📘 হিংসা ও অহংকার > 📄 অহংকারের কারণসমূহ (৬টি)

📄 অহংকারের কারণসমূহ (৬টি)


১. অন্যের সম্মান দেখে অহংকারী হওয়া :
আদমের উচ্চ সম্মান দেখে ইবলীস অহংকারী হয়ে ওঠে এবং সে আল্লাহ্র হুকুম অমান্য করে। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ-
'অতঃপর যখন আমরা ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর। তখন তারা সবাই সিজদা করল ইবলীস ব্যতীত। সে অস্বীকার করল এবং অহংকার দেখালো। ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হ'ল (বাক্বারাহ ২/৩৪)।

যুগে যুগে এটা জারি আছে। যেজন্য নবী-রাসূলগণ ও তাদের যথার্থ অনুসারীগণ সর্বদা অহংকারী সমাজনেতাদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। যদিও অহংকারীরা সর্বদা নিজেদের সাফাই গেয়ে মিথ্যা বলে থাকে।

২. মালের আধিক্য :
অধিক ধন-সম্পদ মানুষকে অনেক সময় অহংকারী করে তোলে। মাল ও সন্তান মানুষের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। কিন্তু মানুষ অনেক সময় এর দ্বারা ফেত্নায় পতিত হয় এবং অহংকারে স্ফীত হয়ে পথভ্রষ্ট হয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ আল্লাহ ক্বারূণের কথা বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন,

إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِنْ قَوْمٍ مُوسَى فَبَغَى عَلَيْهِمْ وَآتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لاَ تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ- ... قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِنْ قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا وَلا يُسْأَلُ عَنْ ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ-
'ক্বারূণ ছিল মূসার সম্প্রদায়ভুক্ত। কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছিল। আমরা তাকে এমন ধন-ভাণ্ডার দান করেছিলাম, যার চাবিসমূহ বহন করা একদল শক্তিশালী লোকের পক্ষে কষ্টসাধ্য ছিল। তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, দম্ভ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিকদের পসন্দ করেন না।' ... 'সে বলল, এ সম্পদ আমি আমার জ্ঞান বলে প্রাপ্ত হয়েছি। অথচ সে কি জানে না যে, আল্লাহ তার পূর্বে বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছেন, যারা তার চাইতে শক্তিতে প্রবল ছিল এবং সম্পদে প্রাচুর্যময় ছিল। আর অপরাধীদেরকে তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে না (তারা সরাসরি জাহান্নামে যাবে)' (ক্বাছাছ ২৮/৭৬, ৭৮)।

ক্বারূণী ধন সবাই পেতে চায়। কিন্তু তা মানুষকে অহংকারী করে তোলে। যা তাকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করে। যেমন আল্লাহ বলেন,

فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِنْ فِئَةٍ يَنْصُرُونَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنْتَصِرِينَ-
'অতঃপর আমরা ক্বারূণকে ও তার প্রাসাদকে ভূগর্ভে ধ্বসিয়ে দিলাম। ফলে তার পক্ষে এমন কোন দল ছিল না, যে আল্লাহ্র শাস্তি হতে তাকে সাহায্য করতে পারে এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না' (ক্বাছাছ ২৮/৮১)।

৩. ইলম :
ইলম অনেক সময় আলেমকে অহংকারী বানায়। দু'ধরনের লোকের মধ্যে এটা দেখা যায়। জন্মগতভাবে বদ চরিত্রের লোকেরা যখন ইলম শিখে, তখন ইলমকে তার বদস্বভাবের পক্ষে কাজে লাগায়। এইসব আলেমরা কুরআন-হাদীছের অপব্যাখ্যা করে এবং নিজেকে অন্যদের তুলনায় বড় আলেম বলে যাহির করে। এদের মধ্যে ইলম থাকলেও সেখানে তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি থাকে না। তাদের সকল কাজে লক্ষ্য থাকে দুনিয়া অর্জন করা ও মানুষের প্রশংসা কুড়ানো। যা তাদেরকে অহংকারী করে ফেলে। যেমন আব্বাসীয় যুগের শ্রেষ্ঠ কবি আবুত ত্বাইয়েব আহমাদ বিন হুসাইন আল-মুতানাব্বী (৩০৩-৩৫৪ হিঃ)⁷¹ বলেন,

مَا مُقَامِي بِأَرْضِ نَخْلَةَ إِلا + كمُقامِ الْمَسِيحِ بين الْيَهُودِ
'নাখলার জনপদে আমার অবস্থান ইহুদীদের মাঝে মসীহ ঈসার অবস্থানের ন্যায়।'

অনুরূপভাবে অন্ধ কবি আবুল 'আলা আল-মা'আররী (৩৬৩-৪৪৯ হিঃ) বলেন,

وأنّي وإن كنتُ الأخير زمانُهُ + لَآتِ بِمَا لَمْ تَسْتَطِعْهُ الْأَوَائِلُ
'আমি যদিও কালের হিসাবে শেষে এসেছি। তথাপি আমি যা এনেছি, তা পূর্বের লোকেরা আনতে সক্ষম হয়নি'।⁷²

দ্বিতীয় কারণ হ'ল, অল্প বিদ্যা। যেমন কিছু ইলম শিখেই নিজেকে অন্যের তুলনায় মনে করা এবং একথা বলা যে, هُمْ رِجَالٌ وَنَحْنُ رِجَالٌ 'তাঁরাও মানুষ ছিলেন, আমরাও মানুষ'।⁷³ অর্থাৎ আমরা ও তারা সমান। এটা তাদের অহংকারের পরিচয়। সেজন্যেই প্রবাদ আছে 'অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী'। নিঃসন্দেহে পূর্ববর্তী বিদ্বানগণের মর্যাদা অনেক বেশী। কেননা তাদের ইলমের পথ ধরেই পরবর্তীরা এসেছেন। তাছাড়া সমকালীন প্রত্যেকেই পৃথক গুণ ও মেধার অধিকারী। অতএব কেউ কারু সমান নয়। প্রত্যেকেই নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। প্রত্যেকেই পৃথকভাবে সম্মান পাওয়ার যোগ্য।

প্রকৃত ইলম হ'ল সেটাই যা মানুষকে বিনয়ী ও আল্লাহভীরু বানায়। ইমাম মালেক বিন আনাস (৯৩-১৭৯ হিঃ)-কে ৪৮ টি প্রশ্ন করা হ'লে তিনি ৩২ টি প্রশ্নের উত্তরে বলেন, لا أَدْري 'আমি জানি না'।⁷⁴ বহু মাসআলায় তিনি বলতেন, তুমি অন্যকে জিজ্ঞেস কর।' 'কাকে জিজ্ঞেস করব? এরূপ প্রশ্নের উত্তরে তিনি কারু নাম না করে বলতেন, আলেমদের জিজ্ঞেস কর'। তিনি মৃত্যুকালে কাঁদতে থাকেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমি আমার 'রায়' অনুযায়ী যত ফৎওয়া দিয়েছি প্রতিটির বদলায় যদি আমাকে চাবুক মারা হ'ত! ... হায় যদি আমি কোন ফৎওয়া না দিতাম!⁷⁵ বহু ইখতেলাফী মাসআলায় ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (১৬৪-২৪১ হিঃ) বলতেন, আমি জানি না'।⁷⁶

ইমাম আবু হানীফা (৮০-১৫০ হিঃ) বলতেন, عِلْمُنَا هَذَا رَأْيٌ وَهُوَ أَحْسَنُ مَا قَدَرْنَا عَلَيْهِ ، وَمَنْ جَاءَنَا بِأَحْسَنَ مِنْهُ قَبِلْنَاهُ مِنْهُ 'আমাদের ইলম হ'ল ‘রায়'। আমাদের নিকটে এটাই সর্বোত্তম হিসাবে অনুমিত হয়েছে। যে ব্যক্তি এর চেয়ে উত্তম নিয়ে আসবে, আমরা তার কাছ থেকে সেটা গ্রহণ করব'।⁷⁷ পরবর্তী যুগে সালাফে ছালেহীনের একটা সাধারণ রীতি ছিল এই যে, তাঁরা নিজস্ব রায় থেকে কিছু লিখলে শেষে বলতেন, وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصِّدْقِ وَالصَّوَابِ 'আল্লাহ সত্য ও সঠিক সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত'।

সত্যসন্ধানী আল্লাহভীরু আলেমদের দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ 'বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই আল্লাহকে ভয় করে থাকে' (ফাত্বির ৩৫/২৮)। এখানে 'আলেম' বলতে দ্বীনী ইলমের অধিকারীদের বুঝানো হয়েছে। কেননা দুনিয়াবী ইলম কাফের-মুশরিকরাও শিখে থাকে। কিন্তু তারা আল্লাহভীরু নয়। আর দুনিয়াবী ইলম কাউকে আল্লাহভীরু বানায় না আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহ ব্যতীত।

পক্ষান্তরে যারা ইলমকে দুনিয়া হাছিলের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে, তাদের বিষয়ে হাদীছে কঠিন হুঁশিয়ারী এসেছে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, ক্বিয়ামতের দিন প্রথম বিচার করা হবে শহীদ, আলেম ও দানশীল ব্যক্তিদের। অতঃপর দুনিয়াসর্বস্ব নিয়তের কারণে তাদেরকে উপুড়মুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।⁷⁸ কা'ব বিন মালেক (রাঃ) হ'তে বর্ণিত অন্য হাদীছে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ইলম শিখল আলেমদের সাথে তর্ক করার জন্য এবং মূর্খদের সাথে ঝগড়া করার জন্য অথবা মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন'।⁷⁹ আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত অন্য হাদীছে তিনি আরও বলেন, مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ 'যে ব্যক্তি এমন ইলম শিখে যা দ্বারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, অথচ সে তা শিখে পার্থিব সম্পদ লাভের জন্য, ঐ ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না'।⁸⁰

অথচ যে ব্যক্তি স্রেফ আল্লাহ্র সন্তুষ্টির লক্ষ্যে মানুষকে কল্যাণের পথ দেখানোর উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন। ফেরেশতারা তার (নিরাপত্তার জন্য) তাদের ডানাসমূহ বিছিয়ে দেন। তাছাড়া ফেরেশতামণ্ডলী, আসমান ও যমীনবাসীগণ, এমনকি পানির মাছ ও গর্তের পিঁপড়ারাও তার জন্য আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। এইসব আলেম হ'লেন 'নবীগণের ওয়ারিছ' وَرَثَةُ الْأَنْبَيَاءِ অর্থাৎ তাঁদের ইলমের উত্তরাধিকারী। কেননা নবীগণ কোন দীনার ও দিরহাম ছেড়ে যাননি, কেবল ইলম ব্যতীত। যে ব্যক্তি সেই ইলম লাভ করেছে, সে ব্যক্তি পূর্ণভাবেই তা লাভ করেছে' (অর্থাৎ সত্য ও ন্যায় দ্বারা পূর্ণ ইলম সে লাভ করেছে)।⁸¹ নিজে ইলম না শিখলেও যে ব্যক্তি কুরআন ও হাদীছ এর ইলম যথাযথভাবে অন্যের নিকট পৌঁছে দিবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার জন্য দো'আ করে বলেন, نَضَّرَ اللَّهُ امْرَأَ سَمِعَ مِنَّا شَيْئًا فَبَلَغَهُ كَمَا سَمِعَ فَرُبَّ مُبَلِّغ أَوْعَى مِنْ سَامِعِ 'আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন তার চেহারা উজ্জ্বল করুন! কেননা যার কাছে ইলম পৌঁছানো হয়, তিনি অনেক সময় শ্রবণকারীর চাইতে অনেক বেশী হেফাযতকারী বা জ্ঞানী হয়ে থাকেন'।⁸²

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলতেন لَيْسَ الْعِلْمُ بِكَثْرَةِ الرِّوَايَةِ، إِنَّمَا الْعِلْمُ الْخَشْيَةُ ‘অধিক হাদীছ বর্ণনা প্রকৃত জ্ঞানার্জন নয়। বরং আল্লাহভীতিই হ'ল প্রকৃত জ্ঞান'।⁸³

অতএব আল্লাহকে চেনা ও জানা এবং আল্লাহভীতি অর্জন করাই হ'ল ইলম হাছিলের মূল লক্ষ্য। আল্লাহভীতি সৃষ্টি হলেই বাকী সবকিছুর জ্ঞান তার জন্য সহজ হয়ে যায়। কুরআন ও হাদীছ হ'ল সকল ইলমের খনি। সেখানে গবেষণা করলে মানবীয় চাহিদার সকল দিক ও বিভাগ পরিচ্ছন্ন হয়ে গবেষকের সামনে ফুটে ওঠে। আল্লাহ্র রহমতে তার অন্তর জগত খুলে যায়। ফলে সে অহংকারমুক্ত হয়।

৪. পদমর্যাদা :
উচ্চ পদমর্যাদা মানুষের মধ্যে অনেক সময় অহংকার সৃষ্টি করে। মূর্খরা এটাকে তাদের হীন স্বার্থে ব্যবহার করে। জ্ঞানীরা এর মাধ্যমে মানব কল্যাণে অবদান রাখেন। পদমর্যাদা একটি কঠিন জওয়াবদিহিতার বিষয়। যিনি যত বড় দায়িত্বের অধিকারী, তাকে তত বড় জওয়াবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَلَا كُلُّكُمْ راعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالإِمَامُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَهْوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى أَهْلِ بَيْتِ زَوْجِهَا وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَعَبْدُ الرَّجُلِ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُ، أَلاَ فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ- 'মনে রেখ, তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসক তার প্রজাসাধারণের দায়িত্বশীল। তিনি তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। ব্যক্তি তার পরিবারের দায়িত্বশীল। সে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীর গৃহ ও সন্তানাদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। চাকর তার মনিবের মাল-সম্পদ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব সাবধান! তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে'।⁸⁴

যে ব্যক্তি পদমর্যাদা বা দায়িত্ব পেয়ে অহংকারী হয় এবং পদের অপব্যবহার করে, তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, مَا مِنْ عَبْدِ يَسْتَرْعيه اللهُ رَعِيَّةً يَمُوتُ يَوْمَ يَمُوتُ وَهُوَ غَاشٍ لِرَعِيَّتِهِ إِلَّا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ 'যখন কোন বান্দাকে লোকদের উপর দায়িত্বশীল নিয়োগ করেন। অতঃপর সে তাদের সাথে খেয়ানতকারী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তার উপরে জান্নাতকে হারাম করে দেন'।⁸⁵ মূলতঃ যুলুম-খেয়ানত সবকিছুর উৎপত্তি হয় পদমর্যাদার অহংকার থেকে। তাই জান্নাত পিয়াসী বান্দাকে এ বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرْفَعُ لَهُ بِقَدْرِ غَدْرِهِ أَلَا وَلَا غَادِرَ أَعْظَمُ غَدْرًا مِنْ أَمِيرِ عَامَّةٍ 'ক্বিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের কোমরে একটা করে ঝাণ্ডা স্থাপন করা হবে। যা তার খেয়ানতের পরিমাণ অনুযায়ী উঁচু হবে। মনে রেখ, সেদিন সবচেয়ে উঁচু ঝাণ্ডা হবে প্রধান শাসকের খেয়ানতের ঝাণ্ডা'।⁸⁶ অতএব পদমর্যাদা যেন মনের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি না করে; বরং যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে কৈফিয়ত দেয়ার ভয়ে হৃদয় যেন সর্বদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে, আল্লাহ্র নিকটে সর্বদা সেই তাওফীক কামনা করতে হবে।

৫. বংশ মর্যাদা :
বংশ মর্যাদা মানুষের উচ্চ সম্মানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মানদণ্ড। এই মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে, যতক্ষণ বংশের লোকেরা বিনয়ী ও চরিত্রবান থাকে। উক্ত দু'টি গুণ যত বৃদ্ধি পায়, বংশের সম্মান ও মর্যাদা তত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু যদি সেখানে কথায় ও আচরণে দাম্ভিকতা প্রকাশ পায়, তাহলে কচুর পাতার পানির মত উক্ত সম্মান ভূলুণ্ঠিত হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَى أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ وَلَا يَبْغِي أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ 'আল্লাহ আমাকে প্রত্যাদেশ করেছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও। তোমাদের কেউ যেন একে অপরের উপর গর্ব না করে এবং একে অপরের উপর ঔদ্ধত্য প্রদর্শন না করে'।⁸⁷

তিনি বলেন, লোকেরা যেন তাদের (মুশরিক) বাপ-দাদার নামে গর্ব করা হ'তে বিরত থাকে, যারা মরে জাহান্নামের অঙ্গারে পরিণত হয়েছে ... নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের থেকে জাহেলিয়াতের অহমিকা ও বাপ-দাদার অহংকার দূরীভূত করে দিয়েছেন। এক্ষণে সে আল্লাহভীরু মুমিন (مُؤْمِنٌ تَقِي) অথবা হতভাগ্য পাপী (فَاجِرٌ شَقِيٌّ) মাত্র। মানবজাতি সবাই আদমের সন্তান। আর আদম হ'ল মাটির তৈরী' (অতএব অহংকার করার মত কিছুই নেই)।⁸⁸ তিনি নিজের সম্পর্কে বলেন, لاَ تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ 'তোমরা আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করো না, যেরূপ খ্রিষ্টানরা মারিয়ামপুত্র ঈসার ব্যাপারে করেছে। আমি আল্লাহ্র একজন বান্দা মাত্র। অতএব তোমরা বলো, আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল'।⁸⁹

সঙ্গত কারণে বিশেষ অবস্থায় বংশ মর্যাদাকে ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে। যেমন (ক) বৈবাহিক সমতার ক্ষেত্রে।⁹⁰ (খ) রাজনৈতিক বাস্তবতার ক্ষেত্রে। যেমন পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলে যান, الْأَئِمَّةُ مِنْ قُرَيْشٍ 'নেতা হবেন কুরায়েশদের মধ্য থেকে'।” তাঁর মৃত্যুর পরে খলীফা নির্বাচন নিয়ে মুহাজির ও আনছারদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হ'লে উক্ত হাদীছটির মাধ্যমে সব দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। অতঃপর সবাই মুহাজির নেতা আবুবকর (রাঃ)-কে খলীফা হিসাবে মেনে নেন। এই সিলসিলা খেলাফতে রাশেদাহ, খিলাফতে বনু উমাইয়া ও আব্বাসীয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (গ) যুদ্ধকালীন সময়ে। যেমন হোনায়েন যুদ্ধে শত্রুবেষ্টিত অবস্থায় সৃষ্ট মহা সংকটকালে দৃঢ়চেতা রাসূল (ছাঃ) খচ্চরের পিঠ থেকে নেমে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে কাফেরদের উদ্দেশ্যে হুংকার দিয়ে বললেন, أَنَا النَّبِيُّ لا كَذِبْ، أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبُ 'আমিই নবী মিথ্যা নই। আমি আব্দুল মুত্ত্বালিবের পুত্র।' রাবী বলেন, সেদিন তাঁর চাইতে দৃঢ় কাউকে দেখা যায়নি'।⁹²

এখানে তিনি আরবের শ্রেষ্ঠ বংশের নেতার পুত্র হিসাবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছেন। এর দ্বারা তিনি শত্রুদের বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, কুরায়েশ বংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান আমি বুক দিতে জানি, পিঠ দিতে জানি না। বস্তুতঃ তাঁর এই হুমকিতে দারুণ কাজ হয়। মাত্র ২০ দিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণকারী কুরায়েশ নেতা আব্বাস, আবু সুফিয়ান বিন হারেছ, হাকীম বিন হিযাম সহ অন্যেরা সবাই দ্রুত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পাশে এসে দাঁড়ান এবং মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায় । শত্রুপক্ষ নিমেষে পরাজিত হয় ও পালিয়ে যায়।

বংশ মর্যাদার এই তারতম্যকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করলেই সেটা দোষের হয়। অন্যায়ভাবে বংশের গৌরব করাকে তিনি 'জাহেলিয়াতের অংশ' (عُبِيَّةُ الْجَاهِلِيَّةِ) বলে ধিক্কার দিয়েছেন।⁹³ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, فَخِيَارُكُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُكُمْ فِى الإِسْلَامِ إِذَا فَقَهُوا 'তোমাদের মধ্যে যারা জাহেলী যুগে উত্তম ছিলে, তারা ইসলামী যুগেও উত্তম, যদি তারা দ্বীনের জ্ঞানে পারদর্শী হয়'।⁹⁴ হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর প্রশংসায় তিনি বলেন, الْكَرِيمُ ابْنُ الْكَرِيمِ ابْنِ الْكَرِيمِ ابْنِ الْكَرِيمِ يُوسُفُ بْنُ يَعْقُوبَ بْنِ إِسْحَاقَ بْنِ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ 'সম্ভ্রান্তের পুত্র সম্ভ্রান্ত। তাঁর পুত্র সম্ভ্রান্ত ও তাঁর পুত্র সম্ভ্রান্ত। তাঁরা হ'লেন ইবরাহীম, তাঁর পুত্র ইসহাক, তাঁর পুত্র ইয়াকূব এবং তাঁর পুত্র ইউসুফ'।⁹⁵ এতে বুঝা যায় যে, বংশমর্যাদা প্রশংসিত। কিন্তু অন্যায়ভাবে তার ব্যবহারটা নিন্দনীয়।

ইসলামে দ্বীন ও আল্লাহভীতিকে সম্মান ও মর্যাদার মানদণ্ড হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ أَتْقَاكُمْ 'তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু' (হুজুরাত ৪৯/১৩)। যেমন দ্বীন ও তাক্বওয়ার কারণেই কৃষ্ণাঙ্গ মুক্তদাস বেলাল উচ্চ সম্মান লাভ করেছিলেন। ওমর (রাঃ) বলতেন, أَبُو بَكْرٍ سَيِّدُنَا، وَأَعْتَقَ سَيِّدَنَا، يَعْنِى بلالاً 'আবুবকর আমাদের নেতা এবং তিনি মুক্ত করেছেন আমাদের নেতাকে (অর্থাৎ বেলালকে)'।⁹⁶ মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে কা'বাগৃহের ছাদে দাঁড়িয়ে আযান দিতে বলেন। তার এই উচ্চ সম্মান দেখে কুরায়েশ নেতারা সমালোচনা করেছিলেন।⁹⁷ ওযু নষ্ট হলেই তাহিইয়াতুল ওযু এবং আযানের পরেই মসজিদে তাহিইয়াতুল মাসজিদ-এর নফল ছালাত আদায়ের নিয়মিত সদভ্যাসের কারণেই জান্নাতে বেলালের অগ্রগামী পদশব্দ স্বপ্নের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) শুনেছিলেন ও তার উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন।⁹⁸

বস্তুতঃ ইসলামের উদার সাম্যের কারণেই কুরায়েশ নেতা আবুবকর ও ওমরের পাশাপাশি পায়ে পা লাগিয়ে ছালাতে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছেন আবিসিনিয়ার বেলাল হাবশী, রোমের ছুহায়েব রূমী, পারস্যের সালমান ফারেসী প্রমুখ ক্রীতদাসগণ। কোটি কোটি মুসলমান তাদের নাম উচ্চারণের সাথে সাথে দো'আ করে বলেন, 'রাযিয়াল্লাহু 'আনহু' (আল্লাহ তার উপরে সন্তুষ্ট হউন!)। স্রেফ দ্বীনের কারণে বেলাল এখানে উচ্চ সম্মানিত। পক্ষান্তরে কুফরীর কারণে তার মনিব উমাইয়া বিন খালাফ হলেন অপমানিত ও লাঞ্ছিত। অথচ তিনি ছিলেন অন্যতম কুরায়েশ নেতা এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আপন চাচা ও নিকটতম প্রতিবেশী। অতএব ইসলামে বংশ মর্যাদা স্বীকৃত ও প্রশংসিত হলেও দ্বীন ও তাক্বওয়া না থাকলে তা নিন্দিত ও মূল্যহীন। এখানে সকলের সম্মান ও মর্যাদার মানদণ্ড হ'ল ঈমান ও তাক্বওয়া। মুসলমান সবাই ভাই ভাই। দাস-মনিবে কোন প্রভেদ নেই। পৃথিবীর কোন সমাজ ব্যবস্থায় এর কোন নযীর নেই। কেবল অহংকারী ব্যক্তিরাই এর বিপরীত আচরণ করে থাকে।

৬. ইবাদত ও নেক আমল :
ইবাদত ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হ'লেও তা অনেক সময় মুমিনের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করে। যা তাকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করে।

বহু নেককার ও ইবাদতগুযার ব্যক্তি অলি-আউলিয়া, গাউছ-কুতুব-আবদাল, পীর-মাশায়েখ ইত্যাদি লকবে অভিহিত হন। তারা ভক্তের ভক্তি রসে আপ্লুত হ'তে ভালবাসেন। নযর-নেয়ায, পদসেবা গ্রহণ ইত্যাদি তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। যা তাদের মধ্যে লোভ ও অহংকার সৃষ্টি করে।

খাত্ত্বাবী বর্ণনা করেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (১১৮-১৮১ হিঃ) একবার খোরাসানের এক বিখ্যাত দরবেশের খানকায় গেলেন। কিন্তু তিনি তাঁর দিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না। তখন তাকে বলা হ'ল, আপনি কি জানেন ইনি কে? ইনি হ'লেন আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীছ আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক'। একথা শুনে দরবেশ দ্রুত বেরিয়ে গিয়ে তাঁর নিকটে ওযর পেশ করলেন ও তাঁকে উপদেশ দিতে বললেন। তখন তিনি তাকে বললেন, إِذَا خَرَجْتَ مِنْ مَنْزِلِكَ فَلَا يَقَعْ بَصَرُكَ عَلَى أَحَدٍ إِلَّا أُرِيتَ أَنَّهُ خَيْرٌ مِنْكَ 'যখন তুমি ঘর থেকে বের হবে, তখন তুমি যাকেই দেখবে, তাকেই তোমার চাইতে উত্তম বলে মনে করবে'।⁹⁹

পক্ষান্তরে সালাফে ছালেহীনের নীতি ছিল এই যে, তারা সর্বদা নিজেকে অন্যের চাইতে হীন মনে করতেন। যেমন (ক) বকর বিন আব্দুল্লাহ মুযানী (মৃঃ ১০৬ হিঃ) বলেন, نَظَرْتُ إِلَى أَهْلِ عَرَفَاتِ ظَنَنْتُ أَنَّهُ قَدْ غُفِرَ لَهُمْ لَوْلَا أَنِّي كُنْتُ فِيهِمْ بِهِ 'আমি আরাফাতের ময়দানে অবস্থানরত সকলের দিকে দেখলাম এবং ভাবলাম যে, এদের সবাইকে ক্ষমা করা হয়েছে, যদি না আমি এদের মধ্যে থাকতাম'। অর্থাৎ কেবল আমাকেই ক্ষমা করা হয়নি।¹⁰⁰

(খ) ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মুজাদ্দিদ খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয (৬১-১০১ হিঃ)-কে বলা হ'ল, আপনি মারা গেলে আমরা আপনাকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কক্ষে দাফন করব। জওয়াবে তিনি বললেন, لأن ألقى الله بكل ذنب غير الشرك أحب إلي من أن أرى نفسي أهلاً لذلك 'শিরক ব্যতীত যাবতীয় পাপ নিয়ে আল্লাহ্র কাছে হাযির হওয়াটা আমার নিকট অধিক প্রিয় ঐ স্থানে কবরস্থ হওয়ার জন্য নিজেকে যোগ্য মনে করার চাইতে'।¹⁰¹ এর মাধ্যমে তিনি নিজের হীনতা প্রকাশ করেছেন।

(গ) আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বলেন, আমরা একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে বসেছিলাম। এমন সময় তিনি বললেন, 'আল্লাহ্ নবী নূহ (আঃ) মৃত্যুকালে স্বীয় পুত্রকে অছিয়ত করে বলেন, আমি তোমাকে দু'টি বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছি ও দু'টি বিষয়ে নিষেধ করে যাচ্ছি। নির্দেশ হ'ল তুমি বলবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। কেননা আসমান ও যমীনের সবকিছু যদি এক হাতে রাখা হয় এবং এটিকে যদি এক হাতে রাখা হয়, তাহলে এটিই ভারি হবে। দ্বিতীয় হ'ল 'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী'। কেননা এটি সকল বস্তুর তাসবীহ এবং এর মাধ্যমেই সকল সৃষ্টিকে রূযী দেওয়া হয়। আর আমি তোমাকে নিষেধ করে যাচ্ছি দু'টি বস্তু থেকে : শিরক ও অহংকার। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলা হ'ল, আমরা সুন্দর জুতা পরি, সুন্দর পোষাক পরিধান করি, লোকেরা আমাদের কাছে এসে বসে- এগুলি কি অহংকার হবে? তিনি বললেন, না। বরং অহংকার হ'ল, সত্যকে দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করা ও মানুষকে হেয় জ্ঞান করা।¹⁰²

সত্য প্রত্যাখ্যান করা ও নিজের ভুলের উপর যিদ ও হঠকারিতার বিষয়টি বেশী দেখা যায় শিরক-বিদ'আত ও তাকলীদপন্থী লোকদের মধ্যে, দল ও রাষ্ট্র নেতাদের মধ্যে এবং মূর্খ ও ধর্মান্ধ লোকদের মধ্যে। প্রত্যেকে নিজেকে নিয়েই গর্বিত থাকে। পবিত্র কুরআন ও ছহীh হাদীছের আলোকে নিজেকে সংশোধনের আকাংখা তাদের মধ্যে তেমন দেখা যায় না। বংশের নেতারা বড়াই করেন তাদের আভিজাত্য নিয়ে। নারীরা অহংকার করে তাদের সৌন্দর্য নিয়ে, ধনীরা অহংকার করে তাদের ধন নিয়ে, আলেমরা অহংকার করেন তাদের ইলম ও অনুসারী দল নিয়ে, দলনেতারা অহংকার করেন তাদের দল নিয়ে, রাষ্ট্রনেতারা অহংকার করেন তাদের শক্তি ও ক্ষমতা নিয়ে। অথচ সব অহংকারই ধূলায় মিশে যাবে আল্লাহ্র একটি 'কুন' শব্দে। অতএব হে মানুষ! অহংকারী হয়ো না, বিনয়ী হও। উদ্ধত হয়ো না, কৃতজ্ঞ হও। অতীত ভুলো না, সামনে তাকাও। জন্মের আগে তুমি কিছুই ছিলে না, এখুনি অচল বা পাগল হয়ে গেলে তুমি হিসাবযোগ্য কিছুই থাকবে না। অতএব অহংকার করো না।

টিকাঃ
৭১. কথিত আছে যে, নবুঅত দাবী করার কারণে তিনি 'মুতানাব্বী' নামে পরিচিত হন।
৭২. ইবনু খাল্লিকান, অফিয়াতুল আ'ইয়ান ১/৪৫০ পৃঃ।
৭৩. ইবনু হাযম, আল-ইহকাম (কায়রো : দারুল হাদীছ ১৪২৬/২০০৫) ৪/৫৮৪।
৭৪. মুহাম্মাদ বিন আলাবী, মালেক বিন আনাস (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, ২য় সংস্করণ ২০১০ খৃঃ) পৃঃ ৩২।
৭৫. ইবনুল কাইয়িম, ই'লামুল মুওয়াক্কেঈন ১/৭৬।
৭৬. ঐ, ১/৩৩।
৭৭. ঐ ১/৭৫।
৭৮. মুসলিম হা/১৯০৫, মিশকাত হা/২০৫।
৭৯. তিরমিযী হা/৩১৩৮ হাদীছ ছহীহ; মিশকাত হা/২২৫ 'ইলম' অধ্যায়।
৮০. আহমাদ, আবুদাঊদ হা/৩৬৬৪, ইবনু মাজাহ; মিশকাত হা/২২৭।
৮১. তিরমিযী হা/২৬৮৫, আবুদাঊদ হা/৩৬৪১, মিশকাত হা/২১২-২১৩।
৮২. ইবনু মাজাহ হা/২৩২, তিরমিযী হা/২৬৫৭, দারেমী হা/২৩০, মিশকাত হা/২৩০-৩১।
৮৩. ইবনুল কাইয়িম, আল-ফাওয়ায়েদ ১৪৭ পৃঃ।
৮৪. বুখারী হা/৭১৩৮, মুসলিম হা/১৮২৯; মিশকাত হা/৩৬৮৫।
৮৫. মুসলিম হা/১৪২ 'ঈমান' অধ্যায়; মিশকাত হা/৩৬৮৬।
৮৬. মুসলিম হা/১৭৩৮, মিশকাত হা/৩৭২৭।
৮৭. মুসলিম হা/২৮৬৫; মিশকাত হা/৪৮৯৮ 'শিষ্টাচার সমূহ' অধ্যায় 'পরস্পরে গর্ব' অনুচ্ছেদ।
৮৮. তিরমিযী হা/৩২৭০; আবুদাঊদ হা/৫১১৬; মিশকাত হা/৪৮৯৯।
৮৯. বুখারী হা/৩৪৪৫; মিশকাত হা/৪৮৯৭।
৯০. বুখারী হা/৫০৯০, মুসলিম হা/১৪৬৬, মিশকাত হা/৩০৮২ 'বিবাহ' অধ্যায়।
৯১. আহমাদ হা/১২৩২৯, ছহীহুল জামে' হা/২৭৫৮, বুখারী হা/৭১৩৯, ফাৎহুল বারী, উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যা দ্রঃ, ইরওয়াউল গালীল হা/৫২০।
৯২. বুখারী হা/৩০৪২, মুসলিম হা/১৭৭৬, মিশকাত হা/৪৮৯৫।
৯৩. তিরমিযী হা/৩৯৫৫, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৪৮৯৯।
৯৪. বুখারী হা/৪৬৮৯, মুসলিম হা/২৩৭৮, মিশকাত হা/৪৮৯৩।
৯৫. বুখারী হা/৩৩৯০; তিরমিযী হা/৩৩৩২; মিশকাত হা/৪৮৯৪।
৯৬. বুখারী হা/৩৭৫৪ ।
৯৭. সীরাতে ইবনে হিশাম ২/৪১৩।
৯৮. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ, মিশকাত হা/১৩২২; তিরমিযী, আহমাদ, মিশকাত হা/১৩২৬ 'ঐচ্ছিক ছালাত' অনুচ্ছেদ।
৯৯. খাত্ত্বাবী, আল-উযলাহ (কায়রো : মাতবা'আ সালাফিয়াহ, ২য় সংস্করণ ১৩৯৯ হিঃ) ৮৯ পৃঃ।
১০০. বায়হাক্বী, শু'আবুল ঈমান হা/৮২৫২।
১০১. ইবনুল জাওযী, ছাইদুল খাত্বের (দামেশক: দারুল কলম, ১ম সংস্করণ ২০০৪ খৃঃ) ২৯৫ পৃঃ।
১০২. আহমাদ হা/৬৫৮৩; ছহীহাহ হা/১৩৪।

📘 হিংসা ও অহংকার > 📄 পরিণতি

📄 পরিণতি


দুনিয়াতে অহংকারের পরিণতি হ'ল লাঞ্ছনা। আর আখেরাতে এর পরিণতি হ'ল 'ত্বীনাতুল খাবাল' অর্থাৎ জাহান্নামীদের পুঁজ-রক্ত পান করা। যার অন্তরে যতটুকু অহংকার সৃষ্টি হবে, তার জ্ঞান ততটুকু হ্রাস পাবে। যদি কারু অন্তরে অহংকার স্থিতি লাভ করে, তবে তার জ্ঞানচক্ষু অন্ধ হয়ে যায়। বোধশক্তি লোপ পায়। সে অন্যের চাইতে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। কাম্য সম্মান না পেলে সে মনোকষ্টে মরতে বসে। তার চেহারায় ও আচরণে, যবানে ও কর্মে কেবলি অহংকারের দুর্গন্ধ বের হ'তে থাকে। ফলে মানুষ তার থেকে ছিটকে পড়ে। এক সময় সে নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। একাকীত্বের যন্ত্রণায় সে ছটফট করতে থাকে। কিন্তু বাইরে ঠাট বজায় রাখে। এভাবেই সে দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যায়। বদরের যুদ্ধে আবু জাহল মরার সময় বলেছিল, 'আমার চাইতে বড় কোন মানুষকে তোমরা হত্যা করেছ কি'? অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'মদীনার ঐ চাষারা ব্যতীত যদি অন্য কেউ আমাকে হত্যা করত'?¹⁰³

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, أَلا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ كُلُّ ضَعِيفَ مُتَضَعَفِ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهُ لَأَبَرَّهُ، أَلا أَخْبَرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ كُلُّ عُتُلٌ حَفَّاظ مُسْتَكْبرٍ 'আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতীদের বিষয়ে খবর দিব না? তারা হ'ল দুর্বল এবং যাদেরকে লোকেরা দুর্বল ভাবে। কিন্তু তারা যদি আল্লাহ্ নামে কসম দিয়ে কিছু বলে, আল্লাহ তা অবশ্যই কবুল করেন। অতঃপর তিনি বলেন, আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের বিষয়ে খবর দিব না? তারা হ'ল বাতিল কথার উপর ঝগড়াকারী, হঠকারী ও অহংকারী'।¹⁰⁴ অর্থাৎ হকপন্থী মুমিনগণ দুনিয়াবী দৃষ্টিতে দুর্বল হ'লেও আল্লাহ্ দৃষ্টিতে সবচেয়ে সবল। কেননা তাদের দো'আ দ্রুত কবুল হয় এবং আল্লাহ্ গযবে অহংকারী ধ্বংস হয়।

পবিত্র কুরআনে জাহান্নামীদের প্রধান দোষ হিসাবে তাদের অহংকারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, وَسِيقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ زُمَرًا ... قِيلَ ادْخُلُوا أَبْوَابَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا فَبِئْسَ مَثْوَى الْمُتَكَبِّرِينَ- 'কাফিরদের দলে দলে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে'... 'তখন তাদেরকে বলা হবে তোমরা জাহান্নামের দরজা সমূহে প্রবেশ কর সেখানে চিরকাল থাকার জন্য। অতএব অহংকারীদের বাসস্থান কতই না নিকৃষ্ট' (যুমার ৩৯/৭১-৭২)। এখানে কাফিরদের বাসস্থান না বলে 'অহংকারীদের বাসস্থান' বলা হয়েছে। কেননা কাফিরদের কুফরীর মূল কারণ হ'ল তাদের সত্য প্রত্যাখ্যানের দম্ভ ও অহংকার।

টিকাঃ
১০৩. বুখারী হা/৩৯৬২, মুসলিম হা/১৮০০, মিশকাত হা/৪০২৯।
১০৪. বুখারী হা/৪৯১৮, মুসলিম হা/২৮৫৩, মিশকাত হা/৫১০৬ 'ক্রোধ ও অহংকার' অনুচ্ছেদ।

📘 হিংসা ও অহংকার > 📄 অহংকার দূরীকরণের উপায় সমূহ (১৪টি)

📄 অহংকার দূরীকরণের উপায় সমূহ (১৪টি)


অহংকার মানুষের ভিতরে লুক্কায়িত একটা বিষের নাম। একে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। কিন্তু একে দমিয়ে রাখতে হবে, যেন মাথা উঁচু করতে না পারে। যেমন ঝাড়িয়ে সাপের বিষ নামাতে হয়। মনের মধ্যে এই বিষ-এর এর উদয় হ'লেই বুদ্বুদের মত একে হাওয়া করে দিতে হবে। তাই অহংকার দূরীকরণের জন্য কেবল আকাংখাই যথেষ্ট নয়, বরং এ রোগের রীতিমত চিকিৎসা ও প্রতিষেধক প্রয়োজন। নিম্নে এ বিষয়ে বর্ণিত হ'ল।-

১. নিজের সৃষ্টি ও মৃত্যুর কথা সর্বদা স্মরণ করা :
মানুষ তার জন্মের সময় উল্লেখযোগ্য কিছুই ছিল না (দাহর ৭৬/১)। মৃত্যুর পর সে লাশে পরিণত হবে। আর মৃত্যুর ঘণ্টা সর্বদা তার মাথার উপর ঝুলে আছে। হুকুম হলেই তা বেজে উঠবে এবং তার রূহ যার হুকুমে তার দেহে এসেছিল তার কাছেই চলে যাবে। তার প্রাণহীন অসাড় দেহটা পড়ে থাকবে দুনিয়ায় পোকার খোরাক হবার জন্য ।

আল্লাহ বলেন,

أَوَلَمْ يَرَ الْإِنْسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِنْ نُطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُبِينٌ وَضَرَبَ لَنَا مَثَلاً وَنَسِيَ خَلْقَهُ قَالَ مَنْ يُحْيِ الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ-
'মানুষ কি দেখে না যে, আমরা তাকে সৃষ্টি করেছি একটি শুক্রাণু হ'তে? অথচ সে এখন হয়ে পড়েছে প্রকাশ্যে বিতর্ককারী'। 'মানুষ আমাদের সম্পর্কে নানা উপমা দেয়। অথচ সে নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে ভুলে যায়। আর বলে, কে এই পচা-গলা হাড়-হাড্ডিকে পুনর্জীবিত করবে'? 'তুমি বলে দাও, ওকে পুনর্জীবিত করবেন তিনি, যিনি ওটাকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন। বস্তুতঃ তিনি সকল সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবহিত' (ইয়াসীন ৩৬/৭৭-৭৯)। তিনি বলেন, أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكُكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنتُمْ فِي بُرُوج مُشَيَّدَةٍ 'যেখানেই তোমরা থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদেরকে গ্রাস করবেই। যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের মধ্যে অবস্থান কর' (নিসা ৪/৭৮)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَكْثَرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِي الْمَوْتَ 'তোমরা স্বাদ ধ্বংসকারী বস্তুকে বেশী বেশী স্মরণ কর' অর্থাৎ মৃত্যুকে।¹⁰⁵

অতএব মানুষের জন্য অহংকার করার মত কিছু নেই। কেননা সে তার রোগ-শোক. বার্ধক্য-জ্বরা কিছুকেই প্রতিরোধ করতে পারে না। শতবার ঔষধ খেলেও আল্লাহ্র ইচ্ছা ব্যতীত তার রোগ সারে না। শত চেষ্টাতেও আল্লাহ্র ইচ্ছা ব্যতীত তার বিপদ দূরীভূত হয় না। ফলে সে একজন অসহায় ব্যক্তি ছাড়া কিছুই নয়। সুতরাং তার উচিত সর্বদা নিরহংকার ও বিনয়ী থাকা।

২. আখেরাতে জওয়াবদিহিতার ভয়ে ভীত হওয়া :
ক্বিয়ামতের দিন প্রত্যেকের আমলনামা তার হাতে দিয়ে আল্লাহ বলবেন, اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا 'তোমার আমলনামা তুমি পাঠ কর। আজ তোমার হিসাব নেওয়ার জন্য তুমিই যথেষ্ট' (ইসরা ১৭/১৪)। অতঃপর যখন তারা স্ব স্ব আমলনামা দেখবে, তখন সে সময়কার অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لاَ يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا وَلَا يَظْلَمُ رَبُّكَ أَحَدًا -
'সেদিন উপস্থিত করা হবে প্রত্যেকের আমলনামা। অতঃপর তাতে যা আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদের দেখবে আতংকিত। এ সময় তারা বলবে, হায় দুর্ভোগ আমাদের! এটা কেমন আমলনামা যে, ছোট-बড় কিছুই বাদ দেয়নি, সবকিছুই লিখে রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সমূহকে সম্মুখে উপস্থিত দেখতে পাবে। বস্তুতঃ তোমার প্রতিপালক কারু প্রতি যুলুম করেন না' (কাহফ ১৮/৪৯)।

অর্থাৎ আল্লাহ যাকে যে নে'মত দিয়েছেন ও দুনিয়াবী দায়িত্ব প্রদান করেছেন, আল্লাহ্র নিকটে তার যথাযথ জওয়াবদিহিতার কথা সর্বদা স্মরণ করতে হবে এবং কিভাবে সে দায়িত্ব আরও সুন্দরভাবে পালন করা যায়, তার জন্য সর্বদা চেষ্টিত থাকতে হবে। কেননা আল্লাহ মানুষের হায়াত ও মউত সৃষ্টি করেছেন, কে তাদের মধ্যে সুন্দরতম আমল করে, সেটা পরীক্ষা করার জন্য' (মুল্ক ৬৭/২)। অতএব এই তীব্র দায়িত্বানুভূতি তাকে অহংকারের পাপ হ'তে মুক্ত রাখবে ইনশাআল্লাহ। أَحْسَنَ عَمَلًاً 'সুন্দরতম আমল' অর্থ 'শরী'আতের আলোকে সর্বাধিক শুদ্ধ আমল এবং অন্তরের দিক দিয়ে সর্বাধিক বিশুদ্ধ কর্ম। যা স্রেফ আল্লাহ্র জন্য নিবেদিত এবং সকল প্রকার রিয়া ও শ্রুতি হ'তে মুক্ত'। উল্লেখ্য যে, এখানে أَكْثَرَ عَمَلًاً 'অধিক আমল' বলা হয়নি। অতএব শিরক বিমুক্ত এবং ছহীহ সুন্নাহ অনুমোদিত সৎকর্ম সংখ্যায় ও পরিমাণে অল্প হ'লেও তাই-ই 'সুন্দরতম আমল' হিসাবে আল্লাহ্র নিকটে গ্রহণীয় হবে।

(ক) হযরত ওমর (রাঃ) খেলাফতের দায়িত্বে (১৩-২৩/৬৩৪-৬৪৩ খৃঃ) থাকা অবস্থায় বলতেন, لَوْ مَاتَتْ سَخْلَةٌ عَلَى شَاطِئِ الْفُرَاتِ ضَيْعَةً لَخِفْتُ أَنْ أَسْأَلَ عَنْهَا 'যদি ফোরাত নদীর কূলে একটি ভেড়ার বাচ্চাও হারানো অবস্থায় মারা যায়, তাতে আমি ভীত হই যে, সেজন্য আমাকে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হ'তে হবে'।¹⁰⁶

(খ) খলীফা হারুনুর রশীদ (১৭০-১৯৩ হিঃ), যিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ব্যাপী বিশাল ইসলামী খেলাফতের অধিকারী ছিলেন, তিনি একদিন রাস্তায় চলছিলেন। এমন সময় জনৈক ইহুদী তার সাথে সাক্ষাৎ করল। সে তাকে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহকে ভয় করুন'। তখন খলীফা ঘোড়া থেকে নামলেন ও মাটিতে সিজদা করলেন। অতঃপর ইহূদীটিকে বললেন, তোমার প্রয়োজন কি বল? সে বলল এবং তিনি তার প্রয়োজন মিটালেন। অতঃপর যখন তাকে বলা হ'ল, আপনি একজন ইহূদীর জন্য সওয়ারী থেকে নামলেন? জবাবে তিনি বললেন, তার কথা শুনে আমার নিম্নোক্ত আয়াতটি স্মরণ হ'ল, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, وَإِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْإِثْمِ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ ‘যখন তাকে বলা হয় ‘আল্লাহকে ভয় কর' তখন তার আত্মসম্মান তাকে পাপে স্ফীত করে তোলে। অতএব তার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। আর অবশ্যই তা নিকৃষ্টতম ঠিকানা'।¹⁰⁷

একজন সাধারণ ইহুদী প্রজার সাথে ক্ষমতাধর খলীফা হারূণ যদি এরূপ নম্র আচরণ করতে পারেন, তাহ'লে অন্যদের সাথে তিনি কেমন নিরহংকার আচরণ করতেন, সেটা সহজে অনুমেয়। এই ঘটনায় ইসলামী খেলাফতে অমুসলিম নাগরিকদের প্রতি সর্বোত্তম সদাচরণের প্রমাণ পাওয়া যায়। যা কথিত গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলিতে মুসলমানদের প্রতি কল্পনাও করা যায় না।

৩. নিজেকে জানা ও আল্লাহকে জানা :
প্রথমেই নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে জানতে হবে যে, প্রাণহীন শুক্রাণু থেকে সে জীবন পেয়েছে। আবার সে মারা যাবে। অতএব তার কোন অহংকার নেই। অতঃপর আল্লাহ সম্পর্কে জানবে যে, তিনিই তাকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন। তিনিই তাকে শক্তি দিয়ে মেধা দিয়ে পূর্ণ-পরিণত মানুষে পরিণত করেছেন। তাঁর দয়ায় তার সবকিছু। অতএব প্রতি পদে পদে আল্লাহ্র দাসত্ব ব্যতীত তার কিছুই করার নেই। আল্লাহ বলেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ 'আমি জিন ও ইনসান সৃষ্টি করেছি কেবলমাত্র আমার দাসত্ব করার জন্য' (যারিয়াত ৫১/৫৬)। অতএব নিজেকে সর্বদা আল্লাহ্র দাস মনে করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে অহংকার দূর করার প্রধান ঔষধ।

৪. যেসব বিষয় মনের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করে, সেগুলিকে তুচ্ছ মনে করা :
যেমন বংশের অহংকার, ধনের অহংকার, পদমর্যাদার অহংকার, বিশেষ কোন নে'মতের অহংকার। এগুলি সবই আল্লাহ্র দান। তিনি যেকোন সময় এগুলি ফিরিয়ে নিতে পারেন। আমরা হর-হামেশা এগুলো দেখতে পাচ্ছি যে, বহু জ্বালাময়ী বক্তা সুস্থ থেকেও নির্বাক হয়ে আছেন, বহু লেখক লুলা হয়ে গেছেন, বহু ধনী নিঃস্ব হয়েছেন, বহু নেতা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। বহু শক্তিমান পুরুষ প্যারালাইজড হয়ে বা স্ট্রোক হয়ে বা বার্ধক্যে জরজর হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। তাদের অসহায় চেহারাগুলি চিন্তা করলেই নিজের মধ্য থেকে অহংকার নিমেষে হারিয়ে যাবে।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ (যদি তুমি সুখী হতে চাও), তাহ'লে যে ব্যক্তি তোমার চেয়ে নীচু, তার দিকে তাকাও। কখনো উপরের দিকে তাকিয়ো না। তাহ'লে তোমাকে দেওয়া আল্লাহ্র নে'মত সমূহকে তুমি হীন মনে করবে না'।¹⁰⁸ অহংকার দূরীকরণে এটি একটি মহৌষধ।

৫. ইচ্ছাকৃতভাবে হীনকর কাজ করা :
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন,

كَانَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْصفُ نَعْلَهُ وَيَخِيطُ ثَوْبَهُ وَيَعْمَلُ فِي بَيْتِهِ كَمَا يَعْمَلُ أَحَدُكُمْ فِي بَيْتِهِ وقالت : كَانَ بَشَراً مِنَ الْبَشَرِ يَفْلِي ثَوْبَهُ وَيَخْلُبُ شَاتَهُ وَيَخْدُمُ نَفْسَهُ -
'রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজের জুতা নিজে ছাফ করতেন, কাপড় সেলাই করতেন ও বাড়ির নানাবিধ কাজ করতেন, যেমন তোমরা করে থাক। তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) অন্যান্য মানুষের ন্যায় একজন মানুষ ছিলেন। তিনি কাপড়ের উকুন বাছতেন, ছাগী দোহন করতেন এবং নিজের অন্যান্য কাজ করতেন।¹⁰⁹

মসজিদে নববী নির্মাণের সময়, খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের সময় তিনি নিজে মাটি কেটেছেন ও পাথর বহন করেছেন। বিভিন্ন সফরে তিনি ছাহাবীদের সঙ্গে বিভিন্ন কাজে অংশ নিয়েছেন।

তাঁর অনুসরণে ছাহাবায়ে কেরামও এরূপ করতেন। যেমন আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) একদিন কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে বাজার অতিক্রম করছিলেন। এ দৃশ্য দেখে জনৈক ব্যক্তি বললেন, হে আব্দুল্লাহ! আল্লাহ কি আপনাকে এ কাজ করা থেকে মুখাপেক্ষীহীন করেননি? (অর্থাৎ আপনার তো যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ রয়েছে! আপনি কেন একাজ করছেন?) জবাবে তিনি বললেন, ،بلي وَلَكِن أَرَدْتُ أَنْ أَدْفَعَ الْكِبْرَ 'হ্যাঁ! কিন্তু আমি এ কাজের মাধ্যমে আমার অহংকার দূর করতে চাই। কেননা আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, 'যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না'।¹¹⁰

অতএব সাধ্যে কুলায় এমন যেকোন হীনকর কাজ করার মানসিকতা অর্জন করতে পারলে মনের মধ্য থেকে সহজে অহংকার দূর হয়ে যাবে। যেমন আপনি অফিসের বস। টেবিলের ধূলা নিজে মুছলেন, মাকড়সার জালগুলো নিজে দূর করলেন, প্রয়োজনে টয়লেট ছাফ করলেন, এমনকি ঘরটা ঝাড়ু দিলেন। এসব ছোটখাট কাজ হলেও এগুলির মাধ্যমে অহংকার দূর হয়। সঙ্গে সঙ্গে অন্যের নিকট সম্মান বৃদ্ধি পায়। সর্বোপরি নিজের কাজ নিজে করায় রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত অনুসরণের ছওয়াব পাওয়া যায়। লোকেরা আপনাকে সামনে নিয়ে মিছিল করতে চায়, আপনার ছবি তুলতে চায়, আপনার নামে প্রশংসামূলক শ্লোগান দিতে চায়, আপনার সামনে আপনার নামে অভিনন্দন পত্র পাঠ করতে চায়, আপনি সুযোগ দিবেন না অথবা এড়িয়ে যাবেন।

৬. আল্লাহ সবকিছু দেখছেন ও শুনছেন, সবসময় একথা মনে রাখা :
আল্লাহ বলেন, إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ - مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلِ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ 'মনে রেখ দু'জন গ্রহণকারী ফেরেশতা মানুষের ডানে ও বামে বসে সর্বদা তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে'। 'সে মুখে যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য সদা তৎপর প্রহরী তার নিকটেই অবস্থান করে' (ক্বাফ ৫০/১৭-১৮)।

হাদীছে জিব্রীলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَنْ تَعْبُدَ اللَّهُ كَأَنَّكَ تَرَاهُ ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ 'তুমি এমনভাবে আল্লাহ্র ইবাদত কর, যেন তুমি তাকে দেখছ। যদি তা না পারো, তবে এমনভাবে যেন তিনি তোমাকে দেখছেন'।¹¹¹

৭. গরীব ও ইয়াতীমদের সঙ্গে থাকা ও রোগীর সেবা করা :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, তোমরা আমাকে দুর্বলদের মধ্যে তালাশ কর'।¹¹² অর্থাৎ তাদের প্রতি সদাচরণের মাধ্যমে আমার সন্তুষ্টি অন্বেষণ কর। জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-কে তার অন্তর কঠিন হওয়ার অভিযোগ পেশ করলে তিনি তাকে বললেন, أَمْسَحْ رَأْسَ الْيَتِيمِ وَأَطْعِمِ الْمَسْكِينَ 'তুমি ইয়াতীমের মাথায় হাত বুলাও এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান কর।¹¹³ তিনি বলেন, إِنَّ الْمُسْلِمَ إِذَا عَادَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ لَمْ يَزَلْ فِي خُرْفَةِ الْجَنَّةِ حَتَّى يَرْجِعَ 'যখন কোন মুসলমান অন্য একজন মুসলমান রোগীর সেবা করে, তখন সে জান্নাতের বাগিচায় অবস্থান করে, যতক্ষণ না সে ফিরে আসে'।¹¹⁴ তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি পীড়িত ছিলাম। কিন্তু তুমি আমার সেবা করোনি। বান্দা বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কিভাবে আমি আপনার সেবা করব? অথচ আপনি বিশ্বচরাচরের পালনকর্তা। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা পীড়িত ছিল, অথচ তুমি তার সেবা করোনি? যদি তুমি তাকে সেবা করতে, তাহ'লে তুমি আমাকে সেখানে পেতে'।¹¹⁵

বস্তুতঃ যেকোন সেবামূলক কাজ যদি নিঃস্বার্থ হয় এবং পরকালীন লক্ষ্যে হয়, তবে সেগুলি অহংকার চূর্ণ করার মহৌষধ হিসাবে আল্লাহ্র নিকটে গৃহীত হয় এবং বান্দা জাহান্নাম থেকে বেঁচে যায়। যেমন আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, জনৈক তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি মরুভূমিতে একটি কুয়ায় নেমে পানি পান শেষে উঠে দেখেন যে, একটি তৃষ্ণার্ত কুকুর পিপাসায় মরণাপন্ন হয়ে জিভ বের করে মাটিতে মুখ ঘষছে। তখন লোকটি পুনরায় কুয়ায় নেমে নিজের চামড়ার মোযা ভরে পানি এনে কুকুরটিকে পান করান এবং আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করেন। ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান'। অন্য বর্ণনায় এসেছে বনু ইস্রাঈলের জনৈকা বেশ্যা মহিলা একটি কুকুরকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় কুয়ার চারপাশে ঘুরতে দেখে নিজের ওড়নায় মোযা বেঁধে কুয়া থেকে পানি তুলে তাকে পান করায়। ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন'।¹¹⁶

৮. নিজের সৎকর্মগুলি আল্লাহ্র নিকটে কবুল হচ্ছে কি-না সেই ভয়ে সর্বদা ভীত থাকা :
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে নিম্নোক্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ - أُولَئِكَ يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَهُمْ لَهَا سَابِقُونَ 'আর যারা যা দান করার তা দান করে ভীত-কম্পিত অন্তরে। এজন্য যে, তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাবে'। 'তারা দ্রুত সম্পাদন করে তাদের সৎকর্ম সমূহ এবং তারা সেদিকে অগ্রগামী হয়' (মুমিনূন ২৩/৬০-৬১)। আমি বললাম, এরা কি তারাই যারা মদ্যপান করে ও চুরি করে? তিনি বললেন, لا يا بنتَ الصِّدِّيقِ وَلَكِنَّهُمُ الَّذِينَ يَصُومُونَ وَيُصَلُّونَ وَيَتَصَدَّقُونَ وَهُمْ يَخَافُونَ أَنْ لا يُقْبَلَ مِنْهُمْ أُولَئِكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَهُمْ لَهَا سَابِقُونَ- 'না হে ছিদ্দীকের কন্যা! বরং এরা হ'ল তারাই যারা ছিয়াম রাখে, ছালাত আদায় করে ও ছাদাক্বা করে এবং তারা সর্বদা ভীত থাকে এ ব্যাপারে যে, তাদের উক্ত নেক আমলগুলি কবুল হচ্ছে কি-না। তারাই সৎকর্ম সমূহের প্রতি দ্রুত ধাবমান হয়'।¹¹⁷

৯. ভুলক্রমে বা উত্তেজনা বশে অহংকার প্রকাশ পেলে সাথে সাথে বান্দার কাছে, অতঃপর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চাওয়া :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَحَدٍ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ ، قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ، 'যদি কেউ কারু সম্মানহানি করে বা অন্য কোন বস্তুর ব্যাপারে তার প্রতি যুলুম করে, তবে সে যেন তা আজই মিটিয়ে নেয়। সেদিন আসার আগে, যেদিন কোন দীনার ও দিরহাম তার সঙ্গে থাকবে না...।¹¹⁸

অন্যতম জ্যেষ্ঠ তাবেঈ মুত্বারিফ বিন আব্দুল্লাহ (মৃঃ ৯৫ হিঃ) হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পক্ষ হ'তে নিযুক্ত খোরাসানের গভর্ণর মুহাল্লাব বিন আবূ ছুফরাকে একদিন দেখলেন রাস্তা দিয়ে খুব জাঁক-জমকের সাথে যেতে। তিনি সামনে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র বান্দা! কিভাবে তুমি রাস্তায় চলছ, যা আল্লাহকে ক্রুদ্ধ করে? একথা শুনে মুহাল্লাব বললেন, আপনি কি আমাকে চিনেন? তাবেঈ বিদ্বান বললেন, نعم، أَوَّلُكَ نُطْفَةٌ مَذِرَةٌ، وَآخِرُكَ حِيفَةٌ قَذِرَةٌ، وَأَنْتَ فِيمَا بَيْنَ ذَلِكَ تَحْمِلُ الْعَدْرَةَ 'অবশ্যই চিনি। তোমার শুরু হ'ল একটি নিকৃষ্ট শুক্রাণু থেকে এবং শেষ হ'ল একটি মরা লাশ হিসাবে। আর তুমি এর মধ্যবর্তী সময়ে বহন করে চলেছ পায়খানার ময়লা'। একথা শুনে মুহাল্লাব জাঁক-জমক ছেড়ে সাধারণভাবে চলে গেলেন।¹¹⁹

১০. অহংকারী পোষাক ও চাল-চলন পরিহার করা :
পোষাক স্বাভাবিক ও সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন হ'তে হবে। কেননা আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পসন্দ করেন'¹²⁰ এবং তিনি বান্দার উপর তাঁর নে'মতের নিদর্শন দেখতে ভালবাসেন'।¹²¹ কিন্তু স্বাভাবিক পোষাকের বাইরে অপ্রয়োজনে আড়ম্বরপূর্ণ কোন পোষাক পরিধান করা 'রিয়া'-র পর্যায়ে পড়ে যাবে। যা কবীরা গোনাহের অন্তর্ভুক্ত। যাতে অনেকে ফেত্নায় পড়েন ও তার মধ্যে অহংকার সৃষ্টি হয়। অনেক মসজিদে বিশেষ মুছল্লীদের জন্য বিশেষ স্থান ও জায়নামায দেখা যায়। এমনকি কারু জন্য বিশেষ দরজাও নির্দিষ্ট থাকে। যেগুলি নিঃসন্দেহে অহংকারের পর্যায়ভুক্ত।

১১. গোপন আমল করা :
নিরহংকার ও রিয়ামুক্ত হওয়ার অন্যতম পন্থা হ'ল গোপন আমল করা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ تَعَالَى فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ ... وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهُ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ -
'কিয়ামতের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ্র আরশের নীচে ছায়া পাবে, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না। তাদের মধ্যে একজন হ'ল ঐ ব্যক্তি ... যে গোপনে ছাদাক্বা করে এমনভাবে যে ডান হাত যা ব্যয় করে, বাম হাত তা জানতে পারে না এবং ঐ ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর দু'চোখ বেয়ে অবিরল ধারে অশ্রু প্রবাহিত হয়'।¹²²

এজন্য তাহাজ্জুদের ছালাত রাত্রির শেষ প্রহরে একাকী নিরিবিলি পড়তে বলা হয়েছে (মুযযাম্মিল ৭৩/২-৩, ২০)।

১২. আল্লাহ্র ভয়ে ক্রন্দন করা :
যদি কেউ আল্লাহ্র ভয়ে কাঁদতে পারে, তবে তার চোখের পানিতে অহংকার ধুয়ে-মুছে ছাফ হয়ে যাবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, لا يَلِجُ النَّارَ رَجُلٌ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللهِ حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ 'যে ব্যক্তি আল্লাহ্র ভয়ে কাঁদে, সে ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে না। যেমন দুধ পুনরায় পালানে প্রবেশ করে না'।¹²³ তিনি বলেন, যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তাহ'লে তোমরা কাঁদতে বেশী, হাসতে কম।¹²⁴ তিনি বলেন, আল্লাহ্র কসম আমি জানি না। আল্লাহ্র কসম আমি জানিনা। অথচ আমি আল্লাহ্র রাসূল; কি হবে সেদিন আমার ও কি হবে সেদিন তোমাদের'।¹²⁵ হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, তোমরা তোমাদের অনেক পাপকে চুলের চাইতে সূক্ষ্ম মনে কর। অথচ রাসূল (ছাঃ)-এর যামানায় আমরা সেগুলিকে ধ্বংসকারী মনে করতাম'।¹²⁶ এক্ষণে অহংকারের মত মহাপাপ হৃদয়ে জাগ্রত হ'লে সেটাকে দ্রুত দমন করতে হবে, যা সহজেই অনুমেয়।

১৩. মানুষকে ক্ষমা করা ও সর্বদা নম্রতা অবলম্বন করা :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَا زَادَ اللَّهُ عْبْدًا بِعَفْوِ إِلا عِزًّا وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ 'বান্দা কাউকে ক্ষমা করলে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর যখন সে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয় অবলম্বন করে, তখন তিনি তার মর্যাদাকে সমুন্নত করেন'।¹²⁷ তিনি বলেন, إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ 'নম্রতা যে বস্তুর মধ্যে থাকে, তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং তা প্রত্যাহার করা হ'লে সেটি দোষযুক্ত হয়ে পড়ে'।¹²⁸ এর দ্বারা বুঝা যায় যে, বিনয় ও আনুগত্য মানুষকে উঁচু ও সম্মানিত করে। পক্ষান্তরে অহংকার ও আত্মগর্ব মানুষকে নীচু ও লাঞ্ছিত করে।

১৪. নিরহংকার হওয়ার জন্য আল্লাহ্র সাহায্য প্রার্থনা করা :
অহংকার থেকে মুক্ত থাকার জন্য নিম্নের দো'আটি পাঠ করা যেতে পারে।-

اللهُ أَكْبَرُ كَبيراً وَالْحَمْدُ لله كَثيراً وَسَبْحَانَ الله وَبِحَمْدِهِ بُكْرَةً وَأَصِيلاً - اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْخِهِ وَنَفْتِهِ -
অর্থ : আল্লাহ সর্বোচ্চ, আল্লাহ্র জন্য যাবতীয় প্রশংসা, সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁর প্রশংসাসহ আল্লাহ্র জন্য সকল পবিত্রতা। আমি আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি বিতাড়িত শয়তান হ'তে এবং তার প্ররোচনা, তার ফুঁক ও তার কুমন্ত্রণা হ'তে। উক্ত হাদীছে نَفْخُهُ বা 'শয়তানের ফুঁক'-এর অর্থ সম্পর্কে রাবী 'আমর বিন মুররা বলেন, সেটা হ'ল الْکِبْرُ অর্থাৎ 'অহংকার'।¹²⁹

এছাড়াও সূরা ফালাক্ব ও নাস পড়া উচিৎ। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, 'কোন প্রার্থনাকারী প্রার্থনা করতে পারে না এবং কোন আশ্রয়প্রার্থী আশ্রয় চাইতে পারে না এ দু'টি সূরার তুলনায় অন্য কিছুর মাধ্যমে'।¹³⁰

টিকাঃ
১০৫. তিরমিযী হা/২৩০৭, মিশকাত হা/১৬০৭।
১০৬. বায়হাক্বী, শু'আবুল ঈমান হা/৭৪১৫, তারীখু ত্বাবারী ৪/২০২; সনদ হাসান লিগাইরিহী।
১০৭. কুরতুবী, সূরা বাক্বারাহ ২০৬ আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য।
১০৮. বুখারী হা/৬৪৯০, মুসলিম হা/২৯৬৩, মিশকাত হা/৫২৪২।
১০৯. বুখারী হা/৬৭৬; আহমাদ হা/২৫৩৮০, ২৬২৩৭, মিশকাত হা/৫৮২২।
১১০. ত্বাবারাণী হা/৩৬৩; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩২৫৭।
১১১. বুখারী হা/৫০, মুসলিম হা/৮, মিশকাত হা/২।
১১২. আবুদাঊদ হা/২৫৯৪; ছহীহাহ হা/৭৭৯; মিশকাত হা/৫২৪৬।
১১৩. আহমাদ, ত্বাবারাণী; ছহীহাহ হা/৮৫৪; মিশকাত হা/৫০০১।
১১৪. মুসলিম হা/২৫৬৮, মিশকাত হা/১৫২৭।
১১৫. মুসলিম হা/২৫৬৯, মিশকাত হা/১৫২৮।
১১৬. বুখারী হা/৩৪৬৭; মুসলিম হা/২২৪৪।
১১৭. তিরমিযী হা/৩১৭৫; ছহীহাহ হা/১৬২; মিশকাত হা/৫৩৫০ 'ক্রন্দন ও আল্লাহভীতি' অনুচ্ছেদ।
১১৮. বুখারী হা/২৪৪৯; মিশকাত হা/৫১২৬ 'যুলুম' অনুচ্ছেদ।
১১৯. কুরতুবী, তাফসীর সূরা মা'আরিজ ৩৯ আয়াত।
১২০. মুসলিম হা/৯১, মিশকাত হা/৫১০৮।
১২১. তিরমিযী হা/২৮১৯, আহমাদ হা/১৯৯৪৮; মিশকাত হা/৪৩৫০, ৪৩৭৯।
১২২. বুখারী হা/১৪২৩, মুসলিম হা/১০৩১; মিশকাত হা/৭০১।
১২৩. তিরমিযী হা/১৭৩৩; মিশকাত হা/৩৮২৮।
১২৪. বুখারী হা/৬৬৩১; মিশকাত হা/৫৩৩৯।
১২৫. বুখারী হা/৩৯১৯; মিশকাত হা/৫৩৪০।
১২৬. বুখারী হা/৬৪৯২; মিশকাত হা/৫৩৫৫।
১২৭. মুসলিম হা/২৫৮৮; মিশকাত হা/১৮৮৯।
১২৮. মুসলিম হা/২৫৯৪; মিশকাত হা/৫০৬৮।
১২৯. ছহীহ ইবনু হিব্বান হা/১৭৭৭; আলবানী, সনদ ছহীহ লিগাইরিহী।
১৩০. নাসাঈ হা/৫৪৩৮; সনদ হাসান ছহীহ।

📘 হিংসা ও অহংকার > 📄 যে অহংকার শোভনীয়

📄 যে অহংকার শোভনীয়


(১) যখন মানুষ মিথ্যা ছেড়ে সত্যের অনুসারী হয়, তখন সে তার জন্য অহংকার করতে পারে। যেমন কুফর ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করা। (২) যদি কেউ জাল ও যঈফ হাদীছ ছেড়ে ছহীহ হাদীছের উপর আমল শুরু করে, তবে তার জন্য সে গর্ব করতে পারে। (৩) যখন কোন ব্যক্তি বাতিল ছেড়ে ফিরক্বা নাজিয়াহ্র অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন সে ঐ জামা'আতের উপর গর্ব করতে পারে। যেমন হযরত ছওবান (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَ هُمْ كَذَلِكَ -
'চিরদিন আমার উম্মতের মধ্যে একটি দল হক-এর উপরে বিজয়ী থাকবে। পরিত্যাগকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এমতাবস্থায় ক্বিয়ামত এসে যাবে, অথচ তারা ঐভাবে থাকবে'।¹³¹ আর ক্বিয়ামত পর্যন্ত ঐ হকপন্থী জামা'আত হ'ল 'আহলুল হাদীছ'।¹³² তিনি বলেন, যে ব্যক্তি জান্নাতের মধ্যস্থলে থাকতে চায়, সে যেন জামা'আতবদ্ধ জীবনকে অপরিহার্য করে নেয়'।¹³³ (৪) হকপন্থী দলের নামে অহংকার। যেমন হোনায়েন-এর যুদ্ধের দিন বিপর্যয়কর অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হুকুমে উচ্চ কণ্ঠের অধিকারী আব্বাস (রাঃ) হোদায়বিয়ার বৃক্ষতলে মৃত্যুর উপরে বায়'আত গ্রহণকারী ছাহাবীদের ডেকে বলেন, أَيْنَ أَصْحَابُ السَّمُرَة 'সামুরা বৃক্ষের সাথীরা কোথায়? يَا مَعْشَرَ الْأَنْصَارِ 'হে আনছারগণ! একইভাবে বাতিলের অন্ধকারে আহলেহাদীছ-এর পরিচয় নিঃসন্দেহে সত্যের অহংকার। যা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। (৫) উচ্চ বংশের অহংকার। যেমন একই যুদ্ধে একই অবস্থার খচ্চরের পিঠ থেকে নেমে তেজস্বী কণ্ঠে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলে ওঠেন, أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبْ + أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبْ 'আমি নবী, মিথ্যা নই । আমি আব্দুল মুত্ত্বালিবের পুত্র'।¹³⁴

খ্রিষ্টানদের সাথে সন্ধির জন্য তাদের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী সেখানে খলীফাকে উপস্থিত হওয়ার জন্য বায়তুল মুকাদ্দাস সফরকালে খলীফা ওমর (রাঃ) যখন একাকী খালি পায়ে উটের লাগام ধরে হাঁটতে শুরু করেন, তখন সাথী আবু ওবায়দাহ (রাঃ) এতে আপত্তি করেন। জবাবে ওমর (রাঃ) বলেন, إِنَّا كُنَّا أَذَلَّ قَوْمٍ فَأَعَزَّنَا اللهُ بِالْإِسْلَامِ فَمَهْمَا نَطْلُبُ الْعِزَّةَ بِغَيْرِ مَا أَعَزَّنَا اللَّهُ بِهِ أَذَلَّنَا اللَّهُ 'আমরা ছিলাম নিকৃষ্ট জাতি। অতঃপর আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। অতএব যে কারণে আল্লাহ আমাদের মর্যাদা দান করেছেন, তা ছেড়ে অন্য কিছুর মাধ্যমে সম্মান তালাশ করলে আল্লাহ আমাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন।' অন্য বর্ণনায় এসেছে, إِنَّا قَوْمٌ أَعَزَّنَا اللهُ بِالْإِسْلَامِ ، فَلَنْ نَبْتَغِي الْعِزَّ بِغَيْرِهِ 'আমরা সেই জাতি যাদেরকে আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। এর বাইরে অন্য কিছুর মাধ্যমে আমরা সম্মান চাই না'।¹³⁵

টিকাঃ
১৩১. ছহীহ মুসলিম 'ইমারত' অধ্যায়-৩৩, অনুচ্ছেদ-৫৩, হা/১৯২০; অত্র হাদীছের ব্যাখ্যা দ্রঃ ঐ, দেউবন্দ ছাপা শরহ নববী ২/১৪৩ পৃঃ; বুখারী, ফাৎহুল বারী হা/৭১ 'ইল্ম' অধ্যায় ও হা/৭৩১১-এর ভাষ্য 'কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা' অধ্যায়; আলবানী, সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৭০-এর ব্যাখ্যা।
১৩২. তিরমিযী হা/২১৯২, ছহীহুল জামে' হা/৭০২; মিশকাত হা/৬২৮৩।
১৩৩. তিরমিযী হা/২৪৬১।
১৩৪. মুসলিম হা/১৭৭৬; বুখারী হা/২৮৬৪; মিশকাত হা/৫৮৮৮, ৫৮৮৯।
১৩৫. হাকেম ১/৬১-৬২, হা/২০৮; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৫১; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, শিরোনাম: 'ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের হাতে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়' ৭/৫৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00