📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হযরত আলী (রা)-এর নবী-ভক্তি
ষষ্ঠ হিজরীর যিলকদ মাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হলো। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৫)। মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশ ও উমরা পালনের অনুমতি দান প্রশ্নে অনেক বাদানুবাদ ও চরম বিরোধিতার পর কুরায়শরা সুহাইল ইব্ন আমরকে দূত হিসেবে পাঠালো। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, এমন লোক প্রেরণ করে সন্ধির ব্যাপারে কুরায়শরা আন্তরিকতারই পরিচয় দিয়েছে।
আলাপ-আলোচনার পর সন্ধিপত্র লেখার সময় হযরত আলী (রা)-কে ডেকে তিনি বললেন, লেখ 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম'। সুহাইল ইব্ন আমর তাতে আপত্তি জানিয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ! 'রহমান' কে আমরা চিনি না। তবে আগে যেমন লিখতে সেভাবে 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' লিখতে পারো।
মুসলমানগণ বললো, আল্লাহর শপথ! আমরা "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" ব্যতীত অন্য কিছু লিখবো না। তখন নবী বললেন, তাই হোক! লেখ, বিসমিকা আল্লাহুম্মা।
অতঃপর তিনি বললেন, লেখ, আল্লাহর রাসূল এ সিদ্ধান্ত প্রকাশ করছেন। একথা শুনে সুহাইল বললো, আল্লাহর শপথ! আমরা যদি স্বীকার করতাম যে, তুমি আল্লাহর রাসূল, তাহলে আল্লাহর ঘরে তোমাকে প্রবেশে কেন বাধা দেব? কেনই বা লড়াই করবো? তবে মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ লিখতে পারো।
নবী বললেন, তোমরা অবিশ্বাস করলেও আমি আল্লাহর রাসূল। অতঃপর তিনি হযরত আলী (রা)-কে 'আল্লাহর রাসূল' মুছে "মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ্" লিখতে বললেন। তখন হযরত আলী নবী-প্রেমের জযবায় বলে উঠলেন, আল্লাহর শপথ! আমি তা মুছতে পারবো না। রাসূলুল্লাহ বললেন, আচ্ছা, আমাকে দেখিয়ে দাও। অতঃপর রাসূলুল্লাহ নিজ হাতে তা মুছে দিলেন। [সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হুদায়বিয়ার সন্ধি]
📄 খায়বার যুদ্ধে হযরত আলী (রা)-এর বীরত্ব
সপ্তম হিজরীতে সংঘটিত খায়বার যুদ্ধে একদিকে শেরে খোদা হযরত আলী (রা)-এর সাহস ও বীরত্ব যেমন ফুটে উঠেছিলো অন্যদিকে তেমনি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নিকট তাঁর অনন্য মর্যাদার বিষয়টিও সমুজ্জ্বল হয়েছিলো। কেননা কৌশলগত সাময়িক গুরুত্বের অধিকারী এই ইয়াহূদী উপনিবেশের ওপর বিজয় গৌরব আল্লাহ্ হযরত আলী (রা)-কেই দান করেছিলেন।
খায়বার ছিলো ইয়াহুদীদের সুরক্ষিত দুর্গবেষ্টিত যুদ্ধ ঘাঁটি এবং গোটা আরব উপদ্বীপে তাদের শেষ আশ্রয় কেন্দ্র। এখান থেকেই পরিচালিত হতো ইসলামবিরোধী তৎপরতা এবং মদীনার ভেতরের ও বাইরের ইয়াহুদীদের সাথে যোগসাজশের চক্রান্ত। তাই রাসূলুল্লাহ ইয়াহুদী চক্রান্ত থেকে শংকামুক্ত হওয়ার জন্য খায়বার জয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন। মদীনার উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় সত্তর মাইল দূরে ছিলো খায়বারের অবস্থান।
রাসূলুল্লাহ চৌদ্দ'শ মুজাহিদ নিয়ে খায়বার অভিমুখে রওয়ানা হলেন। একে একে সকল দুর্গের পতন হলো। কামূছ দুর্গ অপরাজিত রয়ে গেলো। হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) তখন চক্ষুপীড়ায় ভুগছিলেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, "আগামীকাল ঝাণ্ডা ধারণ করবেন এমন একজন, আল্লাহ্ ও রাসূল যাঁকে ভালোবাসেন। তাঁর হাতে বিজয় অর্জিত হবে।”
প্রবীণ সাহাবাগণ প্রত্যেকে এ আশায় উঁচু হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন যে, হয়তো তিনিই হবেন সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। কিন্তু আল্লাহর রাসূল চক্ষুপীড়ায় আক্রান্ত হযরত আলী (রা)-কে ডেকে পাঠালেন এবং তাঁর চোখে থুথু দিয়ে দু'আ করলেন। ফলে তাঁর চক্ষুপীড়া এমন ভালো হলো যে, মনে হলো তাতে কোন পীড়া ছিলো না। অতঃপর তিনি তাঁর হাতে পতাকা তুলে দিলেন। আলী (রা) বললেন, আমি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যাবো যতক্ষণ না তারা আমাদের মতো ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ্ বললেন, ধীরস্থিরভাবে তাদের এলাকায় হাযির হও। অতঃপর ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তাদেরকে তাদের ওপর আল্লাহর হকসমূহ অবহিত করো। আল্লাহর শপথ! মাত্র একজনও যদি তোমা দ্বারা আল্লাহ্ হেদায়াত দান করেন তাহলে তোমার জন্য তা লাল উটের পাল হতে উত্তম। [বুখারী ও মুসলিম, অনুচ্ছেদ: খায়বর যুদ্ধ]
📄 শেরে খোদা ও ইহুদী বীর মুরাহহাবের মধ্যে লড়াই
হযরত আলী (রা) যখন কামূছ দুর্গে উপনীত হলেন তখন সুবিখ্যাত যোদ্ধা মুরাহ্হাব যুদ্ধের গান গেয়ে বীর দর্পে হাযির হলো। কিন্তু আঘাত পাল্টা আঘাতের মাঝে আলী (রা)-এর তলোয়ার অকস্মাৎ ঝলসে উঠলো এবং মুরাহ্হাবের শির ও শিরস্ত্রাণ দুই টুকরা হয়ে গেলো এবং বিজয় সম্পন্ন হলো। ইবনে হিশামের বর্ণনায় মুহাম্মদ বিন মাসলামাহর নাম এসেছে বটে, কিন্তু বিশুদ্ধ মতে হযরত আলী বিন আবূ তালিব (রা)-ই মুরাহ্হাবকে হত্যা করেছিলেন। মুসলিম শরীফের বর্ণনায় তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে এবং আলী (রা)-এর আবৃত্তিকৃত রণগীতিও তাতে বর্ণিত হয়েছে। আর বলা বাহুল্য, ইমাম মুসলিমের নিজস্ব সনদ অধিকতর নির্ভর ও অগ্রাধিকারযোগ্য। [দেখুন মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৮০৭]
বিশুদ্ধ সনদে ইবনে আবী শায়বা হযরত লায়ছ (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একবার আবু জাফরকে দেখতে গেলাম। তিনি নিজের গুনাহ ও আযাবের কথা ভেবে কাঁদছিলেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, জাবির (রা) আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, আলী (রা) খায়বার যুদ্ধের দিন দুর্গদ্বার উপড়ে ফেলেছিলেন। পরে মুসলমানগণ দুর্গ দখল করেছিলেন, আর জাবির নিজে চেষ্টা করে দেখেছেন। কিন্তু চল্লিশ জনের কমে তা ওঠানো সম্ভব হয়নি। আল্লামা ইবনে কাছির যদিও খায়বারের দুর্গদ্বার সংক্রান্ত এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন, কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত এ ঘটনা প্রসিদ্ধির পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মুহাম্মদ ইবন ইসহাক, আবদুল্লাহ ইব্ন্ন হাসানের সূত্রে, তিনি তাঁর কোন নিকটজনের সূত্রে ও তিনি আবু রাফে (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এক ইয়াহুদীর আঘাতে হযরত আলীর হাত থেকে ঢাল পড়ে গেলো। তখন তিনি দুর্গের একটি দরজাকেই ঢাল রূপে তুলে নিলেন। আল্লাহ্ তাঁকে খায়বারের বিজয় দান করা পর্যন্ত ঐ দরজা তাঁর হাতেই ছিলো। পরে তিনি তা ফেলে দিয়েছিলেন।
আবূ রাফে বলেন, এখানো আমার চোখের সামনে সে দৃশ্য ভাসছে। খায়বার যুদ্ধের দিন আমরা আটজন মিলে সেই দরজাটি উল্টাতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। পক্ষান্তরে লায়ছ আবু জাফরের সূত্রে আর তিনি জাবিরের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, চল্লিশ জনে মিলে ঐ দরজা ওঠাতে পেরেছিলো। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২২৫]
📄 রাসূল (সা)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি অবিচল ঈমান ও বিশ্বাস
অষ্টম হিজরীর রমযান মাসে মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণকালে রাসূলুল্লাহ্ সকলকে রসদপত্র সংগ্রহের আদেশ দিলেন এবং এ বিষয়ে নিশ্চিদ্র গোপনীয়তা অবলম্বনপূর্বক দু'আ করলেন।
اللهم خذ العيون والاخبار عن قريش حتى تبغتها في بلادها .
'হে আল্লাহ্! গুপ্তচর ও গুপ্ত খবর কুরায়শের নাগাল থেকে দূরে রাখ যেন তাদের ভূমিতে তাদের ওপর হঠাৎ করে হানা দিতে পারি। [যাদুল মা'আদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৪২১]
মক্কা হতে মদীনায় হিজরতকারী হযরত হাতিব ইব্ন আবী বালতাআ (রা) ছিলেন বদরী সাহাবী। মক্কায় তিনি ছিলেন কুরায়শের আশ্রিত। তাঁর রক্তের কোন সম্পর্ক ছিলো না। সুতরাং মক্কায় রেখে আসা পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করার মতো কোন অবলম্বন কুরায়শ গোত্রে তার ছিলো না। তিনি ভাবলেন, আত্মীয়তার অবলম্বন তো নেই, সুতরাং উপকারের অবলম্বন গ্রহণ করি না কেন, যাতে কৃতজ্ঞতার তাগিদে কুরায়শরা সদয় ও সুপ্রসন্ন হয়। এ চিন্তায় প্রণোদিত হয়ে কুরায়শদেরকে তিনি অভিযানের খবর দিয়ে গোপন পত্র লিখলেন এবং একজন স্ত্রীলোককে বিপুল উপহারের বিনিময়ে পত্র বহনের দায়িত্ব দিলেন। এ ছিলো একটি ভুল পদক্ষেপ, যা আল্লাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহর রাসূল তাকে ভাল বলেছেন। তিনি বলেছেন, আহলে বদরের অবস্থা আল্লাহ্ জানেন এবং তিনি ইরশাদ করেছেন, اعملوا ما شئتم فقد غفرت لكم যা ইচ্ছা করো, তোমাদের আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। [যাদুল মা'আদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২১]
স্ত্রীলোকটি চুলের বেণীতে পত্র লুকিয়ে রওয়ানা হলো। এদিকে আসমানী সূত্রে খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ আলী ও যুবায়র (রা)-কে এ নির্দেশসহ পাঠালেন, "তোমরা দু'জন 'রওয়াতুল খাস' স্থানে উপনীত হও। সেখানে এক বুড়ীর কাছে কুরায়শের নামে লেখা পত্র রয়েছে।"
তারা ধাবমান ঘোড়ায় চড়ে ছুটলেন এবং কথিত স্থানে স্ত্রীলোকটিকে পেয়ে গেলেন। জিজ্ঞাসাবাদের মুখে স্ত্রীলোকটি পত্রের কথা সাফ অস্বীকার করলো। সওয়ারী তল্লাশি করেও কিছু পাওয়া গেলো না। তখন আলী (রা) বললেন, আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আল্লাহর রাসূল অসত্য বলেন নি আর আমরাও মিথ্যা বলছি না। আল্লাহর শপথ! হয় পত্র বের করে দেবে অন্যথায় তোমাকে বিবস্ত্র করে দেখবো। এই হাবভাব দেখে স্ত্রীলোকটি বললো, আচ্ছা, একটু ঘুরে দাঁড়াও। তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন আর স্ত্রীলোকটি খোপা খুলে পত্রটি তাদের হাতে তুলে দিলো। আর তারা পত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ -এর কাছে উপস্থিত হলেন। [যাদুল মা'আদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২১]