📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত ফাতিমা (রা)-এর সাথে আলী (রা)-এর বিবাহ

📄 হযরত ফাতিমা (রা)-এর সাথে আলী (রা)-এর বিবাহ


হিজরী দ্বিতীয় সনে রাসূলুল্লাহ্ হযরত আলী (রা)-এর সাথে তাঁর দুহিতা ফাতিমা (রা)-এর বিবাহ সম্পন্ন করলেন। তখন তিনি ফাতিমা (রা)- কে বলেছিলেন, "আমার পরিবারের প্রিয়তম ব্যক্তির সাথে তোমার বিবাহ সম্পন্ন করলাম।” অতঃপর তিনি তাঁর শরীরে পানি ছিটালেন এবং দু'আ দিলেন। [ইযালাতুল খাফা, পৃষ্ঠা-২৫৪]
ওবায়দুল্লাহ ইব্‌ন মুহম্মদ ইব্‌ন্ন সাম্মাক ইন্ন জাফর আল হাশেমী হতে আবূ আমর বর্ণনা করেছেন। ওবায়দুল্লাহ বলেন, উহুদ যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ আলী (রা)-এর সঙ্গে ফাতিমা (রা)-এর বিবাহ সম্পন্ন করেছেন। তখন তাঁর বয়স ছিলো পনের বছর সাড়ে পাঁচ মাস। আর তখন আলী (রা)-এর বয়স হয়েছিলো ২৫ বছর ৫ মাস।¹
মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে নবী-কন্যা ফাতিমা (রা)-এর পাণি গ্রহণ সম্পর্কে আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর কাছে তাঁর কন্যার বিবাহে আবদার করার সাধ জাগলো। কিন্তু ভাবলাম, কীভাবে তা সম্ভব! আমার তো কিছুই নেই! পরে নিকট-সম্পর্ক ও সুগভীর স্নেহ-অনুগ্রহের কথা স্মরণ করে পয়গাম পাঠালাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কিছু আছে কি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সেদিন যে বর্মটা দিয়েছিলাম সেটা কোথায়? আমি বললাম, সেটা অবশ্য আছে। তিনি বললেন, এটাই তাকে মোহর দাও। [মুসনাদে আহমদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮০]
আলী (রা) থেকে আরো বর্ণিত আছে, বিবাহের সময় রাসূল তাঁর কন্যার সঙ্গে একটি 'মখমল' চাদর, খেজুরের ছালভর্তি চামড়ার একটি বালিশ, দু'টি যাঁতা, একটি মশক ও দু'টি কলস পাঠিয়ে দিলেন। [মুসনাদে আহমদ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১০৪]

টিকাঃ
১. শায়খুল ইসলাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী (র) আলোচ্য বর্ণনার বিশুদ্ধতায় সন্দিহান হয়ে বলেছেন, তৃতীয় হিজরী শাওয়াল মাসে সংঘটিত ওহুদের যুদ্ধে ফাতিমাকে আলী (রা) 'আমার রক্ত ধুয়ে দাও' বলেছিলেন যা বিবাহ-পূর্ব সময়ে সম্ভব ছিলো না। (ইযালাতুল খাফা, পৃষ্ঠা-২৫৪) বস্তুত এটাই বিশুদ্ধ মত এবং এর সপক্ষে সর্বোত্তম প্রমাণ হিসেবে এটা সুপ্রতিষ্ঠিত যে, তৃতীয় হিজরীর শাবানে বা রমযানে হযরত হাসান বিন আলী (রা) জন্মগ্রহণ করেছেন। (ইবনে আসাকির কৃত তারিখে দামেস্ক)

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 নব দম্পতির জীবন যাত্রা

📄 নব দম্পতির জীবন যাত্রা


হযরত আলী (রা) ও ফাতিমা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ-এর প্রিয়তম। আর তিনি স্বয়ং ছিলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের মধ্যে আল্লাহর প্রিয়তম। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদের জীবনযাত্রা ছিলো দুনিয়াবিমুখতা ও কৃচ্ছ এবং সবর ও শোকরের সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত। হযরত হান্নাদ (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আতা (র) বলেছেন:
আমাদের কাছে এ বর্ণনা এসেছে যে, আলী (রা) বলেছেন, একনাগাড়ে বেশ কিছুদিন আমাদের ঘরে কিংবা নবীগৃহে কিছুই ছিলো না। তখন আমি পথে পরিত্যক্ত একটি দীনার দেখে 'নেবো কি নেবো না' এই ভাবনা কিছুক্ষণ মনে মনে ভাবতে থাকলাম। পরে প্রয়োজনের কঠিন তাগিদে নিয়ে নিলাম এবং আটা খরিদ করে ফাতিমাকে বললাম, আটা গুলে রুটি তৈরি কর। তিনি আটা গুলতে শুরু করলেন। ক্লান্তি ও পরিশ্রমের তীব্রতায় তাঁর কেশগুচ্ছ চোখের ভ্রূর ওপর এসে পড়ছিলো। তিনি রুটি বানালেন আর আমি বিষয়টি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বললাম। তিনি অনুমতি দিয়ে বললেন, খেতে পারো, এটা তোমার জন্য আল্লাহর পাঠানো রিযিক। [কানযুল উম্মাল, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৮]
হযরত শাবী (র)-এর সূত্রে হান্নাদ দীনাওরী (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী (রা) বলেছেন, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ ﷺ-কে বিবাহ করার পর মেষের চামড়ার একটি ফরাশ ছাড়া কিছুই 'আমাদের' মালিকানায় ছিলো না। সেটাই ছিলো রাতে আমাদের ঘুমানোর বিছানা আর দিনে উটের দানা খাওয়ার 'দস্তরখানা'। ফাতিমা ছাড়া আমাদের কোন খাদেম ছিলো না। [কানযুল উম্মাল, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৩৩]
হযরত ফাতিমা (রা) হতে তিবরানীর একটি 'হাসান' সনদের বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিন এসে বললেন, আমার দৌহিত্রদ্বয় (হাসান-হুসায়ন) কোথায়? ফাতিমা (রা) বললেন, ভোরে আমাদের ঘরে মুখে দেয়ার মত কিছু না থাকায় আলী বললেন, এদেরকে আমি (বাইরে) নিয়ে যাই। কেননা আশংকা হয় যে, এরা কান্না জুড়ে দেবে, অথচ তোমার কাছে তো দেয়ার মতো কিছু নেই! এখন তিনি অমুক ইয়াহুদীর বাগানে আছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ সেখানে গিয়ে দেখেন, হাসান ও হুসায়ন হাতে কিছু খেজুর নিয়ে একটি জলাধারের পাশে খেলা করছে। তখন তিনি বললেন, হে আলী! গরম তীব্র হয়ে ওঠার আগেই তোমার পুত্রদ্বয়কে নিয়ে বাড়ি ফিরবে।
হযরত আলী (রা) বললেন, ভোরে আমাদের ঘরে কিছুই ছিলো না। সুতরাং হে আল্লাহর রাসূল! যদি একটু বসেন তাহলে ফাতিমার জন্য কিছু খেজুর যোগাড় করে নিতে পারি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বসে পড়লেন। এদিকে ফাতিমা (রা)-এর জন্য খেজুর যোগাড় হয়ে গেলো। সেগুলো তিনি একটি কাপড়ের টুকরায় পেঁচিয়ে রওয়ানার উদ্যোগ নিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ একজনকে ও আলী (রা) অপরজনকে তুলে নিলেন। [আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৭১]
ইমাম বুখারী (রা)-এর বর্ণনায় আছে, আলী (রা) বলেন, যাঁতায় আটা পিষতে ফাতিমা (রা)-এর খুব কষ্ট হচ্ছিলো। এমন সময় 'কিছু যুদ্ধবন্দী এসেছে' সংবাদ পেয়ে তিনি একজন খাদেম চেয়ে নেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে গেলেন। কিন্তু দেখা করতে না পেরে তিনি বিষয়টি আয়েশা (রা)-কে বলে এলেন। পরে রাসূল তা জানতে পেরে তাশরীফ আনলেন এবং আমাদের শয়নস্থলে প্রবেশ করলেন। আমরা উঠে যেতে চাইলে তিনি বললেন, স্ব স্ব স্থানে থাক, এমন কি আমার বুকে তাঁর পদস্পর্শের শীতলতা অনুভব করলাম। তিনি বললেন, তোমরা যা চেয়েছ তার চেয়ে উত্তম কিছু তোমাদের বাতলে দেব না? শয্যা গ্রহণকালে চৌত্রিশবার আল্লাহু আকবার, তেত্রিশবার আলহামদু লিল্লাহ ও তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ বলবে। যা চেয়েছো তোমাদের জন্য এটা তার চেয়ে উত্তম। [বুখারী, কিতাবুল জিহাদ]
এ ঘটনার বিবরণ অপর এক সূত্রে আছে। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহর শপথ! ছুফফার লোকেরা ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছটফট করবে, অথচ তাদের খরচের জন্য আমার হাতে কিছু নেই- এ অবস্থায় আমি তোমাদের কথা ভাবতে পারি না, বরং যুদ্ধবন্দীদের বিক্রি করে সে অর্থ আহলে ছুফফার জন্য খরচ করবো। [মুসনাদে আহমাদ]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আলাহুর রাসূল (রা)-এর সুখ-শান্তির জন্য

📄 আলাহুর রাসূল (রা)-এর সুখ-শান্তির জন্য


অভাবের তীব্র কষাঘাতের মাঝেও তিনি রাসূল -এর সুখ-শান্তির জন্য চেষ্টার কোন ত্রুটি করতেন না এবং আল্লাহর পথে দাওয়াত ও জিহাদে আত্মনিয়োগ করতে পিছপা হতেন না।
ইবনে আসাকিরের বর্ণনায় হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী -এর অভাবগ্রস্ততার কথা জানতে পেরে হযরত আলী (রা) একবার কাজের সন্ধানে বের হলেন যাতে কিছু উপার্জন করে নবী কে সাহায্য করতে পারেন। এক ইয়াহূদীর বাগানে তিনি বালতি প্রতি একটি খেজুর মজুরিতে সতের বালতি পানি তুলে দিলেন। ইয়াহূদী তাঁকে খেজুর বেছে নেয়ার সুযোগ দিলো। আর তিনি সতেরটি আজওয়া খেজুর নিয়ে নবী -এর কাছে উপস্থিত হলেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আবুল হাসান! এগুলো তুমি কোথায় পেয়েছ? তিনি বললেন, হে আল্লাহর নবী! আপনার অনাহারের কথা জেনে আপনার জন্য খাবার সংগ্রহের নিয়তে কাজের সন্ধানে বের হয়েছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসাই কি শুধু এ কাজে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বললেন, "যখন কোন বান্দা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসবে, অভাব-দারিদ্র্য তার দিকে ঢলের চেয়েও দ্রুতবেগে ধাবিত হবে। আর যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসবে সে যেন বিপদ-মুসীবতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।" [কানযুল উম্মাল, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২১]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আদর-স্নেহের উপাধি

📄 আদর-স্নেহের উপাধি


রাসূলুল্লাহ আদর-স্নেহ করে তাঁকে ‘আবূ তুরাব’ (মাটিওয়ালা) উপাধি দান করেছিলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, হযরত আলী (রা) একবার বিবি ফাতিমার গৃহে প্রবেশ করলেন এবং (মনঃক্ষুণ্ণতার কারণে) বের হয়ে মসজিদে গিয়ে শুয়ে থাকলেন। নবী ফাতিমা (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার চাচাত ভাই কোথায়? ফাতিমা বললেন, তিনি মসজিদে আছেন।
নবী সেখানে গিয়ে দেখেন, চাদর সরে গিয়ে তাঁর পিছে মাটি লেগে আছে। তখন তিনি তাঁর পিঠের মাটি মুছে দিয়ে দু’বার বললেন, ওঠ, হে আবু তুরাব! [বুখারী, মানাকিব অধ্যায়]

ফন্ট সাইজ
15px
17px