📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 অনন্য মর্যাদা

📄 অনন্য মর্যাদা


আলী (রা) বলেন, আমি ও নবী করিম কা'বার পাদদেশে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বসতে বললেন এবং তিনি আমার কাঁধে উঠলেন। আমি তাঁকে নিয়ে দাঁড়াতে গেলাম। তিনি আমার অপারগতা বুঝে নেমে গেলেন এবং নিজে বসে আমাকে তাঁর কাঁধে উঠতে বললেন। আমি তাই করলাম। তিনি আমাকে নিয়ে দাঁড়ালেন। হযরত আলী (রা) বলেন, মনে হলো যেন ইচ্ছা করলে আমি আকাশের প্রান্ত স্পর্শ করতে পারব! অতঃপর আমি কা'বাগৃহে উঠে পড়লাম। সেখানে স্বর্ণের কিংবা পিতলের মূর্তি ছিলো। আমি সেটাকে ডানে-বামে ও সামনে পেছনে নাড়া দিয়ে তুলে ফেললাম এবং রাসূলুল্লাহ -এর নির্দেশে ছুঁড়ে ফেললাম। শিশি যেমন ভেঙ্গে যায় তেমনি তা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। অতঃপর আমি নেমে এলাম এবং কেউ দেখে ফেলে কি না এ আশংকায় আমরা উভয়ে এক দৌড়ে বাড়িঘরের আড়ালে চলে গেলাম। (মুসনাদে আহমাদ) স্পষ্টতই এটা ছিলো হিজরত-পূর্ব ঘটনা। [মুস্তাদরাকে হাকেম]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হিজরত

📄 হিজরত


ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগ এবং কুরায়শের প্রতিরোধ ও নির্যাতন যুগপৎভাবে চলতে লাগলো। বয়কটের মুখে হাশেমী পরিবার শি'আবে আবি তালিবে আশ্রয় গ্রহণ করলো। জাফর ইব্‌ন আবূ তালিবের নেতৃত্বে হাবশায় হিজরত সম্পন্ন হলো। ইসলামের দাওয়াত নিয়ে রাসূল তায়েফ গেলেন। তায়েফবাসী তাঁর সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাব দেয়। আল্লাহ্ তাঁর রাসূলকে মিরাজের সৌভাগ্য দান করলেন। হযরত উমর ও হামযা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণে আলোড়ন সৃষ্টি হলো। আল্লাহ্ তা'আলা মক্কা ও বাইরে মক্কার যাঁদের কল্যাণের ইচ্ছা করলেন, তাঁদের বক্ষ উন্মুক্ত করে দিলেন। ফলে তারা মুসলমান হয়ে গেলেন। রাসূল-এর আশ্রয় ও তত্ত্বাবধানকারী আবু তালিব ও সুখ-দুঃখের সঙ্গিনী উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা (রা) পরপর মৃত্যুবরণ করলেন। রাসূল ও তাঁর সাহাবাদের প্রতি কুরায়শের জুলুম-নির্যাতন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো। ইসলামকে 'নির্মূল' করার যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন হলো। তৃণীরের শেষ তীরটিও যেন নিক্ষিপ্ত হলো! নিপীড়ন ও নির্যাতনের এমন সব পন্থা ও কৌশল তারা অবলম্বন করলো যে, এর বেশি কিছু করা ছিলো অকল্পনীয়।

ইতিমধ্যে ইয়াসরিবের দুই বড় কাহতানী গোত্র আওস ও খায়বাজের কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করলো। এভাবে প্রথম ও দ্বিতীয় আকাবায় বায়'আতের মাধ্যমে মদীনায় ইসলামের প্রচার প্রসার ঘটলো আর তখন থেকেই সেখানে মুসলমানদের হিজরত শুরু হলো। বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা ও অক্ষমতার শিকার কিছু সংখ্যক মুসলমান মক্কায় রয়ে গেলেন। এছাড়া রাসূলুল্লাহ আলী ইব্‌ন আবু তালিব ও আবু বকর ইব্‌ন কুহাফাও মক্কায় থেকে গিয়েছিলেন।

রাসূল -এর মদীনায় হিজরত কুরায়শদেরকে শংকিত করে তুললো। এসব ঘটনা ও পরিস্থিতির ধারাপ্রবাহ চলছিলো, যার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আমীরুল মু'মিনীন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-এর জীবনী গ্রন্থে তুলে ধরা সম্ভব নয় এবং এখানে তা বর্ণনা করার প্রয়োজনও নেই, বরং সীরাতুন্নবী হলো এ আলোচনার প্রকৃষ্ট স্থান। বস্তুত সীরাতুন্নবী তো হলো আকূল সমুদ্র। [সীরাতুন্ননবী, পৃষ্ঠা-১২০-১৫৯)

অবশেষে কুরায়শরা 'দারুন-নাদওয়া' সভাগৃহে একত্র হয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিল যে, প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে সাহসী ও সম্ভ্রান্ত যুবক নির্বাচন করা হবে এবং এই যুবকরা নবীগৃহে হানা দিয়ে একযোগে তাঁকে হত্যা করবে। এভাবে তাঁর রক্তের দায় সকল গোত্রে বিভক্ত হলে বনূ আবদে মানাফ সমগ্র কুরায়শের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সাহস পাবে না। এ সিদ্ধান্তে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলে সকলে নিজ নিজ ঘরে ফিরে গেলো।

কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর রাসূলকে এ চক্রান্তের কথা জানিয়ে দিলেন। তখন তিনি আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা)-কে বিছানায় তাঁর চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে বলে এ মর্মে আশ্বস্ত করলেন, "কোন অনিষ্ট তোমাকে স্পর্শ করবে না।"

বস্তুত এটা কোন সাধারণ ব্যাপার ছিলো না, বরং বিশ্ব ইতিহাসে দুর্লভ ঘটনা। নিশ্চিত মৃত্যুর 'কণ্টক শয্যা' চোখ বুজে নিশ্চিন্তে তিনিই শুধু ঘুমাতে পারেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি রয়েছে যাঁর সুদৃঢ় ঈমান ও গভীর ভালোবাসা এবং যিনি নববী ওয়াদায় অটুট আস্থা রেখে জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকতে পারেন। হযরত আলী (রা) ভালোভাবেই জানতেন যে, ইসলাম ও তাঁর নবীর প্রতি কুরায়শের কী সীমাহীন বিদ্বেষ ছিলো! তিনি আরো জানতেন যে, কুরায়েশরা যখন দেখবে যে, রাসূল হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছেন তখন তাঁরই ওপর নেমে আসবে তাদের উন্মত্ত আক্রোশ ও প্রতিহিংসার আগুন। কিন্তু সব কিছু তুচ্ছ জ্ঞান করে 'কিছুই জানি না' এমনভাবে তিনি আল্লাহর রাসূলের বিছানায় প্রশান্ত চিত্তে শুয়ে থাকলেন। বিশ্বে এহেন আত্মত্যাগের তুলনা সত্যিই বিরল।

একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিয়ে শত্রুদল নবীগৃহের দোরগোড়ায় জড়ো হলো। রাসূলুল্লাহ এক মুঠি মাটি হাতে নিলেন এবং সূরা ইয়াসীনের শুরু হতে فَأَغْشَيْنَاهُمْ فَهُمْ لَا يبصرون পর্যন্ত তিলাওয়াত করতে করতে তাদের মাথার ওপর ছিটিয়ে দিলেন। আর আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রাসূলকে তাদের দৃষ্টি থেকে এমনভাবে নিয়ে এলেন যে, তারা তাঁকে দেখতে পেলো না। তখন তিনি নির্বিঘ্নে বেরিয়ে গেলেন। এ সময় এক অপরিচিত 'আগন্তুক' তাদের বলল, এখানে তোমরা কার অপেক্ষায় আছো? তারা বললো, মুহাম্মদ-এর অপেক্ষায়। তখন সে বললো, আল্লাহ্র শপথ, মুহম্মদ তো তাঁর মতলবে বেরিয়ে গেছেন! তারা উঁকি দিয়ে ঘুমন্ত আলীকে বিছানায় দেখে সন্দেহমুক্ত হলো যে, আল্লাহ্র রাসূলই শুয়ে আছেন। কিন্তু ভোরে হযরত আলী (রা)-কে বিছানা ছেড়ে উঠতে দেখে ব্যর্থতার লজ্জা ও গ্লানি নিয়ে তারা ফিরে গেলো। [সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮০-৮৩]

ইবনে সা'দের এক বর্ণনায় আছে, হযরত আলী (রা) বলেন, মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত কালে রাসূল লোকদের গচ্ছিত আমানতসমূহ প্রত্যর্পণ করার জন্য আমাকে তাঁর স্থলে থেকে যেতে বললেন। এজন্যই তাঁকে 'আল-আমীন' বলা হতো। যা-ই হোক, আমি তিন দিনে যাবতীয় আমানত প্রত্যর্পণ করে মক্কা থেকে বের হলাম এবং রাসূলুল্লাহ -কে অনুসরণ করে বনূ আমির ইব্‌ন আওফ গোত্রে উপনীত হলাম। তিনি সেখানে কুলছুম ইদুল হাদামের গৃহে অবস্থান করছিলেন। আমিও তাঁর মেহমান হলাম। [কানযুল উম্মাল, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৫]

হযরত আলী (রা) মদীনা পর্যন্ত সমগ্র সফর দিনে আত্মগোপন করে রাতে পথ চলতেন। দীর্ঘ পথ চলায় তাঁর পদদ্বয় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিলো। নবী বললেন, আলীকে আমার কাছে ডেকে পাঠাও। তাঁকে অবহিত করা হলো যে, তিনি তো হাঁটতেই পারছেন না। তখন নবী করিম স্বয়ং তাশরীফ নিলেন এবং তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, আর পায়ের ফোলা দেখে স্নেহাতিশয্যে কেঁদে ফেললেন। অতঃপর দুই হাতে থুথু নিয়ে তাঁর পদদ্বয় মালিশ করে দিলেন। ফলে শাহাদাতের দিন পর্যন্ত পায়ে কখনো তিনি কোন অসুস্থতা বোধ করেন নি। [ইবনুল আছীরকৃত আল কামিল, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৭৫]

রবিউল আউয়াল মাসের মধ্যভাগে আল্লাহ্র রাসূল আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অবস্থানকালেই হযরত আলী (রা)-এর আগমন হয়েছিলো। [তাবাকাতুল কোবরা, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২২]

ফন্ট সাইজ
15px
17px