📄 প্রাচীন ধর্মগুলোর পরিণতি
ইসলামের দৃষ্টিতে ইহুদী ও খ্রীস্টানরা হলো আহলে কিতাব এবং তাদের ধর্ম হলো আসমানী ধর্ম। তাই ইহুদী ও খ্রীস্ট ধর্ম সম্পর্কেই আমরা প্রথমে আলোচনা করবো।
ইহুদী ধর্মের বিশ্বকোষ বলে, দেবদেবী ও মূর্তি পূজার প্রতি 'ভাববাদিগণের' ধিক্কার প্রমাণ করে যে, প্রাচীন ইসরাইলীদের মাঝেই এর অনুপ্রবেশ ঘটেছিলো, এমন কি ব্যাবিলনের নির্বাসন থেকে তাদের প্রত্যাবর্তনের দিনগুলো পর্যন্ত এর মূলোৎপাটন করা সম্ভব হয়নি, বরং শিরক ও কুসংস্কারপূর্ণ বিভিন্ন বিশ্বাস তারা গ্রহণ করে নিয়েছিলো। [Jewish Encyclopaedia. VoL. XII. P-568-569]
অন্যদিকে খ্রীস্ট ধর্ম প্রথম যুগ থেকেই গোঁড়া ও মূর্খ লোকদের বিবৃতি ও বিকৃতির এবং নবদীক্ষিত রোমকদের পৌত্তলিকতার শিকার হয়েছিলো। ফলে হযরত ঈসা (আ)-এর সরল ধর্ম-শিক্ষা, আল্লাহমুখিতা ও একত্ববাদের আলো পৌত্তলিকতার কঠিন ধূম্রজালে চাপা পড়ে গিয়েছিলো। এক্ষেত্রে সেন্ট পোল-এর ভূমিকাই ছিলো প্রধান, যিনি 'প্রায় প্রারম্ভ' থেকেই খ্রীস্টধর্মের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব লাভ করেছিলেন। কতিপয় গবেষক মনে করেন, দেহত্ব ও মূর্তভার বিশ্বাস এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাবসম্বলিত বর্তমান খ্রীস্ট ধর্মের অবকাঠামো যীশুর প্রত্যক্ষ শিষ্যবর্গের চেয়ে বরং সেন্ট পোল দ্বারা অধিক প্রভাবিত। বস্তুত পোলীয় চিন্তাধারাকেই খ্রীস্ট জগৎ সুদীর্ঘ আঠারো শতাব্দী ধরে অর্থোডকস খৃস্টীয় বিশ্বাসের ভিত্তিরূপে গ্রহণ করেছে।
হিন্দু ধর্মও গোড়া থেকেই 'সত্য পথ' থেকে সরে গিয়েছিল এবং বিশ্বাসের সরলতা ও সৃষ্টিকর্তার সম্পর্ক থেকে বিচ্যুত হয়ে পৌত্তলিকতার গ্রাসে এমনভাবে নিপতিত হয়েছিলো যে, তেত্রিশ কোটি হলো তার উপাস্য। [L. S. S. O. Malley: Popular Hinduism, P p. 6-7]
বৌদ্ধ ধর্মের অবস্থাও তথৈবচ। এখানে বিকৃতি ও বিচ্যুতি এমন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিলো যে, পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী বৌদ্ধ ধর্ম অতি অল্পকালেই এক নির্ভেজাল পৌত্তলিক ধর্মে পরিণত হলো। মূর্তি ও প্রতিমার নাম ও সংখ্যা ছাড়া হিন্দু ধর্মের সাথে তার কোন পার্থক্য থাকলো না, এমন কি কোন কোন প্রাচ্য ভাষায় বুদ্ধ (Buddha) শব্দটিও মূর্তি ও প্রতিমার সমার্থক হয়ে পড়লো। [e.v. Vaiday: History of Mediaeval Hindu India, VIP (1). 100. Sup. 97]
জরথুস্ত্রীয় ধর্মের হালচালও অভিন্ন, এর প্রণেতাগণ বলেন,
জরথুস্ত্র-এর তিরোধানের পর বিপরীত প্রতিক্রিয়ারূপে একটি সমান্তরাল সংস্কার আন্দোলনের যে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিলো তাতে 'প্রাচীন উপাস্যবর্গ' (আচার ও বিশ্বাসের জগতে) পুনরুজ্জীবন ও পুনর্বাসন লাভ করেছিলো এবং হৃদয় ও বিশ্বাসের তখনও প্রাচীন ধর্ম লালনকারীরা এই পুনরুত্থানকে উষ্ণ স্বাগতম জানিয়েছিলো এবং প্রাচীন যাজক সম্প্রদায় পূর্ণ সন্তোষ ও আনন্দের সাথে তাতে নেতৃত্ব দান করেছিলেন। এভাবে একত্ববাদে আহ্হ্বানকারী একটি সাহসী ধর্ম নিজেই বহু উপাস্যের গড্ডলিকায় ভেসে গেলো।
📄 নবীর খিলাফত লাভের দাবি ও শর্ত
বস্তুত 'নবীন' ইসলামী উম্মাহ তখন যে সমস্যা ও সংকটের সম্মুখীন হয়েছিলো তা ছিলো একান্ত অনিবার্য। কেননা
سُنَّةَ اللَّهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلُ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللهِ تَبْدِيلًا.
"বিগতদের ক্ষেত্রে এটাই ছিলো আল্লাহর বিধান আর আল্লাহর বিধানে কখনও তুমি কোন পরিবর্তন পাবে না।" [সূরা আহযাব; পৃ-৬২]
আর এ সংকট সমাধানের একমাত্র পথ ছিলো একজন খলীফা ও প্রতিনিধি নির্বাচন করা যিনি আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণ ও যোগ্যতাবলে বিকৃতি ও বিচ্যুতির হাত থেকে দীন ও উম্মাহর হেফাজত সুনিশ্চিত করবেন। তার গুণ ও বৈশিষ্ট্য হবে এরূপ:
১. ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আজীবন তিনি আল্লাহ্র রাসূলের পূর্ণ আস্থাভাজন এবং তাঁর পক্ষ হতে সত্যনিষ্ঠার সনদপ্রাপ্ত ছিলেন। দীনের কোন মৌলিক বিধান অনুষ্ঠানে ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে আল্লাহ্র রাসূল তাকে স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং এমন নাযুক ও বিপজ্জনক মুহূর্তে তিনি তাঁর সঙ্গ গ্রহণ করেছেন যখন মানুষ পূর্ণ আস্থা ও নির্ভরতা ছাড়া কারো সঙ্গ গ্রহণ করে না।
২. বিভিন্ন বিপদ ও দুর্যোগ যখন দীনের ভিত্তিমূলে আঘাত হানতে উদ্যত হয়, ফলে ধর্মপ্রবর্তনের জীবনব্যাপী কঠোর সাধনা ও শ্রম ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হয়, এমন কি তাঁর সান্নিধ্যধন্য ও সুদৃঢ় ঈমানের অধিকারী হৃদয়ও যখন ভয়ের কম্পন অনুভব করে, মহাদুর্যোগের সেই কঠিনতম মুহূর্তেও তিনি পাহাড়ের মতো অটল থাকবেন এবং নবীগণের সত্যে অবিচল শিষ্যবর্গের ভূমিকা পালন করবেন অর্থাৎ অজ্ঞতার ধূলিকণা সরিয়ে বিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাস ও মূল সত্যকে সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরবেন এবং সাধারণ অনুসারীদের অন্তর্চক্ষু খুলে দেবেন।
৩. ইসলামের সূক্ষ্ম জ্ঞান ও বোধ অর্জন এবং নবীর জীবদ্দশায় ইসলামের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে তথা যুদ্ধ ও শান্তি, ভীতি ও স্বস্তি, ঐক্য, বিভক্তি, অভাব ও প্রাচুর্যের এক কথায় সর্বাবস্থায় ইসলামের প্রতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা হবে তার বৈশিষ্ট্য।
৪. দীনের মৌলিকত্ব ও দ্বীনের নববী আকৃতি ও প্রকৃতি অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে অতুচ্চ গায়রত ও সংবেদনশীলতা হবে তার বৈশিষ্ট্য এবং এই দীনী গায়রত হবে মা-বোন ও স্ত্রী-কন্যার আবরু রক্ষায় পুরুষের গায়রাত সংবেদনশীলতার চেয়ে অধিক নাযুক ও উত্তাপপূর্ণ। ভীতি বা আপত্তি ও ব্যাখ্যা প্রবণতা বা আপসকামিতা ও নিকটতমদের সঙ্গত্যাগ বা অসহযোগিতা কোন কিছুই তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত ও বিচ্যুত করতে পারে না।
৫. নবীর ইন্তিকালের পর তাঁর খলীফা হিসেবে তাঁর প্রতিটি ইচ্ছা ও ওসিয়ত বাস্তবায়নে তিনি হবেন এমন দায়িত্বসচেতন ও আত্মনিবেদিত যে, কোন দাবির মুখে কিংবা কারো নিন্দার ভয়ে তা থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হবেন না।
৬. দুনিয়ার ভোগ-আনন্দের ক্ষেত্রে তার দুনিয়াবিমুখতা ও নির্মোহতা হবে এমন যার চেয়ে উচ্চতর অবস্থা কেবল নবী জীবনেই শুধু কল্পনা করা সম্ভব। পারিবারিক ও উত্তরাধিকারভিত্তিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা-কল্পনাও তাকে স্পর্শ করবে না যেমন হয়েছিলো আরব উপদ্বীপের নিকটপ্রতিবেশী রোম ও পারস্যের রাজপরিবারগুলোর ক্ষেত্রে।
📄 মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হযরত আবূ বকর (রা)
বলা বাহুল্য, 'সিদ্দীকে আকবর' সুমহান ব্যক্তিত্বে এ সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্যের পূর্ণ সমাবেশ ঘটেছিলো। খিলাফত লাভের পূর্বে মহানবী ﷺ-এর জীবদ্দশায় এবং খিলাফত লাভের পর ইন্তিকাল পর্যন্ত তাঁর সমগ্র জীবনে এগুলো এমন সমুজ্জ্বল ও স্বতঃসিদ্ধ ছিলো যে, অধিক সন্দেহবাদীরও তাতে সন্দেহ পোষণের কোন অবকাশ নেই। [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড] এখানে আমরা তাঁর জীবন সম্পর্কে এ সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্যের পর্যালোচনা করে দেখবো।
১. তাঁর প্রতি আল্লাহর রাসূলের পূর্ণ আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদসংকুল সফরে তাঁকে সফরসঙ্গী করার মাঝে। শত্রুরা যখন তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলো সম্ভাব্য সকল স্থানে এবং সুযোগ পাওয়ামাত্র হত্যার উদ্দেশে পদচিহ্ন অনুসরণ করে ছুটে আসছিলো স্বগোত্র কুরায়শের হিংস্র হায়েনার দল। বলা বাহুল্য, সাধারণ বুদ্ধির মানুষও পূর্ণ আস্থাভাজন ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিকেই শুধু সফরসঙ্গীরূপে গ্রহণ করবে, যিনি জীবন দিয়ে হলেও তাঁর প্রাণরক্ষায় বদ্ধপরিকর।¹
কুরআনে উল্লেখপূর্বক এ অনন্যসাধারণ উৎসর্গ কীর্তিকে আল্লাহ্ অমরত্ব দান করেছেন। আল্লাহ্ বলেন,
ثَانِي اثْنَيْنِ إِذْهُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا .
"দু'জনের দ্বিতীয় জন, যখন তারা গুহায় অবস্থান করছিলো, তখন আপন সঙ্গীকে তিনি বলেছিলেন, চিন্তা করো না, আল্লাহ তো আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।" [সূরা তাওবা: ৪০]
বলা বাহুল্য, হযরত আবূ বকর (রা) হলেন এ মহাসৌভাগ্যের একক অধিকারী যাতে কোন শরীকদার নেই।
দ্বিতীয়ত, কোন গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক দীনী রোকন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্থলবর্তিতার প্রশ্ন। এটা তো জানা কথা যে, রোযা ও যাকাত যেহেতু নিজস্বভাবে পালনীয় ব্যক্তিগত ইবাদত, সেহেতু তাতে স্থলবর্তিতার অবকাশ নেই।
সালাতের ইমামতি ও হজ্জ পরিচালনার ক্ষেত্রে অবশ্য তা সম্ভব। আর উভয় ক্ষেত্রেই হযরত আবু বকর (রা) সে সৌভাগ্য লাভ করেছেন। শেষ অসুস্থতার সময় সালাতের ইমামতির জন্য আল্লাহর রাসূল তাঁকে আপন স্থলবর্তী করেছেন এবং সবার মাঝে তাঁকেই উপযুক্ত মনে করেছেন। ওবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবা বলেন, আমি আয়েশা (রা)-এর কাছে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর শেষ অসুস্থতার ঘটনা বর্ণনা করতে আরয করলাম। তিনি বললেন,
"অসুস্থ অবস্থায় আল্লাহর নবী জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা কি সালাত আদায় করে ফেলেছে? আমরা বললাম, না, তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি পাত্রে করে পানি চাইলেন, আমরা পানি দিলাম, আর তিনি অযু করে রওয়ানা হলেন। কিন্তু উনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন। অতঃপর হুঁশ ফিরে এলে জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা কি সালাত আদায় করে ফেলেছে?
আমরা বললাম, না, হে আল্লাহর রাসূল! তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি বললেন, আমাকে পাত্রে পানি দাও। তখন তিনি বসে অযু করলেন, অতঃপর রওয়ানা হলেন। কিন্তু পুনরায় অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। অতঃপর জ্ঞান ফিরে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা কি সালাত আদায় করে ফেলেছে? আমরা বললাম না, হে আল্লাহর রাসূল। তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি বললেন, আমাকে পাত্রে পানি দাও। তখন তিনি বসে অযু করলেন, অতঃপর রওয়ানা হলেন, কিন্তু বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর জ্ঞান ফিরে এলে জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা কি সালাত আদায় করে ফেলেছে? আমরা বললাম- না, হে আল্লাহ্র রাসূল! তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। লোকেরা তখন মসজিদে ঈশার সালাত আদায়ের উদ্দেশে দাঁড়ানো অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্-এর জন্য প্রতীক্ষারত ছিলো।
আল্লাহর রাসূল তখন আবূ বকর (রা)-এর কাছে সালাতের ইমামতি করার বার্তা পাঠালেন। দূত তাঁকে এসে বললেন, আল্লাহর রাসূল আপনাকে নামায পড়ানোর আদেশ করেছেন। আবূ বকর (রা) ছিলেন কোমল-হৃদয় মানুষ। তাই তিনি বললেন, হে উমর, আপনি নামায পড়ান। উমর (রা) বললেন, এ বিষয়ে আপনি অধিক উপযুক্ত। ফলে সে ক'দিন আবু বকর (রা) সালাতের ইমামতি করলেন।
পরে একদিন নবী কিঞ্চিৎ সুস্থ বোধ করলেন। তখন দু'জন লোকের কাঁধে ভর করে যোহরের সালাতে উপস্থিত হলেন। দু'জনের একজন হলেন আব্বাস (রা), আবু বকর নামায পড়াচ্ছিলেন। তিনি তাঁকে দেখে পিছিয়ে আসতে উদ্যত হলেন, কিন্তু নবী ইশারায় তাঁকে বারণ করলেন এবং বললেন, আমাকে তার পাশে বসিয়ে দাও। তারা তাঁকে আবু বকর (রা)-এর পাশে বসিয়ে দিলো। তখন আবূ বকর (রা) দাঁড়ানো অবস্থায় নবী-এর সালাত অনুসরণ করে সালাত আদায় করতে লাগলেন, আর লোকেরা আবূ বকর (রা)-এর সালাত অনুসরণ করতে লাগলেন। নবী বসা অবস্থায় ছিলেন।
হযরত ওবায়দুল্লাহ (র) বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর নিকট হাযির হয়ে তাঁর অনুমতিক্রমে তাঁকে হযরত আয়েশা (রা)-এর পূর্ণ বক্তব্যটি বর্ণনা করলাম। তিনি সমর্থন করে শুধু বললেন, দ্বিতীয় যে লোকটির নাম আয়েশা বলেন নি, তিনি হলেন হযরত আলী। [বুখারী, অনুচ্ছেদ: ইমাম নিয়োগ করা হয় অনুসরণ করার জন্য, অধ্যায়: সালাত]
হযরত আবূ মূসা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, অসুস্থতা বৃদ্ধির পর রাসূলুল্লাহ্ বললেন, "আবু বকরকে নামায পড়াতে বলে দাও।"
হযরত আয়েশা (রা) আরয করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আবু বকর (রা) খুব নরমদিল মানুষ, আপনার স্থানে দাঁড়িয়ে তিনি স্থির থেকে নামায পড়াতে পারবেন না। তখন তিনি ক্ষীণ স্বরে হযরত আয়েশা (রা)-কে বললেন, আবু বকরকে নামায পড়ানোর আদেশ পৌঁছে দাও। আসলে তোমরা তো হলে (আল্লাহর নবী) ইউসুফের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারিণীদের দল। [মুসলিম, সালাত অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ইস্তিখলাফুল ইমাম ইসলামের প্রথম হজ্জ পরিচালনার ক্ষেত্রে ইযা আরাদা লাহু উযরুন আও মারাযা]
আল্লাহর রাসূল হযরত আবূ বকর (রা)-কে স্থলাভিষিক্ত আমীর নিযুক্ত করেছিলেন, এটা ছিলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক দায়িত্ব। হজ্জ ফরয হয়েছিলো নবম হিজরীতে। সে বছর আল্লাহর রাসূল হযরত আবূ বকর (রা)-কে মুসলমানদের হজ্জ পরিচালনা করার জন্য হজ্জ কাফেলার আমীর হিসেবে প্রেরণ করলেন। হজ্জ মৌসুমে মুশরিকরা নিজ নিজ গৃহেই অবস্থান করছিলো। পেছনেও আমরা বলে এসেছি যে, মদীনা থেকে তিন'শ হজ্জযাত্রী হযরত আবূ বকর (রা)-এর সঙ্গী হয়েছিলেন। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৫৪৩-৫৪৬]
২. মুসলিম উম্মাহর কঠিনতম বিপদ ও দুর্যোগ তথা নবী ﷺ-এর ইন্তিকালের নাযুকতম মুহূর্তে হযরত আবূ বকর (রা)-এর ধীর, প্রশান্ত ও অবিচল ব্যক্তিত্বের প্রথম সমুজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছিলো। বস্তুত নবী-এর ইন্তিকালের সংবাদ সাহাবা কিরামের জন্য বজ্রপাতের চেয়েও কঠিন ছিলো, এমন কি যাঁরা এ খবর বিশ্বাস করতে রাজী ছিলেন না তাঁদের পুরোভাগে ছিলেন হযরত উমর (রা)-এর ন্যায় ব্যক্তি, যাঁর গভীর প্রজ্ঞা ও আত্মসংযম ছিলো সুবিদিত। তিনি মসজিদে এসে সমবেত লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে বললেন, আল্লাহ্ মুনাফিকদের বিনাশ না করা পর্যন্ত আল্লাহ্র রাসূলের মৃত্যু হতে পারে না। [সীরাতে ইব্ন হিশাম, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৭৯]
হযরত আবূ বকর (রা)-ই ছিলেন সেই সাহসী পুরুষ, প্রবলতম ঝড়-ঝঞ্ঝার মুখেও যিনি মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের মতোই অবিচল থাকেন।
বাসভবন থেকে রওয়ানা হয়ে মসজিদে নববীর দরজায় এসে তিনি অবতরণ করলেন। উমর (রা) তখন সমবেত লোকদের উদ্দেশে কথা বলছিলেন। কোনদিকে ভ্রক্ষেপ না করে তিনি আয়েশা (রা)-এর ঘরে রাসূলুল্লাহ-এর পবিত্র দেহের সামনে হাযির হলেন এবং তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল হতে পর্দা সরিয়ে অবনত হয়ে (ললাটে) চুম্বন করলেন। তিনি বললেন, আপনার জন্য আমার আব্বা-আম্মা উৎসর্গীকৃত হোন! আল্লাহ্ যে মৃত্যুর ফায়সালা করেছেন তার স্বাদ তো আপনি গ্রহণ করেছেন। এরপর মৃত্যু আর কখনো আপনাকে স্পর্শ করবে না। অতঃপর তিনি পুনরায় চাদর টেনে দিয়ে মসজিদে হাযির হলেন এবং বক্তব্যরত হযরত উমর (রা)-কে শান্ত ও নীরব হতে বললেন, কিন্তু তিনি কথা বলেই চললেন। এ অবস্থায় হযরত আবূ বকর (রা) উপস্থিত লোকদের উদ্দেশে কথা আরম্ভ করলেন, আর সকলে হযরত উমর থেকে সরে তাঁর বক্তব্য শ্রবণে মনোযোগী হলেন। তখন তিনি আল্লাহর হামদ-ছানা ও প্রশংসা করে বললেন-
"হে লোক সকল! যারা মুহাম্মদ ﷺ-এর উপাসনা করতে তারা শোন, মুহাম্মদ ইন্তিকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহ্র ইবাদত করতে তারা শোন, আল্লাহ্ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। অতঃপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন,
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَّাতَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِيبَهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ .
"মুহাম্মদ তো রাসূল ছাড়া অন্য কিছু নন! তাঁর পূর্বেও রাসূলগণ বিগত হয়েছেন। সুতরাং তিনি যদি ইন্তিকাল করেন কিংবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা উল্টো পায়ে পেছনে ফিরে যাবে? আর যে উল্টো পায়ে পেছনে ফিরে যাবে সে আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ্ শোকরকারীদের অবশ্যই প্রতিদান দেবেন।" [সূরা আলে ইমরান: ১৪৪]
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবী কিরাম বলেন, আল্লাহর কসম। আবু বকরের মুখে সেদিন এ আয়াত শোনার আগে মানুষ যেন জানতই না যে, এমন আয়াত নাযিল হয়েছে!
হযরত উমর (রা) আল্লাহর কসম করে বলেন, আবু বকরের মুখে এই তিলাওয়াত শোনামাত্র হতবুদ্ধি অবস্থায় মাটিতে পড়ে গেলাম, যেন আমার পদদ্বয় আমাকে বহন করতে পারছিলো না। তখন আমার বুঝ হলো যে, আল্লাহর নবী সত্যি সত্যি ইন্তিকাল করেছেন। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৬৫৫-৫৬]
বিভিন্ন আরব গোত্র যখন যাকাত আদায়ের অপরিহার্যতা অস্বীকার করলো কিংবা বায়তুলমালে যাকাত আদায়ের বিধান প্রত্যাখ্যান করলো সেই নাযুক সময়ে সিদ্দীকে আকবার যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন তার প্রতিটি শব্দে দীনের মৌলিকত্ব, নববী আকৃতি ও প্রকৃতি রক্ষায় সিদ্দীকী মর্যাদাবোধ ও সংবেদনশীলতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ঘটেছিলো, বস্তুত ইসলামের ইতিহাসে সমুজ্জ্বল অধ্যায়ের সেই একটিমাত্র বাক্য যে কোন সারগর্ভ ভাষণ কিংবা তত্ত্বপূর্ণ গ্রন্থের চেয়ে মূল্যবান ও আবেদনপূর্ণ ছিলো। একই সঙ্গে তা ইসলামের প্রাণ ও মর্ম সম্পর্কে সিদ্দীকে আকবরের সূক্ষ্ম জ্ঞানের প্রতিবিম্ব ছিলো। [আরকানে আরবাআ, যাকাত পর্ব ও খাত্তাবী (র) রচিত সাআলিমুস সুনান]
ইতিহাসের রেকর্ড থেকে এবার শুনুন ঈমানের তেজে তেজোদৃপ্ত কণ্ঠের সেই ঘোষণা। অহী এখন সমাপ্ত এবং দীন সুসম্পন্ন। সুতরাং আমার প্রাণ থাকতে কি তা ক্ষুণ্ণ হতে পারে?
মেশকাতুল মাছাবীহের বর্ণনামতে হযরত উমর (রা) তাঁকে বলেছিলেন, হে খালীফাতুর রাসূল! মানুষের প্রতি কোমল ও নমনীয় হোন। তখন সিদ্দীকে আকবার তাঁকে বলেছিলেন,
اجبار فى الجاهلية خوار فى الاسلام اينقص الدين.
জাহিলিয়াতের পরাক্রমশালী তুমি ইসলামে এসে দুর্বল হয়ে গেলে! আমি বেঁচে থাকতে দীন ক্ষুণ্ণ হবে?
অথচ বহু বিশিষ্ট সাহাবী তখন অস্ত্র ধারণের বৈধতা সম্পর্কে এ কারণে দ্বিধান্বিত ছিলেন যে, তারা তো ইসলামের কালিমা উচ্চারণকারী এবং অন্যান্য আহকাম গ্রহণকারী। কিন্তু সিদ্দীকে আকবরের অন্তরে মুহূর্তের জন্যও ছিলো না কোন দ্বিধা সংশয়, বরং তাঁর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা ছিলো,
"আল্লাহর কসম! নবীর যামানায় যাকাতের উটের সঙ্গে যে রশিটি দেয়া হতো সেটা বন্ধ হলেও তাদের বিরুদ্ধে আমি অস্ত্র ধারণ করবো। যাকাত হলো মালের হক, আল্লাহর কসম! নামায ও যাকাতের মাঝে যারা পার্থক্য করে তাদের বিরুদ্ধে আমার লড়াই হবে।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩১১]
বস্তুত ইসলামের ইতিহাসে যাকাত দান অস্বীকার ছিলো শরীয়ত প্রাসাদে এক বিরাট ফাটল সৃষ্টির ও অন্তহীন ফেতনার দুয়ার খুলে দেয়ার শামিল। আল্লাহ না করুন, সিদ্দীকে আকবার যদি এ ফাটল সৃষ্টির সামান্যতম সুযোগ দিতেন এবং মহাদুর্যোগের এ দুয়ার বন্ধ করতে বিন্দুমাত্র শিথিলতা প্রদর্শন করতেন তাহলে আর কখনো তা বন্ধ হতো না বরং নিত্য নতুন ফিতনা শুরু হতো। নামাযের ক্ষেত্রে জুমা ও জামাতের বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠতো যে, বাড়িতে একা একা পড়াই যথেষ্ট। রোযা সম্পর্কে দাবি উঠতো যে, শুরু ও শেষের সময় সীমা এবং রমযানের সময়াবদ্ধতায় কী প্রয়োজন, এমন কি নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত রোকনে ও সম্মিলিতভাবে হজ্জ আদায়ের বিষয়টিও প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে পড়তো। এক কথায় নবুওয়তি খিলাফত ও ইসলামী হুকুমাতের সমগ্র কাঠামোটাই ভেঙ্গে পড়তো, অথচ এরই ওপর নির্ভর করে ইসলামের শান্তি নীতি ও অন্যান্য বিধানের বাস্তবায়ন এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ইজ্জত ও মর্যাদার আসন, বরং রাসূলের ইন্তিকালের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামেরও মৃত্যুঘণ্টা বেজে উঠতো, অথচ ইসলাম এসেছে কিয়ামত পর্যন্ত প্রাণবন্ত ও কার্যকর থাকার জন্য।
সুতরাং এটা প্রমাণিত সত্য যে, যে অনমনীয়, আপসহীন ও চূড়ান্ত নীতি ও অবস্থান সিদ্দীকে আকবার সেদিন গ্রহণ করেছিলেন সেটা ছিলো আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর অন্তরে ইলহামকৃত। তাই কিয়ামত পর্যন্ত দীনের অস্তিত্ব ও মৌলিকত্ব এবং স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতা বহাল থাকার ক্ষেত্রে তিনিই হলেন অনন্য গৌরবের প্রথম হকদার।
বস্তুত ইতিহাসের এ সাক্ষ্য আমরা ও অন্যরা সকলেই মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করে যে, ধর্মত্যাগের ফিতনার মুকাবিলায় ও ইসলামের মজবুত রজ্জু ছিন্নভিন্ন করার চক্রান্তের মুখে হযরত সিদ্দীকে আকবার যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের অনুসৃত নীতি ও কর্মের প্রায় সমতুল্য ভূমিকাই পালন করেছিলেন এবং নবুয়তি খিলাফতের পূর্ণ হক আদায় করেছিলেন। সুতরাং এই পৃথিবী ও তার মানব সম্প্রদায় যখন আল্লাহ্র নিরংকুশ মালিকানায় ফিরে যাবে সেদিন পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর সকৃতজ্ঞ প্রশংসা ও দু'আ তিনি অবশ্যই পেতে থাকবেন। [আরকানে আরবাআ; যাকাত পর্ব]
৫. নবী ﷺ-এর ইন্তিকালের পর তাঁর ইচ্ছা ও অসিয়ত বাস্তবায়নে হযরত আবূ বকর (রা)-এর সজাগ দৃষ্টি ও নিবেদিত প্রয়াসের সমুজ্জ্বল প্রমাণ হলো হযরত উসামার নেতৃত্বে প্রস্তুতকৃত বাহিনী প্রেরণ। এ বাহিনী আল্লাহর রাসূল স্বয়ং প্রস্তুত করেছিলেন এবং তা প্রেরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, এমন কি হযরত উসামা (রা) তাঁর বাহিনীসহ মদীনা হতে এক 'ফরাখ' দূরে জুরুফ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন এবং আল্লাহর রাসূল শেষ অসুস্থতার কঠিন সময়েও "উসামার বাহিনী প্রেরণ করো" বলে বারবার তাগিদ দিচ্ছিলেন।
ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ 'পরম বন্ধু'-র সান্নিধ্যে চলে গেলেন। সেই নাযুকতম পরিস্থিতিতেও হযরত আবূ বকর (রা) 'অন্তিম নববী ইচ্ছা' বাস্তবায়নে অগ্রসর হলেন এবং উসামা বাহিনীকে অভিযানের আদেশ প্রদান করলেন, অথচ ধর্মত্যাগীদের মদীনা আক্রমণের পূর্ণ আশংকার মুখে মদীনা থেকে মুসলিম বাহিনীর বিদায় কারো কাছেই যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছিলো না। কিন্তু হযরত আবূ বকর (রা) আপন সিদ্ধান্তে ছিলেন অনড়। সুরতহালের বিবরণ প্রসঙ্গে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) এ হাকীকত অতি উত্তমরূপে তুলে ধরেছেন, আবুল আ'রাজ বলেন, আবূ হুরায়রা (রা) বলেছেন,
"যিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, আল্লাহ্র কসম, আবূ বকর খলীফা না হলে এই যমীনে আর আল্লাহর ইবাদত হতো না।"
একথা তিনি দু'বার কিংবা তিনবার উচ্চারণ করে উসামা বাহিনী প্রেরণ প্রসঙ্গে বলেছেন,
উসামার বাহিনীকে অভিযানের আদেশ প্রদান করে আবূ বকর (রা) বললেন, আল্লাহর রাসূল স্বয়ং যে বাহিনী প্রস্তুত ও প্রেরণ করেছেন আমি তা প্রত্যাহার করতে পারি না এবং যে ঝাণ্ডা তিনি তুলে দিয়েছেন আমি তা খুলে নিতে পারি না। ফল এই দাঁড়ালো যে, উসামা বাহিনীর অগ্রাভিযান দেখে পথিমধ্যের ধর্মত্যাগে উদ্যত গোত্রগুলো বলাবলি শুরু করলো যে, প্রবল শক্তির অধিকারী না হলে এ কাওম এমন সময় এমন অভিযানে বের হতে পারে না। সুতরাং বুদ্ধিমানের কাজ হলো রোমকদের সাথে এদের মুকাবিলা পর্যন্ত অপেক্ষা করা।
পরবর্তীতে উসামা বাহিনী রোমকদের শোচনীয়ভাবে পর্যুদস্ত করে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করলো। ফলে আরব গোত্রগুলো ঈমানের ওপর অবিচল থাকলো। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩০৪]
শরীয়তের আহকাম বর্জন ও ঈমান বিসর্জন দিয়ে যারা কুফরী গ্রহণ করেছিলো এবং জাহিলিয়াতের অভ্যস্ত জীবনে ফিরে গিয়েছিলো (আল্লামা খাত্তাবীর ভাষায় এরা হলো প্রথম শ্রেণী) তদ্রূপ নামায ও যাকাতের মাঝে পার্থক্য করে যারা যাকাত অস্বীকার করেছিলো (আল্লামা খাত্তাবীর ভাষায় ধরা হলো দ্বিতীয় শ্রেণী) এ উভয় শ্রেণীর বিরুদ্ধে হযরত আবূ বকর (রা) ধর্মত্যাগের ভিত্তিতে অস্ত্র ধারণ করেছিলেন। কেননা দীনের অকাট্য প্রমাণিত কোন বিধান অস্বীকার করা কুফরী। তাই তিনি বলেছিলেন, "আল্লাহর কসম, নামায ও যাকাতের মাঝে যারা পার্থক্য করে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আমি যুদ্ধ করে যাব। কেননা যাকাত হলো মালের হক।"
পক্ষান্তরে ইমামের অধিকার অস্বীকার করে যারা যাকাত আত্মসাৎ করেছিলো তদ্রূপ যারা ইমামের অধিকার স্বীকার করলেও গোত্রপতিদের প্রভাবে ইমামের হাতে যাকাত অর্পণে বিরত ছিলো তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের ভিত্তি ছিলো বিদ্রোহ, কেননা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের অপরিহার্যতা সর্বসম্মত এবং কুরআন দ্বারা প্রমাণিত।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেছেন, فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِي إِلَى أمر الله .
"একদল যদি অন্য দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাহলে বিদ্রোহকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করো যতক্ষণ না তারা আল্লাহর বিধানে প্রত্যাবর্তন করে।" [সূরা হুজুরাত: ৯]
বিভিন্ন আরব গোত্রের ধর্মত্যাগ ও মিথ্যা নবুয়তের ফিতনা গোলযোগ হযরত আবূ বকর (রা) অতি কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন। আল্লাহ্ না করুন, এ ফিতনার বিস্তার যদি অব্যাহত থাকতো তাহলে ইসলামের কিছুই আর অবশিষ্ট থাকতো না।
এজন্যই তিনি ভণ্ড নবী মুসায়লামা ও তার অনুসারীদের সমূলে ধ্বংস করেছিলেন এবং এগারজন সেনাপতির হাতে ঝাণ্ডা অর্পণপূর্বক ধর্মত্যাগী ও যাকাত বিরোধীদের কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন এবং শাজাহ ও বনু তামীমের ফিতনা দমন করেছিলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৬৪]
এ সময় ইরাক ও আরব উপদ্বীপের পঞ্চাশ হাজারের মতো মুশরিক ও মুরতাদ নিহত হয়েছিলো। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২১৯]
পরিস্থিতি সম্পর্কে আল্লামা ইবনে কাছীর (রা)-এর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য হলো! ধর্মচ্যুতরা ইসলামে পুনঃদীক্ষিত হয়েছিলো এবং সত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো এবং জাযীরাতুল আরবের পুনঃস্থিতিশীলতার মাধ্যমে দূরবর্তী ও নিকটবর্তী সকলে সমস্তরে এসে গিয়েছিলো। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩২৯]
মুহম্মদ ইবনে ইসহাকের ভাষায়- "নবী ﷺ-এর ইন্তিকালের পর আরব গোত্রে ধর্মত্যাগের হিড়িক পড়ে যায়। ইহুদী ও খ্রীস্ট ধর্মের অনুসারীরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো এবং মুনাফিকদের প্রতাপ দেখা দিলো। ফলে নবীহারা উম্মত শীতের বর্ষণ-রাত্রে বৃষ্টিতে ভেজা মেষপালের ন্যায় বিপন্ন হয়ে পড়লো। কিন্তু উম্মতকে আল্লাহ্ আবু বকরের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ করলেন।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৯]
হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রা)-এর নেতৃত্বে ইরাক-অভিযান হলো এবং ইরাকের সিংহভাগ এলাকাসহ আমবার ও দাওমাতুল জান্দাল বিজিত হলো এবং বহু যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলামের অব্যাহত বিজয় সম্পন্ন হলো। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২-৩]
এভাবে ইসলামের ভিত্তিভূমি ও আশ্রয়কেন্দ্র জাযীরাতুল আরবে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো এবং ইসলামের আসল মূলধন সেই আরব জাতির হৃদয়ের গভীরে ইসলামের শিকড় পুনঃপ্রোথিত হলো। ফলে ইসলামের বিজয় স্রোত ইরাক ও সিরিয়া অভিমুখে প্রবাহিত হলো এবং মুসলিম বাহিনী ইসলামের প্রসার, রাজ্য বিস্তার ও প্রতিবেশী দেশ অধিকারের সংগ্রামে নিয়োজিত হলো এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় খলীফার আমলে তা পূর্ণতা লাভ করলো। হযরত আবূ বকর (রা) যখন ইহজগৎ ত্যাগ করেন তখন দামেস্ক জয় ও ভাগ্যনির্ধারণী ইয়ারমুক যুদ্ধে বিজয় ছিলো মুসলিম বাহিনীর দোরগোড়ায়। তাছাড়া হযরত উমর ও উসমান (রা)-এর যুগ থেকে উমাইয়া আমল পর্যন্ত অর্জিত বিজয়গুলোর মূলেও হযরত আবূ বকর (রা)-এর নীতি ও কীর্তির বিরাট অবদান ছিলো, এমন কি তাঁর দু'বছরের সংক্ষিপ্ত খিলাফতকালই ছিলো পরবর্তীতে সারা বিশ্বের ইসলামের উত্থান ও কল্যাণ প্রসারের ভিত্তি।
৬. হযরত আবূ বকর (রা)-এর দুনিয়াবিমুখতা, মোহহীনতা ও বায়তুল-মালের ভাতা গ্রহণে তাঁর কৃচ্ছের প্রকৃতি অনুধাবনের জন্য সিদ্দিকী জীবনের দু'টি উদাহরণ তুলে ধরাই যথেষ্ট হবে।
জীবনে একবার তাঁর স্ত্রীর সাধ জেগেছিলো পরিবারের সকলকে হালুয়া তৈরি করে খাওয়াবেন। কিন্তু খলীফা বললেন, আবু বকরের তো সেই সামর্থ্য নেই! স্ত্রী বললেন, কয়েক দিনের খরচ থেকে কিছু কিছু করে বাঁচিয়ে রাখবো, খলীফা বললেন, তা দেখো।
এভাবে অনেক কষ্টের উদ্বৃত্ত তিনি খলীফার হাতে তুলে দিলেন হালুয়ার আয়োজনের জন্য। আর খলীফা হযরত আবূ বকর (রা) কি করলেন? উদ্বৃত্ত অর্থ বায়তুল মালে ফেরত দিয়ে বললেন, এটা আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত। সুতরাং আগামীতে যেন আবু বকরের ভাতা এ পরিমাণ কম দেয়া হয়, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে মালের পেছনের ক্ষতিপূরণও তিনি আদায় করলেন!
দ্বিতীয় উদাহরণ প্রসঙ্গে হযরত হাসান ইবনে আলী (রা) বলেন, ইন্তিকালের সময় আবূ বকর (রা) বললেন, হে আয়েশা! মুসলমানদের খিদমতে নিযুক্ত থাকার সময় যে উটনীর দুধ আমরা পান করেছি এবং যে লেপ আমরা ব্যবহার করেছি আমার মৃত্যুর পর সেগুলো উমরের কাছে ফেরত দিও।
অসিয়ত মতে হযরত আয়েশা (রা) যখন ফেরত দিলেন তখন দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা) বললেন, আবূ বকর! আল্লাহ্ আপনাকে রহম করুন! পরবর্তীতে আপনি বড় কঠিন পরীক্ষায় ফেলে গেছেন। [তারীখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা-৮৭]
টিকাঃ
১. শিয়া আলিম ইবনুল মুতীহহের منهاج الكرامة في معرفة الامامة গ্রন্থে লিখেছেন, হয়তো সতর্কতার খাতিরে তাকে সফরসঙ্গী করা হয়েছিলো যাতে পিছনে থেকে তিনি গোপনীয়তা ফাঁস করতে না পারেন। সুতরাং এখানে আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্বের কিছু নেই। বর্ণিত আছে, ইবনুল মুতীহররে উন্নতি ও সৌভাগ্যের পৃষ্ঠপোষক তাতারী বাদশাহ আলীজা খোদা বন্দ খান, যাঁকে উৎসর্গ করে এ গ্রন্থ রচিত হয়েছে তিনি এ বক্তব্য শুনে মন্তব্য করেছেন যে, কোন বুদ্ধিমান লোক এমন করতে পারে না।
📄 ইসলামের শুরা ব্যবস্থা ও আবূ বকর (রা)-এর খিলাফত
প্রাচীন পৃথিবীতে রাজবংশীয় শাসন ও উত্তরাধিকারসূত্রীয় আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব ধারা প্রচলিত ছিলো। বস্তুত এ দ্বৈত শাসনের যাঁতাকলে মানব সম্প্রদায় নিষ্পেষিত হচ্ছিলো। একটি হলো রাজবংশের স্বেচ্ছাচারমূলক রাজনৈতিক শাসন যা পিতা থেকে পুত্রের কিংবা রাজপরিবারের অন্য কোন সদস্যের হাতে হাত বদল হতো। কখনো শান্তিপূর্ণ উপায়ে, কখনো বা রক্তপিচ্ছিল পথে। যোগ্যতা কিংবা রাজা ও প্রজার স্বার্থ-চিন্তার কোন অবকাশ ছিলো না সেখানে রাজ্য ও রাজ্যের সম্পদ রাজা ও রাজপরিবারের ভোগ দখলে। রৌপ্য ও হীরা কাঞ্চন ও বল্লাহীন ভোগ বিলাস ও বিনোদনই ছিলো রাজা ও রাজপরিবারের একমাত্র লক্ষ্য। রাজদণ্ডের প্রতাপ ও ঐশ্বর্যের উত্তাপ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাদের যা কিছু কীর্তিকলাপ তা আজকের মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। সেই শাসন-শোষণ ও আনন্দ-বিনোদনের ইতিহাস যারা পড়েছেন তারাই শুধু তা কল্পনা করতে পারেন। প্রজাসাধারণও তাদেরকে অতিমানব বলে বিশ্বাস করতো। কেননা তাদের শিরায় ঈশ্বরের পবিত্র রক্ত প্রবাহিত এবং রাজ্য শাসন ও প্রজা শোষণের ক্ষমতা ঈশ্বরপ্রদত্ত ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত।
পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষের অভাব ও দুঃখ-কষ্টের চিত্র ছিলো বড়ই করুণ। পাষাণ হৃদয়ও তাতে বিগলিত হতো এবং নির্দয় চক্ষুও অশ্রুসিক্ত হতো। ক্ষুধার এক মুঠো অন্ন ও লজ্জার এক টুকরো বস্ত্র লাভের জন্যও তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রাণান্ত হতো। হাজারো কর ও খাজনার ভারে তারা ভারাক্রান্ত হতো এবং চাবুকের আঘাতে আর্তনাদ করতো। দৃশ্য-অদৃশ্য বহু শৃঙ্খলে তাদের চলৎশক্তি ছিলো রহিত। এক কথায় মানুষ ছিলো তারা, কিন্তু জীবন ছিলো মানবেতর। মর্যাদায় ছিলো পশুরও অধম। রাজা ও রাজপরিবারের ভোগস্পৃহা ও সম্পদ চাহিদা চরিতার্থ করাই যেন ছিলো তাদের জন্মের সার্থকতা। [সীরাতুন্নবী, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬]
দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকারভিত্তিক ধর্মীয় ক্ষমতা ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব, যা বিশেষ বংশ বা সম্প্রদায়ের হাতে কুক্ষিগত ছিলো যুগ যুগ ধরে বংশ-পরম্পরায়। পূজনীয় পর্যায়ের যে আধ্যাত্মিক অবস্থান ও ধর্মীয় মর্যাদা তারা ভোগ করত সেটাকে জাগতিক স্বার্থসিদ্ধি ও ইন্দ্রিয় চাহিদা চরিতার্থের হাতিয়াররূপে ব্যবহার করতো। এক কথায় তারা ছিলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে নিরংকুশ মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণী, যাদের হালাল-হারাম নির্ধারণের এবং বিধান ও ব্যবস্থা প্রবর্তনের একচ্ছত্র ক্ষমতা ছিলো। ধর্মীয় মধ্যস্বত্বভোগী ও সম্প্রদায়ের যে চিত্র আল-কুরআন পেশ করেছে তার চেয়ে নিখুঁত ও বাস্তবানুগ চিত্র আর কী হতে পারে!
ইরশাদ হয়েছে, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِّنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِلِ اللَّهِ .
"হে ঈমানদারগণ! বহু (ইহুদী) ধর্মনেতা ও (খ্রীস্টান) পাদরী মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে।" [সূরা তাওবা: ৩৪]
খ্রীস্ট সমাজে উপরোক্ত শ্রেণীর জন্য ব্যবহৃত শব্দটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সুপ্রসিদ্ধ আরব খ্রীস্টান পণ্ডিত বুতরুস বুস্তানী তাঁর বিশ্বকোষ গ্রন্থে বলেন,
শব্দটি এ ধারণার ইঙ্গিতবাহী যে, এরা হলো প্রভুর উত্তরাধিকারী, মূসার ধর্ম বিধানে লেবীয় সম্প্রদায় যেমন সদাপ্রভুর উত্তরাধিকারী ছিলো। হিব্রু, মিশরীয় ও অন্যান্য প্রাচীন জাতিবর্গের বিধি ব্যবস্থায় উপাসনা ও উপাসনালয় পরিচালনার জন্য বিশেষশ্রেণী ছিলো। খ্রীস্টান গির্জার প্রতিষ্ঠা লগ্নেও অনুরূপ সেবায়েতশ্রেণী গড়ে উঠেছিলো, গির্জা যখন দারিদ্র্যের আবর্ত থেকে উদ্ধার পেলো তখন থেকেই তথা যাজকশ্রেণীর প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার শুরু হলো। ফলে শুধু ধর্মসেবক নয়, বরং সমকালীন জ্ঞান ও শিক্ষায় একক প্রাধান্যের মাধ্যমে তারাই হয়ে উঠেছিলো সমাজের একক নিয়ন্ত্রক শক্তি। রোমান শাসনামলে যাজক সম্প্রদায় বহুবিধ কর ও খাজনা থেকে মুক্ত ছিলো। তদুপরি 'জনস্বার্থ' সম্পর্কেও তাদের কোন দায়বদ্ধতা ছিলো না। বরং তাদের কায়েমী ক্ষমতা নিজস্ব পরিমণ্ডল অতিক্রম করে প্রজা সাধারণের ওপরও বিস্তৃত ছিলো। [বুস্তানীর বিশ্বকোষ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪৬]
প্রাচীন ইরান তথা পারস্যের অবস্থাও ছিলো অভিন্ন। পারসিক ধর্মীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব কোন-না-কোন সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণে থাকতো। গোড়ার দিকে 'মায়দায়া' সম্প্রদায়ের ও জরথুস্ত্র'-এর অনুসারীদের যুগে 'আল-মাগান' সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটেছিলো। ধর্মীয় সম্প্রদায় ছিলো পৃথিবীতে বিধাতার ছায়া এবং তার সেবা প্রযত্নের জন্যই তাদের সৃষ্টি। শাসক এ গোত্রের সদস্য হওয়া অপরিহার্য। কেননা ঈশ্বরের সত্তা তার মাঝেই মূর্ত হয়। সুতরাং এ পরিবারই হবে 'অগ্নিগৃহের' সেবা দায়িত্বের মর্যাদার অধিকারী। [সাসানী যুগের ইরান, আর্থার ক্রিস্টিয়ান]
হিন্দু-ভারতের ধর্মব্যবস্থায় 'ব্রাহ্মণ সমাজ' ছিলো ধর্মীয় ক্ষমতার নিরংকুশ অধিকারী। মর্যাদা ও পবিত্রতার এমন শীর্ষবিন্দুতে ছিলো তাদের অবস্থান যেখানে অন্য কারো 'উত্তরণ' সম্ভব ছিলো না। সেখানে ব্রাহ্মণের 'পাপ' ত্রিভুবন বিনাশ করলেও তিনি ক্ষমাযোগ্য এবং 'ব্রাহ্মণ হত্যা' সর্বাবস্থায় মহাপাপ। ব্রাহ্মণের ওপর কর ধার্য করা যায় না এবং ব্রাহ্মণ ছাড়া উপাসনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান হতে পারে না।
এ উভয় ক্ষেত্রেই ইসলাম বংশপরম্পরা ও উত্তরাধিকার ধারা বিলুপ্ত করেছিলো। কেননা যুগ যুগ ধরে মানবতার বিরুদ্ধে তা 'মহাঅপরাধ' সংঘটন করেছে যার অসংখ্য প্রমাণ রোম, পারস্য ও ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসে রয়েছে। [সীরাতুন্নবী, পৃষ্ঠা-৩৮]
খলীফা নির্বাচনের দায়িত্ব মুসলিম উম্মাহর ওপর এবং ইলম ও প্রজ্ঞা, ইখলাস ও বিচক্ষণতার অধিকারী শুরার হাতে অর্পণ করেছে। এ কারণেই আল্লাহর রাসূল তাঁর স্থলাভিষিক্ত খলীফা সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ রেখে যান নি। বলা বাহুল্য, এ সম্পর্কে ঘোষণা প্রদান 'শরীয়ত কর্তব্য' হলে অবশ্যই তিনি তা কার্যকর করে যেতেন। কেননা তাঁর প্রতি আল্লাহ্র নির্দেশ হলো,
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلَغَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَّমْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ، وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ .
“হে রাসূল, আপনার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আপনার ওপর যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দিন। এ যদি না করেন তাহলে আপনি তো প্রতিপালকের বার্তা পৌঁছালেন না! আর আল্লাহ্ আপনাকে 'শত্রু' থেকে রক্ষা করবেন।" [সূরা মায়িদা: ৬৭]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
سُنَّةَ اللهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلُ وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ قَدَرًا مقْدُورَانِ الَّذِينَ يُবَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللهَ وَكَفَى بِاللهِ حَسِيبًا .
"ইতোপূর্বে বিগত নবীগণের ক্ষেত্রে এ-ই ছিলো আল্লাহ্র বিধান। আর আল্লাহর বিধান পূর্ব নির্ধারিত। তারা ঐ সকল লোক যারা আল্লাহর বাণীসমূহ পৌঁছে দিতেন এবং শুধু আল্লাহকে ভয় করতেন। আল্লাহ্ ছাড়া কাউকে ভয় করতেন না। আর হিসেবে গ্রহণের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" [সূরা আহযাব: ৩৮-৩৯]
সহীহ বুখারী শরীফে ওবায়দুল্লাহ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন উতবার বর্ণনায় হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ যেদিন অন্তিম শয্যায় শায়িত হলেন সেদিন ঘরে কয়েকজন লোক ছিলো। তিনি তাদের বললেন,
هلموا اكتب لكم كتابا لا تضلوا بعده .
'এসো, তোমাদের আমি একটি ফরমান লিখে দিই, যার পরে তোমরা আর 'বিচ্যুত' হবে না।
কিন্তু কেউ কেউ বললেন, এখন তিনি রোগ যন্ত্রণায় কাতর। আমাদের কাছে তো কুরআন রয়েছে। সুতরাং আল্লাহ্র কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তখন ঘরের লোকেরা মতানৈক্য ও বিবাদ করলো। একদল বলে, কাগজ পেশ করো, তোমাদের জন্য তিনি কোন ফরমান লিখুন, যার পর তোমরা 'বিচ্যুত' হবে না। কিন্তু অন্য দল অন্য রকম বলে। বাদানুবাদ বৃদ্ধির মুখে আল্লাহর রাসূল বলেছিলেন, "তোমরা উঠে যাও।" [মাগাযী অধ্যায়, অনুচ্ছেদ: মাবাদুন্নাবী ওয়া ওয়াফাতিহ]
কাগজ তলবের পর তিন দিন তিনি হায়াতে ছিলেন। কিন্তু পুনঃতলব করেন নি। খিলাফত সম্পর্কেও স্পষ্ট কিছু বলেন নি, অথচ সেদিন ও তার পরে বিভিন্ন অসিয়ত করেছেন। তখন তাঁর অন্যতম অসিয়ত ছিলো- "নামায ও ক্রীতদাসদাসী সম্পর্কে সতর্ক থেকো।"
হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ নামায, যাকাত ও ক্রীতদাসদাসী সম্পর্কে অসিয়ত করেছিলেন। [বায়হাকী ও আহমাদ]
আরেকটি অসিয়ত ছিলো এই,
قاتل الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور انبيائهم مساجد لا يبقين دينান على ارض العرب .
"ইহুদী ও নাসারাদের আল্লাহ্ নিপাত করুন, তারা তাদের নবীদের কবরকে সিজদাস্থল বানিয়েছিলো। আরব ভূমিতে দুই ধর্ম যেন না থাকে।" [মুআত্তা মালিক]
হযরত আয়েশা ও ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, অসুস্থতার সময় আল্লাহ্র রাসূল পবিত্র মুখমণ্ডলের ওপর একটি কাপড় টেনে টেনে দিতেন কিন্তু শ্বাস ভারি হয়ে এলে তা সরিয়ে ফেলতেন। এ অবস্থায় তিনি বললেন,
"ইহুদী নাসারাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। তারা তাদের নবীদের কবরকে 'সিজদাস্থল' বানিয়েছিলো। (উম্মতকে) তিনি এ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। [বুখারী, অনুচ্ছেদ: মাবাদুন্নাবী ওয়া ওয়াফাতিহ।
কাগজ তলবের হাদীস প্রসঙ্গে গবেষক আল আক্কাদ বলেন,
"আলী (রা)-এর অনুকূলে খিলাফতের অসিয়তের পথে হযরত উমরই আল্লাহ্র রাসূলের সামনে অন্তরায় হয়েছিলেন।" এটা এমনই দায়িত্ববিবর্জিত মন্তব্য যা হযরত উমর ও তাঁর মত সমর্থনকারীদের নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সকলেরই মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। বস্তুত নবী-এর কাগজ তলব কারো অনুকূলে খিলাফত ঘোষণার জন্য ছিলো না। কেননা সে ক্ষেত্রে তাঁর একটিমাত্র শব্দ বা ইঙ্গিতই যথেষ্ট ছিলো। যেমন ইমামতির আদেশ থেকে সাহাবাগণ আবু বকর (রা)-এর অগ্রাধিকারের প্রতি ইঙ্গিত বুঝে নিয়েছিলেন।
তাছাড়া কাগজ তলবের পর (তিন দিন) হায়াতে থেকেও তিনি তা পুনঃতলব করেন নি, অথচ হযরত আলী ও তাঁর মাঝে অন্তরঙ্গ সাক্ষাতে কোন বাধা ছিলো না। কেননা হযরত আলী (রা)-এর স্ত্রী ফাতিমা (রা) শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত 'সান্নিধ্যে' ছিলেন। সুতরাং ইচ্ছা করলেই তাঁকে ডেকে নিয়ে তিনি খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করতে পারতেন।
এই সম্পূর্ণ 'স্বেচ্ছা নীরবতা' ছাড়াও প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইতোপূর্বের নববী সুন্নাত ও নীতি পর্যালোচনা করলে দেখতে পাওয়া যায় যে, পরিবারকে তিনি শাসনপদ থেকে দূরেই রাখতেন এবং নবীগণের উত্তরাধিকার ধারা জোরদারভাবে রদ করতেন। সুতরাং এই নীতি, সুন্নত ও স্বেচ্ছা নীরবতা মোটেই প্রমাণ করে না যে, মুহম্মদ ﷺ হযরত আলী (রা)-এর খিলাফত চেয়েছিলেন কিন্তু ইচ্ছা প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়া, পৃষ্ঠা-৬১৯]
খিলাফতুন্নবী ও উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে গবেষক আল আক্কাদ অতি উত্তম কথা বলেছেন। তাঁর মতে খিলাফতের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার যদি আল্লাহ্র কোন বিধান হতো তাহলে 'পুত্রহীন' অবস্থায় তাঁর তিরোধান যেমন আশ্চর্যতম বিষয় হতো তেমনি আহলে বায়তের খিলাফত সম্পর্কিত সুস্পষ্ট আয়াত ছাড়া নুযুলে কুরআনের সমাপ্তি ঘটাও অদ্ভুত বিষয় হতো।
তদ্রূপ এই উত্তরাধিকার যদি দীনের অপরিহার্য কোন বিষয় কিংবা তাকদীরের অলংঘনীয় কোন ফায়সালা হতো তাহলে দুনিয়াতে তা অবশ্যই কার্যকর হতো, অকাট্য তাকদীর যেমন কার্যকর হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী যে কোন খিলাফত ব্যর্থ হতো, বিশ্বজগতের নিয়মবিরুদ্ধ যে কোন উদ্দেশ্য যেমন ব্যর্থ হয়।
মোটকথা, শরীয়তের সুস্পষ্ট বাণী কিংবা ঘটনা প্রবাহের ইঙ্গিত কিংবা আসমানী ইচ্ছা কোন কিছুই চরমপন্থীদের খিলাফত প্রশ্নে নিকটাত্মীয়তার অগ্রাধিকার কিংবা হাশেমী পরিবারের একক অধিকার সম্পর্কিত মতামত সমর্থন করে না। [আল-আবকারিয়াতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৯৩৬]