📘 হিংসা ও অহংকার > 📄 যে অহংকার শোভনীয়

📄 যে অহংকার শোভনীয়


(১) যখন মানুষ মিথ্যা ছেড়ে সত্যের অনুসারী হয়, তখন সে তার জন্য অহংকার করতে পারে। যেমন কুফর ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করা। (২) যদি কেউ জাল ও যঈফ হাদীছ ছেড়ে ছহীহ হাদীছের উপর আমল শুরু করে, তবে তার জন্য সে গর্ব করতে পারে। (৩) যখন কোন ব্যক্তি বাতিল ছেড়ে ফিরক্বা নাজিয়াহ্র অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন সে ঐ জামা'আতের উপর গর্ব করতে পারে। যেমন হযরত ছওবান (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَ هُمْ كَذَلِكَ -
'চিরদিন আমার উম্মতের মধ্যে একটি দল হক-এর উপরে বিজয়ী থাকবে। পরিত্যাগকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এমতাবস্থায় ক্বিয়ামত এসে যাবে, অথচ তারা ঐভাবে থাকবে'।¹³¹ আর ক্বিয়ামত পর্যন্ত ঐ হকপন্থী জামা'আত হ'ল 'আহলুল হাদীছ'।¹³² তিনি বলেন, যে ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যস্থলে থাকতে চায়, সে যেন জামা'আতবদ্ধ জীবনকে অপরিহার্য করে নেয়'।¹³³ (৪) হকপন্থী দলের নামে অহংকার। যেমন হোনায়েন-এর যুদ্ধের দিন বিপর্যয়কর অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হুকুমে উচ্চ কণ্ঠের অধিকারী আব্বাস (রাঃ) হোদায়বিয়ার বৃক্ষতলে মৃত্যুর উপরে বায়'আত গ্রহণকারী ছাহাবীদের ডেকে বলেন, أَيْنَ أَصْحَابُ السَّمُرَة 'সামুরা বৃক্ষের সাথীরা কোথায়? يَا مَعْشَرَ الْأَنْصَارِ 'হে আনছারগণ! একইভাবে বাতিলের অন্ধকারে আহলেহাদীছ-এর পরিচয় নিঃসন্দেহে সত্যের অহংকার। যা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। (৫) উচ্চ বংশের অহংকার। যেমন একই যুদ্ধে একই অবস্থার খচ্চরের পিঠ থেকে নেমে তেজস্বী কণ্ঠে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলে ওঠেন, أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبْ + أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبْ 'আমি নবী, মিথ্যা নই । আমি আব্দুল মুত্ত্বালিবের পুত্র'।¹³⁴

খ্রিষ্টানদের সাথে সন্ধির জন্য তাদের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী সেখানে খলীফাকে উপস্থিত হওয়ার জন্য বায়তুল মুকাদ্দাস সফরকালে খলীফা ওমর (রাঃ) যখন একাকী খালি পায়ে উটের লাগام ধরে হাঁটতে শুরু করেন, তখন সাথী আবু ওবায়দাহ (রাঃ) এতে আপত্তি করেন। জবাবে ওমর (রাঃ) বলেন, إِنَّا كُنَّا أَذَلَّ قَوْمٍ فَأَعَزَّنَا اللهُ بِالْإِسْلَامِ فَمَهْمَا نَطْلُبُ الْعِزَّةَ بِغَيْرِ مَا أَعَزَّنَا اللَّهُ بِهِ أَذَلَّنَا اللَّهُ 'আমরা ছিলাম নিকৃষ্ট জাতি। অতঃপর আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। অতএব যে কারণে আল্লাহ আমাদের মর্যাদা দান করেছেন, তা ছেড়ে অন্য কিছুর মাধ্যমে সম্মান তালাশ করলে আল্লাহ আমাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন।' অন্য বর্ণনায় এসেছে, إِنَّا قَوْمٌ أَعَزَّنَا اللهُ بِالْإِسْلَامِ ، فَلَنْ نَبْتَغِي الْعِزَّ بِغَيْرِهِ 'আমরা সেই জাতি যাদেরকে আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। এর বাইরে অন্য কিছুর মাধ্যমে আমরা সম্মান চাই না'।¹³⁵

টিকাঃ
১৩১. ছহীহ মুসলিম 'ইমারত' অধ্যায়-৩৩, অনুচ্ছেদ-৫৩, হা/১৯২০; অত্র হাদীছের ব্যাখ্যা দ্রঃ ঐ, দেউবন্দ ছাপা শরহ নববী ২/১৪৩ পৃঃ; বুখারী, ফাৎহুল বারী হা/৭১ 'ইল্ম' অধ্যায় ও হা/৭৩১১-এর ভাষ্য 'কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা' অধ্যায়; আলবানী, সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৭০-এর ব্যাখ্যা।
১৩২. তিরমিযী হা/২১৯২, ছহীহুল জামে' হা/৭০২; মিশকাত হা/৬২৮৩।
১৩৩. তিরমিযী হা/২৪৬১।
১৩৪. মুসলিম হা/১৭৭৬; বুখারী হা/২৮৬৪; মিশকাত হা/৫৮৮৮, ৫৮৮৯।
১৩৫. হাকেম ১/৬১-৬২, হা/২০৮; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৫১; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, শিরোনাম: 'ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের হাতে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়' ৭/৫৬।

📘 হিংসা ও অহংকার > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


হাফেয যাহাবী (রহঃ) বলেন, অহংকারের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম প্রকার হ'ল ইলমের অহংকার। কেননা তার ইলম তার কোন কাজে আসেনা। যে ব্যক্তি আখেরাতের জন্য জ্ঞানার্জন করে, জ্ঞান তার অহংকারকে চূর্ণ করে দেয় এবং তার অন্তর আল্লাহ্র ভয়ে ভীত থাকে। যে নিজেকে হীন মনে করে এবং সর্বদা নিজের হিসাব নিয়ে সন্ত্রস্ত থাকে। একটু উদাসীন হ'লেই ভাবে এই বুঝি ছিরাতে মুস্তাক্বীম থেকে বিচ্যুত হ'লাম ও ধ্বংস হয়ে গেলাম। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ইলম শিখে গর্ব করার জন্য ও নেতৃত্ব লাভের জন্য, সে অন্যের উপর অহংকার করে ও তাদেরকে হীন মনে করে। আর এটিই হ'ল সবচেয়ে বড় অহংকার (أَكْبَرُ الْكبر)। আর ঐ ব্যক্তি কখনই জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার রয়েছে। লা হাওলা অলা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।¹³⁶

পরিশেষে বলব, জাত-পাত, দল-মত ও যাবতীয় মিথ্যার অহংকার ছেড়ে আল্লাহ প্রেরিত মহাসত্যের দিকে ফিরে আসা এবং কুরআন ও সুন্নাহ্র অনুসরণ করা আল্লাহ্র সৃষ্টি হিসাবে প্রত্যেক মানুষের জন্য অবশ্য কর্তব্য। বান্দার কোন অহংকার থাকলে তা হবে কেবল সত্যের অহংকার। অন্য কিছুর জন্য নয়। আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا يُؤْمِنُ بِآيَاتِنَا الَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِهَا خَرُّوا سُجَّداً وَسَبِّحُوا بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ 'নিশ্চয়ই তারাই (প্রকৃত) ঈমান আনে, যখন তারা উক্ত আয়াত সমূহ দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হয়, তখন তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের প্রতিপালকের প্রশংসা জ্ঞাপন করে এমন অবস্থায় যে, তারা কোনরূপ অহংকার প্রদর্শন করে না' (সাজদাহ ৩২/১৫)। অত্র আয়াতটি পাঠ করলে বা শ্রবণ করলে সাথে সাথে একটি সিজদা করা মুস্তাহাব। এটি কুরআনের ১০ম সিজদা। আল্লাহ আমাদেরকে মিথ্যা অহমিকা ও তার কুফল হ'তে রক্ষা করুন- আমীন!

--0--

سبحانك اللهم وبحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك وأتوب إليك، اللهم اغفر لي ولوالدي وللمؤمنين يوم يقوم الحساب-

***

টিকাঃ
১৩৬. যাহাবী, আল-কাবায়ির (বৈরূত : দারুন নাদওয়াতিল জাদীদাহ পৃঃ ৭৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00