📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশী

📄 আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশী


নাজাশী যখন মুসলিম মুহাজিরদের প্রশ্ন করলেন, এ কোন্ ধর্ম যার জন্য তোমরা স্বজাতিকে পরিত্যাগ করলে এবং সনাতন কোন ধর্মে প্রবেশ করলে না?

হযরত জাফর তখন জবাব দিতে অগ্রসর হলেন এবং কথা না বাড়িয়ে শুধু জাহিলিয়্যা যুগের বাস্তব চিত্র তুলে ধরলেন। অতঃপর ইসলাম তার অনুসারীদের জীবনে যে মহাবিপ্লব সাধন করেছে তা তুলে ধরলেন। বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে কিংবা খ্রীস্ট ধর্মের অনুরাগী ও পৃষ্ঠপোষক একজন শাসক উত্তেজিত হতে পারেন, এমন কি একজন সাধারণ অমুসলিমের অন্তরে জাহিলিয়াতের উন্মাদনা মাথা চাড়া দিতে পারে, এমন কোন বিষয় তিনি আদৌ উত্থাপন করলেন না, বরং তাঁর বক্তব্য ছিলো আগাগোড়া বাস্তব অবস্থার নিখুঁত বিবরণ। বস্তুত এ ছিলো স্থান-কাল-পাত্র উপযোগী এমন প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষণ, যা শুধু তার উচ্চাঙ্গ আরবী অলংকার জ্ঞানের পরিচ্ছদই নয়, বরং চিন্তা ও বুদ্ধিগত প্রজ্ঞারও পরিচায়ক। সেই সাথে তাঁর স্বভাব বিশুদ্ধতা ও জ্ঞানের গভীরতার পরিচায়ক যা কুরায়শ গোত্রে হাশিম পরিবারের বৈশিষ্ট্য ছিলো। আর সকলের মাঝে জাফরের ছিলো ভিন্নতর বৈশিষ্ট্য। [আস-সীরাতুন নবুবিয়াহ, পৃষ্ঠা-১৩৩-৩৪)

নবী-এর চাচাত বোন আবূ তালিব-তনয়া উম্মে হানীর নাম ফাখিতা মতান্তরে ফাতিমা বা হিন্দা, তবে তাঁর প্রথম নামটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তিনি হোবায়রা ইব্‌ন আমর ইবন 'আইস আল-মাখযুমীর স্ত্রী ছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এই চাচাত বোন সম্পর্কেই বলেছেন, কুরায়শের নারীরা শ্রেষ্ঠ।

আবূ আমর বলেন, মক্কা বিজয়ের পর হোবায়রা নাজরান এলাকায় পলাতক ছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি কৈফিয়তমূলক কবিতা বলেছেন। আবার উম্মে হানীর ইসলাম গ্রহণের খবর পেয়েও এক কবিতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। উম্মে হানীর গর্ভে তাঁর আমর নামে যে পুত্র সন্তান ছিলো সে নামেই তিনি উপনাম ধারণ করেছিলেন।

মক্কা বিজয়কালে উম্মে হানী তাঁর শ্বশুরকুল বনু মাখযূমের দু'জনকে হযরত আলী (রা)-এর হত্যার হুমকি প্রদানের প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা দান করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে উম্মে হানী রাসূলুল্লাহ-এর কাছে হাযির হলে তিনি তাঁকে শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়ে বললেন, "তুমি কাকে নিয়ে এসেছো?" তিনি দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তাকে অবহিত করলে তিনি বললেন,

"যারা তোমার আশ্রয় ও নিরাপত্তা পেয়েছে আমিও তাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিলাম। আর তাদের হত্যা করা হবে না।"

বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রাসূল তার বাড়িতে গোসল করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিজয়ের আট রাকাত শোকরানা সালাত আদায় করেছিলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০০]

সহীহ বুখারীতে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন উম্মে হানী বিনতে আবূ তালিবের ঘরে যান এবং গোসল করে আট রাকআত শোকরানা সালাত আদায় করেন।

সিহাহ্ সিত্তা ও অন্যান্য গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ হতে উম্মে হানী থেকে বর্ণিত হাদীস রয়েছে। তিরমিযী ও অন্যদের মতে হযরত আলী (রা)-এর পরেও তিনি বেঁচে ছিলেন। [আল-ইসাবা, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৭-৩১৮]

আবূ আহমদ আল-আসকারী বলেন, জুমানাহ বিনতে আবূ তালিব হলেন আবদুল্লাহ ইব্‌ন আবূ সুফিয়ান ইব্‌ন হারিছ ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবের মাতা। এই মত সমর্থন করে 'কিতাবুল উখওয়া' গ্রন্থে ইমাম দারে কুতনী (বিনা সনদে) বলেছেন, আবু সুফিয়ান ইব্‌ন হারিছ তাঁকে বিবাহ করেছিলেন এবং তার গর্ভে আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

যুবায়র ইব্‌ন বাক্কার (রা) বলেন, ইনি উম্মে হানীর বোন, খায়বারের ফসল থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের জন্য ত্রিশ 'ওয়াসাক' নির্ধারণ করেছিলেন তাদের তালিকা দিতে গিয়ে ইবনে ইসহাক জুমানা বিনতে আবূ তালিবের নামও উল্লেখ করেছেন।

আল্লামা ফাকেহী (র) প্রণীত মক্কা গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে উছমান ইব্‌ন জুশম বলেন, হযরত আতা, মুজাহিদ ইবনে কাছীর ও অন্যদের দেখেছি, সাতাশে রমযান রাতে তাঁরা তানঈমের উদ্দেশে বের হতেন এবং আবু তালিব তনয়া জুমানার তাঁবু থেকে উমরার ইহরাম করতেন। ইবনে সা'দ (র) জুমানার আলোচনা তাঁর মাতা ফাতিমা বিনতে আসাদ প্রসঙ্গে এনেছেন। আবার নবী -এর চাচাত ভগ্নিগণ শিরোনামে আলাদাভাবেও এনেছেন এবং বলেছেন, আবু সুফিয়ানের পুত্র জাফর তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন। খায়বারের ফসল থেকে আল্লাহর রাসূল তাঁকে ত্রিশ ওয়াসাক পরিমাণ দান করেছিলেন। [প্রাগুক্ত, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২৫৯-২৬০]

টিকাঃ
২. নাজাশী উদ্দেশে প্রদত্ত হযরত জাফরের জবাব পড়ুন সীরাতে ইবনে হিশামে, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৩৪-৩৮)

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 জন্ম

📄 জন্ম


বিশুদ্ধ মতে নবুয়তের দশ বছর পূর্বে হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) জন্মগ্রহণ করেছেন। [আল-ইসাবা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫০৭]

ইবন সা'আদ বলেন, খ্রীস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর ত্রিশতম হস্তিবর্ষের রজব মাসের বার তারিখ রাতে তাঁর জন্ম। [ইবন সা'দ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১, আল-বাদরীন অধ্যায়]

হাকীম বিন হিযাম (রা)-এর পরিচিতি প্রসঙ্গে ইমাম হাকিম (র) বলেন, প্রসিদ্ধ বর্ণনা এই যে, ফাতিমা বিনতে আসাদ আমীরুল মু'মিনীন আবী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-কে কা'বার অভ্যন্তরে প্রসব করেছেন। অনুরূপভাবে হাকীম ইবন হিযাম (রা)-ও কাবাগৃহে জন্মগ্রহণ করেছেন। কিন্তু 'নাহজুল বালাগাহ'-এর ভাষ্যকার ইবনু আবিল হাদীদ বলেন, আলী (রা)-এর ভূমিষ্ঠ স্থান সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। বহু শিয়া কা'বাঘরকে চিহ্নিত করলেও হাদীসশাস্ত্রবিশারদগণ তা স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে কাবাঘরে জন্মগ্রহণকারী হলেন হাকীম ইব্‌ন হিযাম ইব্‌ন খোয়ায়লিদ ইবনে আসাদ ইবনে আবদুল উযযা ইব্‌ন কুসাঈ। [ইবনে আবুল হাদীদ: শারহু নাহজিল বালাগাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালন

📄 রাসূলুল্লাহ (সা)-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালন


নিজস্ব সনদে তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে মুজাহিদ হতে বর্ণনা করেন। মুজাহিদ বলেন, আলী ইব্‌ন আবূ তালিবের প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহ ছিলো যে, আল্লাহ তাঁর কল্যাণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন। কুরায়শের দুর্ভিক্ষকালে আবূ তালিবের বিরাট পরিবারের কথা ভেবে রাসূলুল্লাহ তাঁর চাচা আব্বাসকে বললেন (তিনি ছিলেন সচ্ছলতম হাশেমী), হে আব্বাস, আপনার ভাই আবূ তালিবের পরিবার বড়, আর দুর্ভিক্ষে মানুষের দুর্দশা তো দেখতেই পাচ্ছেন। আসুন, আমরা তাঁর ভার লাঘব করি। আমি একজন, আপনি একজন এভাবে আমরা তার ঘরের দু'জনের দায়িত্ব গ্রহণ করি। আব্বাস তাতে সায় দিলেন।

তখন তাঁরা আবু তালিবের কাছে গিয়ে বললেন, সংকটকাল পর্যন্ত আমরা আপনার ভার কিছুটা লাঘব করতে চাই। তখন আবু তালিব বললেন, আকীলকে আমার জন্য রেখে তোমাদের যা ইচ্ছা করতে পারো। তখন রাসূলুল্লাহ আলীকে ও আব্বাস (রা) জাফরকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করে নিলেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ যখন নবুয়ত প্রাপ্ত হন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব তখন নবীগৃহে নবীর সান্নিধ্যে বাস করছিলেন এবং নবুয়তের সত্যতা স্বীকার করে তার অনুসরণ করেছিলেন। অন্যদিকে হযরত জাফরও আব্বাস (রা)-এর প্রতিপালনে থেকে এক সময় ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং পৃথক হয়ে গেলেন। [তাবারী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩১৩]

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত আলী (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ

📄 হযরত আলী (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ


ইবনে ইসহাক (র) লিখেছেন, নবী ও হযরত খাদীজা (রা)-কে একদিন নামায পড়তে দেখে হযরত আলী (রা) জিজ্ঞেস করলেন, হে মুহম্মদ, এটা কি? তিনি বললেন, এটা আল্লাহর পছন্দকৃত দীন। এই দীনের বাহকরূপেই তিনি তাঁর রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। সুতরাং লাত-ওযযাকে অস্বীকার করে এক লা শরীক আল্লাহর ইবাদতের জন্য তোমাকে আমি আহ্বান করছি। হযরত আলী (রা) তখন বললেন, আজকের পূর্বে এমন কথা আমি আর কখনো শুনিনি। সুতরাং আবূ তালিবকে না বলে কোন ফায়সালা করতে পারি না। নিজে ঘোষণা দেয়ার পূর্বে বিষয়টি জানাজানি হওয়া আল্লাহর রাসূল অপছন্দ করলেন, তাই বললেন, হে আলী! ইসলাম গ্রহণ যদি না কর তাহলে গোপন রাখ। তিনি ঐ দিন ঐভাবেই ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ আলী (রা)-এর অন্তরে (ঐ রাতেই) ইসলামের সুধা ঢেলে দিলেন। ফলে প্রত্যুষে তিনি নবী-এর কাছে গিয়ে বললেন, হে মুহম্মদ! আমার সামনে (তখন) কী পেশ করেছিলেন?

রাসূলুল্লাহ বললেন, "তুমি সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। আর তুমি লাত-ওযযাকে অস্বীকার করবে এবং সকল দেবদেবীর সাথে সম্পর্কহীনতার কথা ঘোষণা করবে।"

হযরত আলী (রা) তা স্বীকার করে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তবে আবূ তালিবের পক্ষ হতে আশংকা বোধ করে তা প্রকাশ না করে গোপন রাখলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২৪]

অধিকাংশের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত বিশুদ্ধ ও মত এই যে, খাদীজা (রা)-এর পর তিনিই হলেন প্রথম মুসলিম ও প্রথম সালাত আদায়কারী। যায়দ ইব্‌ন আরকাম (রা) বলেন, আল্লাহ্র রাসূলের হাতে প্রথম যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন তিনি হলেন হযরত আলী। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, হযরত খাদীজা (রা)-এর পরে আলী (রা)-ই প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মুহম্মদ ইব্‌ন আবদুর রহমান ইব্‌ন যুরারা (রা) বলেন, হযরত আলী (রা) নয় বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মুজাহিদ (র)-এর বর্ণনামতে হযরত আলী (রা) হলেন প্রথম সালাত আদায়কারী। আর তখন তাঁর বয়স ছিলো দশ বছর। হযরত হাসান ইব্‌ন যায়েদ বলেন, অল্প বয়স হওয়ায় তিনি মূর্তি পূজা করেন নি। [ইবনে সা'দ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২১]

স্বভাব ও প্রকৃতি এবং পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার অনিবার্য ধারা অবশ্য সেটাই প্রমাণিত করে যে, তাঁর প্রতিপালন হয়েছে নবীগৃহে, নবীর তত্ত্বাবধানে এবং নবুয়তের নূরানী পরিবেশে, যেখানে সমগ্র মানব জাতির উদ্দেশে ইসলামের দাওয়াত এবং আল্লাহর বাণী ও রিসালাতের বিকাশ ঘটেছে। সুতরাং যদি কোন প্রবল প্রতিকূলতা না থাকে এবং স্বভাব-প্রকৃতি যদি সত্যবিমুখ ও অনুভূতিহীন না হয়, তাহলে এই নূরানী পরিবেশে নূরানী প্রভাব গ্রহণ করা তো খুবই স্বাভাবিক! আর আলী (রা) ছিলেন এ সকল ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পূত-পবিএ।

কোন কোন গবেষক আলিম বর্ণনাগুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন করে বলেছেন, ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে আহলে বায়ত ও নারী সমাজের মধ্যে প্রথম হলেন উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদিজা (রা), 'পরিপক্ব ও জ্ঞানী' পুরুষদের মাঝে হযরত আবূ বকর (রা) এবং অল্প বয়স্কদের মাঝে হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)। তবে প্রথম বক্তব্যই যুক্তির নিকটতর। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৯-৪০]

ফন্ট সাইজ
15px
17px