📄 বিদায় হজ্জ ও গাদীরেখাম-এর ভাষণ
বিদায় হজ্জে আলী (রা) রাসূলুল্লাহ-এর সফরসঙ্গী ছিলেন। আল্লাহ্র রাসূল তেষট্টিটি উটনী নিজ হাতে যবেহ করেছেন। এটা ছিলো তাঁর জীবনের বয়সের সমান সংখ্যা। অতঃপর তিনি নিজে বিরত থেকে আলী (রা)-কে এক'শ উটের অবশিষ্টগুলো যবেহ করার আদেশ দিলেন। তিনি যবেহ করে এক'শ পূর্ণ করলেন।
আইয়ামে তাশরীফের তিন দিন পূর্ণ করে রাসূলুল্লাহ মক্কায় উপস্থিত হলেন এবং বিদায়ী তাওয়াফ করলেন। অতঃপর লোকদেরকে (যার যার ঠিকানায়) ফিরে যাবার আদেশ দিয়ে তিনি নিজে মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। গাদীরেখুম (মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী একটি জলাশয়) নামক স্থানে পৌঁছে তিনি ভাষণ দান করলেন। তাতে আলী (রা)-এর গুণ বর্ণনা করে বললেন,
'আমি যার অভিভাবক, আলীও তার অভিভাবক। হে আল্লাহ্, তার বন্ধুর আপনি বন্ধু হোন এবং তার শত্রুর আপনি শত্রু হোন।' [সীরাতে ইবনে কাছীর, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৫-৪১৬]
কারণ এই যে, আলী (রা) সম্পর্কে একদল লোকের অভিযোগ ছিলো। ইয়ামানে যারা তার সঙ্গে ছিলো তাদের দু'একজনের প্রতি তিনি তো সুবিচার করেছিলেন কিন্তু তারা সেটাকে অবিচার, অসদাচার ও কৃপণতা ভেবে তার সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছিলেন, অথচ তিনি ছিলেন সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। [প্রাগুক্ত, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৪]
ইবনে কাছীর (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ হজ্জ শেষে মদীনায় ফেরার পথে গাদীরেখুম নামক স্থানে একটি বৃক্ষের ছায়ায় অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। তারিখ হলো ১৮ যিলহজ্জ রোজ রবিবার। তখন তিনি বিভিন্ন বিষয়ের সাথে আলী (রা)-এর ইনসাফ, আমানতদারি, নিকটাত্মীয়তার সম্পর্ক ইত্যাদি গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণনা করেন। ফলে অনেকের অন্তরে তাঁর সম্পর্কে যে খারাপ ধারণা বিদ্যমান ছিলো তা দূর হয়ে যায়। এখানে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রধান হাদীসগুলো 'বিশুদ্ধ ও দুর্বল' নির্ণয়পূর্বক বর্ণনা করবো।
অতঃপর আল্লামা ইবনে কাছীরের বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, এ সম্পর্কে ভেজাল-নির্ভেজাল ও ভুল-নির্ভুল সব রকম বর্ণনাই রয়েছে। কেননা অনেক মুহাদ্দিস বিশুদ্ধ ও দুর্বল নির্বিশেষে প্রাপ্ত প্রাসঙ্গিক সব কিছুই পরিবেশনের অভ্যাস অনুসরণ করেছেন। [আল বিদায়া, ওয়ান নিহায়া, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২০৮]
📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তেকাল
সৃষ্টিজগতে যেমন তেমনি নবী-রাসূলগণের মাঝেও আল্লাহ্র শাশ্বত বিধান কার্যকর হয়ে আসছে। আল্লাহ যথার্থই বলেছেন,
'মুহাম্মদ তো রাসূল ছাড়া অন্য কিছু নন! তাঁর পূর্বে বহু রাসূল বিগত হয়েছেন। সুতরাং তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন কিংবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে?' [সূরা আলে ইমরান : ১৪৪]
এদিকে দীন ও শরীয়তের প্রচার ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব সুসম্পন্ন হলো এবং দলে দলে মানুষের ইসলাম গ্রহণের 'দৃশ্য' দেখিয়ে আল্লাহ্ তাঁর নবীর চক্ষু জুড়িয়ে দিলেন। এভাবে ইসলামের বিশ্বব্যাপী প্রসার লাভে শুভ ইঙ্গিত প্রকাশ পেলো। সর্বোপরি আপন স্বচ্ছতা ও মৌলিকতার ওপর দীনের পূর্ণ হিফাজত ও জীবনের সকল ক্ষেত্রে তার পূর্ণ বাস্তবায়নের উদ্দেশে রাসূলুল্লাহ ﷺ নবুয়তের ছায়ায় আপন তত্ত্বাবধানে যে 'আল-জামাআত' গড়ে তুলেছিলেন তাদের ব্যাপারে তিনি পূর্ণ আশ্বস্ত হলেন। যখন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সুনিশ্চিত প্রমাণের প্রকাশ ঘটলো তখন তিনি আল্লাহর সঙ্গে 'মিলন'-এর জন্য প্রস্তুত হলেন এবং আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধুর মিলন পছন্দ করলেন। এ সময় তিনি বেশ কয়েকটি খুতবার মাধ্যমে মুসলমানদেরকে প্রয়োজনীয় বিষয়ে অসিয়ত করলেন এবং পাঁচ থেকে নয়টি দীনারের মতো সামান্য যা অবশিষ্ট ছিলো তা দান করার ব্যবস্থা করলেন। তারপরও তিনি বলেছিলেন, "আল্লাহ সম্পর্কে মুহম্মদের কী ধারণা, যদি তিনি এই মাল রেখে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান, হে আয়েশা! এগুলো তুমি দান করার ব্যবস্থা করো।" [মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৯]
অসুস্থতা যখন তীব্র রূপ ধারণ করলো আর তিনি অযু করে সালাতের জন্য রওয়ানা হলেন, তখন অচেতন হয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফিরে আসা মাত্র জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা কি সালাত আদায় করে ফেলেছে? তাঁকে অবহিত করা হলো, না, হে আল্লাহর রাসূল! তারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। লোকেরা তখন মসজিদে ইশার সালাতের জন্য রাসূলুল্লাহ্-এর অপেক্ষায় স্থির হয়ে বসে ছিলেন। তখন তিনি আবূ বকর (রা)-কে সালাত আদায়ের আদেশ পাঠালেন। আবূ বকর (রা) ছিলেন 'নরম দিল' মানুষ। তাই তিনি বললেন, হে উমর! তুমি সালাত পড়াও। হযরত উমর (রা) বললেন, এ বিষয়ে আপনি আমার চেয়ে অধিক হকদার। তখন তিনি ঐসব দিন নামায পড়ালেন।
এর মাঝে একবার কিঞ্চিৎ উপশম বোধ হওয়ায় রাসূলুল্লাহ্ হযরত আব্বাস ও আলী (রা)- এ দু'জনের কাঁধে ভর করে যোহর সালাতের জন্য বের হলেন। আবু বকর (রা) তাঁকে দেখে পিছিয়ে আসতে উদ্যত হলেন। তখন তিনি তাঁকে ইঙ্গিতে বারণ করলেন এবং উভয়কে আদেশ করলেন তাঁকে আবূ বকর (রা)-এর পাশে বসিয়ে দিতে। অতঃপর হযরত আবূ বকর (রা) দাঁড়িয়ে আর রাসূলুল্লাহ্ বসে নামায পড়লেন। [বুখারী, অনুচ্ছেদ: মাবাদুন্নাবীঃ ওয়া ওফাতিহি]
হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সালাত ও যাকাতের প্রতি যত্নবান হতে এবং দাসদাসীদের প্রতি উত্তম আচরণের অসিয়ত করেন। [মুসনাদএর বরাতে সীরাতে ইবনে কাছীর, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৭৩]
হযরত আয়েশা (রা) বলেন, আমি তাঁর 'তত্ত্ব' নিতে নিকটবর্তী হলাম, তখন তিনি আকাশ পানে দৃষ্টিপাত করে বললেন,
'সর্বোত্তম বন্ধুর সান্নিধ্যে, সর্বোত্তম বন্ধুর সান্নিধ্যে'
তাঁর সামনে মশক ও পানির পেয়ালা রক্ষিত ছিলো। তিনি পানিতে হাত ভিজিয়ে মুখে দিচ্ছিলেন আর বলছিলেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু'। মৃত্যু যন্ত্রণা অবধারিত। অতঃপর তিনি বাম আঙ্গুল উঠিয়ে বলতে লাগলেন, 'সর্বোত্তম বন্ধুর সান্নিধ্যে।' এভাবে অবশেষে তাঁর রূহ মোবারক কবয করা হলো এবং তাঁর হাত পানির পাত্রে ঢলে পড়লো।
সাহাবা কিরামের গভীর নবী-প্রেমের কারণে এ মৃত্যু সংবাদ তাঁদের জন্য ছিলো বজ্রপাতের মতো। তাছাড়া সন্তানের জন্য পিতার স্নেহকোল যেমন, সাহাবা কেরামের জন্য নবী ﷺ-এর স্নেহচ্ছায়া তো ছিলো তার চেয়ে অনেক বড় ও মূল্যবান। নিকটাত্মীয়তার সম্পর্ক এবং বিশুদ্ধ স্বভাব ও ফিতরতের স্বাভাবিক দাবি অনুযায়ী সাধারণভাবে আহলে বায়ত ও হাশেমী পরিবার, বিশেষভাবে ফাতিমা বিনতে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ও আলী ইবনে আবূ তালিব (রা)-এর জন্য এ শোক ও বেদনা ছিলো অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। কেননা প্রগাঢ় প্রেম, কোমল অনুভূতি ও উষ্ণ আবেগ ছিলো হাশেমী পরিবারের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ঈমানের অসাধারণ শক্তি ও আল্লাহ্র ফায়সালার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আত্মসমর্পণের গুণে এ মহাশোক তাঁরা সংবরণ করতে পেরেছিলেন। আহলে বায়তের সদস্যগণই কাফন-দাফনের দায়িত্ব পালন করেছেন, নবীর সঙ্গে তাঁদের ভালোবাসার সম্পর্ক তো ছিলো এমন যা দু'জন মানবের মাঝে কিংবা কোন নবী ও তাঁর উম্মতের মাঝে অথবা কোন প্রেমিক ও তাঁর প্রেমাস্পদের মাঝে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। তবু কেউ তাঁর জন্য বিলাপ করেনি। কেননা এ সম্পর্কে তাঁর কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা ছিলো। জীবনসায়াহ্নে তিনি বলেছেন,
'ইহুদী ও খ্রীস্টানদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। কেননা তারা তাদের নবীগণের কবরকে সিজদা-ক্ষেত্র বানিয়েছিলো।'
একথা বলে তাদের কর্মকীর্তি সম্পর্কে মুসলমানদেরকে তিনি সতর্ক করেছিলেন। [বুখারী]
রাসূলুল্লাহ্ ﷺ ৬৩ বছর বয়সে ১১ হিজরী ১২ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার অপরাহ্নে ইন্তেকাল করেন।
বস্তুত মুসলিম উম্মাহ ও সমগ্র মানব জাতির জন্য এ দিনটি ছিলো কঠিনতম ও অন্ধকারতম দিন, যেমন তাঁর জন্মদিন ছিলো পৃথিবীর প্রথম সূর্যোদয়ের পর চরম সৌভাগ্যের দিন। [আস-সীরাতুন্নবুবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৩৯৩-৪০৭]