📄 বদর যুদ্ধে হযরত আলী (রা)
দ্বিতীয় হিজরীর রমযান মাসে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হলো। বস্তুত বদর ছিলো ইসলাম ও ইসলামী উম্মাহর ভাগ্য নির্ধারণকারী এক চূড়ান্ত যুদ্ধ যা ইতিহাসের গতিধারা পরিবর্তন করে দিয়েছিলো।
এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ যখন মুসলমানদের সামনে এসে তাদেরকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন, তখন রাবীয়ার দুই পুত্র ওতবা ও শায়বা এবং শায়বার পুত্র ওয়ালীদ- এই তিনজন উভয় শিবিরের মাঝে দাঁড়িয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধের ডাক দিলো। তাদের মুকাবিলায় তিন আনসারী জোয়ান অগ্রসর হলেন। তারা বললো, তোমরা কারা? তাঁরা বললেন, আমরা আনসার। তারা বললো, সুযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী, তবে আমাদের কওমের কাউকে পাঠাও।
তাদের মর্যাদা ও যুদ্ধকুশলতার কথা রাসূল খুব ভালভাবে অবগত ছিলেন। কেননা তারা ছিলো কুরায়শের সেরা যুদ্ধবীর। অবশ্য তাদের মুকাবিলার উপযোগী বহু বাহাদুর ও শাহ সওয়ার কুরায়শী মুহাজির ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর নিকটতম রক্ত সম্পর্কের তিনজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “দাঁড়াও হে হামযা, দাঁড়াও হে আলী, দাঁড়াও হে ওবায়দা!” নিকটতমদের জীবন রক্ষার চিন্তায় সহজেই তিনি অন্যদের কথা বলতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেন নি। আলী, হামযা ও ওবায়দাকে দেখে ওতবার দল বললো, হাঁ, এবার সুযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী বটে!
বয়সে সবার প্রবীণ হযরত ওবায়দা ওতবার মুকাবিলা করলেন। পক্ষান্তরে হযরত হামযা ও আলী যথাক্রমে শায়েবা ও ওয়ালীদ ইব্ন ওতবার মুকাবিলা করলেন। প্রথম আঘাতেই তাদের হত্যা করে ফেললেন। কিন্তু হযরত ওবায়দা প্রতিপক্ষকে গুরুতর আহত করে নিজেও অনুরূপ আহত হলেন। তখন হযরত হামযা ও আলী (রা) শত্রু নিধন করে হযরত ওবায়দা (রা)-কে বহন করে আনলেন। অতঃপর তিনি শাহাদাত বরণ করেন। [সীরাতে ইব্ন হিশাম, পৃষ্ঠা-৬২৫]
হযরত কাতাদাহ (র)-এর সূত্রে ইব্ন সাআদ (র) বলেন, বদর যুদ্ধে হযরত আলী (রা) আল্লাহর রাসূলের পতাকাবাহী ছিলেন। [তাবাকাত, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৩]
হাফেয ইব্ন আসাকির (র) বলেন, বদর যুদ্ধে গনীমত থেকে যুলফিকার তলোয়ারটি রাসূলুল্লাহ নূফলরূপে গ্রহণ করেছিলেন। পরে সেটা তিনি হযরত আলী (রা)-কে দান করেছিলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৭]
📄 উহুদ যুদ্ধ
তৃতীয় হিজরী শাওয়াল মাসে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো এবং আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মুসলমানদের জন্য 'মদদ' নাযিল করেছিলেন। ফলে মুশরিক বাহিনী ছত্রভঙ্গ হলো এবং স্ত্রীলোকেরা পলায়ন করলো।
এদিকে রাসূল আবদুল্লাহ ইব্ন জুবাইর (রা)-এর নেতৃত্বাধীন পঞ্চাশ জনের এক তীরন্দাজ দলকে নিযুক্ত করে নির্দেশ দিলেন শত্রুবাহিনীর অশ্বদলকে বর্শার অগ্রভাগে ঠেকিয়ে রাখো, যেন তারা আমাদের পশ্চাদ্ভাগে হানা দিতে না পারে। জয়-পরাজয় যা-ই হোক, তোমরা স্বস্থানে অবিচল থাকবে। তিনি এও বললেন, 'পাখির ঝাঁক শহীদানের লাশ ঠুকরে খাচ্ছে দেখেও নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করা চলবে না। কিন্তু পরাজিত বাহিনীর ছত্রভঙ্গ পলায়ন দেখে ও বিজয় নিশ্চিত ভেবে তীরন্দাজ দল তাদের অবস্থান ত্যাগ করলো এবং মূল বাহিনীর সঙ্গে গনীমত সংগ্রহে যোগ দিলো। তখন দল নেতা আবদুল্লাহ আল্লাহর রাসূলের সাবধান বাণী স্মরণ করিয়ে দিলেন। যুদ্ধ শেষ ভেবে তাঁরা তাঁর কথায় আমল দিলেন না এবং তাঁরা মনে করেছিলেন মুশরিক বাহিনী আর ফিরে আসবে না। অবস্থান ত্যাগের ফলে মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ভাগ অরক্ষিত হয়ে পড়লো এবং সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে কুরায়শদের অশ্বদল পেছন দিক থেকে প্রচণ্ড হামলা চালালো। এমন সময় কে যেন চিৎকার করে বলে উঠলো, শোন, "মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন।” ফলে মুসলমানগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটতে লাগলো। তখন সম্মুখ থেকেও হামলা শুরু হলো এবং মুসলমানদের ওপর বিপর্যয় নেমে এলো, এমন কি শত্রুদল রাসূলুল্লাহ পর্যন্ত পৌছে গেলো। ফলে তিনি প্রতিপক্ষের প্রস্তরাঘাতে পড়ে গেলেন। এতে তাঁর নিচের পাটির সম্মুখভাগের ডান দিকের একটি দাঁত ভেঙ্গে গেলো। মাথা জখম হলো এবং ঠোঁট ফেটে গেলো। রাসূলুল্লাহ্ -এর অবস্থানস্থল তখন মুসলমানগণ জানতে পারছিলো না। হযরত আলী ও তালহা ইব্ন ওবায়দুল্লাহর সাহায্যে তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। আর মালিক ইবন সিনান তাঁর পবিত্র চেহারা হতে রক্ত চুষে নিলেন।
বুখারী বর্ণনামতে সাহল ইবন সা'দ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ -এর জখম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই জানি, রাসূলুল্লাহ্-এর জখম কে ধুয়েছিলেন, কে পানি ঢেলেছিলেন এবং কী বস্তু দ্বারা তাঁর চিকিৎসা করা হয়েছিলো। তিনি বলেন, নবী-দুহিতা ফাতিমা (রা) তাঁর জখম ধুয়ে দিয়েছিলেন আর আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) ঢালে করে পানি ঢেলেছিলেন। কিন্তু রক্ত ক্ষরণ বন্ধ না হয়ে বেড়েই চলেছে দেখে ফাতিমা (রা) এক টুকরো চাটাই পুড়িয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন। ফলে রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হলো। [বুখারী, মাগাযী অধ্যায়, অনুচ্ছেদ: উহুদ যুদ্ধ]
ইবন কাছীর (র) বলেন, উহুদ যুদ্ধে আলী (রা) ছিলেন বাহিনীর দক্ষিণ বাহুতে এবং মুসআব ইবন উমায়র (রা)-এর শাহাদাতের পর পতাকা ছিলো তাঁর হাতে। সেদিন তিনি বিপুল বিক্রমে মুশরিক নিধন করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্-এর পবিত্র মুখমণ্ডলের রক্ত ধুয়ে দিয়েছিলেন যা মাথার জখম ও ভাঙ্গা দাঁত থেকে গড়িয়ে পড়ছিলো। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২২৪]
📄 খন্দক যুদ্ধে আলী (রা)-এর যুদ্ধ কুশলতা
পঞ্চম হিজরীর শাওয়াল মাসে সংঘটিত খন্দক যুদ্ধ ছিলো ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। এর প্রভাব ছিলো সুদূরপ্রসারী। বস্তুত এটা ছিলো চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারক যুদ্ধ যাতে মুসলমানদের অস্তিত্ব এমনভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছিলো যা ইতোপূর্বে আর কখনো ঘটেনি। সে মহাদুর্যোগের যে চিত্র আল-কুরআনে আল্লাহ্ পেশ করেছেন তার চেয়ে নিখুঁত ও বাস্তব চিত্র আর কী হতে পারে!
إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللهِ الظُّنُونَا - هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالًا شَدِيدًا
"(স্মরণ করো) যখন তারা তোমাদের ওপর চড়াও হলো তোমাদের ঊর্ধ্বভূমি হতে এবং তোমাদের নিম্নভূমি হতে এবং যখন চক্ষু উল্টে গেলো এবং হৃদয় কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌছে গেলো আর তোমরা আল্লাহ্ সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা পোষণ করতে লাগলে। ঐ সময় মু'মিনদের 'পরীক্ষা' করা হয়েছিলো এবং তারা ভীষণ প্রকম্পিত হয়েছিলো।" [সূরা আহযাব: ১০-১১]
এ যুদ্ধে প্রথমবারের মতো হযরত আলী (রা)-এর যুদ্ধকুশলতা ও শৌর্য-বীর্য অনন্যরূপে প্রকাশ পেয়েছিলো। শত্রুর হামলার আশংকায় মদীনার উত্তর-পশ্চিমের অরক্ষিত সমভূমিতে হযরত সালমান ফারসী (রা)-এর প্রস্তাবে যে পরিখা খনন করা হয়েছিলো সেটাই ছিলো মুসলিম ও কুরায়শ-গাতফান বাহিনীর মাঝে অন্তরায়। এ যুদ্ধে তাদের সংখ্যা দশ হাজারে পৌঁছে গিয়েছিলো। কুরায়শের একদল অগ্রগামী ঘোড়-সওয়ার পরিখা প্রান্তে এসে হতবাক হয়ে গেলো। কেননা আরবদের যুদ্ধ ইতিহাসে এটা ছিলো সম্পূর্ণ নতুন কৌশল। অতঃপর তারা পরিখার অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ স্থানে এসে ঘোড়াসহ ঝাঁপ দিয়ে পরিখা পার হলো এবং মুসলমানদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ঘোড়া দৌড়ে বেড়াতে লাগলো। তাদের একজন আমর ইব্ন আবদে ওদ ছিলো হাজারে এক বলে খ্যাত অশ্বযোদ্ধা। সে ঘোড়া থামিয়ে হুংকার দিলো- আছে কোন্ লড়াকু?
হযরত আলী (রা) অগ্রসর হয়ে বললেন, হে আমর! তুমি আল্লাহর নামে প্রতিজ্ঞা করনি যে, কোন কুরায়শী দু'টি আবদার করলে একটি আবদার তুমি অবশ্যই রক্ষা করবে? আমর বললো, তা ঠিক। হযরত আলী (রা) তখন বললেন, আমি তোমাকে ইসলামের মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য গ্রহণের আহ্বান করছি। আমর বলল, আমার সে প্রয়োজন নেই। হযরত আলী (রা) তখন বললেন, তবে আমি তোমাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান গ্রহণ করছি। সে বললো, কেন ভাতিজা! আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে কতল করতে চাই না। আলী (রা) বললেন, কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি তোমার খুন দেখতে চাই।
তখন বীরত্বের লড়াই হলো এবং আমরের খুনে হযরত আলীর তলোয়ার রাঙ্গা হলো। [আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০০]
কুরায়শ মিত্র বনু কুরায়যা ও কুরায়শের মাঝে বিরোধ দেখা দেয়ার মুখে আল্লাহ্ তা'আলা সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড শীতের রাতে ভীষণ 'বায়ু প্রবাহ' প্রেরণ করলেন। ফলে তাদের রান্নার ডেগ উল্টে গেলো এবং তাঁবুসমূহ উপড়ে গেলো। এরপর যুদ্ধে সাহস হারিয়ে কুরায়শরা পলায়নের পথ ধরলো। তখন রাসূলুল্লাহ ভবিষ্যদ্বাণী করে বললেন, "আজ থেকে কুরায়শরা তোমাদের বিরুদ্ধে আর যুদ্ধযাত্রা করবে না, বরং তোমরাই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবে।" [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১০৬]
📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হযরত আলী (রা)-এর নবী-ভক্তি
ষষ্ঠ হিজরীর যিলকদ মাসে হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হলো। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৫)। মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশ ও উমরা পালনের অনুমতি দান প্রশ্নে অনেক বাদানুবাদ ও চরম বিরোধিতার পর কুরায়শরা সুহাইল ইব্ন আমরকে দূত হিসেবে পাঠালো। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, এমন লোক প্রেরণ করে সন্ধির ব্যাপারে কুরায়শরা আন্তরিকতারই পরিচয় দিয়েছে।
আলাপ-আলোচনার পর সন্ধিপত্র লেখার সময় হযরত আলী (রা)-কে ডেকে তিনি বললেন, লেখ 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম'। সুহাইল ইব্ন আমর তাতে আপত্তি জানিয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ! 'রহমান' কে আমরা চিনি না। তবে আগে যেমন লিখতে সেভাবে 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' লিখতে পারো।
মুসলমানগণ বললো, আল্লাহর শপথ! আমরা "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" ব্যতীত অন্য কিছু লিখবো না। তখন নবী বললেন, তাই হোক! লেখ, বিসমিকা আল্লাহুম্মা।
অতঃপর তিনি বললেন, লেখ, আল্লাহর রাসূল এ সিদ্ধান্ত প্রকাশ করছেন। একথা শুনে সুহাইল বললো, আল্লাহর শপথ! আমরা যদি স্বীকার করতাম যে, তুমি আল্লাহর রাসূল, তাহলে আল্লাহর ঘরে তোমাকে প্রবেশে কেন বাধা দেব? কেনই বা লড়াই করবো? তবে মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ লিখতে পারো।
নবী বললেন, তোমরা অবিশ্বাস করলেও আমি আল্লাহর রাসূল। অতঃপর তিনি হযরত আলী (রা)-কে 'আল্লাহর রাসূল' মুছে "মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ্" লিখতে বললেন। তখন হযরত আলী নবী-প্রেমের জযবায় বলে উঠলেন, আল্লাহর শপথ! আমি তা মুছতে পারবো না। রাসূলুল্লাহ বললেন, আচ্ছা, আমাকে দেখিয়ে দাও। অতঃপর রাসূলুল্লাহ নিজ হাতে তা মুছে দিলেন। [সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, হুদায়বিয়ার সন্ধি]