📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 শেরে খোদা ও ইহুদী বীর মুরাহহাবের মধ্যে লড়াই

📄 শেরে খোদা ও ইহুদী বীর মুরাহহাবের মধ্যে লড়াই


হযরত আলী (রা) যখন কামূছ দুর্গে উপনীত হলেন তখন সুবিখ্যাত যোদ্ধা মুরাহ্হাব যুদ্ধের গান গেয়ে বীর দর্পে হাযির হলো। কিন্তু আঘাত পাল্টা আঘাতের মাঝে আলী (রা)-এর তলোয়ার অকস্মাৎ ঝলসে উঠলো এবং মুরাহ্হাবের শির ও শিরস্ত্রাণ দুই টুকরা হয়ে গেলো এবং বিজয় সম্পন্ন হলো। ইবনে হিশামের বর্ণনায় মুহাম্মদ বিন মাসলামাহর নাম এসেছে বটে, কিন্তু বিশুদ্ধ মতে হযরত আলী বিন আবূ তালিব (রা)-ই মুরাহ্হাবকে হত্যা করেছিলেন। মুসলিম শরীফের বর্ণনায় তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে এবং আলী (রা)-এর আবৃত্তিকৃত রণগীতিও তাতে বর্ণিত হয়েছে। আর বলা বাহুল্য, ইমাম মুসলিমের নিজস্ব সনদ অধিকতর নির্ভর ও অগ্রাধিকারযোগ্য। [দেখুন মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৮০৭]
বিশুদ্ধ সনদে ইবনে আবী শায়বা হযরত লায়ছ (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একবার আবু জাফরকে দেখতে গেলাম। তিনি নিজের গুনাহ ও আযাবের কথা ভেবে কাঁদছিলেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, জাবির (রা) আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, আলী (রা) খায়বার যুদ্ধের দিন দুর্গদ্বার উপড়ে ফেলেছিলেন। পরে মুসলমানগণ দুর্গ দখল করেছিলেন, আর জাবির নিজে চেষ্টা করে দেখেছেন। কিন্তু চল্লিশ জনের কমে তা ওঠানো সম্ভব হয়নি। আল্লামা ইবনে কাছির যদিও খায়বারের দুর্গদ্বার সংক্রান্ত এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন, কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত এ ঘটনা প্রসিদ্ধির পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মুহাম্মদ ইবন ইসহাক, আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ন হাসানের সূত্রে, তিনি তাঁর কোন নিকটজনের সূত্রে ও তিনি আবু রাফে (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এক ইয়াহুদীর আঘাতে হযরত আলীর হাত থেকে ঢাল পড়ে গেলো। তখন তিনি দুর্গের একটি দরজাকেই ঢাল রূপে তুলে নিলেন। আল্লাহ্ তাঁকে খায়বারের বিজয় দান করা পর্যন্ত ঐ দরজা তাঁর হাতেই ছিলো। পরে তিনি তা ফেলে দিয়েছিলেন।
আবূ রাফে বলেন, এখানো আমার চোখের সামনে সে দৃশ্য ভাসছে। খায়বার যুদ্ধের দিন আমরা আটজন মিলে সেই দরজাটি উল্টাতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। পক্ষান্তরে লায়ছ আবু জাফরের সূত্রে আর তিনি জাবিরের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, চল্লিশ জনে মিলে ঐ দরজা ওঠাতে পেরেছিলো। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২২৫]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 রাসূল (সা)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি অবিচল ঈমান ও বিশ্বাস

📄 রাসূল (সা)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি অবিচল ঈমান ও বিশ্বাস


অষ্টম হিজরীর রমযান মাসে মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণকালে রাসূলুল্লাহ্ সকলকে রসদপত্র সংগ্রহের আদেশ দিলেন এবং এ বিষয়ে নিশ্চিদ্র গোপনীয়তা অবলম্বনপূর্বক দু'আ করলেন।
اللهم خذ العيون والاخبار عن قريش حتى تبغتها في بلادها .
'হে আল্লাহ্! গুপ্তচর ও গুপ্ত খবর কুরায়শের নাগাল থেকে দূরে রাখ যেন তাদের ভূমিতে তাদের ওপর হঠাৎ করে হানা দিতে পারি। [যাদুল মা'আদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৪২১]
মক্কা হতে মদীনায় হিজরতকারী হযরত হাতিব ইব্‌ন আবী বালতাআ (রা) ছিলেন বদরী সাহাবী। মক্কায় তিনি ছিলেন কুরায়শের আশ্রিত। তাঁর রক্তের কোন সম্পর্ক ছিলো না। সুতরাং মক্কায় রেখে আসা পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করার মতো কোন অবলম্বন কুরায়শ গোত্রে তার ছিলো না। তিনি ভাবলেন, আত্মীয়তার অবলম্বন তো নেই, সুতরাং উপকারের অবলম্বন গ্রহণ করি না কেন, যাতে কৃতজ্ঞতার তাগিদে কুরায়শরা সদয় ও সুপ্রসন্ন হয়। এ চিন্তায় প্রণোদিত হয়ে কুরায়শদেরকে তিনি অভিযানের খবর দিয়ে গোপন পত্র লিখলেন এবং একজন স্ত্রীলোককে বিপুল উপহারের বিনিময়ে পত্র বহনের দায়িত্ব দিলেন। এ ছিলো একটি ভুল পদক্ষেপ, যা আল্লাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহর রাসূল তাকে ভাল বলেছেন। তিনি বলেছেন, আহলে বদরের অবস্থা আল্লাহ্ জানেন এবং তিনি ইরশাদ করেছেন, اعملوا ما شئتم فقد غفرت لكم যা ইচ্ছা করো, তোমাদের আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। [যাদুল মা'আদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২১]
স্ত্রীলোকটি চুলের বেণীতে পত্র লুকিয়ে রওয়ানা হলো। এদিকে আসমানী সূত্রে খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ আলী ও যুবায়র (রা)-কে এ নির্দেশসহ পাঠালেন, "তোমরা দু'জন 'রওয়াতুল খাস' স্থানে উপনীত হও। সেখানে এক বুড়ীর কাছে কুরায়শের নামে লেখা পত্র রয়েছে।"
তারা ধাবমান ঘোড়ায় চড়ে ছুটলেন এবং কথিত স্থানে স্ত্রীলোকটিকে পেয়ে গেলেন। জিজ্ঞাসাবাদের মুখে স্ত্রীলোকটি পত্রের কথা সাফ অস্বীকার করলো। সওয়ারী তল্লাশি করেও কিছু পাওয়া গেলো না। তখন আলী (রা) বললেন, আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আল্লাহর রাসূল অসত্য বলেন নি আর আমরাও মিথ্যা বলছি না। আল্লাহর শপথ! হয় পত্র বের করে দেবে অন্যথায় তোমাকে বিবস্ত্র করে দেখবো। এই হাবভাব দেখে স্ত্রীলোকটি বললো, আচ্ছা, একটু ঘুরে দাঁড়াও। তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন আর স্ত্রীলোকটি খোপা খুলে পত্রটি তাদের হাতে তুলে দিলো। আর তারা পত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ -এর কাছে উপস্থিত হলেন। [যাদুল মা'আদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২১]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আলী (রা)-কে নবীজীর সান্তনা দান

📄 আলী (রা)-কে নবীজীর সান্তনা দান


নবম হিজরী, রজব মাসের তাবুক অভিযান ছিলো 'সীরাতুন্নবী'র অতি গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। বস্তুত তাবুক অভিযানের মাধ্যমে অর্জিত লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও ফলাফল আরব ও মুসলিম উম্মাহর জীবনে ও ইসলামের ইতিহাসের ঘটনা প্রবাহে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিলো।
এ অভিযানে রাসূলুল্লাহ মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামাহ আনসারী (রা)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত এবং হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-কে আহলে বায়তের তত্ত্বাবধায়করূপে মদীনায় রেখে গিয়েছিলেন। এ সময় মুনাফিকদের কিছু অসংযত কথায় ব্যথিত হযরত আলী (রা)-কে সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ্র রাসূল বলেছিলেন, আচ্ছা, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, মূসার সঙ্গে হারূন যেমন ছিলেন তুমি আমার সঙ্গে তেমন হয়ে থাকবে। পার্থক্য শুধু এই যে, আমার পরে কোন নবী নেই। [বুখারী, অনুচ্ছেদ: তাবুক যুদ্ধ]
অন্য বর্ণনামতে, রাসূলুল্লাহ হযরত আলী (রা)-কে মদীনায় আপন স্থলবর্তী নিযুক্ত করলেন, তখন তিনি আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! অবলা নারী ও শিশুদের সাথে আমাকে রেখে যাচ্ছেন......। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২২৫]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 ইয়ামানে প্রেরণ ও হামাদানের ইসলাম গ্রহণ

📄 ইয়ামানে প্রেরণ ও হামাদানের ইসলাম গ্রহণ


নবম হিজরীতে মক্কা বিজয় ও তাবুক অভিযানের পর চতুর্দিক থেকে মদীনায় প্রতিনিধিদলের ঢল নামলো এবং দলে দলে আল্লাহর দীন গ্রহণ করতে লাগলো। এ সময় ইয়ামানী ও আশ'আরী প্রতিনিধিদল এই আনন্দগীত আবৃত্তি করে করে এসেছিলো:
'আগামীকাল দেখা হবে বন্ধুদের সঙ্গে, মুহম্মদ ও তাঁর সাথীদের সঙ্গে।'
আল্লাহ্র রাসূলও আনন্দ প্রকাশ করে বলেছিলেন:
'আহলে ইয়ামান তোমাদের মাঝে এসেছে; তারা হলো কোমল চিত্ত ও বিনম্র হৃদয়। ঈমান ও হিকমত হলো ইয়ামানের সম্পদ।' [যাদুল মা'আদ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩২]

রাসূল হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা)-কে একদল মুসলমানের নেতারূপে ইয়ামানে ইসলামের দাওয়াত দিতে পাঠালেন। তারা সেখানে ছয় মাস অবস্থান করলেন কিন্তু আহলে ইয়ামান খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদের ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত কবুল করলো না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-কে পাঠালেন। তিনি তাদেরকে রাসূলুল্লাহ্-এর দাওয়াতনামা পড়ে শোনালেন। তখন হামাদানবাসী সকলে ইসলাম গ্রহণ করলো। আলী (রা) রাসূলুল্লাহ্-কে হামাদানীদের ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ-পত্র দিলেন। রাসূল পত্র পাঠ করে সেজদায় পড়ে গেলেন। অতঃপর মাথা তুলে বললেন, হামাদানবাসীকে সালাম! হামাদানবাসীকে সালাম! [যাদুল মা'আদ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৩]

ফন্ট সাইজ
15px
17px