থিতিতে তাঁকে অগ্রবর্তী করার বিষয় সকলে সম্যক অবগত, যদি তারা এমন এক ব্যক্তির বায়'আত ও খিলাফত সম্পর্কে একমত হতে পারেন তাহলে উম্মাহর ঐক্য, সংহতি, উদ্যম ও শক্তি অটুট থাকে এবং ইসলামের ছায়া বিস্তার ও তার প্রচার-প্রসার অব্যাহত থাকে।
পক্ষান্তরে যদি তাঁরা অনৈক্য ও বিভক্তির শিকার হয়ে পড়েন তাহলে অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলামও ধর্মীয় নেতৃত্ব ও উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে নাস্তানাবুদ হবে এবং অগ্রগতি স্তব্ধ হবে, এমন কি আল্লাহ না করুন ইসলামের অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও নাযুকতা আরো বেশি ছিলো এজন্য যে, মদীনা হলো ঘটনাস্থল যেখানে ছিলো দুই বৃহৎ কাহতানী গোত্র আওস ও খাজরাজের প্রাচীন অধিবাস, যাঁরা ইসলাম ও তার নবীকে নিরাপদ আশ্রয় দান করেছিলেন। মুহাজিরগণকে ভাই বলে ভালোবেসেছিলেন এবং ত্যাগ ও কুরবানীর সর্বোচ্চ নমুনা পেশ করেছিলেন। সুতরাং মদীনার আদি বাসিন্দা ও ত্যাগী আনসার হিসেবে তারা যদি মক্কী ও মুহাজির নবীর উত্তরাধিকার ও খিলাফতের স্বত্ব দাবি করেন তাহলে তা অস্বাভাবিক কিছু ছিলো না, বরং তা-ই ছিলো স্বাভাবিক ধর্ম।
এই মনস্তাত্ত্বিক সংকট, ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর মহানবী ﷺ-এর ইন্তি কাল-পরবর্তী মহাপরীক্ষার স্বরূপ যথার্থ অনুধাবন করেছিলেন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব, যিনি প্রজ্ঞায় ও বিচক্ষণতায় সাহাবা সমাজে ছিলেন বিশিষ্ট এবং বিভিন্ন পরিস্থিতির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। আল্লাহপ্রদত্ত প্রজ্ঞা দ্বারা তিনি পরিস্থিতির নাযুকতা যেমন অনুধাবন করলেন তেমনি এটাও বুঝলেন যে, এখন এক মুহূর্ত বিলম্ব বা শৈথিল্যেরও অবকাশ নেই। কেননা সাহাবা জামাতের সঠিক সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে উম্মাহর ঐক্য ও ইসলামের ভবিষ্যত। সুতরাং কোন কারণে যদি ঐক্য-রজ্জু ও সিদ্ধান্ত-ক্ষমতা তাদের হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে আর কখনো তা ফিরে আসবে না। তাই তিনি ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণের আন্তরিক তাগাদা অনুভব করলেন, বিশেষত তাঁর জানা ছিলো যে, মদীনাবাসীরা তাদের মধ্য হতেই খলীফা নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষী ছিলো। কেননা তারাই হলো ইসলামের আনসার এবং মদীনার আদি পরিবার, অথচ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের এবং গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কারণে আরব জাতি কুরায়শ ছাড়া অন্য নেতৃত্ব মেনে নেবে না। তাই অবিলম্বে তিনি সিদ্দীকে আকবারের বায়'আতের ওপর মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করলেন যাতে শয়তান অনৈক্য ও ভাঙ্গণের সুযোগ না পায় এবং নফসানিয়াত তাদের কলবে দাঁত বসাতে না পারে। সর্বোপরি নবী ﷺ-এর জানাযা, দাফন ও বিদায়কালে মুসলমানদের একজন আমীরের অভিভাবকত্বে যেন পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত থাকে এবং দাফনকার্য যথাযোগ্য মর্যাদা ও পবিত্রতার সাথে হতে পারে। তাই তিনি উঠলেন, সম্বোধন করলেন, এবং বললেন,
"তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির হাতে আল্লাহ্ তোমাদের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। তিনি রাসূলের প্রিয় সঙ্গী এবং গুহায় (অবস্থানকালে) দু'জনের দ্বিতীয় ব্যক্তি। সুতরাং এ থেকে তাঁর হাতে বায়'আত গ্রহণ করো।"
তখন লোকেরা আবু বকর (রা)-এর হাতে বায়'আত গ্রহণ করলো।
যুহরীর সূত্রে ইমাম মালিক বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীসটি সময়, পরিস্থিতির নাযুকতা ও ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর অধিকতর আলোকপাত করছে-
হযরত উমর (রা) বলেন, আমরা নবীগৃহে অবস্থান করছিলোাম, এমন সময় দেয়ালের, পেছন থেকে আওয়াজ এলো, হে খাত্তাবের পুত্র, বেরিয়ে আসুন। আমি বললাম, যাও, তোমার কথা শোনার চেয়ে বড় কাজে আমি ব্যস্ত আছি [অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্-এর জানাযার বিষয় নিয়ে।।
আবার আওয়াজ এলো, এদিকে ঘটনা এই যে, আনসারগণ বনু সাঈদা গোত্রের প্রাঙ্গণে জড়ো হয়েছে। সুতরাং যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াতে পারে এবং কিছু ঘটে যাওয়ার পূর্বেই পরিস্থিতি সামাল দিন। তখন আমি আবু বকরকে বললাম, জলদি চলুন। [ফাতহুল বারী, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩০]
বনু সাঈদা গোত্রের প্রাঙ্গণে বায়'আত অনুষ্ঠানের পরবর্তী দিন মসজিদে নববীতে সাধারণ বায়'আত অনুষ্ঠিত হলো। সেখানে খলীফার প্রথম ভাষণে যথাযোগ্য হামদ-ছানার পর আবূ বকর (রা) বললেন,
"আম্মাবাদ, হে লোক সকল! তোমাদের যিম্মাদারি আমার ওপর চাপানো হয়েছে, অথচ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। সুতরাং সঠিক কাজ যদি করি তাহলে আমাকে সাহায্য করবে। আর যদি ভুল করি তাহলে আমাকে সোজা পথে নিয়ে আসবে। সত্যবাদিতা আমানত, আর মিথ্যাবাদিতা খেয়ানত। তোমাদের দুর্বল ব্যক্তি আমার কাছে সবল, যতক্ষণ না আল্লাহর ইচ্ছায় তার হক তার কাছে ফিরে আসে। আর তোমাদের সবল ব্যক্তি আমার কাছে দুর্বল, যতক্ষণ না আল্লাহর ইচ্ছায় তার কবল হতে (অন্যের) হক উদ্ধার করতে পারি।
যে কোন কওম আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ বর্জন করবে আল্লাহ্ তাদর অপদস্থ করবেন। আর যখনই অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়বে আল্লাহ্ তাদের ওপর বালা মুসিবত চাপিয়ে দেবেন। কাজেই যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্যে অবিচল থাকি তোমরা আমার আনুগত্য করো। কিন্তু আমি যদি আল্লাহ্ ও রাসূলের অবাধ্য হই তাহলে আমি তোমাদের আনুগত্যের হকদার নই। নামাযে দাঁড়াও। আল্লাহ তোমাদের রহম করুন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৪৭]
হযরত আবূ বকর (রা)-এর বায়'আত কোন দৈব আনুকূল্য, ঘটনাচক্র, কিংবা সফল ষড়যন্ত্রের ফসল ছিলো না, বরং তা ছিলো সর্বজ্ঞানী ও সর্ব ক্ষমতাবান আল্লাহর ফায়সালা। আরও ছিলো এ কথার জ্বলন্ত প্রমাণ যে, আল্লাহ্ চান সর্ব ধর্মের উপর ইসলামের বিজয় এবং সর্বজাতির ওপর সুসংহত মুসলিম উম্মাহর উত্থান। তাছাড়া চিরস্বাধীন আরবদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথেও এটা সঙ্গতিপূর্ণ ছিলো। কেননা গোত্রীয় নেতৃত্ব ও সমর অধিনায়কত্বের ক্ষেত্রে গুণ ও বয়স এবং প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার বিচারে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকেই তারা বরণ করে থাকে। এটা তাদের যুগ যুগের ঐতিহ্য।
ভারতবর্ষে ইংরেজী সাহিত্যের সুপ্রসিদ্ধ ইসলামী চিন্তাবিদ ও লেখক-গবেষক সৈয়দ আমীর আলী ইতিহাসের এ সত্যকে বড় সুন্দরভাবে তুলে ধরছেন। তিনি বলেন, মূলত আরবদের গোত্রীয় নেতৃত্ব উত্তরাধিকার পদ্ধতির পরিবর্তে নির্বাচন নির্ভর ছিলো এবং এই 'ভোটাধিকার নীতি' তারা যত্ন ও নিষ্ঠার সাথে পালন ও সংরক্ষণ করতো। গোত্রপ্রধান নির্বাচনকালে প্রত্যক সদস্য তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতো। পরবর্তীতে গোত্রপ্রধানের পুরুষ উত্তরাধিকারীদের কোন একজনকে বয়স ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচন করতো।
প্রথম খলীফা নির্বাচনকালে এই প্রাচীন আরব রীতি অনুসৃত হয়েছিলো। আর পরিস্থিতির নাযুকতার কারণে যেহেতু কোন রকম দীর্ঘসূত্রিতার অবকাশ ছিলো না। তাই সম্ভাব্য দ্রুত প্রক্রিয়ায় (প্রথম) খলীফারূপে আবূ বকর (রা)-এর নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিলো। অবশ্য বয়স ও অভিজ্ঞতা এবং প্রভাব ও মর্যাদার বিষয়টিও বিবেচনায় ছিলো। কেননা আরবরা এগুলো পূর্ণমাত্রায় গুরুত্ব প্রদান করতো। আবূ বকর (রা)-এর প্রজ্ঞা ও সংযম বিশেষভাবে স্বীকৃত ছিলো। পক্ষান্তরে নবী-পরিবার ও হযরত আলী (রা) ইসলামের প্রতি স্বভাব আন্তরিকতা ও প্রশ্নাতীত আনুগত্যের কারণে রাসূলের খলীফারূপে আবূ বকর (রা)-এর নির্বাচন স্বীকার করে নিয়েছিলেন।
এভাবে শাসন ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহ বংশ কৌলীন্যের প্রতি অতিভক্তিজাত উত্তরাধিকার ব্যবস্থা পরিহার করেছিলো।
পক্ষান্তরে প্রথমবারেই যদি ও অতি অবশ্যই যোগ্যতার ভিত্তিতে হাশেমী খলীফা নির্বাচিত হতেন তাহলে হাশেমী পরিবারে যুগপৎ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের সমাবেশ ঘটতো। খ্রীস্ট ধর্মের যাজক সম্প্রদায়ের ন্যায় ইসলাম ধর্মেও পুরোহিত সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হতো যার অনিবার্য ফল হিসেবে মুসলিম সমাজেও কায়েমী শাসন-শোষণ এবং নৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাচারসহ যাবতীয় অবক্ষয় দেখা দিতো, যেমন অন্যান্য ধর্ম সমাজে দেখা দিয়েছিলো যার বিবরণ বিশ্বস্ত ঐতিহাসিকগণ ইতিহাসের পাতায় রেখে গেছেন। এভাবে ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন 'প্রজন্মধারা' সৃষ্টি হতো নিজেদেরকে যারা সমাজ-উর্ধ্ব, এমন কি মানব-ঊর্ধ্ব শ্রেণী বলে দাবি করে বসতো এবং অর্থ-শোষণ, দক্ষিণা গ্রহণ ও 'হাদিয়াবৃত্তি'র ওপর তাদের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল হয়ে পড়তো, অথচ তা আসমানী হিকমতের সম্পূর্ণ খেলাফ। যেজন্য আল্লাহ্র রাসূল হাশেমী পরিবারের 'যাকাত ভোগ' নিষিদ্ধ করে দেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন,
হাসান ইব্ন আলী একবার সাদকার একটি খেজুর মুখে দিলেন। তখন নবী ﷺ 'ওয়াক ওয়াক' করতে লাগলেন যাতে হাসান তা ফেলে দেন। অতঃপর তিনি বললেন, জানো না, আমরা সাদকার মাল আহার করি না? [বুখারী, মুসলিম, কিতাবুয যাকাত, নবী পরিবার ও সাদাকা বিষয়ক অধ্যায়।
আবদুল মুত্তালিব ইবন রাবী'আ ইব্ন হারিস হতে বর্ণিত। এক দীর্ঘ হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ -বলেছেন,
ان هذه الصدقات انما هي من اوساخ الناس وانها لا تحل لمحمد ولا لال محمد
"এ সমস্ত (যাকাত) সাদাকা হলো মানুষের মালের ময়লা। মুহম্মদ ও মুহম্মদ পরিবারের জন্য তা হালাল নয়।" [সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: যাকাত]
এভাবে আল্লাহ্ হাশেমী পরিবার ও নবী-পরিবারকে এ আয়াতের নযীর হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ -
"হে ঈমানদারগণ! অধিকাংশ ইহুদী ধর্মনেতা ও খ্রীস্টান সাধু অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করে থাকে।" [সূরা তাওবা: ৩৪]
বস্তুত যুগপৎ ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের উত্তরাধিকার যদি হাশেমীরা লাভ করতো তাহলে কখনো তা এই পরিবার বৃত্ত থেকে মুক্ত হতো না। কুরায়শের এক স্পষ্টভাষীর এ মন্তব্যে কোন অতিশয়োক্তি নেই যে,
"বনু হাশিম যদি তোমাদের ওপর শাসন ক্ষমতা লাভ করেন তাহলে কুরায়শের অন্য কোন শাখা কখনো তা পাবে না।" [আল আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৯৩৮]
📄 হযরত আলী (রা)-এর বিলম্বিত বায়'আতের হিকমত
বিভিন্ন বিপ্লব ও সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সেগুলোর উদ্ভব ও পরিণতি সম্পর্কে মানুষের অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। কেননা প্রতিটি সংস্কার প্রচেষ্টার সূচনা হতো 'মানব সমাজের সংশোধন এবং অন্যায় ও অসত্যের অপসারণ, এই উদাত্ত আহ্হ্বানের মাধ্যমে। কিন্তু তা পরিণতি লাভ করতো বিপ্লব ও আন্দোলনের প্রবর্তক যিনি তার 'শক্তি ও ক্ষমতা' প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। তাই বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ব্যক্তিগণ যে কোন আদর্শিক বিপ্লব ও সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে অতি সতর্ক ও সংবেদনশীল মনোভাব প্রদর্শন করে থাকেন।
কুরায়শ নেতা আবু সুফিয়ানকে রোম-সম্রাট হিরাক্লিয়াসের 'জিজ্ঞাসাবাদ' থেকেও বিষয়টি বেশ পরিষ্কাররূপে ফুটে ওঠে।
ইসলামের নবীর পক্ষ হতে 'দাওয়া-পত্র' পেয়ে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস আবূ সুফিয়ানকে তলব করে 'নবী' সম্পর্কে যে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন এবং যে অনুভূতি ও মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন তা একদিকে যেমন সম্রাটের গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিচায়ক তেমনি তা কোন নব-বিপ্লব সম্পর্কে মানুষের স্বভাব সতর্কতার প্রমাণ। বিভিন্ন প্রশ্নের মাঝে আবু সুফিয়ানকে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাঁর পূর্বপুরুষের কেউ কি বাদশাহ ছিলেন? আবু সুফিয়ান বললেন, না।
শেষ পর্যায়ে সম্রাট মন্তব্য করলেন, তুমি বলেছ, তাঁর পূর্বপুরুষে কেউ বাদশাহ ছিলেন না, তখন আমি ভাবলাম যে, তেমন যদি হতো তাহলে বলতে পারতাম যে, একজন মানুষ তার পূর্বপুরুষের রাজত্ব পুনরুদ্ধারের মতলব করছে। [বুখারী: অহীর সূচনা অধ্যায়।
এখন প্রশ্ন হলো, নবী ও নবুয়ত এবং দাঈ ও দাওয়াত সম্পর্কে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস যেখানে 'পূর্বপুরুষে কেউ বাদশাহ ছিলেন না' এই ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন সেখানে এই নবুয়তি দাওয়াত যদি নবী ﷺ-এর ইন্তিকালের পরই নবী-পরিবারে 'শাসনধারা' জন্মই দিতো তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াতো? এমন ভুল ধারণা কি দাওয়াতের পথে অন্তরায় হতো না যে, আল্লাহ্ না করুন পরিবারের উজ্জ্বল ভবিষ্যত সংরক্ষণ ও পারিবারিক ব্যবস্থা প্রবর্তনই ছিলো নবুয়তি দাওয়াতের উদ্দেশ্য?
সর্বজ্ঞানী ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র ফায়সালা হিসেবেই নবী ﷺ-এর ইন্তিকালের পর আহলে বায়ত ও হাশিমী পরিবারের কোন সদস্য মুসলমানদের শাসনভার ও খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নি, বরং যথাক্রমে বনু তায়ম গোত্রের হযরত আবূ বকর (রা) ও বনূ আদী গোত্রের হযরত উমর (রা) এবং বনু উমাইয়া গোত্রের হযরত উসমান (রা), এরপর চতুর্থ পর্যায়ে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পিত হয় হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-এর ওপর, যখন উম্মাহর মাঝে তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও খিলাফতের জন্য তাঁর চেয়ে যোগ্য আর কেউ ছিলেন না। ফলে ভুল ধারণারও কোন অবকাশ ছিলো না। কেননা বিষয়টি তখন গোষ্ঠী ও পরিবারের পর্যায় অতিক্রম করে অগ্রাধিকার ও যোগ্যতার পর্যায়ে এসে গিয়েছিলো। দুষ্ট কথার কোন সুযোগ সেখানে ছিলো না। আর আল্লাহ্র ফায়সালা তো চিরঅটল।
📄 নীতির প্রতি অবিচল সিদ্দীকে আকবরের প্রথম পরীক্ষা
হাদীসবিশারদ ও ঐতিহাসিকগণ কর্তৃক সর্বসম্মতরূপে প্রমাণিত হাদীস এই যে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন,
انا معشر الانبياء لا نورت ما تركنا صدقة .
"আমরা নবীগণ মীরাস রেখে যাই না, আমরা যা রেখে যাই তা সাদাকারূপে গণ্য।" [মুসনাদে আহমাদ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৬৩]
নিজস্ব সনদে ইমাম আহমদ (র) হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لا يقسم ورثتى دينارًا ولا درهماً ما تركت بعد نفقة نسائي ومعونة عاملي فهو صدقة .
"আমার ওয়ারিশগণ দীনার দিরহাম বাটোয়ারা করতে পারে না, আমার স্ত্রীদের খোরপোষ এবং আমার ব্যবস্থাপকের ভাতা বাবদ খরচের পর যা থাকবে তা সাদাকারূপে গণ্য হবে।"
বুখারী, মুসলিম ও আবু দাউদ (র) মালিক ইব্ন আনাস (র)-এর সূত্রে তাঁর নিজস্ব সনদে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হতে অভিন্ন শব্দে উপরোক্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া ইমাম বুখারী (র) উরওয়া (র)-এর সূত্রে, আর তিনি হযরত আয়েশা (রা) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী ﷺ-এর ইন্তিকালের পর স্ত্রীগণ মীরাস প্রার্থনা করে হযরত উসমান (রা)-কে হযরত আবূ বকর (রা)-এর নিকট পাঠাতে মনস্থ করলেন। তখন হযরত আয়েশা (রা) এই বলে বাধা দিলেন, আল্লাহ্র রাসূল তো বলেছেন, আমরা মীরাস রেখে যাই না, আমরা যা রেখে যাই তা সাদাকা।
ইমাম মুসলিম (র)-ও অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেন। বস্তুত এই নববী ফরমানই ছিলো শানে রিসালাতের উপযুক্ত এবং তাঁর সারা জীবনের নীতি ও আচরণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কেননা বিপদ-ঝুঁকির মুখে আহলে বায়ত ও বনূ হাশিমকেই তিনি আগে রাখতেন, অথচ গনীমত লাভের সময় তাদেরকে রাখতেন পেছনে। যেমন বদরের মাঠে কুরায়শের শ্রেষ্ঠ বীরদের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের জন্য তিনি হামযা, আলী ও উবায়দা (রা)-কে ডেকেছিলেন, কিন্তু সাদাকা ও যাকাত গ্রহণ তাদের জন্য বারণ করেছেন, অথচ মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সাদাকা যাকাতই হলো অন্যতম প্রধান অর্থ ক্ষেত্র। এ যেন ছিলো সম্পদের চিরপ্রবহমান এক স্রোতধারা যা কোনদিন শুকিয়ে যাবে না।
তদ্রূপ জাহিলিয়াতের যুগ থেকে চলে আসা অর্থের সুদ ও 'রক্তের শোধ' যখন বাতিল ঘোষিত হলো তখন তিনি চাচা আব্বাস ও আব্বাস (রা)-এর ভাতিজা ইব্ন রাবী'আকে দিয়ে তা শুরু করলেন। বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বললেন,
وربا الجاهلية موضوع ، واول ربا اضعه ربানা مربا العباس بن عبد المطلب ، ودماء الجاهلية موضوعة وان اول دم اضع من دمائنا دم ابن ربيعة بن الحارث .
"জাহিলিয়াতের সকল যুদ্ধ রহিত হলো এবং সবার আগে আমাদের আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের সুদ রহিত করলাম। তদ্রূপ জাহিলিয়াতের সকল 'রক্ত-শোধ' রহিত হলো এবং সবার আগে আমাদের ইব্ন রাবী'আ ইব্দুল হারিছের রক্ত শোধ রহিত করলাম।” [মুসলিম, অধ্যায়: হজ্জ, অনুচ্ছেদ: হিজ্জাতুন্নাবী।]
হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর নামে লেখা এক পত্রে হযরত আলী (রা) নিজেও এ সত্য তুলে ধরেছেন এভাবে:
ঘোরতর যুদ্ধে মানুষের দিশেহারা অবস্থায় আপন পরিবারকেই তিনি আগে বাড়াতেন এবং তাদেরকে ঢাল বানিয়ে অন্যদেরকে তীর-তলোয়ারের সামনে থেকে রক্ষা করতেন। তাই বদরের যুদ্ধে ওবায়দার রক্ত ঝরেছে, ওহুদের মাঠে হামযা শহীদ হয়েছেন আর মুতার যুদ্ধে জাফর ইব্ন আবু তালিব জান দিয়ে ঝাণ্ডা রক্ষা করেছেন। [নাহজুল বালাগাহ, পৃষ্ঠা ৩৬৮-৩৬৯।]
ইতোমধ্যে এমন এক নাযুক পরিস্থিতির উদ্ভব হলো যা নীতি ও বিশ্বাসের প্রতি সিদ্দীকে আকবারের অবিচলতা ও আপন জ্ঞান মুতাবিক ন্যায় ও ইনসাফের প্রতি তাঁর চিরদায়বদ্ধতার উজ্জ্বলতম প্রমাণ হয়ে আছে। আর মানুষ তো নিজের জ্ঞান ও বিবেচনার কাছেই দায়বদ্ধ!
বস্তুত নীতি ও রাজনীতি এবং আবেগ ও শরীয়তের সমান্তরাল অবস্থানের কারণে বিষয়টি অতি সংবেদনশীল হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু শরীয়তের বিধানকে তিনি আবেগ ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখেছিলেন এবং নবীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে তিনি যা জানতেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।
বুখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনায় ঘটনা এরূপ- হযরত ফাতিমা (রা) ও আব্বাস (রা) আবূ বকর (রা)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর মীরাস হিসেবে খায়বার ও ফাদাক অঞ্চলের জমি ও হিস্সা দাবি করলেন। তখন আবূ বকর (রা) বললেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ-কে আমি বলতে শুনেছি, আমরা মীরাস রেখে যাই না, আমরা যা রেখে যাই তা সাদাকা। মুহাম্মদের পরিবার এই মাল দ্বারাই শুধু জীবিকা নির্বাহ করবে।
অন্য বর্ণনামতে আবূ বকর (রা) বলেছেন, আমি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ মীরাস রেখে যান না, তবে তিনি যে ভরণ-পোষণ নির্বাহ করতেন আমিও তা করবো এবং তিনি যাদের জন্য খরচ করতেন আমিও তাদের জন্য খরচ করবো। [মুসনাদে আহমাদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০]
সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ্ তাঁর রাসূলকে মদীনা ও ফাদাক অঞ্চলে যা দান করেছিলেন এবং খায়বারের পঞ্চমাংশ হতে যা কিছু অবশিষ্ট ছিলো নবী কন্যা ফাতিমা (রা) আবূ বকর (রা)-এর নিকট সেগুলোর মীরাস দাবি করে পাঠালেন। তখন হযরত আবু বকর (রা) বললেন, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ তো বলেছেন, "আমরা মীরাস রেখে যাই না। আমরা যা রেখে যাই তা সাদাকা।" মুহম্মদের পরিবার শুধু এই সম্পদ হতে জীবিকা গ্রহণ করতে পারে।
"আল্লাহ্র কসম! রাসূলুল্লাহ্ ﷺ -এর যামানায় সাদাকার মাল যে অবস্থায় ছিলো আমি তাতে সামান্য পরিবর্তনও করবো না, বরং এ ক্ষেত্রে তিনি যা করেছেন আমিও হুবহু তাই করবো।" [বুখারী, খায়বার যুদ্ধ]
হযরত আবূ বকর (রা) আরো বলেছেন, আল্লাহ্র রাসূলকে করতে দেখেছি, এমন কোন কাজ না করে আমি ক্ষান্ত হবো না।
মোটকথা, আবূ বকর (রা) যা সত্য বলে বিশ্বাস করেছিলেন তার ওপর অবিচল ছিলেন এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নবীর অসিয়ত বাস্তবায়ন করেছিলেন। অন্যদিকে ফাতিমা (রা)-ও মীরাসের দাবির ওপর অটল ছিলেন। কেননা সম্ভবত এ হাদীস তাঁর জানা ছিলো না কিংবা হয়তো তিনি মনে করতেন যে, তাঁর 'পিতৃ-চিহ্ন' লাভের আরযু রক্ষা করার নৈতিক ক্ষমতা ও অবকাশ আল্লাহ্র রাসূলের প্রথম খলীফার ছিলো। মোটকথা, উভয়ে ইজতিহাদ করেছেন এবং উভয়ের নিজস্ব কৈফিয়ত রয়েছে।
মুসনাদে আহমাদের বর্ণনামতে হযরত ফাতিমা (রা) বলেছিলেন, রাসূলুল্লাহ হতে আপনি যা শুনেছেন সে সম্পর্কে আপনিই ভালো জানেন। [মুসনাদে আহমাদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪]
মহানবী ﷺ -এর ইন্তিকালের পর হযরত ফাতিমা (রা) ছয় মাস বেঁচেছিলেন এবং এ কারণে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি আবূ বকর (রা)-এর প্রতি অপ্রসন্ন ও বিমুখ ছিলেন।
বলা বাহুল্য, মানব স্বভাবের প্রকাশ হিসেবে যে কোন সমাজ-জীবনে এ ধরনের ঘটনা অতি স্বাভাবিক। কেননা আবেগ ও সংবেদনশীলতা এবং নিজস্ব জ্ঞান ও বিশ্বাসের প্রতি অবিচলতা দু'টোই মানুষের স্বভাব ও ফিতরাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তবে এটা অবহারিত যে, নবী-কন্যার এই মতভিন্নতা ও অপ্রসন্নতা শরীয়তের সীমাবহির্ভূত ছিলো না কিংবা তাঁর স্বভাব মহত্ত্ব ও চিত্ত ঔদার্যের পরিপন্থীও ছিলো না। হযরত আমির (রা) বলেন, নবী-কন্যার অসুস্থতা যখন তীব্র রূপ ধারণ করেছিলো তখন হযরত আবূ বকর (রা) তাঁর সাক্ষাত প্রার্থনা করলেন। হযরত আলী (রা) বললেন, এই দেখো, আবূ বকর দরজায় এসেছেন। ইচ্ছা করলে তুমি অনুমতি দিতে পার। হযরত ফাতিমা বললেন, এটাই কি আপনার পছন্দ? হযরত আলী (রা) বললেন, হ্যাঁ। তখন হযরত আবূ বকর (রা) গৃহে প্রবেশ করে কৈফিয়তমূলক কথা বললেন আর নবী-কন্যা তাঁর প্রতি প্রসন্নতা প্রকাশ করলেন।
আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ গ্রন্থে গবেষক আল আক্কাদের যে মন্তব্য সেটাই এ আলোচনার শেষ কথা হতে পারে।
তিনি বলেন, এ অজুহাতে নবী ﷺ -এর প্রতি সিদ্দীকে আকবারের বিশ্বস্ততা ও আনুগত্য সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা বিবেকসম্মত নয়। কেননা আপন কন্যা আয়েশাকেও তিনি একইভাবে বঞ্চিত করেছেন। আসল কারণ এই যে, মুহাম্মদী শরীয়ত মতে নবীগণ কোন মীরাস রেখে যান না। সুতরাং আপন কন্যা আয়েশাসহ নবী-পরিবারকে মীরাস না দেয়ার কারণ 'কৃপণতা' ছিলো না, বরং দীনে মুহাম্মদী ও অসিয়তে মুহম্মদীকে রক্ষা করাই ছিলো এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য। আর মন রক্ষার পরিবর্তে দীন রক্ষাই তো কর্তব্য! [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৪৪৬]
আল আক্কাদ আরো লিখেছেন,
মীরাস প্রশ্নে হযরত আবু বকর (রা) যা করেছেন তা থেকে ভিন্ন কিছু করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলো না। কেননা তাঁর সামনে হাদীস ছিলো যে, নবী মীরাস রেখে যান না।
এ ক্ষেত্রে কন্যা আয়েশা (রা)-এর প্রতিও তাঁর আচরণ ছিলো অভিন্ন। মৃত্যুর সময় হযরত আয়েশা (রা)-কে তিনি অসিয়ত করেছিলেন যে, তাঁকে যে মাল তিনি হেবা করেছিলেন তা যেন মুসলমানদের অনুকূলে তিনি ছেড়ে দেন, অথচ হেবা ও মীরাস সূত্রে হযরত আয়েশা (রা)-এর জন্য ঐ মাল সম্পূর্ণ হালাল ছিলো। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৪৪৮]
ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য এই যে, হযরত আবূ বকর (রা) তাঁর পূর্ণ খিলাফতকালে আহলে বায়তের যথাযথ হক আদায় করেছেন এবং খায়বারের পঞ্চমাংশ ফাদাক অঞ্চলের সম্পদ ও মদীনার যে সকল ফায় রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর মালিকানায় ছিলো তা থেকে আহলে বায়তের প্রাপ্য যথারীতি আদায় করেছেন। এতে হাদীসের ভিত্তিতে ঐ সম্পদে মীরাস অনুমোদন করেন নি।
মুহম্মদ ইব্ন আলী ইব্ন হুসায়ন (যিনি মুহম্মদ বাকির নামে সুপরিচিত) ও যায়দ ইব্ন আলী শহীদ বলেছেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রতি কোন অবিচার বা অভিযোগযোগ্য কোন আচরণ হয়নি।