📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত আলী (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ

📄 হযরত আলী (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ


ইবনে ইসহাক (র) লিখেছেন, নবী ও হযরত খাদীজা (রা)-কে একদিন নামায পড়তে দেখে হযরত আলী (রা) জিজ্ঞেস করলেন, হে মুহম্মদ, এটা কি? তিনি বললেন, এটা আল্লাহর পছন্দকৃত দীন। এই দীনের বাহকরূপেই তিনি তাঁর রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। সুতরাং লাত-ওযযাকে অস্বীকার করে এক লা শরীক আল্লাহর ইবাদতের জন্য তোমাকে আমি আহ্বান করছি। হযরত আলী (রা) তখন বললেন, আজকের পূর্বে এমন কথা আমি আর কখনো শুনিনি। সুতরাং আবূ তালিবকে না বলে কোন ফায়সালা করতে পারি না। নিজে ঘোষণা দেয়ার পূর্বে বিষয়টি জানাজানি হওয়া আল্লাহর রাসূল অপছন্দ করলেন, তাই বললেন, হে আলী! ইসলাম গ্রহণ যদি না কর তাহলে গোপন রাখ। তিনি ঐ দিন ঐভাবেই ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ আলী (রা)-এর অন্তরে (ঐ রাতেই) ইসলামের সুধা ঢেলে দিলেন। ফলে প্রত্যুষে তিনি নবী-এর কাছে গিয়ে বললেন, হে মুহম্মদ! আমার সামনে (তখন) কী পেশ করেছিলেন?

রাসূলুল্লাহ বললেন, "তুমি সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। আর তুমি লাত-ওযযাকে অস্বীকার করবে এবং সকল দেবদেবীর সাথে সম্পর্কহীনতার কথা ঘোষণা করবে।"

হযরত আলী (রা) তা স্বীকার করে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তবে আবূ তালিবের পক্ষ হতে আশংকা বোধ করে তা প্রকাশ না করে গোপন রাখলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২৪]

অধিকাংশের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত বিশুদ্ধ ও মত এই যে, খাদীজা (রা)-এর পর তিনিই হলেন প্রথম মুসলিম ও প্রথম সালাত আদায়কারী। যায়দ ইব্‌ন আরকাম (রা) বলেন, আল্লাহ্র রাসূলের হাতে প্রথম যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন তিনি হলেন হযরত আলী। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, হযরত খাদীজা (রা)-এর পরে আলী (রা)-ই প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মুহম্মদ ইব্‌ন আবদুর রহমান ইব্‌ন যুরারা (রা) বলেন, হযরত আলী (রা) নয় বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মুজাহিদ (র)-এর বর্ণনামতে হযরত আলী (রা) হলেন প্রথম সালাত আদায়কারী। আর তখন তাঁর বয়স ছিলো দশ বছর। হযরত হাসান ইব্‌ন যায়েদ বলেন, অল্প বয়স হওয়ায় তিনি মূর্তি পূজা করেন নি। [ইবনে সা'দ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২১]

স্বভাব ও প্রকৃতি এবং পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার অনিবার্য ধারা অবশ্য সেটাই প্রমাণিত করে যে, তাঁর প্রতিপালন হয়েছে নবীগৃহে, নবীর তত্ত্বাবধানে এবং নবুয়তের নূরানী পরিবেশে, যেখানে সমগ্র মানব জাতির উদ্দেশে ইসলামের দাওয়াত এবং আল্লাহর বাণী ও রিসালাতের বিকাশ ঘটেছে। সুতরাং যদি কোন প্রবল প্রতিকূলতা না থাকে এবং স্বভাব-প্রকৃতি যদি সত্যবিমুখ ও অনুভূতিহীন না হয়, তাহলে এই নূরানী পরিবেশে নূরানী প্রভাব গ্রহণ করা তো খুবই স্বাভাবিক! আর আলী (রা) ছিলেন এ সকল ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পূত-পবিএ।

কোন কোন গবেষক আলিম বর্ণনাগুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন করে বলেছেন, ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে আহলে বায়ত ও নারী সমাজের মধ্যে প্রথম হলেন উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা (রা), 'পরিপক্ব ও জ্ঞানী' পুরুষদের মাঝে হযরত আবূ বকর (রা) এবং অল্প বয়স্কদের মাঝে হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)। তবে প্রথম বক্তব্যই যুক্তির নিকটতর। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৯-৪০]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আবূ তালিবের সামনে হযরত আলী (রা)

📄 আবূ তালিবের সামনে হযরত আলী (রা)


কিছু সংখ্যক আলিমের বর্ণনাসূত্রে ইব্‌ন ইসহাক বলেন, সালাতের সময় রাসূলুল্লাহ মক্কার কোন পাহাড়ী স্থানে চলে যেতেন। হযরত আলী (রা) পিতা আবু তালিব ও গোত্রের লোকদের চোখের আড়ালে তাঁর সাথে যেতেন এবং সেখানে সালাত-ইবাদত করে সন্ধ্যায় ফিরে আসতেন। আল্লাহর যতদিন ইচ্ছা হলো ততদিন তাঁদের এ অবস্থা অব্যাহত থাকলো। একদিন আবু তালিব পুত্র আলী (রা) ও ভ্রাতুষ্পুত্র নবী -কে সালাতরত অবস্থায় পেয়ে আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাতিজা! এ কোন্ ধর্ম যা তোমাকে পালন করতে দেখছি?

তিনি বললেন, হে চাচাজান! এ হলো আল্লাহর দীন, তাঁর ফেরেশতাদের দীন, তাঁর রাসূলগণের আনীত দীন এবং আমাদের পিতা ইব্রাহীম (আ)-এর দীন কিংবা এ ধরনের কোন কথা তিনি বললেন। আল্লাহ্ আমাকে মানুষের কাছে রাসলুরূপে পাঠিয়েছেন। চাচাজান, আমি যাদের কল্যাণকামী ও হেদায়াত প্রত্যাশী তাদের মাঝে আপনি এর অধিক হকদার। এ ডাকে সাড়া দিয়ে আমাকে সাহায্য করার ব্যাপারে আপনিই সর্বোত্তম হকদার কিংবা তিনি অনুরূপ বলেছেন।

আবু তালিব বললেন, হে স্নেহাস্পদ ভাতিজা! আমি তো পূর্বপুরুষের ধর্ম ও তাদের আদর্শ ত্যাগ করতে পারি না। আল্লাহর শপথ! তুমি কষ্ট পাও আমার জীবন থাকতে এমন কিছু তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। হযরত আলী (রা)-কে তিনি বলেছেন, বৎস! এ কোন্ ধর্ম তুমি গ্রহণ করেছো? তিনি বললেন, পিতা, আমি আল্লাহ ও রাসূল যা এনেছেন তা সত্য বলে মেনে নিয়েছি, তাঁকে অনুসরণ করেছি এবং তাঁর সঙ্গে আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করেছি।

জবাবে হযরত আলী (রা)-কে তিনি বলেছেন, কল্যাণের পথেই তিনি তোমাকে ডেকেছেন। সুতরাং তাঁর সাহচর্য অপরিহার্য করে নাও। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা-২৪৬]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 সত্যের সন্ধানে মক্কায় আগতদের সহযোগিতা

📄 সত্যের সন্ধানে মক্কায় আগতদের সহযোগিতা


সত্যের সন্ধানে কিংবা ইসলামের আকর্ষণে যাঁরা মক্কায় আসতেন আলী (রা) সর্বদা তাঁদের সাহায্য করতেন এবং তাঁদেরকে আল্লাহর রাসূলের কাছে পৌঁছে দিতেন। বস্তুত তিনি ছিলেন হাশেমী পরিবারের সহজাত দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার পূর্ণ অধিকারী। হযরত আবূ যর গিফারী (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় আমরা তার কিছুটা পরিচয় পাই। নিজ সনদে ইমাম বুখারী (র) হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতে এরূপ বর্ণনা করেছেন।

রাসূলুল্লাহ -এর সংবাদ শুনে আবু যর তাঁর ভাইকে বললেন, এই মক্কা উপত্যকার উদ্দেশে সওয়ারি প্রস্তুত কর এবং যিনি নিজকে নবী দাবি করেন এবং আসমান থেকে খবর আসার কথা বলেন, তাঁর কথাবার্তা শুনে ও খোঁজ-খবর নিয়ে আমার কাছে ফিরে এসো। আবূ যরের ভ্রাতা মক্কায় এসে তাঁর কথাবার্তা শুনে ফিরে গিয়ে বললেন, আমি তাঁকে মহত্তম চরিত্রের বিষয়ে কথা বলতে শুনেছি এবং এমন 'বাণী' তাঁর কাছে শুনেছি যা কবিতা নয়।

আবু যর (রা) বললেন, তুমি আমার মনস্কামনা পূর্ণ করতে পার নি। অতঃপর তিনি রসদপত্র ও পানির মশক সাথে নিয়ে মক্কায় উপনীত হলেন। এরপর মাসজিদুল হারামে এসে রাসূলুল্লাহ -কে খোঁজ করলেন। তিনি তাঁকে চিনতেন না, তবে তিনি কারো কাছে জিজ্ঞেস করাও সমীচীন মনে করলেন না। ইতোমধ্যে রাত হয়ে গেলো। তিনি সেখানেই শুয়ে পড়লেন। হযরত আলী (রা) তাঁকে বিদেশী পর্যটক বুঝতে পেরে ইশারা করলেন। আবু যর (রা) তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁদের পারস্পরিক প্রশ্ন বিনিময় হলো না। এভাবে ভোর হয়ে গেলো। এরপর তিনি মশক ও রসদপত্রসহ মসজিদে চলে এলেন। কিন্তু সারা দিনেও তিনি নবী -এর সাক্ষাৎ পেলেন না। সন্ধ্যায় তিনি আপন শয়নস্থলে ফিরে এলেন। হযরত আলী (রা) চলে যাওয়ার সময় ভাবলেন, মনে হয় পরদেশী এখনো তার ঠিকানা খুঁজে পায়নি। তাই তিনি তাঁকে সাথে নিয়ে গেলেন। এবারও কোন কথা হলো না। তৃতীয় দিন যখন একই ঘটনা ঘটলো তখন তিনি ঘরে এনে বললেন, আপনার আগমনের উদ্দেশ্য কি আমাকে বলবেন? তিনি বললেন, পথ প্রদর্শনের প্রতিশ্রুতি দিলে বলবো। তিনি প্রতিশ্রুতি দিলে আবু যর (রা) তার উদ্দেশ্য জানালেন।

আলী (রা) বললেন, নিঃসন্দেহে তিনি আল্লাহ্র প্রেরিত সত্য রাসূল। আপনি আমার অনুগমন করুন। যদি আপনার জন্য আশংকার কোন কারণ দেখি তাহলে আমি পেশাব করার ছলে বসে পড়বো, আর আমি যদি পথ চলা অব্যাহত রাখি তাহলে আপনি আমার পেছনে পেছনে চলে আসবেন এবং আমি যেখানে প্রবেশ করি সেখানে প্রবেশ করবেন। এভাবে আবু যর (রা)-কে তিনি নবী -এর কাছে নিয়ে গেলেন। আবু যর (রা) তাঁর কথা শুনে সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করলেন। [সহীহ বুখারী]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 অনন্য মর্যাদা

📄 অনন্য মর্যাদা


আলী (রা) বলেন, আমি ও নবী করিম কা'বার পাদদেশে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বসতে বললেন এবং তিনি আমার কাঁধে উঠলেন। আমি তাঁকে নিয়ে দাঁড়াতে গেলাম। তিনি আমার অপারগতা বুঝে নেমে গেলেন এবং নিজে বসে আমাকে তাঁর কাঁধে উঠতে বললেন। আমি তাই করলাম। তিনি আমাকে নিয়ে দাঁড়ালেন। হযরত আলী (রা) বলেন, মনে হলো যেন ইচ্ছা করলে আমি আকাশের প্রান্ত স্পর্শ করতে পারব! অতঃপর আমি কা'বাগৃহে উঠে পড়লাম। সেখানে স্বর্ণের কিংবা পিতলের মূর্তি ছিলো। আমি সেটাকে ডানে-বামে ও সামনে পেছনে নাড়া দিয়ে তুলে ফেললাম এবং রাসূলুল্লাহ -এর নির্দেশে ছুঁড়ে ফেললাম। শিশি যেমন ভেঙ্গে যায় তেমনি তা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। অতঃপর আমি নেমে এলাম এবং কেউ দেখে ফেলে কি না এ আশংকায় আমরা উভয়ে এক দৌড়ে বাড়িঘরের আড়ালে চলে গেলাম। (মুসনাদে আহমাদ) স্পষ্টতই এটা ছিলো হিজরত-পূর্ব ঘটনা। [মুস্তাদরাকে হাকেম]

ফন্ট সাইজ
15px
17px