📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 জন্ম

📄 জন্ম


বিশুদ্ধ মতে নবুয়তের দশ বছর পূর্বে হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) জন্মগ্রহণ করেছেন। [আল-ইসাবা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫০৭]

ইবন সা'আদ বলেন, খ্রীস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর ত্রিশতম হস্তিবর্ষের রজব মাসের বার তারিখ রাতে তাঁর জন্ম। [ইবন সা'দ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১, আল-বাদরীন অধ্যায়]

হাকীম বিন হিযাম (রা)-এর পরিচিতি প্রসঙ্গে ইমাম হাকিম (র) বলেন, প্রসিদ্ধ বর্ণনা এই যে, ফাতিমা বিনতে আসাদ আমীরুল মু'মিনীন আবী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-কে কা'বার অভ্যন্তরে প্রসব করেছেন। অনুরূপভাবে হাকীম ইবন হিযাম (রা)-ও কাবাগৃহে জন্মগ্রহণ করেছেন। কিন্তু 'নাহজুল বালাগাহ'-এর ভাষ্যকার ইবনু আবিল হাদীদ বলেন, আলী (রা)-এর ভূমিষ্ঠ স্থান সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। বহু শিয়া কা'বাঘরকে চিহ্নিত করলেও হাদীসশাস্ত্রবিশারদগণ তা স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে কাবাঘরে জন্মগ্রহণকারী হলেন হাকীম ইব্‌ন হিযাম ইব্‌ন খোয়ায়লিদ ইবনে আসাদ ইবনে আবদুল উযযা ইব্‌ন কুসাঈ। [ইবনে আবুল হাদীদ: শারহু নাহজিল বালাগাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালন

📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালন


নিজস্ব সনদে তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে মুজাহিদ হতে বর্ণনা করেন। মুজাহিদ বলেন, আলী ইব্‌ন আবূ তালিবের প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহ ছিলো যে, আল্লাহ তাঁর কল্যাণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন। কুরায়শের দুর্ভিক্ষকালে আবূ তালিবের বিরাট পরিবারের কথা ভেবে রাসূলুল্লাহ তাঁর চাচা আব্বাসকে বললেন (তিনি ছিলেন সচ্ছলতম হাশেমী), হে আব্বাস, আপনার ভাই আবূ তালিবের পরিবার বড়, আর দুর্ভিক্ষে মানুষের দুর্দশা তো দেখতেই পাচ্ছেন। আসুন, আমরা তাঁর ভার লাঘব করি। আমি একজন, আপনি একজন এভাবে আমরা তার ঘরের দু'জনের দায়িত্ব গ্রহণ করি। আব্বাস তাতে সায় দিলেন।

তখন তাঁরা আবু তালিবের কাছে গিয়ে বললেন, সংকটকাল পর্যন্ত আমরা আপনার ভার কিছুটা লাঘব করতে চাই। তখন আবু তালিব বললেন, আকীলকে আমার জন্য রেখে তোমাদের যা ইচ্ছা করতে পারো। তখন রাসূলুল্লাহ আলীকে ও আব্বাস (রা) জাফরকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করে নিলেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ যখন নবুয়ত প্রাপ্ত হন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব তখন নবীগৃহে নবীর সান্নিধ্যে বাস করছিলেন এবং নবুয়তের সত্যতা স্বীকার করে তার অনুসরণ করেছিলেন। অন্যদিকে হযরত জাফরও আব্বাস (রা)-এর প্রতিপালনে থেকে এক সময় ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং পৃথক হয়ে গেলেন। [তাবারী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩১৩]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত আলী (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ

📄 হযরত আলী (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ


ইবনে ইসহাক (র) লিখেছেন, নবী ও হযরত খাদীজা (রা)-কে একদিন নামায পড়তে দেখে হযরত আলী (রা) জিজ্ঞেস করলেন, হে মুহম্মদ, এটা কি? তিনি বললেন, এটা আল্লাহর পছন্দকৃত দীন। এই দীনের বাহকরূপেই তিনি তাঁর রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। সুতরাং লাত-ওযযাকে অস্বীকার করে এক লা শরীক আল্লাহর ইবাদতের জন্য তোমাকে আমি আহ্বান করছি। হযরত আলী (রা) তখন বললেন, আজকের পূর্বে এমন কথা আমি আর কখনো শুনিনি। সুতরাং আবূ তালিবকে না বলে কোন ফায়সালা করতে পারি না। নিজে ঘোষণা দেয়ার পূর্বে বিষয়টি জানাজানি হওয়া আল্লাহর রাসূল অপছন্দ করলেন, তাই বললেন, হে আলী! ইসলাম গ্রহণ যদি না কর তাহলে গোপন রাখ। তিনি ঐ দিন ঐভাবেই ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ আলী (রা)-এর অন্তরে (ঐ রাতেই) ইসলামের সুধা ঢেলে দিলেন। ফলে প্রত্যুষে তিনি নবী-এর কাছে গিয়ে বললেন, হে মুহম্মদ! আমার সামনে (তখন) কী পেশ করেছিলেন?

রাসূলুল্লাহ বললেন, "তুমি সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। আর তুমি লাত-ওযযাকে অস্বীকার করবে এবং সকল দেবদেবীর সাথে সম্পর্কহীনতার কথা ঘোষণা করবে।"

হযরত আলী (রা) তা স্বীকার করে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তবে আবূ তালিবের পক্ষ হতে আশংকা বোধ করে তা প্রকাশ না করে গোপন রাখলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২৪]

অধিকাংশের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত বিশুদ্ধ ও মত এই যে, খাদীজা (রা)-এর পর তিনিই হলেন প্রথম মুসলিম ও প্রথম সালাত আদায়কারী। যায়দ ইব্‌ন আরকাম (রা) বলেন, আল্লাহ্র রাসূলের হাতে প্রথম যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন তিনি হলেন হযরত আলী। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, হযরত খাদীজা (রা)-এর পরে আলী (রা)-ই প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মুহম্মদ ইব্‌ন আবদুর রহমান ইব্‌ন যুরারা (রা) বলেন, হযরত আলী (রা) নয় বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মুজাহিদ (র)-এর বর্ণনামতে হযরত আলী (রা) হলেন প্রথম সালাত আদায়কারী। আর তখন তাঁর বয়স ছিলো দশ বছর। হযরত হাসান ইব্‌ন যায়েদ বলেন, অল্প বয়স হওয়ায় তিনি মূর্তি পূজা করেন নি। [ইবনে সা'দ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২১]

স্বভাব ও প্রকৃতি এবং পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার অনিবার্য ধারা অবশ্য সেটাই প্রমাণিত করে যে, তাঁর প্রতিপালন হয়েছে নবীগৃহে, নবীর তত্ত্বাবধানে এবং নবুয়তের নূরানী পরিবেশে, যেখানে সমগ্র মানব জাতির উদ্দেশে ইসলামের দাওয়াত এবং আল্লাহর বাণী ও রিসালাতের বিকাশ ঘটেছে। সুতরাং যদি কোন প্রবল প্রতিকূলতা না থাকে এবং স্বভাব-প্রকৃতি যদি সত্যবিমুখ ও অনুভূতিহীন না হয়, তাহলে এই নূরানী পরিবেশে নূরানী প্রভাব গ্রহণ করা তো খুবই স্বাভাবিক! আর আলী (রা) ছিলেন এ সকল ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পূত-পবিএ।

কোন কোন গবেষক আলিম বর্ণনাগুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন করে বলেছেন, ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে আহলে বায়ত ও নারী সমাজের মধ্যে প্রথম হলেন উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা (রা), 'পরিপক্ব ও জ্ঞানী' পুরুষদের মাঝে হযরত আবূ বকর (রা) এবং অল্প বয়স্কদের মাঝে হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)। তবে প্রথম বক্তব্যই যুক্তির নিকটতর। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৯-৪০]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আবূ তালিবের সামনে হযরত আলী (রা)

📄 আবূ তালিবের সামনে হযরত আলী (রা)


কিছু সংখ্যক আলিমের বর্ণনাসূত্রে ইব্‌ন ইসহাক বলেন, সালাতের সময় রাসূলুল্লাহ মক্কার কোন পাহাড়ী স্থানে চলে যেতেন। হযরত আলী (রা) পিতা আবু তালিব ও গোত্রের লোকদের চোখের আড়ালে তাঁর সাথে যেতেন এবং সেখানে সালাত-ইবাদত করে সন্ধ্যায় ফিরে আসতেন। আল্লাহর যতদিন ইচ্ছা হলো ততদিন তাঁদের এ অবস্থা অব্যাহত থাকলো। একদিন আবু তালিব পুত্র আলী (রা) ও ভ্রাতুষ্পুত্র নবী -কে সালাতরত অবস্থায় পেয়ে আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাতিজা! এ কোন্ ধর্ম যা তোমাকে পালন করতে দেখছি?

তিনি বললেন, হে চাচাজান! এ হলো আল্লাহর দীন, তাঁর ফেরেশতাদের দীন, তাঁর রাসূলগণের আনীত দীন এবং আমাদের পিতা ইব্রাহীম (আ)-এর দীন কিংবা এ ধরনের কোন কথা তিনি বললেন। আল্লাহ্ আমাকে মানুষের কাছে রাসলুরূপে পাঠিয়েছেন। চাচাজান, আমি যাদের কল্যাণকামী ও হেদায়াত প্রত্যাশী তাদের মাঝে আপনি এর অধিক হকদার। এ ডাকে সাড়া দিয়ে আমাকে সাহায্য করার ব্যাপারে আপনিই সর্বোত্তম হকদার কিংবা তিনি অনুরূপ বলেছেন।

আবু তালিব বললেন, হে স্নেহাস্পদ ভাতিজা! আমি তো পূর্বপুরুষের ধর্ম ও তাদের আদর্শ ত্যাগ করতে পারি না। আল্লাহর শপথ! তুমি কষ্ট পাও আমার জীবন থাকতে এমন কিছু তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। হযরত আলী (রা)-কে তিনি বলেছেন, বৎস! এ কোন্ ধর্ম তুমি গ্রহণ করেছো? তিনি বললেন, পিতা, আমি আল্লাহ ও রাসূল যা এনেছেন তা সত্য বলে মেনে নিয়েছি, তাঁকে অনুসরণ করেছি এবং তাঁর সঙ্গে আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করেছি।

জবাবে হযরত আলী (রা)-কে তিনি বলেছেন, কল্যাণের পথেই তিনি তোমাকে ডেকেছেন। সুতরাং তাঁর সাহচর্য অপরিহার্য করে নাও। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা-২৪৬]

ফন্ট সাইজ
15px
17px