📄 বনী হাশিম
বস্তুত হাশিম পরিবার ছিলো কুরায়শের মধ্যমণি। প্রামাণ্য ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থগুলোতে তাদের জীবনব্যাপী কর্ম ও কীর্তির এবং বচন ও উক্তির খুব সামান্যই সংরক্ষিত হয়েছে, সেগুলোও তাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মহানুভবতা, সহজাত মাত্রাজ্ঞান ও বুদ্ধি-বিচক্ষণতার জ্বলন্ত স্বাক্ষর বহন করে। কা'বা ঘরের আসমানী মর্যাদায় তাদের অবিচল বিশ্বাস ছিলো। জুলুমঅবিচার ও সত্যবিমুখতা ছিলো তাদের স্বভাববিরুদ্ধ। সাহাসিকতা ও উচ্চ মনোবল, দয়া ও বদান্যতা এবং দুর্বল ও মজলুমের প্রতি অবারিত সাহায্য-সহযোগিতা ছিলো তাদের স্বভাব বৈশিষ্ট্য। মোটকথা, আরবদের ভাষায় الفروسية (মহত্ত্ব ও বীরত্ব) শব্দটি যতগুলো মহৎ গুণ ও ভাব নির্দেশক তার সবই ছিলো বনী হাশিমের স্বভাবজাত। যে উন্নত নৈতিকতা ও জীবনচরিত আল্লাহ্র রাসূলের পূর্বপুরুষ হিসেবে শোভনীয় ছিলো তার সবই ছিলো তাদের মাঝে বিদ্যমান। তবে পার্থক্য এই যে, একটি অন্তর্বর্তীকাল তারা অতিক্রম করছিলো এবং জাহিলিয়াতের আকীদা- বিশ্বাস ও পূজাউপাসনার ক্ষেত্রে স্বগোত্রের সহগামী হয়ে পড়েছিলো। [সীরাতে নবুবিয়া, পৃষ্ঠা-৭৫]
📄 আবদুল মুত্তালিব ইবন হাশিম
আবদুল মুত্তালিব ইব্ন্ন হাশিম ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ ও হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) উভয়ের পিতামহ। তিনি আপন চাচা মুত্তালিবের মৃত্যুর পর জমজম বিতরণ ও হাজী আপ্যায়নের দায়িত্বভার লাভ করে অতি সুষ্ঠুভাবে তা আঞ্জাম দিয়েছেন। সেই পূর্বপুরুষদের অন্যান্য গোত্রীয় দায়িত্বও তিনি সুচারুরূপে পালন করেছেন। তবে কুরায়শ গোত্রে তার কোন পূর্বপুরুষ তার সমতুল্য মর্যাদা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন নি। আপন গোত্রে তিনি ছিলেন সর্বপ্রিয় ও সর্বজনমান্য। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা- ১৪২]
আবদুল মুত্তালিব অবশ্য কুরায়শের সেরা বিত্তশালী কিংবা একচ্ছত্র (অবিসংবাদিত) নেতাও ছিলেন না, যেমনটি ছিলো প্রাচীন পূর্বপুরুষ কুসাঈ বরং তার চেয়ে অর্থশালী ও ক্ষমতাশালী অনেক লোক মক্কায় ছিলো। তবে যেহেতু জমজম বিতরণ ও হাজীদের আপ্যায়নের দায়িত্ব পালন করতেন, আর তা বায়তুল্লাহ্ সেবা হিসেবে অতি মর্যাদাপূর্ণ কাজ ছিলো সে কারণে কুরায়শ গোত্রে মর্যাদা ও শ্রদ্ধার অতি উচ্চ আসনে তিনি সমাসীন ছিলেন। [ড. জাওয়াদ আলী প্রণীত আল্ মুফাসসাল ফী তারীখিল আরাব কাবলাল ইসলাম, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৮]
আবদুল মুত্তালিবের অন্তরে এই ঈমান ও বিশ্বাস সমুজ্জ্বল ছিলো যে, কা'বাঘর যেহেতু আল্লাহর প্রিয় ঘর তাই স্বয়ং তিনি তা হিফাজত করবেন। হাবশার অধিপতি আবরাহা যখন বায়তুল্লাহ্র মর্যাদা লুণ্ঠনের হীন উদ্দেশে মক্কা অভিযানে এসেছিলো এবং আবদুল মুত্তালিব তার মুখোমুখি হয়েছিলেন সেই বিপদাপন্ন অবস্থায় কুরায়শের এ শ্রদ্ধাভাজন নেতার বুলন্দ হিম্মত ও বিশাল বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের তেজোদীপ্তির প্রকাশ ঘটেছিলো।
হাবশা বাহিনী দু'শ উট আটক করেছো, এ খবর পেয়ে আবদুল মুত্তালিব আবরাহার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। আবরাহা তাঁকে ইজ্জত করে আসন থেকে নেমে এলো এবং পাশে বসিয়ে প্রয়োজন জিজ্ঞেস করলো। তিনি বললেন, আমার প্রয়োজন শুধু এই যে, বাদশা আমার আটককৃত দু'শ উট ফিরিয়ে দেবেন।
এ কথা শুনে আবরাহা তার প্রতি বিমুখ হলো এবং তাঁকে অবজ্ঞার চোখে দেখলো আর বললো, আশ্চর্য! দু'শ উটের আবদার নিয়ে এসেছো, অথচ আমি যে তোমার ও তোমার পূর্বপুরুষের ধর্মগৃহ ধ্বংস করতে এসেছি তা বেমালুম ভুলে গেছো, সে বিষয়ে কিছুই বলছো না।
আবদুল মুত্তালিব বললেন, আমি তো শুধু উটের মালিক। কা'বা ঘরের মালিক যিনি তিনিই তা রক্ষা করবেন। আবরাহা বলল, আমার হাত থেকে তার রক্ষা নেই। জবাবে আবদুল মুত্তালিব শান্ত-নিরুদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, তোমার ব্যাপার তুমিই বুঝবে। [সীরাতে নবুবিয়্যা, পৃষ্ঠা-৭৯-৮০]
আবদুল মুত্তালিব তাঁর সন্তানদের জুলুমঅবিচার পরিহারের কথা বলতেন, মহত্তম চরিত্রে উদ্বুদ্ধ করতেন এবং নিকৃষ্ট কাজে নিষেধ করতেন। [বুলুগুল আরাব ফী মাআরিফাতি আহওয়ালিল আরাব, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২৪]
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বয়স যখন আট তখন আশিঊর্ধ্ব বয়সে আবদুল মুত্তালিব মৃত্যুবরণ করেন। এর অর্থ দাঁড়ালো এই যে, ৫৭৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো। [আল মুফাসসাল ফী তারীখিল আরাব কাবলাল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৮]
কথিত আছে, আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুতে শোকার্ত মক্কায় বহু দিন মেলা- বাজার বসেনি। [বালায়ূরী প্রণীত আনসাবুল আশরাফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৮]
📄 হযরত আলী (রা)-এর পিতা আবূ তালিব
আবূ তালিব ইব্ন আবদুল মুত্তালিব ইন্ন হাশিম ইব্ন আবদে মুনাফ নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পঁয়ত্রিশ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে তাঁর নাম হলো আবৃন্দে মানাফ- মতান্তরে ইমরান বা শায়বা। তবে আবু তালিব উপনামে তিনি পরিচিত।
আবু তালিব ছিলেন কুরায়শের নেতৃস্থানীয় ও মান্যবর ব্যক্তি। বিপদে ও দুর্যোগে তাঁরই ওপর ছিলো গোত্রের ভরসা। [বুলুগুল আরাব ফী মাআরিফাতি আহওয়ালিল আরাব, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২৪]
মৃত্যুকালে আবদুল মুত্তালিব তাঁকেই ইয়াতীম নবীর প্রতিপালনের জন্য অসিয়ত করেছিলেন। আর তিনিও তাঁর উত্তম প্রতিপালন করেছিলেন। [সিরাতুন নবুবিয়্যা, পৃষ্ঠা-১০৩]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা আবদুল্লাহ ও চাচা আবু তালিব ছিলেন সহোদর ভাই। তাঁদের আম্মা হলেন ফাতিমা বিনতে আমর বিন আইস ইব্ন আবদ ইব্ন ইমরান ইব্ন মাখযূম। [সীরাতে ইব্ন হিশাম, পৃষ্ঠা-১৭৯]
আর্থিক অসচ্ছলতা সত্ত্বেও ভ্রাতুষ্পুত্রকে আবূ তালিব নিজ সন্তানের চেয়েও অধিক ভালবাসতেন। আর তিনিও আবূ তালিবের পাশে ছাড়া অন্য কারো কাছে ঘুমাতেন না, এমন কি বাইরে গেলেও তাঁর সঙ্গে থাকতেন। আবূ তালিবের এমন ভালবাসা আর কারো প্রতি ছিলো না। তিনি তাঁর জন্য আলাদা খাবার রাখতেন। [হায়াতে আবূ তালিব, ১৫১]
ইবন ইসহাক বলেন, দাদার মৃত্যুর পর আবু তালিবই ইয়াতীম নবীকে দেখাশোনা করতেন। তাই তিনি তাঁর ঘরে তাঁর সঙ্গে থাকতেন। [সীরাতে ইব্ন হিশাম, পৃষ্ঠা-১৭৯]
আবূ তালিব একবার বাণিজ্য কাফেলায় সিরিয়া যাত্রা করলেন। বর্ণনামতে, যাত্রার প্রাক্কালে ইয়াতীম নবী চাচা আবূ তালিবকে জড়িয়ে ধরলেন, আর তিনি স্নেহ কোমল হয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ। অবশ্যই তোমাকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাবো। কখনো তুমি আমাকে ছাড়া থাকবে না, আমিও তোমাকে ছাড়া থাকবো না। অতঃপর তিনি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। [সীরাতে ইব্ন হিশাম, পৃষ্ঠা-১৮০]
আবূ তালিবের স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আসাদ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ বলতেন, গর্ভধারিণী মায়ের পর তিনিই ছিলেন আমার মা। আবূ তালিব কখনো কখনো বিশেষ ভোজের আয়োজন করতেন এবং তার জন্য খাবার সাজিয়ে রাখতেন। আর তিনি আমাদেরকে তাঁর দস্তরখানে জড়ো করতেন। তখন এ নারী কিছু খাবার পৃথক রেখে দিতেন। আর আমি তা পরে আবার খেয়ে নিতাম। [হাকেম মুস্তাদরাক, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮]
ফাতিমা বিনতে আসাদ ইব্ন হাশিম সম্পর্কে আবূ আমর বলেন, তিনিই প্রথম হাশেমী নারী যিনি হাশেমী পুত্র সন্তান প্রসব করেছেন। [ইস্তিয়াব, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৬]
তিনি ইসলাম গ্রহণপূর্বক মদীনায় হিজরত করেছিলেন। মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আপন জামা পরিয়েছিলেন এবং তাঁর প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে কবরে রেখেছিলেন। [সীরাতে আলাম আন-নুবালা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৭]
আল্লাহর নির্দেশে আল্লাহর নবী যখন ইসলামের প্রকাশ্য দাওয়াত দিলেন এবং সত্যের উদাত্ত আহ্বান জানালেন এবং দেবদেবীর নিন্দা-সমালোচনা করতে থাকলেন, তখন কুরায়শদের কাছে তা খুবই গুরুতর ও অসহনীয় মনে হলো। ফলে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁর বিরোধিতা ও শত্রুতায় অবতীর্ণ হলো। অপরদিকে আবূ তালিব তাঁকে স্নেহ ও ছত্রচ্ছায়া দিয়ে যেতে লাগলেন।
বিষয়টি যখন বহু দূর গড়িয়ে গেলো তখন কুরায়শ দল আবূ তালিবের কাছে এসে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারির ভাষায় বললো,
"হে আবূ তালিব! আপনার বয়োজ্যেষ্ঠতা, আভিজাত্য ও মর্যাদা আমরা স্বীকার করি। তবে আমাদের আশা ছিলো যে, আপনার ভাতিজাকে আপনি নিবৃত্ত করবেন। কিন্তু আপনি তা করেন নি। আল্লাহর শপথ! পূর্বপুরুষের সমালোচনা, জ্ঞানীদের প্রতি অবজ্ঞা ও দেবদেবীর নিন্দা রটনার মুখে আমরা আর ধৈর্য ধারণ করতে পারছি না। সুতরাং হয় তাকে আমাদের থেকে নিবৃত্ত রাখুন নতুবা আমরা তার ও আপনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাব, যতক্ষণ না কোন এক পক্ষ ধ্বংস হয়ে যায়।
আবু তালিব রাসূলুল্লাহ্-কে কুরায়শদের সঙ্গে তাঁর আলোচনার কথা অবহিত করলেন এবং নিজের ও তাঁর জীবন রক্ষার বিষয়ে যত্নবান হতে তাগিদ দিলেন। কিন্তু আল্লাহর রাসূলের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন জবাব ছিলো এই:
"হে আমার চাচা! আল্লাহর শপথ। এ বিষয়টি ত্যাগ করার বিনিময়ে যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য আর বাঁ হাতে চন্দ্র তুলে দেয় তবুও আমি তা ত্যাগ করবো না, যতক্ষণ না আল্লাহ্ তা সুপ্রকাশ করেন কিংবা আমি তার জন্য শেষ হয়ে যাই।" [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা- ২৬৫-২৬৬]
তখন আবু তালিব বললেন, যাও ভাতিজা, তোমার যা পছন্দ তা বলো। আল্লাহর শপথ! কখনো কোন কারণে তোমাকে আমি পরিত্যাগ করবো না। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ২৬৫-২৬৬]
বিভিন্ন গোত্রে ইসলামের ক্রমবর্ধমান বিস্তৃতি দেখে কুরায়শরা পরস্পর শলা-পরামর্শের ভিত্তিতে স্থির করলো যে, এক লিখিত চুক্তির মাধ্যমে হাশিম ও মুত্তালিব পরিবারের বিরুদ্ধে তারা বয়কট আরোপ করবে এবং তাদের সাথে বিয়ে-শাদী ও যাবতীয় লেনদেন বর্জন করবে। এ বিষয়ে পরস্পর তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো এবং চুক্তিপত্র লিখে কা'বা ঘরের ভেতরে তা ঝুলিয়ে রাখলো। এই কঠিন দুর্যোগকালে হাশিম ও মুত্তালিব পরিবার আবূ তালিবের পাশে এসে দাঁড়ালো এবং তার সঙ্গে "শিআবে আবী" তালিবে আশ্রয় নিলো। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা- ৩৫০-৩৫১।
এটা হলো নবুয়তের সপ্তম বর্ষের মুহররম মাসের ঘটনা। এখানে হাশিম ও মুত্তালিব পরিবার একে একে তিন বছর কাটিয়ে দিলো। সে বড় ভয়ানক অবস্থা। জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় কোন কিছু পাওয়ার উপায় ছিলো না। সংগোপনে সামান্য যা কিছু হাতে আসত তা-ই দিয়ে জীবন রক্ষা হতো। এরপর উইপোকা দ্বারা চুক্তিপত্র নষ্ট হওয়া, নবী কর্তৃক আবূ তালিবকে তা অবহিত করা (কুরায়শের একাংশের চাপের মুখে), চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলা ও চুক্তি বাতিল করার ঘটনাবলী একে একে সংঘটিত হলো। (বিস্তারিত বিবরণ দেখুন, সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৭৩-৩৭৭)। এটাই হাদীস ও সীরাত গ্রন্থে সুপ্রমাণিত এবং উম্মাহর সর্বযুগে সুপ্রসিদ্ধ ও সুস্বীকৃত মত। এ কারণে নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খুবই দুঃখ ও আফসোস ছিলো। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলাম হলো আকীদা ও বিশ্বাসের ধর্ম। সুতরাং বিশুদ্ধ ঈমান ছাড়া শুধু বংশ ও আত্মীয়তার পরিচয় কিংবা পক্ষ সমর্থন ও ভালোবাসার প্রশ্রয় এখানে নেই।
নবুয়তের দশম বর্ষের শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি কোন এক সময় আশি-ঊর্ধ্ব বয়সে আবু তালিব মৃত্যুবরণ করলেন (বুলূগুল আরাব, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩২৪)। তিনি অবশ্য ইসলাম গ্রহণ করেন নি। উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা (রা)-ও একই বছর ইন্তিকাল করলেন। আল্লাহর নবীর উপর লাগাতার বিপদ-মুসীবতের কারণে এ বছরের নাম হলো 'শোকের বছর'।
📄 হযরত আলী (রা)-এর ভ্রাতৃবৃন্দ
আবূ তালিবের পুত্র সন্তান হলেন তালিব (এ নামেই তিনি আবু তালিব উপাধি ধারণ করেছেন), আকীল, জাফর ও আলী- এই চারজন। আর কন্যা সন্তান হলেন উম্মে হানী ও জুমানা- এ দু'জন। এঁরা সকলেই ছিলেন ফাতিমা বিনতে আসাদ-এর গর্ভজাত। চার পুত্রের প্রত্যেকেরই বয়সের ব্যবধান ছিলো দশ বছর করে অর্থাৎ আকীল ছিলেন তালিবের দশ বছরের ছোট এবং জাফর ছিলেন আকীলের দশ বছরের ছোট। আবার আলী ছিলেন জাফরের দশ বছরের ছোট। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃষ্ঠা-২২৩]
বদর যুদ্ধের পর মুশরিক অবস্থায় তালিবের মৃত্যু হয়েছিলো। কথিত আছে, ঘর থেকে বের হয়ে তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। কারো কারো মতে, তিনি আর ফিরে আসেন নি এবং কোন খোঁজ-খবর পাওয়া যায়নি। তিনি হলেন আরবের হারিয়ে যাওয়া লোকদের একজন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে তিনি তাঁর শানে কিছু স্তুতি-কবিতা রচনা করেন। বদর যুদ্ধে তাঁর অংশ গ্রহণ ছিলো অনিচ্ছাপ্রসূত। সে সময় কথা প্রসঙ্গে কুরায়শরা তাঁকে বলেছিলো, আল্লাহর শপথ, তোমরা হাশেমীরা আমাদের সঙ্গে বের হলেও আমরা অধিক জ্ঞাত আছি, তোমাদের মন রয়েছে মুহাম্মদের সঙ্গে।
অন্যদের সাথে তালিবও মক্কায় ফিরে এসেছিলেন এবং নবীর শানে স্তুতি রচনা করেছিলেন এবং তাতে বদরের নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করেছিলেন।
দ্বিতীয় পুত্র আকীল ইব্ন আবূ তালিবের (উপনাম আবূ ইয়াযীদ) ইসলাম গ্রহণ মক্কা বিজয় পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছিলো। অন্য মতে, হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করে অষ্টম হিজরীর শুরুতে তিনি হিজরত করেছিলেন। বদর যুদ্ধে বন্দী হওয়ার পর তাঁর চাচা আব্বাস তাঁর মুক্তিপণ আদায় করেছিলেন। সহীহ বুখারীর বিভিন্ন স্থানে তাঁর কথা এসেছে, মুতার যুদ্ধে তিনি শরীক হয়েছেন। তবে মক্কা বিজয় ও হুনায়ন যুদ্ধে তাঁর কোন উল্লেখ নেই। ইবনে সাআদের বর্ণনা মতে সম্ভবত তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। তবে হাসান ইন্ন আলীর সূত্রে যুবায়র ইব্ন বাক্কার বর্ণনা করেছেন যে, হুনায়ন যুদ্ধে যাঁরা অবিচল ছিলেন আকীল তাদের অন্যতম।
চার পুত্রের মাঝে আকীলই ছিলেন আবূ তালিবের প্রিয়তম। দুর্ভিক্ষের বছর রাসূলুল্লাহ ও হযরত আব্বাস (রা) তাঁর গুরুভার লাঘবের উদ্দেশে তাঁর পুত্রদের ভাগ করে নেয়ার প্রস্তাব করলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, "আকীলকে আমার জন্য রেখে তোমাদের যা ইচ্ছা করতে পারো।" তখন রাসূলুল্লাহ ও হযরত আলী (রা)-কে ও হযরত আব্বাস হযরত জাফর (রা)-কে নিজের কাছে নিয়ে এলেন।
কুরায়শ বংশের পরিচয় ও যশ-অপযশ সম্পর্কে তিনি বিজ্ঞ ছিলেন। মদীনার মসজিদে এ বিষয়ে তিনি শিক্ষা দান করতেন। তিনি তাৎক্ষণিক ভাবে অকাট্য যুক্তি প্রয়োগে পারদর্শী ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা)-এর সূত্রে হিশাম ইবনে কালবী বলেন, কুরায়শ গোত্রে চারজন লোক ছিলো, বিরোধ মীমাংসার জন্য লোকেরা তাদের শরণাপন্ন হতো। তাঁরা হলেন আকীল, মাখারামা, হুয়াইতিব ও আবু জাহম।
ঋণগ্রস্ততার কারণে একবার আকীল হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর কাছে গিয়েছিলেন। ইবনে সা'দ বলেন, বর্ণনামতে মুআবিয়া (রা)-এর খিলাফতকালে তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো, তবে বিশুদ্ধ সনদের বর্ণনামতে ইয়াযীদ ইব্ন মু'আবিয়ার আমলে হাররার¹ মর্মন্তুদ ঘটনার পূর্বে ছিয়ানব্বই বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেছেন। শেষ জীবনে তাঁর দৃষ্টিশক্তি লোপ পেয়েছিলো।
প্রশস্ত বাড়ির বড় পরিবার ছিলো তাঁর। বার পুত্র সন্তানের নয়জনই ইমাম হুসাইন (রা)-এর সাথে শহীদ হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে মুসলিম ইন্ন আকীল ছিলেন সাহসিকতা ও শৌর্যবীর্যে শ্রেষ্ঠ। ইমাম হুসাইন তাঁকেই অগ্রদূতরূপে কুফায় পাঠিয়েছিলেন। সেখানে ইবনে যিয়াদ তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিলো।²
হযরত জাফর ইব্ন আবু তালিব ছিলেন প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন। ইবন সা'দ তাঁর তাবাকাতে বলেন, রাসূলুল্লাহ এর দারে আরকামে অবস্থান গ্রহণ করার পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সেখানে তিনি দাওয়াতী কাজ করেন। সীরাত বর্ণনামতে নবী তাঁর ও মু'আয ইব্ন্ন জাবালের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছিলেন। আবূ হুরায়রা (রা) নবী-এর পর তাঁকেই শ্রেষ্ঠ মানুষ মনে করতেন। ইমাম বুখারী (র) বর্ণনামতে, জাফর (রা) ছিলেন দরিদ্রদের জন্য সর্বোত্তম। হযরত ইকরামা (র)-এ সূত্রে খালিদ আল হামযা (র) বলেন, হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-কে আমি বলতে শুনেছি,
"রাসূলুল্লাহ এর পর পাদুকা পরিধানকারী কিংবা বাহনে আরোহণকারী কিংবা ভূমিতে পদাঙ্ক সৃষ্টিকারী কোন মানুষ জাফর ইব্ন আবূ তালিবের চেয়ে উত্তম ছিলো না।" [তিরমিযী, নাসায়ী ও হাদীসটির বর্ণনাসূত্র বিশুদ্ধ।]
আল মাকবারী-এর সূত্রে বাগাবী (র) আবূ হুরায়রা (রা) হতে বর্ণনা করেন, জাফরের ভালবাসা ও ওঠাবসা ছিলো হতদরিদ্রদের সাথে। তিনি তাদের সেবা করতেন। তারাও তাঁর সেবা করত। তিনি তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতেন। তারাও তাঁর সাথে কথাবার্তা বলতো। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে 'আবুল মাসাকীন' (হতদরিদ্র দুঃস্থদের অভিভাবক) বলে ডাকতেন।
নবী ﷺ বলেছেন, অবয়বে ও চরিত্রে তুমি আমার মতো হয়েছ, [হযরত বারা রা-এর সূত্রে বুখারী ও মুসলিম]
হযরত জাফরের (রা) নেতৃত্বে হিজরত হওয়ার পর বাদশাহ নাজ্জাশী ও অন্য অনেকে তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। খায়বার বিজয়ের পরপর হযরত জাফর ও অন্যান্য মুহাজির রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। আর আল্লাহর রাসূল তাঁর ললাট চুম্বন করে বলেছিলেন,
"জানি না, আমার বেশি আনন্দ কিসে; জাফরের আগমনে না খায়বার বিজয়ে।"
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা) বলেন, "আলী (রা) আমার কোন আবদার না-মঞ্জুর করলে আমি জাফরের দোহাই দিতাম, আর তিনি আমার আবদার রক্ষা করতেন।"
জুমাদাল উলা অষ্টম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় রোমকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন এবং পিছু না হটে বীরের মতো লড়াই করে সিরিয়ার মুতা এলাকায় শহীদ হয়েছেন। যুদ্ধের ঘোরতর সময়ে তিনি ঘোড়া ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং শাহাদাত পর্যন্ত জিহাদ করেছিলেন।
ইবনে উমর (রা) বলেন, মুতা যুদ্ধে জাফরকে আমরা যখন খুঁজে পেলাম তখন দেখি, তাঁর শরীরের সম্মুখে অংশে নব্বইটির বেশি তীর বর্শার যখম রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
"আমি জাফরকে ফেরেশতাদের সঙ্গে জান্নাতে উড়ে বেড়াতে দেখেছি।"
তাবারানীর আরেক বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্তমাখা দুই ডানাবিশিষ্ট ফেরেশতার বেশে জাফরকে দেখানো হয়েছে। কারণ যুদ্ধে তাঁর উভয় হাত কর্তন করা হয়েছিলো।
যুদ্ধফেরতা বাহিনীকে মদীনার উপকণ্ঠে আল্লাহর রাসূল ও তাঁর সাহাবাগণ আন্তরিক মোবারকবাদ জানিয়েছিলেন। তিনি তখন এক সওয়ারিতে আরূঢ় ছিলেন। দেখা গেলো, একদল বালক দৌড়ে আসছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, শিশুদের সওয়ারিতে তুলে নাও আর জাফরের ইয়াতীম শিশুকে আমার কাঁধে দাও। অতঃপর আবদুল্লাহ ইব্ন জাফরকে তিনি সওয়ারিতে নিজের সামনে বসালেন। [মুসনাদে আহমাদ]
হযরত আয়েশা (রা) বলেন, জাফরের ইন্তিকালের সংবাদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারায় আমরা বিমর্ষ ভাব ফুটে উঠতে দেখেছিলোম।¹ জাফর পরিবারকে তিনি বলেছিলেন, আমার ভাতিজাদেরকে কাছে আনো। কাছে আনা হলে দেখা গেলো তারা যেন পাখির অসহায় বাচ্চা! অতঃপর তিনি ক্ষৌরকারকে ডেকে আনালেন। আর সে তাদের মাথা মুড়িয়ে দিলো। অতঃপর তিনি তাদের মাকে বললেন, তুমি কি তাদের অভাবের আশংকা কর, অথচ দুনিয়া ও আখিরাতে আমি হলাম তাদের অভিভাবক। [ইবনে সা'দ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৭]
অপর এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জাফরের বিধবা স্ত্রীকে বললেন, জাফরের সন্তানদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো। নিয়ে আসা হলে তিনি কাছে টেনে, আদর করে তাদের ঘ্রাণ নিলেন। আর তখন তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিলো। তখন তিনি হযরত জাফরের শাহাদাতের বিষয় তাদের অবহিত করলেন।
জাফরের পরিবারের শোকের সময় আল্লাহর রাসূল তাঁর স্ত্রীগণকে বললেন, তাদের জন্য খাবার তৈরি করো (পরবর্তীতে এটি সুন্নাতে পরিণত হয়েছে)। কেননা তাদের ওপর শোকে কাতরকরা বিপদ নেমে এসেছে। আর তাঁর চেহারায় তখন শোকের ছায়া দেখা যাচ্ছিলো। [সীরাতে ইবনে হিশাম (সংক্ষেপিত); বর্ণনাটি তিরমিযী শরীফেও আছে]
জাফর-তনয় আবদুল্লাহ হলেন আবিসিনিয়ায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম মুসলিম শিশু। তিনি ছিলেন আরবের শ্রেষ্ঠ দানশীল। তার অন্য ভাইয়েরা হলেন মুহাম্মদ ইব্ন জাফর ও আওন ইব্ন জাফর।
টিকাঃ
১. ইয়াযীদ বাহিনী কর্তৃক মদীনা আক্রমণ ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার মর্মন্তুদ ঘটনা হাররার ঘটনা নামে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করেছে।
২. আল-ইসাবা শিহাবুদ্দীন আবুল ফযল আহমদ ইব্ন আলী ইন্ন হাজার আসকালানী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৯৪।
৩. আল-জাওহারা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৪০-৪১; ইবনে সাআদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৪ (দারু সাদির বৈরুত)।
১. আল-ইসাবা, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৩৭-৩৮।