📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 খন্দক যুদ্ধে আলী (রা)-এর যুদ্ধ কুশলতা

📄 খন্দক যুদ্ধে আলী (রা)-এর যুদ্ধ কুশলতা


পঞ্চম হিজরীর শাওয়াল মাসে সংঘটিত খন্দক যুদ্ধ ছিলো ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। এর প্রভাব ছিলো সুদূরপ্রসারী। বস্তুত এটা ছিলো চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারক যুদ্ধ যাতে মুসলমানদের অস্তিত্ব এমনভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছিলো যা ইতোপূর্বে আর কখনো ঘটেনি। সে মহাদুর্যোগের যে চিত্র আল-কুরআনে আল্লাহ্ পেশ করেছেন তার চেয়ে নিখুঁত ও বাস্তব চিত্র আর কী হতে পারে!
إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللهِ الظُّنُونَا - هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالًا شَدِيدًا
"(স্মরণ করো) যখন তারা তোমাদের ওপর চড়াও হলো তোমাদের ঊর্ধ্বভূমি হতে এবং তোমাদের নিম্নভূমি হতে এবং যখন চক্ষু উল্টে গেলো এবং হৃদয় কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌছে গেলো আর তোমরা আল্লাহ্ সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা পোষণ করতে লাগলে। ঐ সময় মু'মিনদের 'পরীক্ষা' করা হয়েছিলো এবং তারা ভীষণ প্রকম্পিত হয়েছিলো।" [সূরা আহযাব: ১০-১১]
এ যুদ্ধে প্রথমবারের মতো হযরত আলী (রা)-এর যুদ্ধকুশলতা ও শৌর্য-বীর্য অনন্যরূপে প্রকাশ পেয়েছিলো। শত্রুর হামলার আশংকায় মদীনার উত্তর-পশ্চিমের অরক্ষিত সমভূমিতে হযরত সালমান ফারসী (রা)-এর প্রস্তাবে যে পরিখা খনন করা হয়েছিলো সেটাই ছিলো মুসলিম ও কুরায়শ-গাতফান বাহিনীর মাঝে অন্তরায়। এ যুদ্ধে তাদের সংখ্যা দশ হাজারে পৌঁছে গিয়েছিলো। কুরায়শের একদল অগ্রগামী ঘোড়-সওয়ার পরিখা প্রান্তে এসে হতবাক হয়ে গেলো। কেননা আরবদের যুদ্ধ ইতিহাসে এটা ছিলো সম্পূর্ণ নতুন কৌশল। অতঃপর তারা পরিখার অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ স্থানে এসে ঘোড়াসহ ঝাঁপ দিয়ে পরিখা পার হলো এবং মুসলমানদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ঘোড়া দৌড়ে বেড়াতে লাগলো। তাদের একজন আমর ইব্‌ন আবদে ওদ ছিলো হাজারে এক বলে খ্যাত অশ্বযোদ্ধা। সে ঘোড়া থামিয়ে হুংকার দিলো- আছে কোন্ লড়াকু?
হযরত আলী (রা) অগ্রসর হয়ে বললেন, হে আমর! তুমি আল্লাহর নামে প্রতিজ্ঞা করনি যে, কোন কুরায়শী দু'টি আবদার করলে একটি আবদার তুমি অবশ্যই রক্ষা করবে? আমর বললো, তা ঠিক। হযরত আলী (রা) তখন বললেন, আমি তোমাকে ইসলামের মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য গ্রহণের আহ্বান করছি। আমর বলল, আমার সে প্রয়োজন নেই। হযরত আলী (রা) তখন বললেন, তবে আমি তোমাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান গ্রহণ করছি। সে বললো, কেন ভাতিজা! আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে কতল করতে চাই না। আলী (রা) বললেন, কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি তোমার খুন দেখতে চাই।
তখন বীরত্বের লড়াই হলো এবং আমরের খুনে হযরত আলীর তলোয়ার রাঙ্গা হলো। [আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০০]
কুরায়শ মিত্র বনু কুরায়যা ও কুরায়শের মাঝে বিরোধ দেখা দেয়ার মুখে আল্লাহ্ তা'আলা সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড শীতের রাতে ভীষণ 'বায়ু প্রবাহ' প্রেরণ করলেন। ফলে তাদের রান্নার ডেগ উল্টে গেলো এবং তাঁবুসমূহ উপড়ে গেলো। এরপর যুদ্ধে সাহস হারিয়ে কুরায়শরা পলায়নের পথ ধরলো। তখন রাসূলুল্লাহ ভবিষ্যদ্বাণী করে বললেন, "আজ থেকে কুরায়শরা তোমাদের বিরুদ্ধে আর যুদ্ধযাত্রা করবে না, বরং তোমরাই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবে।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১০৬]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হযরত আলী (রা)-এর নবী-ভক্তি

📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হযরত আলী (রা)-এর নবী-ভক্তি


ষষ্ঠ হিজরীর যিলকদ মাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হলো। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৫)। মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশ ও উমরা পালনের অনুমতি দান প্রশ্নে অনেক বাদানুবাদ ও চরম বিরোধিতার পর কুরায়শরা সুহাইল ইব্‌ন আমরকে দূত হিসেবে পাঠালো। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, এমন লোক প্রেরণ করে সন্ধির ব্যাপারে কুরায়শরা আন্তরিকতারই পরিচয় দিয়েছে।
আলাপ-আলোচনার পর সন্ধিপত্র লেখার সময় হযরত আলী (রা)-কে ডেকে তিনি বললেন, লেখ 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম'। সুহাইল ইব্‌ন আমর তাতে আপত্তি জানিয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ! 'রহমান' কে আমরা চিনি না। তবে আগে যেমন লিখতে সেভাবে 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' লিখতে পারো।
মুসলমানগণ বললো, আল্লাহর শপথ! আমরা "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" ব্যতীত অন্য কিছু লিখবো না। তখন নবী বললেন, তাই হোক! লেখ, বিসমিকা আল্লাহুম্মা।
অতঃপর তিনি বললেন, লেখ, আল্লাহর রাসূল এ সিদ্ধান্ত প্রকাশ করছেন। একথা শুনে সুহাইল বললো, আল্লাহর শপথ! আমরা যদি স্বীকার করতাম যে, তুমি আল্লাহর রাসূল, তাহলে আল্লাহর ঘরে তোমাকে প্রবেশে কেন বাধা দেব? কেনই বা লড়াই করবো? তবে মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ লিখতে পারো।
নবী বললেন, তোমরা অবিশ্বাস করলেও আমি আল্লাহর রাসূল। অতঃপর তিনি হযরত আলী (রা)-কে 'আল্লাহর রাসূল' মুছে "মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্" লিখতে বললেন। তখন হযরত আলী নবী-প্রেমের জযবায় বলে উঠলেন, আল্লাহর শপথ! আমি তা মুছতে পারবো না। রাসূলুল্লাহ বললেন, আচ্ছা, আমাকে দেখিয়ে দাও। অতঃপর রাসূলুল্লাহ নিজ হাতে তা মুছে দিলেন। [সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হুদায়বিয়ার সন্ধি]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 খায়বার যুদ্ধে হযরত আলী (রা)-এর বীরত্ব

📄 খায়বার যুদ্ধে হযরত আলী (রা)-এর বীরত্ব


সপ্তম হিজরীতে সংঘটিত খায়বার যুদ্ধে একদিকে শেরে খোদা হযরত আলী (রা)-এর সাহস ও বীরত্ব যেমন ফুটে উঠেছিলো অন্যদিকে তেমনি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নিকট তাঁর অনন্য মর্যাদার বিষয়টিও সমুজ্জ্বল হয়েছিলো। কেননা কৌশলগত সাময়িক গুরুত্বের অধিকারী এই ইয়াহূদী উপনিবেশের ওপর বিজয় গৌরব আল্লাহ্ হযরত আলী (রা)-কেই দান করেছিলেন।
খায়বার ছিলো ইয়াহুদীদের সুরক্ষিত দুর্গবেষ্টিত যুদ্ধ ঘাঁটি এবং গোটা আরব উপদ্বীপে তাদের শেষ আশ্রয় কেন্দ্র। এখান থেকেই পরিচালিত হতো ইসলামবিরোধী তৎপরতা এবং মদীনার ভেতরের ও বাইরের ইয়াহুদীদের সাথে যোগসাজশের চক্রান্ত। তাই রাসূলুল্লাহ ইয়াহুদী চক্রান্ত থেকে শংকামুক্ত হওয়ার জন্য খায়বার জয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন। মদীনার উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় সত্তর মাইল দূরে ছিলো খায়বারের অবস্থান।
রাসূলুল্লাহ চৌদ্দ'শ মুজাহিদ নিয়ে খায়বার অভিমুখে রওয়ানা হলেন। একে একে সকল দুর্গের পতন হলো। কামূছ দুর্গ অপরাজিত রয়ে গেলো। হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) তখন চক্ষুপীড়ায় ভুগছিলেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, "আগামীকাল ঝাণ্ডা ধারণ করবেন এমন একজন, আল্লাহ্ ও রাসূল যাঁকে ভালোবাসেন। তাঁর হাতে বিজয় অর্জিত হবে।”
প্রবীণ সাহাবাগণ প্রত্যেকে এ আশায় উঁচু হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন যে, হয়তো তিনিই হবেন সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। কিন্তু আল্লাহর রাসূল চক্ষুপীড়ায় আক্রান্ত হযরত আলী (রা)-কে ডেকে পাঠালেন এবং তাঁর চোখে থুথু দিয়ে দু'আ করলেন। ফলে তাঁর চক্ষুপীড়া এমন ভালো হলো যে, মনে হলো তাতে কোন পীড়া ছিলো না। অতঃপর তিনি তাঁর হাতে পতাকা তুলে দিলেন। আলী (রা) বললেন, আমি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যাবো যতক্ষণ না তারা আমাদের মতো ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ্ বললেন, ধীরস্থিরভাবে তাদের এলাকায় হাযির হও। অতঃপর ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তাদেরকে তাদের ওপর আল্লাহর হকসমূহ অবহিত করো। আল্লাহর শপথ! মাত্র একজনও যদি তোমা দ্বারা আল্লাহ্ হেদায়াত দান করেন তাহলে তোমার জন্য তা লাল উটের পাল হতে উত্তম। [বুখারী ও মুসলিম, অনুচ্ছেদ: খায়বর যুদ্ধ]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 শেরে খোদা ও ইহুদী বীর মুরাহহাবের মধ্যে লড়াই

📄 শেরে খোদা ও ইহুদী বীর মুরাহহাবের মধ্যে লড়াই


হযরত আলী (রা) যখন কামূছ দুর্গে উপনীত হলেন তখন সুবিখ্যাত যোদ্ধা মুরাহ্হাব যুদ্ধের গান গেয়ে বীর দর্পে হাযির হলো। কিন্তু আঘাত পাল্টা আঘাতের মাঝে আলী (রা)-এর তলোয়ার অকস্মাৎ ঝলসে উঠলো এবং মুরাহ্হাবের শির ও শিরস্ত্রাণ দুই টুকরা হয়ে গেলো এবং বিজয় সম্পন্ন হলো। ইবনে হিশামের বর্ণনায় মুহাম্মদ বিন মাসলামাহর নাম এসেছে বটে, কিন্তু বিশুদ্ধ মতে হযরত আলী বিন আবূ তালিব (রা)-ই মুরাহ্হাবকে হত্যা করেছিলেন। মুসলিম শরীফের বর্ণনায় তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে এবং আলী (রা)-এর আবৃত্তিকৃত রণগীতিও তাতে বর্ণিত হয়েছে। আর বলা বাহুল্য, ইমাম মুসলিমের নিজস্ব সনদ অধিকতর নির্ভর ও অগ্রাধিকারযোগ্য। [দেখুন মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ১৮০৭]
বিশুদ্ধ সনদে ইবনে আবী শায়বা হযরত লায়ছ (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একবার আবু জাফরকে দেখতে গেলাম। তিনি নিজের গুনাহ ও আযাবের কথা ভেবে কাঁদছিলেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, জাবির (রা) আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, আলী (রা) খায়বার যুদ্ধের দিন দুর্গদ্বার উপড়ে ফেলেছিলেন। পরে মুসলমানগণ দুর্গ দখল করেছিলেন, আর জাবির নিজে চেষ্টা করে দেখেছেন। কিন্তু চল্লিশ জনের কমে তা ওঠানো সম্ভব হয়নি। আল্লামা ইবনে কাছির যদিও খায়বারের দুর্গদ্বার সংক্রান্ত এ হাদীসকে দুর্বল বলেছেন, কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত এ ঘটনা প্রসিদ্ধির পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মুহাম্মদ ইবন ইসহাক, আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ন হাসানের সূত্রে, তিনি তাঁর কোন নিকটজনের সূত্রে ও তিনি আবু রাফে (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এক ইয়াহুদীর আঘাতে হযরত আলীর হাত থেকে ঢাল পড়ে গেলো। তখন তিনি দুর্গের একটি দরজাকেই ঢাল রূপে তুলে নিলেন। আল্লাহ্ তাঁকে খায়বারের বিজয় দান করা পর্যন্ত ঐ দরজা তাঁর হাতেই ছিলো। পরে তিনি তা ফেলে দিয়েছিলেন।
আবূ রাফে বলেন, এখানো আমার চোখের সামনে সে দৃশ্য ভাসছে। খায়বার যুদ্ধের দিন আমরা আটজন মিলে সেই দরজাটি উল্টাতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। পক্ষান্তরে লায়ছ আবু জাফরের সূত্রে আর তিনি জাবিরের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, চল্লিশ জনে মিলে ঐ দরজা ওঠাতে পেরেছিলো। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২২৫]

ফন্ট সাইজ
15px
17px