📄 আলাহুর রাসূল (রা)-এর সুখ-শান্তির জন্য
অভাবের তীব্র কষাঘাতের মাঝেও তিনি রাসূল -এর সুখ-শান্তির জন্য চেষ্টার কোন ত্রুটি করতেন না এবং আল্লাহর পথে দাওয়াত ও জিহাদে আত্মনিয়োগ করতে পিছপা হতেন না।
ইবনে আসাকিরের বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী -এর অভাবগ্রস্ততার কথা জানতে পেরে হযরত আলী (রা) একবার কাজের সন্ধানে বের হলেন যাতে কিছু উপার্জন করে নবী কে সাহায্য করতে পারেন। এক ইয়াহূদীর বাগানে তিনি বালতি প্রতি একটি খেজুর মজুরিতে সতের বালতি পানি তুলে দিলেন। ইয়াহূদী তাঁকে খেজুর বেছে নেয়ার সুযোগ দিলো। আর তিনি সতেরটি আজওয়া খেজুর নিয়ে নবী -এর কাছে উপস্থিত হলেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আবুল হাসান! এগুলো তুমি কোথায় পেয়েছ? তিনি বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনার অনাহারের কথা জেনে আপনার জন্য খাবার সংগ্রহের নিয়তে কাজের সন্ধানে বের হয়েছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসাই কি শুধু এ কাজে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বললেন, "যখন কোন বান্দা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসবে, অভাব-দারিদ্র্য তার দিকে ঢলের চেয়েও দ্রুতবেগে ধাবিত হবে। আর যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসবে সে যেন বিপদ-মুসীবতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।" [কানযুল উম্মাল, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২১]
📄 আদর-স্নেহের উপাধি
রাসূলুল্লাহ আদর-স্নেহ করে তাঁকে ‘আবূ তুরাব’ (মাটিওয়ালা) উপাধি দান করেছিলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, হযরত আলী (রা) একবার বিবি ফাতিমার গৃহে প্রবেশ করলেন এবং (মনঃক্ষুণ্ণতার কারণে) বের হয়ে মসজিদে গিয়ে শুয়ে থাকলেন। নবী ফাতিমা (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার চাচাত ভাই কোথায়? ফাতিমা বললেন, তিনি মসজিদে আছেন।
নবী সেখানে গিয়ে দেখেন, চাদর সরে গিয়ে তাঁর পিছে মাটি লেগে আছে। তখন তিনি তাঁর পিঠের মাটি মুছে দিয়ে দু’বার বললেন, ওঠ, হে আবু তুরাব! [বুখারী, মানাকিব অধ্যায়]
📄 বদর যুদ্ধে হযরত আলী (রা)
দ্বিতীয় হিজরীর রমযান মাসে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হলো। বস্তুত বদর ছিলো ইসলাম ও ইসলামী উম্মাহর ভাগ্য নির্ধারণকারী এক চূড়ান্ত যুদ্ধ যা ইতিহাসের গতিধারা পরিবর্তন করে দিয়েছিলো।
এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ যখন মুসলমানদের সামনে এসে তাদেরকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন, তখন রাবীয়ার দুই পুত্র ওতবা ও শায়বা এবং শায়বার পুত্র ওয়ালীদ- এই তিনজন উভয় শিবিরের মাঝে দাঁড়িয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধের ডাক দিলো। তাদের মুকাবিলায় তিন আনসারী জোয়ান অগ্রসর হলেন। তারা বললো, তোমরা কারা? তাঁরা বললেন, আমরা আনসার। তারা বললো, সুযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী, তবে আমাদের কওমের কাউকে পাঠাও।
তাদের মর্যাদা ও যুদ্ধকুশলতার কথা রাসূল খুব ভালভাবে অবগত ছিলেন। কেননা তারা ছিলো কুরায়শের সেরা যুদ্ধবীর। অবশ্য তাদের মুকাবিলার উপযোগী বহু বাহাদুর ও শাহ সওয়ার কুরায়শী মুহাজির ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর নিকটতম রক্ত সম্পর্কের তিনজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “দাঁড়াও হে হামযা, দাঁড়াও হে আলী, দাঁড়াও হে ওবায়দা!” নিকটতমদের জীবন রক্ষার চিন্তায় সহজেই তিনি অন্যদের কথা বলতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেন নি। আলী, হামযা ও ওবায়দাকে দেখে ওতবার দল বললো, হাঁ, এবার সুযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী বটে!
বয়সে সবার প্রবীণ হযরত ওবায়দা ওতবার মুকাবিলা করলেন। পক্ষান্তরে হযরত হামযা ও আলী যথাক্রমে শায়েবা ও ওয়ালীদ ইব্ন ওতবার মুকাবিলা করলেন। প্রথম আঘাতেই তাদের হত্যা করে ফেললেন। কিন্তু হযরত ওবায়দা প্রতিপক্ষকে গুরুতর আহত করে নিজেও অনুরূপ আহত হলেন। তখন হযরত হামযা ও আলী (রা) শত্রু নিধন করে হযরত ওবায়দা (রা)-কে বহন করে আনলেন। অতঃপর তিনি শাহাদাত বরণ করেন। [সীরাতে ইব্ন হিশাম, পৃষ্ঠা-৬২৫]
হযরত কাতাদাহ (র)-এর সূত্রে ইব্ন সাআদ (র) বলেন, বদর যুদ্ধে হযরত আলী (রা) আল্লাহর রাসূলের পতাকাবাহী ছিলেন। [তাবাকাত, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৩]
হাফেয ইব্ন আসাকির (র) বলেন, বদর যুদ্ধে গনীমত থেকে যুলফিকার তলোয়ারটি রাসূলুল্লাহ নূফলরূপে গ্রহণ করেছিলেন। পরে সেটা তিনি হযরত আলী (রা)-কে দান করেছিলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৭]
📄 উহুদ যুদ্ধ
তৃতীয় হিজরী শাওয়াল মাসে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো এবং আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মুসলমানদের জন্য 'মদদ' নাযিল করেছিলেন। ফলে মুশরিক বাহিনী ছত্রভঙ্গ হলো এবং স্ত্রীলোকেরা পলায়ন করলো।
এদিকে রাসূল আবদুল্লাহ ইব্ন জুবাইর (রা)-এর নেতৃত্বাধীন পঞ্চাশ জনের এক তীরন্দাজ দলকে নিযুক্ত করে নির্দেশ দিলেন শত্রুবাহিনীর অশ্বদলকে বর্শার অগ্রভাগে ঠেকিয়ে রাখো, যেন তারা আমাদের পশ্চাদ্ভাগে হানা দিতে না পারে। জয়-পরাজয় যা-ই হোক, তোমরা স্বস্থানে অবিচল থাকবে। তিনি এও বললেন, 'পাখির ঝাঁক শহীদানের লাশ ঠুকরে খাচ্ছে দেখেও নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করা চলবে না। কিন্তু পরাজিত বাহিনীর ছত্রভঙ্গ পলায়ন দেখে ও বিজয় নিশ্চিত ভেবে তীরন্দাজ দল তাদের অবস্থান ত্যাগ করলো এবং মূল বাহিনীর সঙ্গে গনীমত সংগ্রহে যোগ দিলো। তখন দল নেতা আবদুল্লাহ আল্লাহর রাসূলের সাবধান বাণী স্মরণ করিয়ে দিলেন। যুদ্ধ শেষ ভেবে তাঁরা তাঁর কথায় আমল দিলেন না এবং তাঁরা মনে করেছিলেন মুশরিক বাহিনী আর ফিরে আসবে না। অবস্থান ত্যাগের ফলে মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ভাগ অরক্ষিত হয়ে পড়লো এবং সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে কুরায়শদের অশ্বদল পেছন দিক থেকে প্রচণ্ড হামলা চালালো। এমন সময় কে যেন চিৎকার করে বলে উঠলো, শোন, "মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন।” ফলে মুসলমানগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটতে লাগলো। তখন সম্মুখ থেকেও হামলা শুরু হলো এবং মুসলমানদের ওপর বিপর্যয় নেমে এলো, এমন কি শত্রুদল রাসূলুল্লাহ পর্যন্ত পৌছে গেলো। ফলে তিনি প্রতিপক্ষের প্রস্তরাঘাতে পড়ে গেলেন। এতে তাঁর নিচের পাটির সম্মুখভাগের ডান দিকের একটি দাঁত ভেঙ্গে গেলো। মাথা জখম হলো এবং ঠোঁট ফেটে গেলো। রাসূলুল্লাহ্ -এর অবস্থানস্থল তখন মুসলমানগণ জানতে পারছিলো না। হযরত আলী ও তালহা ইব্ন ওবায়দুল্লাহর সাহায্যে তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। আর মালিক ইবন সিনান তাঁর পবিত্র চেহারা হতে রক্ত চুষে নিলেন।
বুখারী বর্ণনামতে সাহল ইবন সা'দ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ -এর জখম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই জানি, রাসূলুল্লাহ্-এর জখম কে ধুয়েছিলেন, কে পানি ঢেলেছিলেন এবং কী বস্তু দ্বারা তাঁর চিকিৎসা করা হয়েছিলো। তিনি বলেন, নবী-দুহিতা ফাতিমা (রা) তাঁর জখম ধুয়ে দিয়েছিলেন আর আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) ঢালে করে পানি ঢেলেছিলেন। কিন্তু রক্ত ক্ষরণ বন্ধ না হয়ে বেড়েই চলেছে দেখে ফাতিমা (রা) এক টুকরো চাটাই পুড়িয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন। ফলে রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হলো। [বুখারী, মাগাযী অধ্যায়, অনুচ্ছেদ: উহুদ যুদ্ধ]
ইবন কাছীর (র) বলেন, উহুদ যুদ্ধে আলী (রা) ছিলেন বাহিনীর দক্ষিণ বাহুতে এবং মুসআব ইবন উমায়র (রা)-এর শাহাদাতের পর পতাকা ছিলো তাঁর হাতে। সেদিন তিনি বিপুল বিক্রমে মুশরিক নিধন করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্-এর পবিত্র মুখমণ্ডলের রক্ত ধুয়ে দিয়েছিলেন যা মাথার জখম ও ভাঙ্গা দাঁত থেকে গড়িয়ে পড়ছিলো। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২২৪]