📄 কুরায়শ গোত্র
সমগ্র আরবে কুরায়শ গোত্রের খ্যাতি ও মর্যাদা ছিলো প্রবাদতুল্য এবং তাদের বংশগত কৌলীন্য ও নেতৃমর্যাদা ছিলো বিতর্কের ঊর্ধ্বে। তাদের ভাষা সৌন্দর্য ও বাগ্মিতা, মহত্ত্ব ও মহানুভবতা, সাহস ও বীরত্ব এবং অন্যান্য গুণ ও বৈশিষ্ট্য আরবের সকল গোত্র মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করতো। [আস-সীরাতুন নবুবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৭৪]
কুরায়শ গোত্র ছিলো একতাবদ্ধ ও পরস্পর বন্ধুভাবাপন্ন। ধর্মীয় বন্ধনবঞ্চিত ও শিষ্টাচারবর্জিত বেদুঈন আরবের বিপরীতে বহু বিষয়ে তারা ইবরাহীমী শরীয়তের অনুসারী ছিলো। যেমন মৃতদের দাফন-কাফন, নাপাকীর গোসল, মুহরানা, সাক্ষীর মাধ্যমে বিবাহ, তিন তালাক প্রদান, হজ্জ, অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা পালন ইত্যাদি। [বুলুগুল আরাব ফী মা'আরিফাতি আহওয়ানিল আরাব, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৪৩]
এছাড়া কুরায়শ অগ্নিপূজারীদের এড়িয়ে চলতো এবং অগ্নিপূজার প্রতি ঘৃণা ও প্রখর আত্মসম্মানবোধের কারণে কন্যা ও ভগ্নিকে এবং তাদের কন্যাকে বিবাহ করতো না। কুরআনও তাদের এই সুচিন্তা ও সুকর্মকে প্রশংসা করেছে।
তদুপরি তাদের একটি বিশেষ মর্যাদা ছিলো এই যে, যেকোন গোত্রে তারা নিঃশর্তভাবে বিবাহ করতে পারতো। কিন্তু অকুরায়শীদের জন্য কুরায়শী কন্যা গ্রহণের শর্ত ছিলো কুরায়শের ধর্মাচারে নিষ্ঠাবান হওয়া। কুরায়শরা বিশ্বাস করতো যে, ধর্মীয় আনুগত্যের শর্ত ছাড়া কন্যা দান বৈধ নয় এবং তাদের বংশমর্যাদার অনুকূলও নয়।
টিকাঃ
১. আরব জাতির গুণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা দেখুন অত্র লেখকের রচিত السيرة النبوية গ্রন্থের জাহিলী যুগ অধ্যায়, 'জাযীরাতুল আরবে নবী প্রেরণের কারণ' শীর্ষক শিরোনাম। (পৃষ্ঠা ৪২-৫৫, সপ্তম সংস্করণ, দারুশ শুরূক জিদ্দা হতে প্রকাশিত)
📄 বনী হাশিম
বস্তুত হাশিম পরিবার ছিলো কুরায়শের মধ্যমণি। প্রামাণ্য ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থগুলোতে তাদের জীবনব্যাপী কর্ম ও কীর্তির এবং বচন ও উক্তির খুব সামান্যই সংরক্ষিত হয়েছে, সেগুলোও তাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মহানুভবতা, সহজাত মাত্রাজ্ঞান ও বুদ্ধি-বিচক্ষণতার জ্বলন্ত স্বাক্ষর বহন করে। কা'বা ঘরের আসমানী মর্যাদায় তাদের অবিচল বিশ্বাস ছিলো। জুলুমঅবিচার ও সত্যবিমুখতা ছিলো তাদের স্বভাববিরুদ্ধ। সাহাসিকতা ও উচ্চ মনোবল, দয়া ও বদান্যতা এবং দুর্বল ও মজলুমের প্রতি অবারিত সাহায্য-সহযোগিতা ছিলো তাদের স্বভাব বৈশিষ্ট্য। মোটকথা, আরবদের ভাষায় الفروسية (মহত্ত্ব ও বীরত্ব) শব্দটি যতগুলো মহৎ গুণ ও ভাব নির্দেশক তার সবই ছিলো বনী হাশিমের স্বভাবজাত। যে উন্নত নৈতিকতা ও জীবনচরিত আল্লাহ্র রাসূলের পূর্বপুরুষ হিসেবে শোভনীয় ছিলো তার সবই ছিলো তাদের মাঝে বিদ্যমান। তবে পার্থক্য এই যে, একটি অন্তর্বর্তীকাল তারা অতিক্রম করছিলো এবং জাহিলিয়াতের আকীদা- বিশ্বাস ও পূজাউপাসনার ক্ষেত্রে স্বগোত্রের সহগামী হয়ে পড়েছিলো। [সীরাতে নবুবিয়া, পৃষ্ঠা-৭৫]
📄 আবদুল মুত্তালিব ইবন হাশিম
আবদুল মুত্তালিব ইব্ন্ন হাশিম ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ ও হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) উভয়ের পিতামহ। তিনি আপন চাচা মুত্তালিবের মৃত্যুর পর জমজম বিতরণ ও হাজী আপ্যায়নের দায়িত্বভার লাভ করে অতি সুষ্ঠুভাবে তা আঞ্জাম দিয়েছেন। সেই পূর্বপুরুষদের অন্যান্য গোত্রীয় দায়িত্বও তিনি সুচারুরূপে পালন করেছেন। তবে কুরায়শ গোত্রে তার কোন পূর্বপুরুষ তার সমতুল্য মর্যাদা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন নি। আপন গোত্রে তিনি ছিলেন সর্বপ্রিয় ও সর্বজনমান্য। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা- ১৪২]
আবদুল মুত্তালিব অবশ্য কুরায়শের সেরা বিত্তশালী কিংবা একচ্ছত্র (অবিসংবাদিত) নেতাও ছিলেন না, যেমনটি ছিলো প্রাচীন পূর্বপুরুষ কুসাঈ বরং তার চেয়ে অর্থশালী ও ক্ষমতাশালী অনেক লোক মক্কায় ছিলো। তবে যেহেতু জমজম বিতরণ ও হাজীদের আপ্যায়নের দায়িত্ব পালন করতেন, আর তা বায়তুল্লাহ্ সেবা হিসেবে অতি মর্যাদাপূর্ণ কাজ ছিলো সে কারণে কুরায়শ গোত্রে মর্যাদা ও শ্রদ্ধার অতি উচ্চ আসনে তিনি সমাসীন ছিলেন। [ড. জাওয়াদ আলী প্রণীত আল্ মুফাসসাল ফী তারীখিল আরাব কাবলাল ইসলাম, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৮]
আবদুল মুত্তালিবের অন্তরে এই ঈমান ও বিশ্বাস সমুজ্জ্বল ছিলো যে, কা'বাঘর যেহেতু আল্লাহর প্রিয় ঘর তাই স্বয়ং তিনি তা হিফাজত করবেন। হাবশার অধিপতি আবরাহা যখন বায়তুল্লাহ্র মর্যাদা লুণ্ঠনের হীন উদ্দেশে মক্কা অভিযানে এসেছিলো এবং আবদুল মুত্তালিব তার মুখোমুখি হয়েছিলেন সেই বিপদাপন্ন অবস্থায় কুরায়শের এ শ্রদ্ধাভাজন নেতার বুলন্দ হিম্মত ও বিশাল বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের তেজোদীপ্তির প্রকাশ ঘটেছিলো।
হাবশা বাহিনী দু'শ উট আটক করেছো, এ খবর পেয়ে আবদুল মুত্তালিব আবরাহার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। আবরাহা তাঁকে ইজ্জত করে আসন থেকে নেমে এলো এবং পাশে বসিয়ে প্রয়োজন জিজ্ঞেস করলো। তিনি বললেন, আমার প্রয়োজন শুধু এই যে, বাদশা আমার আটককৃত দু'শ উট ফিরিয়ে দেবেন।
এ কথা শুনে আবরাহা তার প্রতি বিমুখ হলো এবং তাঁকে অবজ্ঞার চোখে দেখলো আর বললো, আশ্চর্য! দু'শ উটের আবদার নিয়ে এসেছো, অথচ আমি যে তোমার ও তোমার পূর্বপুরুষের ধর্মগৃহ ধ্বংস করতে এসেছি তা বেমালুম ভুলে গেছো, সে বিষয়ে কিছুই বলছো না।
আবদুল মুত্তালিব বললেন, আমি তো শুধু উটের মালিক। কা'বা ঘরের মালিক যিনি তিনিই তা রক্ষা করবেন। আবরাহা বলল, আমার হাত থেকে তার রক্ষা নেই। জবাবে আবদুল মুত্তালিব শান্ত-নিরুদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, তোমার ব্যাপার তুমিই বুঝবে। [সীরাতে নবুবিয়্যা, পৃষ্ঠা-৭৯-৮০]
আবদুল মুত্তালিব তাঁর সন্তানদের জুলুমঅবিচার পরিহারের কথা বলতেন, মহত্তম চরিত্রে উদ্বুদ্ধ করতেন এবং নিকৃষ্ট কাজে নিষেধ করতেন। [বুলুগুল আরাব ফী মাআরিফাতি আহওয়ালিল আরাব, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২৪]
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বয়স যখন আট তখন আশিঊর্ধ্ব বয়সে আবদুল মুত্তালিব মৃত্যুবরণ করেন। এর অর্থ দাঁড়ালো এই যে, ৫৭৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো। [আল মুফাসসাল ফী তারীখিল আরাব কাবলাল ইসলাম, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৮]
কথিত আছে, আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুতে শোকার্ত মক্কায় বহু দিন মেলা- বাজার বসেনি। [বালায়ূরী প্রণীত আনসাবুল আশরাফ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৭৮]
📄 হযরত আলী (রা)-এর পিতা আবূ তালিব
আবূ তালিব ইব্ন আবদুল মুত্তালিব ইন্ন হাশিম ইব্ন আবদে মুনাফ নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পঁয়ত্রিশ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে তাঁর নাম হলো আবৃন্দে মানাফ- মতান্তরে ইমরান বা শায়বা। তবে আবু তালিব উপনামে তিনি পরিচিত।
আবু তালিব ছিলেন কুরায়শের নেতৃস্থানীয় ও মান্যবর ব্যক্তি। বিপদে ও দুর্যোগে তাঁরই ওপর ছিলো গোত্রের ভরসা। [বুলুগুল আরাব ফী মাআরিফাতি আহওয়ালিল আরাব, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২৪]
মৃত্যুকালে আবদুল মুত্তালিব তাঁকেই ইয়াতীম নবীর প্রতিপালনের জন্য অসিয়ত করেছিলেন। আর তিনিও তাঁর উত্তম প্রতিপালন করেছিলেন। [সিরাতুন নবুবিয়্যা, পৃষ্ঠা-১০৩]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা আবদুল্লাহ ও চাচা আবু তালিব ছিলেন সহোদর ভাই। তাঁদের আম্মা হলেন ফাতিমা বিনতে আমর বিন আইস ইব্ন আবদ ইব্ন ইমরান ইব্ন মাখযূম। [সীরাতে ইব্ন হিশাম, পৃষ্ঠা-১৭৯]
আর্থিক অসচ্ছলতা সত্ত্বেও ভ্রাতুষ্পুত্রকে আবূ তালিব নিজ সন্তানের চেয়েও অধিক ভালবাসতেন। আর তিনিও আবূ তালিবের পাশে ছাড়া অন্য কারো কাছে ঘুমাতেন না, এমন কি বাইরে গেলেও তাঁর সঙ্গে থাকতেন। আবূ তালিবের এমন ভালবাসা আর কারো প্রতি ছিলো না। তিনি তাঁর জন্য আলাদা খাবার রাখতেন। [হায়াতে আবূ তালিব, ১৫১]
ইবন ইসহাক বলেন, দাদার মৃত্যুর পর আবু তালিবই ইয়াতীম নবীকে দেখাশোনা করতেন। তাই তিনি তাঁর ঘরে তাঁর সঙ্গে থাকতেন। [সীরাতে ইব্ন হিশাম, পৃষ্ঠা-১৭৯]
আবূ তালিব একবার বাণিজ্য কাফেলায় সিরিয়া যাত্রা করলেন। বর্ণনামতে, যাত্রার প্রাক্কালে ইয়াতীম নবী চাচা আবূ তালিবকে জড়িয়ে ধরলেন, আর তিনি স্নেহ কোমল হয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ। অবশ্যই তোমাকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাবো। কখনো তুমি আমাকে ছাড়া থাকবে না, আমিও তোমাকে ছাড়া থাকবো না। অতঃপর তিনি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। [সীরাতে ইব্ন হিশাম, পৃষ্ঠা-১৮০]
আবূ তালিবের স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আসাদ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ বলতেন, গর্ভধারিণী মায়ের পর তিনিই ছিলেন আমার মা। আবূ তালিব কখনো কখনো বিশেষ ভোজের আয়োজন করতেন এবং তার জন্য খাবার সাজিয়ে রাখতেন। আর তিনি আমাদেরকে তাঁর দস্তরখানে জড়ো করতেন। তখন এ নারী কিছু খাবার পৃথক রেখে দিতেন। আর আমি তা পরে আবার খেয়ে নিতাম। [হাকেম মুস্তাদরাক, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৮]
ফাতিমা বিনতে আসাদ ইব্ন হাশিম সম্পর্কে আবূ আমর বলেন, তিনিই প্রথম হাশেমী নারী যিনি হাশেমী পুত্র সন্তান প্রসব করেছেন। [ইস্তিয়াব, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৬]
তিনি ইসলাম গ্রহণপূর্বক মদীনায় হিজরত করেছিলেন। মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আপন জামা পরিয়েছিলেন এবং তাঁর প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে কবরে রেখেছিলেন। [সীরাতে আলাম আন-নুবালা, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৭]
আল্লাহর নির্দেশে আল্লাহর নবী যখন ইসলামের প্রকাশ্য দাওয়াত দিলেন এবং সত্যের উদাত্ত আহ্বান জানালেন এবং দেবদেবীর নিন্দা-সমালোচনা করতে থাকলেন, তখন কুরায়শদের কাছে তা খুবই গুরুতর ও অসহনীয় মনে হলো। ফলে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁর বিরোধিতা ও শত্রুতায় অবতীর্ণ হলো। অপরদিকে আবূ তালিব তাঁকে স্নেহ ও ছত্রচ্ছায়া দিয়ে যেতে লাগলেন।
বিষয়টি যখন বহু দূর গড়িয়ে গেলো তখন কুরায়শ দল আবূ তালিবের কাছে এসে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারির ভাষায় বললো,
"হে আবূ তালিব! আপনার বয়োজ্যেষ্ঠতা, আভিজাত্য ও মর্যাদা আমরা স্বীকার করি। তবে আমাদের আশা ছিলো যে, আপনার ভাতিজাকে আপনি নিবৃত্ত করবেন। কিন্তু আপনি তা করেন নি। আল্লাহর শপথ! পূর্বপুরুষের সমালোচনা, জ্ঞানীদের প্রতি অবজ্ঞা ও দেবদেবীর নিন্দা রটনার মুখে আমরা আর ধৈর্য ধারণ করতে পারছি না। সুতরাং হয় তাকে আমাদের থেকে নিবৃত্ত রাখুন নতুবা আমরা তার ও আপনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাব, যতক্ষণ না কোন এক পক্ষ ধ্বংস হয়ে যায়।
আবু তালিব রাসূলুল্লাহ্-কে কুরায়শদের সঙ্গে তাঁর আলোচনার কথা অবহিত করলেন এবং নিজের ও তাঁর জীবন রক্ষার বিষয়ে যত্নবান হতে তাগিদ দিলেন। কিন্তু আল্লাহর রাসূলের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন জবাব ছিলো এই:
"হে আমার চাচা! আল্লাহর শপথ। এ বিষয়টি ত্যাগ করার বিনিময়ে যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য আর বাঁ হাতে চন্দ্র তুলে দেয় তবুও আমি তা ত্যাগ করবো না, যতক্ষণ না আল্লাহ্ তা সুপ্রকাশ করেন কিংবা আমি তার জন্য শেষ হয়ে যাই।" [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা- ২৬৫-২৬৬]
তখন আবু তালিব বললেন, যাও ভাতিজা, তোমার যা পছন্দ তা বলো। আল্লাহর শপথ! কখনো কোন কারণে তোমাকে আমি পরিত্যাগ করবো না। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ২৬৫-২৬৬]
বিভিন্ন গোত্রে ইসলামের ক্রমবর্ধমান বিস্তৃতি দেখে কুরায়শরা পরস্পর শলা-পরামর্শের ভিত্তিতে স্থির করলো যে, এক লিখিত চুক্তির মাধ্যমে হাশিম ও মুত্তালিব পরিবারের বিরুদ্ধে তারা বয়কট আরোপ করবে এবং তাদের সাথে বিয়ে-শাদী ও যাবতীয় লেনদেন বর্জন করবে। এ বিষয়ে পরস্পর তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো এবং চুক্তিপত্র লিখে কা'বা ঘরের ভেতরে তা ঝুলিয়ে রাখলো। এই কঠিন দুর্যোগকালে হাশিম ও মুত্তালিব পরিবার আবূ তালিবের পাশে এসে দাঁড়ালো এবং তার সঙ্গে "শিআবে আবী" তালিবে আশ্রয় নিলো। [সীরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা- ৩৫০-৩৫১।
এটা হলো নবুয়তের সপ্তম বর্ষের মুহররম মাসের ঘটনা। এখানে হাশিম ও মুত্তালিব পরিবার একে একে তিন বছর কাটিয়ে দিলো। সে বড় ভয়ানক অবস্থা। জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় কোন কিছু পাওয়ার উপায় ছিলো না। সংগোপনে সামান্য যা কিছু হাতে আসত তা-ই দিয়ে জীবন রক্ষা হতো। এরপর উইপোকা দ্বারা চুক্তিপত্র নষ্ট হওয়া, নবী কর্তৃক আবূ তালিবকে তা অবহিত করা (কুরায়শের একাংশের চাপের মুখে), চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলা ও চুক্তি বাতিল করার ঘটনাবলী একে একে সংঘটিত হলো। (বিস্তারিত বিবরণ দেখুন, সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৭৩-৩৭৭)। এটাই হাদীস ও সীরাত গ্রন্থে সুপ্রমাণিত এবং উম্মাহর সর্বযুগে সুপ্রসিদ্ধ ও সুস্বীকৃত মত। এ কারণে নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খুবই দুঃখ ও আফসোস ছিলো। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলাম হলো আকীদা ও বিশ্বাসের ধর্ম। সুতরাং বিশুদ্ধ ঈমান ছাড়া শুধু বংশ ও আত্মীয়তার পরিচয় কিংবা পক্ষ সমর্থন ও ভালোবাসার প্রশ্রয় এখানে নেই।
নবুয়তের দশম বর্ষের শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি কোন এক সময় আশি-ঊর্ধ্ব বয়সে আবু তালিব মৃত্যুবরণ করলেন (বুলূগুল আরাব, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩২৪)। তিনি অবশ্য ইসলাম গ্রহণ করেন নি। উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজা (রা)-ও একই বছর ইন্তিকাল করলেন। আল্লাহর নবীর উপর লাগাতার বিপদ-মুসীবতের কারণে এ বছরের নাম হলো 'শোকের বছর'।