📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত আলী (রা)-এর পিতা আবূ তালিব

📄 হযরত আলী (রা)-এর পিতা আবূ তালিব


আবূ তালিব ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব ইন্ন হাশিম ইব্‌ন আবদে মুনাফ নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পঁয়ত্রিশ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে তাঁর নাম হলো আবৃন্দে মানাফ- মতান্তরে ইমরান বা শায়বা। তবে আবু তালিব উপনামে তিনি পরিচিত।

আবু তালিব ছিলেন কুরায়শের নেতৃস্থানীয় ও মান্যবর ব্যক্তি। বিপদে ও দুর্যোগে তাঁরই ওপর ছিলো গোত্রের ভরসা। [বুলুগুল আরাব ফী মাআরিফাতি আহওয়ালিল আরাব, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২৪]

মৃত্যুকালে আবদুল মুত্তালিব তাঁকেই ইয়াতীম নবীর প্রতিপালনের জন্য অসিয়ত করেছিলেন। আর তিনিও তাঁর উত্তম প্রতিপালন করেছিলেন। [সিরাতুন নবুবিয়্যা, পৃষ্ঠা-১০৩]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা আবদুল্লাহ ও চাচা আবু তালিব ছিলেন সহোদর ভাই। তাঁদের আম্মা হলেন ফাতিমা বিনতে আমর বিন আইস ইব্‌ন আবদ ইব্‌ন ইমরান ইব্‌ন মাখযূম। [সীরাতে ইব্‌ন হিশাম, পৃষ্ঠা-১৭৯]

আর্থিক অসচ্ছলতা সত্ত্বেও ভ্রাতুষ্পুত্রকে আবূ তালিব নিজ সন্তানের চেয়েও অধিক ভালবাসতেন। আর তিনিও আবূ তালিবের পাশে ছাড়া অন্য কারো কাছে ঘুমাতেন না, এমন কি বাইরে গেলেও তাঁর সঙ্গে থাকতেন। আবূ তালিবের এমন ভালবাসা আর কারো প্রতি ছিলো না। তিনি তাঁর জন্য আলাদা খাবার রাখতেন। [হায়াতে আবূ তালিব, ১৫১]

ইবন ইসহাক বলেন, দাদার মৃত্যুর পর আবু তালিবই ইয়াতীম নবীকে দেখাশোনা করতেন। তাই তিনি তাঁর ঘরে তাঁর সঙ্গে থাকতেন। [সীরাতে ইব্‌ন হিশাম, পৃষ্ঠা-১৭৯]

আবূ তালিব একবার বাণিজ্য কাফেলায় সিরিয়া যাত্রা করলেন। বর্ণনামতে, যাত্রার প্রাক্কালে ইয়াতীম নবী চাচা আবূ তালিবকে জড়িয়ে ধরলেন, আর তিনি স্নেহ কোমল হয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ। অবশ্যই তোমাকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাবো। কখনো তুমি আমাকে ছাড়া থাকবে না, আমিও তোমাকে ছাড়া থাকবো না। অতঃপর তিনি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। [সীরাতে ইব্‌ন হিশাম, পৃষ্ঠা-১৮০]

আবূ তালিবের স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আসাদ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ বলতেন, গর্ভধারিণী মায়ের পর তিনিই ছিলেন আমার মা। আবূ তালিব কখনো কখনো বিশেষ ভোজের আয়োজন করতেন এবং তার জন্য খাবার সাজিয়ে রাখতেন। আর তিনি আমাদেরকে তাঁর দস্তরখানে জড়ো করতেন। তখন এ নারী কিছু খাবার পৃথক রেখে দিতেন। আর আমি তা পরে আবার খেয়ে নিতাম। [হাকেম মুস্তাদরাক, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮]

ফাতিমা বিনতে আসাদ ইব্‌ন হাশিম সম্পর্কে আবূ আমর বলেন, তিনিই প্রথম হাশেমী নারী যিনি হাশেমী পুত্র সন্তান প্রসব করেছেন। [ইস্তিয়াব, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৬]

তিনি ইসলাম গ্রহণপূর্বক মদীনায় হিজরত করেছিলেন। মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আপন জামা পরিয়েছিলেন এবং তাঁর প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে কবরে রেখেছিলেন। [সীরাতে আলাম আন-নুবালা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৭]

আল্লাহর নির্দেশে আল্লাহর নবী যখন ইসলামের প্রকাশ্য দাওয়াত দিলেন এবং সত্যের উদাত্ত আহ্বান জানালেন এবং দেবদেবীর নিন্দা-সমালোচনা করতে থাকলেন, তখন কুরায়শদের কাছে তা খুবই গুরুতর ও অসহনীয় মনে হলো। ফলে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁর বিরোধিতা ও শত্রুতায় অবতীর্ণ হলো। অপরদিকে আবূ তালিব তাঁকে স্নেহ ও ছত্রচ্ছায়া দিয়ে যেতে লাগলেন।

বিষয়টি যখন বহু দূর গড়িয়ে গেলো তখন কুরায়শ দল আবূ তালিবের কাছে এসে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারির ভাষায় বললো,

"হে আবূ তালিব! আপনার বয়োজ্যেষ্ঠতা, আভিজাত্য ও মর্যাদা আমরা স্বীকার করি। তবে আমাদের আশা ছিলো যে, আপনার ভাতিজাকে আপনি নিবৃত্ত করবেন। কিন্তু আপনি তা করেন নি। আল্লাহর শপথ! পূর্বপুরুষের সমালোচনা, জ্ঞানীদের প্রতি অবজ্ঞা ও দেবদেবীর নিন্দা রটনার মুখে আমরা আর ধৈর্য ধারণ করতে পারছি না। সুতরাং হয় তাকে আমাদের থেকে নিবৃত্ত রাখুন নতুবা আমরা তার ও আপনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাব, যতক্ষণ না কোন এক পক্ষ ধ্বংস হয়ে যায়।

আবু তালিব রাসূলুল্লাহ্-কে কুরায়শদের সঙ্গে তাঁর আলোচনার কথা অবহিত করলেন এবং নিজের ও তাঁর জীবন রক্ষার বিষয়ে যত্নবান হতে তাগিদ দিলেন। কিন্তু আল্লাহর রাসূলের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন জবাব ছিলো এই:

"হে আমার চাচা! আল্লাহর শপথ। এ বিষয়টি ত্যাগ করার বিনিময়ে যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য আর বাঁ হাতে চন্দ্র তুলে দেয় তবুও আমি তা ত্যাগ করবো না, যতক্ষণ না আল্লাহ্ তা সুপ্রকাশ করেন কিংবা আমি তার জন্য শেষ হয়ে যাই।" [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা- ২৬৫-২৬৬]

তখন আবু তালিব বললেন, যাও ভাতিজা, তোমার যা পছন্দ তা বলো। আল্লাহর শপথ! কখনো কোন কারণে তোমাকে আমি পরিত্যাগ করবো না। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ২৬৫-২৬৬]

বিভিন্ন গোত্রে ইসলামের ক্রমবর্ধমান বিস্তৃতি দেখে কুরায়শরা পরস্পর শলা-পরামর্শের ভিত্তিতে স্থির করলো যে, এক লিখিত চুক্তির মাধ্যমে হাশিম ও মুত্তালিব পরিবারের বিরুদ্ধে তারা বয়কট আরোপ করবে এবং তাদের সাথে বিয়ে-শাদী ও যাবতীয় লেনদেন বর্জন করবে। এ বিষয়ে পরস্পর তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো এবং চুক্তিপত্র লিখে কা'বা ঘরের ভেতরে তা ঝুলিয়ে রাখলো। এই কঠিন দুর্যোগকালে হাশিম ও মুত্তালিব পরিবার আবূ তালিবের পাশে এসে দাঁড়ালো এবং তার সঙ্গে "শিআবে আবী" তালিবে আশ্রয় নিলো। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা- ৩৫০-৩৫১।

এটা হলো নবুয়তের সপ্তম বর্ষের মুহররম মাসের ঘটনা। এখানে হাশিম ও মুত্তালিব পরিবার একে একে তিন বছর কাটিয়ে দিলো। সে বড় ভয়ানক অবস্থা। জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় কোন কিছু পাওয়ার উপায় ছিলো না। সংগোপনে সামান্য যা কিছু হাতে আসত তা-ই দিয়ে জীবন রক্ষা হতো। এরপর উইপোকা দ্বারা চুক্তিপত্র নষ্ট হওয়া, নবী কর্তৃক আবূ তালিবকে তা অবহিত করা (কুরায়শের একাংশের চাপের মুখে), চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলা ও চুক্তি বাতিল করার ঘটনাবলী একে একে সংঘটিত হলো। (বিস্তারিত বিবরণ দেখুন, সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৭৩-৩৭৭)। এটাই হাদীস ও সীরাত গ্রন্থে সুপ্রমাণিত এবং উম্মাহর সর্বযুগে সুপ্রসিদ্ধ ও সুস্বীকৃত মত। এ কারণে নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খুবই দুঃখ ও আফসোস ছিলো। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলাম হলো আকীদা ও বিশ্বাসের ধর্ম। সুতরাং বিশুদ্ধ ঈমান ছাড়া শুধু বংশ ও আত্মীয়তার পরিচয় কিংবা পক্ষ সমর্থন ও ভালোবাসার প্রশ্রয় এখানে নেই।

নবুয়তের দশম বর্ষের শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি কোন এক সময় আশি-ঊর্ধ্ব বয়সে আবু তালিব মৃত্যুবরণ করলেন (বুলূগুল আরাব, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩২৪)। তিনি অবশ্য ইসলাম গ্রহণ করেন নি। উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা (রা)-ও একই বছর ইন্তিকাল করলেন। আল্লাহর নবীর উপর লাগাতার বিপদ-মুসীবতের কারণে এ বছরের নাম হলো 'শোকের বছর'।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 হযরত আলী (রা)-এর ভ্রাতৃবৃন্দ

📄 হযরত আলী (রা)-এর ভ্রাতৃবৃন্দ


আবূ তালিবের পুত্র সন্তান হলেন তালিব (এ নামেই তিনি আবু তালিব উপাধি ধারণ করেছেন), আকীল, জাফর ও আলী- এই চারজন। আর কন্যা সন্তান হলেন উম্মে হানী ও জুমানা- এ দু'জন। এঁরা সকলেই ছিলেন ফাতিমা বিনতে আসাদ-এর গর্ভজাত। চার পুত্রের প্রত্যেকেরই বয়সের ব্যবধান ছিলো দশ বছর করে অর্থাৎ আকীল ছিলেন তালিবের দশ বছরের ছোট এবং জাফর ছিলেন আকীলের দশ বছরের ছোট। আবার আলী ছিলেন জাফরের দশ বছরের ছোট। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃষ্ঠা-২২৩]

বদর যুদ্ধের পর মুশরিক অবস্থায় তালিবের মৃত্যু হয়েছিলো। কথিত আছে, ঘর থেকে বের হয়ে তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। কারো কারো মতে, তিনি আর ফিরে আসেন নি এবং কোন খোঁজ-খবর পাওয়া যায়নি। তিনি হলেন আরবের হারিয়ে যাওয়া লোকদের একজন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে তিনি তাঁর শানে কিছু স্তুতি-কবিতা রচনা করেন। বদর যুদ্ধে তাঁর অংশ গ্রহণ ছিলো অনিচ্ছাপ্রসূত। সে সময় কথা প্রসঙ্গে কুরায়শরা তাঁকে বলেছিলো, আল্লাহর শপথ, তোমরা হাশেমীরা আমাদের সঙ্গে বের হলেও আমরা অধিক জ্ঞাত আছি, তোমাদের মন রয়েছে মুহাম্মদের সঙ্গে।

অন্যদের সাথে তালিবও মক্কায় ফিরে এসেছিলেন এবং নবীর শানে স্তুতি রচনা করেছিলেন এবং তাতে বদরের নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করেছিলেন।

দ্বিতীয় পুত্র আকীল ইব্‌ন আবূ তালিবের (উপনাম আবূ ইয়াযীদ) ইসলাম গ্রহণ মক্কা বিজয় পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছিলো। অন্য মতে, হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করে অষ্টম হিজরীর শুরুতে তিনি হিজরত করেছিলেন। বদর যুদ্ধে বন্দী হওয়ার পর তাঁর চাচা আব্বাস তাঁর মুক্তিপণ আদায় করেছিলেন। সহীহ বুখারীর বিভিন্ন স্থানে তাঁর কথা এসেছে, মুতার যুদ্ধে তিনি শরীক হয়েছেন। তবে মক্কা বিজয় ও হুনায়ন যুদ্ধে তাঁর কোন উল্লেখ নেই। ইবনে সাআদের বর্ণনা মতে সম্ভবত তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। তবে হাসান ইন্ন আলীর সূত্রে যুবায়র ইব্‌ন বাক্কার বর্ণনা করেছেন যে, হুনায়ন যুদ্ধে যাঁরা অবিচল ছিলেন আকীল তাদের অন্যতম।

চার পুত্রের মাঝে আকীলই ছিলেন আবূ তালিবের প্রিয়তম। দুর্ভিক্ষের বছর রাসূলুল্লাহ ও হযরত আব্বাস (রা) তাঁর গুরুভার লাঘবের উদ্দেশে তাঁর পুত্রদের ভাগ করে নেয়ার প্রস্তাব করলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, "আকীলকে আমার জন্য রেখে তোমাদের যা ইচ্ছা করতে পারো।" তখন রাসূলুল্লাহ ও হযরত আলী (রা)-কে ও হযরত আব্বাস হযরত জাফর (রা)-কে নিজের কাছে নিয়ে এলেন।

কুরায়শ বংশের পরিচয় ও যশ-অপযশ সম্পর্কে তিনি বিজ্ঞ ছিলেন। মদীনার মসজিদে এ বিষয়ে তিনি শিক্ষা দান করতেন। তিনি তাৎক্ষণিক ভাবে অকাট্য যুক্তি প্রয়োগে পারদর্শী ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর সূত্রে হিশাম ইবনে কালবী বলেন, কুরায়শ গোত্রে চারজন লোক ছিলো, বিরোধ মীমাংসার জন্য লোকেরা তাদের শরণাপন্ন হতো। তাঁরা হলেন আকীল, মাখারামা, হুয়াইতিব ও আবু জাহম।

ঋণগ্রস্ততার কারণে একবার আকীল হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর কাছে গিয়েছিলেন। ইবনে সা'দ বলেন, বর্ণনামতে মুআবিয়া (রা)-এর খিলাফতকালে তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো, তবে বিশুদ্ধ সনদের বর্ণনামতে ইয়াযীদ ইব্‌ন মু'আবিয়ার আমলে হাররার¹ মর্মন্তুদ ঘটনার পূর্বে ছিয়ানব্বই বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেছেন। শেষ জীবনে তাঁর দৃষ্টিশক্তি লোপ পেয়েছিলো।

প্রশস্ত বাড়ির বড় পরিবার ছিলো তাঁর। বার পুত্র সন্তানের নয়জনই ইমাম হুসাইন (রা)-এর সাথে শহীদ হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে মুসলিম ইন্ন আকীল ছিলেন সাহসিকতা ও শৌর্যবীর্যে শ্রেষ্ঠ। ইমাম হুসাইন তাঁকেই অগ্রদূতরূপে কুফায় পাঠিয়েছিলেন। সেখানে ইবনে যিয়াদ তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিলো।²

হযরত জাফর ইব্‌ন আবু তালিব ছিলেন প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন। ইবন সা'দ তাঁর তাবাকাতে বলেন, রাসূলুল্লাহ এর দারে আরকামে অবস্থান গ্রহণ করার পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সেখানে তিনি দাওয়াতী কাজ করেন। সীরাত বর্ণনামতে নবী তাঁর ও মু'আয ইব্‌ন্ন জাবালের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছিলেন। আবূ হুরায়রা (রা) নবী-এর পর তাঁকেই শ্রেষ্ঠ মানুষ মনে করতেন। ইমাম বুখারী (র) বর্ণনামতে, জাফর (রা) ছিলেন দরিদ্রদের জন্য সর্বোত্তম। হযরত ইকরামা (র)-এ সূত্রে খালিদ আল হামযা (র) বলেন, হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-কে আমি বলতে শুনেছি,

"রাসূলুল্লাহ এর পর পাদুকা পরিধানকারী কিংবা বাহনে আরোহণকারী কিংবা ভূমিতে পদাঙ্ক সৃষ্টিকারী কোন মানুষ জাফর ইব্‌ন আবূ তালিবের চেয়ে উত্তম ছিলো না।" [তিরমিযী, নাসায়ী ও হাদীসটির বর্ণনাসূত্র বিশুদ্ধ।]

আল মাকবারী-এর সূত্রে বাগাবী (র) আবূ হুরায়রা (রা) হতে বর্ণনা করেন, জাফরের ভালবাসা ও ওঠাবসা ছিলো হতদরিদ্রদের সাথে। তিনি তাদের সেবা করতেন। তারাও তাঁর সেবা করত। তিনি তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতেন। তারাও তাঁর সাথে কথাবার্তা বলতো। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে 'আবুল মাসাকীন' (হতদরিদ্র দুঃস্থদের অভিভাবক) বলে ডাকতেন।

নবী ﷺ বলেছেন, অবয়বে ও চরিত্রে তুমি আমার মতো হয়েছ, [হযরত বারা রা-এর সূত্রে বুখারী ও মুসলিম]

হযরত জাফরের (রা) নেতৃত্বে হিজরত হওয়ার পর বাদশাহ নাজ্জাশী ও অন্য অনেকে তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। খায়বার বিজয়ের পরপর হযরত জাফর ও অন্যান্য মুহাজির রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। আর আল্লাহর রাসূল তাঁর ললাট চুম্বন করে বলেছিলেন,

"জানি না, আমার বেশি আনন্দ কিসে; জাফরের আগমনে না খায়বার বিজয়ে।"

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা) বলেন, "আলী (রা) আমার কোন আবদার না-মঞ্জুর করলে আমি জাফরের দোহাই দিতাম, আর তিনি আমার আবদার রক্ষা করতেন।"

জুমাদাল উলা অষ্টম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় রোমকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন এবং পিছু না হটে বীরের মতো লড়াই করে সিরিয়ার মুতা এলাকায় শহীদ হয়েছেন। যুদ্ধের ঘোরতর সময়ে তিনি ঘোড়া ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং শাহাদাত পর্যন্ত জিহাদ করেছিলেন।

ইবনে উমর (রা) বলেন, মুতা যুদ্ধে জাফরকে আমরা যখন খুঁজে পেলাম তখন দেখি, তাঁর শরীরের সম্মুখে অংশে নব্বইটির বেশি তীর বর্শার যখম রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

"আমি জাফরকে ফেরেশতাদের সঙ্গে জান্নাতে উড়ে বেড়াতে দেখেছি।"

তাবারানীর আরেক বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্তমাখা দুই ডানাবিশিষ্ট ফেরেশতার বেশে জাফরকে দেখানো হয়েছে। কারণ যুদ্ধে তাঁর উভয় হাত কর্তন করা হয়েছিলো।

যুদ্ধফেরতা বাহিনীকে মদীনার উপকণ্ঠে আল্লাহর রাসূল ও তাঁর সাহাবাগণ আন্তরিক মোবারকবাদ জানিয়েছিলেন। তিনি তখন এক সওয়ারিতে আরূঢ় ছিলেন। দেখা গেলো, একদল বালক দৌড়ে আসছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, শিশুদের সওয়ারিতে তুলে নাও আর জাফরের ইয়াতীম শিশুকে আমার কাঁধে দাও। অতঃপর আবদুল্লাহ ইব্‌ন জাফরকে তিনি সওয়ারিতে নিজের সামনে বসালেন। [মুসনাদে আহমাদ]

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, জাফরের ইন্তিকালের সংবাদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারায় আমরা বিমর্ষ ভাব ফুটে উঠতে দেখেছিলোম।¹ জাফর পরিবারকে তিনি বলেছিলেন, আমার ভাতিজাদেরকে কাছে আনো। কাছে আনা হলে দেখা গেলো তারা যেন পাখির অসহায় বাচ্চা! অতঃপর তিনি ক্ষৌরকারকে ডেকে আনালেন। আর সে তাদের মাথা মুড়িয়ে দিলো। অতঃপর তিনি তাদের মাকে বললেন, তুমি কি তাদের অভাবের আশংকা কর, অথচ দুনিয়া ও আখিরাতে আমি হলাম তাদের অভিভাবক। [ইবনে সা'দ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৭]

অপর এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জাফরের বিধবা স্ত্রীকে বললেন, জাফরের সন্তানদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো। নিয়ে আসা হলে তিনি কাছে টেনে, আদর করে তাদের ঘ্রাণ নিলেন। আর তখন তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিলো। তখন তিনি হযরত জাফরের শাহাদাতের বিষয় তাদের অবহিত করলেন।

জাফরের পরিবারের শোকের সময় আল্লাহর রাসূল তাঁর স্ত্রীগণকে বললেন, তাদের জন্য খাবার তৈরি করো (পরবর্তীতে এটি সুন্নাতে পরিণত হয়েছে)। কেননা তাদের ওপর শোকে কাতরকরা বিপদ নেমে এসেছে। আর তাঁর চেহারায় তখন শোকের ছায়া দেখা যাচ্ছিলো। [সীরাতে ইবনে হিশাম (সংক্ষেপিত); বর্ণনাটি তিরমিযী শরীফেও আছে]

জাফর-তনয় আবদুল্লাহ হলেন আবিসিনিয়ায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম মুসলিম শিশু। তিনি ছিলেন আরবের শ্রেষ্ঠ দানশীল। তার অন্য ভাইয়েরা হলেন মুহাম্মদ ইব্‌ন জাফর ও আওন ইব্‌ন জাফর।

টিকাঃ
১. ইয়াযীদ বাহিনী কর্তৃক মদীনা আক্রমণ ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার মর্মন্তুদ ঘটনা হাররার ঘটনা নামে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করেছে।
২. আল-ইসাবা শিহাবুদ্দীন আবুল ফযল আহমদ ইব্‌ন আলী ইন্ন হাজার আসকালানী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৯৪।
৩. আল-জাওহারা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৪০-৪১; ইবনে সাআদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৪ (দারু সাদির বৈরুত)।
১. আল-ইসাবা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৩৭-৩৮।

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশী

📄 আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশী


নাজাশী যখন মুসলিম মুহাজিরদের প্রশ্ন করলেন, এ কোন্ ধর্ম যার জন্য তোমরা স্বজাতিকে পরিত্যাগ করলে এবং সনাতন কোন ধর্মে প্রবেশ করলে না?

হযরত জাফর তখন জবাব দিতে অগ্রসর হলেন এবং কথা না বাড়িয়ে শুধু জাহিলিয়্যা যুগের বাস্তব চিত্র তুলে ধরলেন। অতঃপর ইসলাম তার অনুসারীদের জীবনে যে মহাবিপ্লব সাধন করেছে তা তুলে ধরলেন। বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে কিংবা খ্রীস্ট ধর্মের অনুরাগী ও পৃষ্ঠপোষক একজন শাসক উত্তেজিত হতে পারেন, এমন কি একজন সাধারণ অমুসলিমের অন্তরে জাহিলিয়াতের উন্মাদনা মাথা চাড়া দিতে পারে, এমন কোন বিষয় তিনি আদৌ উত্থাপন করলেন না, বরং তাঁর বক্তব্য ছিলো আগাগোড়া বাস্তব অবস্থার নিখুঁত বিবরণ। বস্তুত এ ছিলো স্থান-কাল-পাত্র উপযোগী এমন প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষণ, যা শুধু তার উচ্চাঙ্গ আরবী অলংকার জ্ঞানের পরিচ্ছদই নয়, বরং চিন্তা ও বুদ্ধিগত প্রজ্ঞারও পরিচায়ক। সেই সাথে তাঁর স্বভাব বিশুদ্ধতা ও জ্ঞানের গভীরতার পরিচায়ক যা কুরায়শ গোত্রে হাশিম পরিবারের বৈশিষ্ট্য ছিলো। আর সকলের মাঝে জাফরের ছিলো ভিন্নতর বৈশিষ্ট্য। [আস-সীরাতুন নবুবিয়াহ, পৃষ্ঠা-১৩৩-৩৪)

নবী-এর চাচাত বোন আবূ তালিব-তনয়া উম্মে হানীর নাম ফাখিতা মতান্তরে ফাতিমা বা হিন্দা, তবে তাঁর প্রথম নামটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তিনি হোবায়রা ইব্‌ন আমর ইবন 'আইস আল-মাখযুমীর স্ত্রী ছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এই চাচাত বোন সম্পর্কেই বলেছেন, কুরায়শের নারীরা শ্রেষ্ঠ।

আবূ আমর বলেন, মক্কা বিজয়ের পর হোবায়রা নাজরান এলাকায় পলাতক ছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি কৈফিয়তমূলক কবিতা বলেছেন। আবার উম্মে হানীর ইসলাম গ্রহণের খবর পেয়েও এক কবিতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। উম্মে হানীর গর্ভে তাঁর আমর নামে যে পুত্র সন্তান ছিলো সে নামেই তিনি উপনাম ধারণ করেছিলেন।

মক্কা বিজয়কালে উম্মে হানী তাঁর শ্বশুরকুল বনু মাখযূমের দু'জনকে হযরত আলী (রা)-এর হত্যার হুমকি প্রদানের প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা দান করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে উম্মে হানী রাসূলুল্লাহ-এর কাছে হাযির হলে তিনি তাঁকে শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়ে বললেন, "তুমি কাকে নিয়ে এসেছো?" তিনি দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তাকে অবহিত করলে তিনি বললেন,

"যারা তোমার আশ্রয় ও নিরাপত্তা পেয়েছে আমিও তাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিলাম। আর তাদের হত্যা করা হবে না।"

বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রাসূল তার বাড়িতে গোসল করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিজয়ের আট রাকাত শোকরানা সালাত আদায় করেছিলেন। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০০]

সহীহ বুখারীতে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন উম্মে হানী বিনতে আবূ তালিবের ঘরে যান এবং গোসল করে আট রাকআত শোকরানা সালাত আদায় করেন।

সিহাহ্ সিত্তা ও অন্যান্য গ্রন্থে রাসূলুল্লাহ হতে উম্মে হানী থেকে বর্ণিত হাদীস রয়েছে। তিরমিযী ও অন্যদের মতে হযরত আলী (রা)-এর পরেও তিনি বেঁচে ছিলেন। [আল-ইসাবা, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৭-৩১৮]

আবূ আহমদ আল-আসকারী বলেন, জুমানাহ বিনতে আবূ তালিব হলেন আবদুল্লাহ ইব্‌ন আবূ সুফিয়ান ইব্‌ন হারিছ ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবের মাতা। এই মত সমর্থন করে 'কিতাবুল উখওয়া' গ্রন্থে ইমাম দারে কুতনী (বিনা সনদে) বলেছেন, আবু সুফিয়ান ইব্‌ন হারিছ তাঁকে বিবাহ করেছিলেন এবং তার গর্ভে আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

যুবায়র ইব্‌ন বাক্কার (রা) বলেন, ইনি উম্মে হানীর বোন, খায়বারের ফসল থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের জন্য ত্রিশ 'ওয়াসাক' নির্ধারণ করেছিলেন তাদের তালিকা দিতে গিয়ে ইবনে ইসহাক জুমানা বিনতে আবূ তালিবের নামও উল্লেখ করেছেন।

আল্লামা ফাকেহী (র) প্রণীত মক্কা গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে উছমান ইব্‌ন জুশম বলেন, হযরত আতা, মুজাহিদ ইবনে কাছীর ও অন্যদের দেখেছি, সাতাশে রমযান রাতে তাঁরা তানঈমের উদ্দেশে বের হতেন এবং আবু তালিব তনয়া জুমানার তাঁবু থেকে উমরার ইহরাম করতেন। ইবনে সা'দ (র) জুমানার আলোচনা তাঁর মাতা ফাতিমা বিনতে আসাদ প্রসঙ্গে এনেছেন। আবার নবী -এর চাচাত ভগ্নিগণ শিরোনামে আলাদাভাবেও এনেছেন এবং বলেছেন, আবু সুফিয়ানের পুত্র জাফর তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন। খায়বারের ফসল থেকে আল্লাহর রাসূল তাঁকে ত্রিশ ওয়াসাক পরিমাণ দান করেছিলেন। [প্রাগুক্ত, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২৫৯-২৬০]

টিকাঃ
২. নাজাশী উদ্দেশে প্রদত্ত হযরত জাফরের জবাব পড়ুন সীরাতে ইবনে হিশামে, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৩৪-৩৮)

📘 হযরত আলী রাঃ জীবন ও খিলাফত 📄 জন্ম

📄 জন্ম


বিশুদ্ধ মতে নবুয়তের দশ বছর পূর্বে হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) জন্মগ্রহণ করেছেন। [আল-ইসাবা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫০৭]

ইবন সা'আদ বলেন, খ্রীস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর ত্রিশতম হস্তিবর্ষের রজব মাসের বার তারিখ রাতে তাঁর জন্ম। [ইবন সা'দ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১, আল-বাদরীন অধ্যায়]

হাকীম বিন হিযাম (রা)-এর পরিচিতি প্রসঙ্গে ইমাম হাকিম (র) বলেন, প্রসিদ্ধ বর্ণনা এই যে, ফাতিমা বিনতে আসাদ আমীরুল মু'মিনীন আবী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-কে কা'বার অভ্যন্তরে প্রসব করেছেন। অনুরূপভাবে হাকীম ইবন হিযাম (রা)-ও কাবাগৃহে জন্মগ্রহণ করেছেন। কিন্তু 'নাহজুল বালাগাহ'-এর ভাষ্যকার ইবনু আবিল হাদীদ বলেন, আলী (রা)-এর ভূমিষ্ঠ স্থান সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। বহু শিয়া কা'বাঘরকে চিহ্নিত করলেও হাদীসশাস্ত্রবিশারদগণ তা স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে কাবাঘরে জন্মগ্রহণকারী হলেন হাকীম ইব্‌ন হিযাম ইব্‌ন খোয়ায়লিদ ইবনে আসাদ ইবনে আবদুল উযযা ইব্‌ন কুসাঈ। [ইবনে আবুল হাদীদ: শারহু নাহজিল বালাগাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৪]

ফন্ট সাইজ
15px
17px