📄 আলী (রা)-কে নবীজীর সান্তনা দান
নবম হিজরী, রজব মাসের তাবুক অভিযান ছিলো 'সীরাতুন্নবী'র অতি গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। বস্তুত তাবুক অভিযানের মাধ্যমে অর্জিত লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও ফলাফল আরব ও মুসলিম উম্মাহর জীবনে ও ইসলামের ইতিহাসের ঘটনা প্রবাহে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিলো।
এ অভিযানে রাসূলুল্লাহ মুহাম্মদ ইব্ন মাসলামাহ আনসারী (রা)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত এবং হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-কে আহলে বায়তের তত্ত্বাবধায়করূপে মদীনায় রেখে গিয়েছিলেন। এ সময় মুনাফিকদের কিছু অসংযত কথায় ব্যথিত হযরত আলী (রা)-কে সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ্র রাসূল বলেছিলেন, আচ্ছা, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, মূসার সঙ্গে হারূন যেমন ছিলেন তুমি আমার সঙ্গে তেমন হয়ে থাকবে। পার্থক্য শুধু এই যে, আমার পরে কোন নবী নেই। [বুখারী, অনুচ্ছেদ: তাবুক যুদ্ধ]
অন্য বর্ণনামতে, রাসূলুল্লাহ হযরত আলী (রা)-কে মদীনায় আপন স্থলবর্তী নিযুক্ত করলেন, তখন তিনি আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! অবলা নারী ও শিশুদের সাথে আমাকে রেখে যাচ্ছেন......। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২২৫]
📄 ইয়ামানে প্রেরণ ও হামাদানের ইসলাম গ্রহণ
নবম হিজরীতে মক্কা বিজয় ও তাবুক অভিযানের পর চতুর্দিক থেকে মদীনায় প্রতিনিধিদলের ঢল নামলো এবং দলে দলে আল্লাহর দীন গ্রহণ করতে লাগলো। এ সময় ইয়ামানী ও আশ'আরী প্রতিনিধিদল এই আনন্দগীত আবৃত্তি করে করে এসেছিলো:
'আগামীকাল দেখা হবে বন্ধুদের সঙ্গে, মুহম্মদ ও তাঁর সাথীদের সঙ্গে।'
আল্লাহ্র রাসূলও আনন্দ প্রকাশ করে বলেছিলেন:
'আহলে ইয়ামান তোমাদের মাঝে এসেছে; তারা হলো কোমল চিত্ত ও বিনম্র হৃদয়। ঈমান ও হিকমত হলো ইয়ামানের সম্পদ।' [যাদুল মা'আদ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩২]
রাসূল হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-কে একদল মুসলমানের নেতারূপে ইয়ামানে ইসলামের দাওয়াত দিতে পাঠালেন। তারা সেখানে ছয় মাস অবস্থান করলেন কিন্তু আহলে ইয়ামান খালিদ ইব্ন ওয়ালীদের ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত কবুল করলো না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-কে পাঠালেন। তিনি তাদেরকে রাসূলুল্লাহ্-এর দাওয়াতনামা পড়ে শোনালেন। তখন হামাদানবাসী সকলে ইসলাম গ্রহণ করলো। আলী (রা) রাসূলুল্লাহ্-কে হামাদানীদের ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ-পত্র দিলেন। রাসূল পত্র পাঠ করে সেজদায় পড়ে গেলেন। অতঃপর মাথা তুলে বললেন, হামাদানবাসীকে সালাম! হামাদানবাসীকে সালাম! [যাদুল মা'আদ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৩]
📄 আলাহুর রাসূলের প্রতিনিধিত্ব লাভ ও বিনয়-নম্রতা
নবম হিজরীতে হজ্জ ফরয হলো। রাসূলুল্লাহ্ আসে বছর হযরত আবূ বকর (রা)-কে হজ্জের আমীর নিযুক্ত করে মুসলমানদের জন্য হজ্জ অনুষ্ঠান করার দায়িত্ব দিলেন। মক্কার মুশরিকরা তখনও তাদের বাসস্থানে বাস করছিলো। হজ্জ পালনে ইচ্ছুক তিন শত মুসলমানের কাফেলা আবূ বকর (রা)-এর সাথে মদীনা হতে রওয়ানা হলো।
এদিকে রাসূলুল্লাহ্-এর ওপর সূরা তাওবা নাযিল হলো। তখন তিনি আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-কে ডেকে বললেন, সূরা তাওবার প্রথমাংশের এই ঘোষণাটুকু নিয়ে তুমি রওয়ানা হও এবং কুরবানীর দিন মিনায় সমবেত লোকদের মাঝে ঘোষণা কর, কোন কাফের জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং এ বছরের পর কোন মুশরিক হজ্জ করতে আসবে না। কোন নগ্ন ব্যক্তি বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করবে না। রাসূলুল্লাহ -এর পক্ষ হতে কারো জন্য কোন প্রতিশ্রুতি থাকলে তা তার মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) রাসূলুল্লাহ -এর 'আল আযবা' উটনীতে সওয়ার হলেন এবং (পথে) আবূ বকর (রা)-এর সঙ্গে মিলিত হলেন। আবু বকর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, আমীর না মামূর?
আলী (রা) বললেন, আমি আমীর নই, মামূর।
অতঃপর উভয়ে যাত্রা অব্যাহত রাখলেন এবং আবূ বকর (রা) হজ্জ অনুষ্ঠান করলেন। কুরবানীর দিন আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) লোকদের মাঝে রাসূলুল্লাহ -এর আদেশপ্রাপ্ত ঘোষণা প্রচার করলেন। [সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫-৬]
📄 বিদায় হজ্জ ও গাদীরেখাম-এর ভাষণ
বিদায় হজ্জে আলী (রা) রাসূলুল্লাহ-এর সফরসঙ্গী ছিলেন। আল্লাহ্র রাসূল তেষট্টিটি উটনী নিজ হাতে যবেহ করেছেন। এটা ছিলো তাঁর জীবনের বয়সের সমান সংখ্যা। অতঃপর তিনি নিজে বিরত থেকে আলী (রা)-কে এক'শ উটের অবশিষ্টগুলো যবেহ করার আদেশ দিলেন। তিনি যবেহ করে এক'শ পূর্ণ করলেন।
আইয়ামে তাশরীফের তিন দিন পূর্ণ করে রাসূলুল্লাহ মক্কায় উপস্থিত হলেন এবং বিদায়ী তাওয়াফ করলেন। অতঃপর লোকদেরকে (যার যার ঠিকানায়) ফিরে যাবার আদেশ দিয়ে তিনি নিজে মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। গাদীরেখুম (মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী একটি জলাশয়) নামক স্থানে পৌঁছে তিনি ভাষণ দান করলেন। তাতে আলী (রা)-এর গুণ বর্ণনা করে বললেন,
'আমি যার অভিভাবক, আলীও তার অভিভাবক। হে আল্লাহ্, তার বন্ধুর আপনি বন্ধু হোন এবং তার শত্রুর আপনি শত্রু হোন।' [সীরাতে ইবনে কাছীর, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৫-৪১৬]
কারণ এই যে, আলী (রা) সম্পর্কে একদল লোকের অভিযোগ ছিলো। ইয়ামানে যারা তার সঙ্গে ছিলো তাদের দু'একজনের প্রতি তিনি তো সুবিচার করেছিলেন কিন্তু তারা সেটাকে অবিচার, অসদাচার ও কৃপণতা ভেবে তার সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছিলেন, অথচ তিনি ছিলেন সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। [প্রাগুক্ত, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৪]
ইবনে কাছীর (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ হজ্জ শেষে মদীনায় ফেরার পথে গাদীরেখুম নামক স্থানে একটি বৃক্ষের ছায়ায় অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। তারিখ হলো ১৮ যিলহজ্জ রোজ রবিবার। তখন তিনি বিভিন্ন বিষয়ের সাথে আলী (রা)-এর ইনসাফ, আমানতদারি, নিকটাত্মীয়তার সম্পর্ক ইত্যাদি গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণনা করেন। ফলে অনেকের অন্তরে তাঁর সম্পর্কে যে খারাপ ধারণা বিদ্যমান ছিলো তা দূর হয়ে যায়। এখানে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রধান হাদীসগুলো 'বিশুদ্ধ ও দুর্বল' নির্ণয়পূর্বক বর্ণনা করবো।
অতঃপর আল্লামা ইবনে কাছীরের বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, এ সম্পর্কে ভেজাল-নির্ভেজাল ও ভুল-নির্ভুল সব রকম বর্ণনাই রয়েছে। কেননা অনেক মুহাদ্দিস বিশুদ্ধ ও দুর্বল নির্বিশেষে প্রাপ্ত প্রাসঙ্গিক সব কিছুই পরিবেশনের অভ্যাস অনুসরণ করেছেন। [আল বিদায়া, ওয়ান নিহায়া, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২০৮]