📘 হিংসা ও অহংকার > 📄 হিংসুকের অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায় সমূহ (৫টি)

📄 হিংসুকের অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায় সমূহ (৫টি)


(১) হিংসায় ছবর করা ও পাল্টা হিংসা না করা : আল্লাহ বলেন, وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوْا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا 'যদি তোমরা ছবর কর ও আল্লাহভীরুতা অবলম্বন কর, তাহ'লে ওদের চক্রান্ত তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না' (আলে ইমরান ৩/১২০)। শিশু ইউসুফকে বাঘে খেয়েছে বলে তার মিথ্যা রক্ত মাখানো জামা দেখানোর পর পিতা ইয়াকূব (আঃ) ছেলেদের বলেছিলেন, 'তোমাদের মন তোমাদেরকে একটা (মিথ্যা) কাহিনী বানিয়ে দিয়েছে। অতএব এখন ছবর করাই উত্তম। আর তোমরা যেসব কাহিনী শুনাচ্ছ, সে বিষয়ে আল্লাহই আমার একমাত্র সাহায্যস্থল' (ইউসুফ ১২/১৮)। আল্লাহ ইয়াকূবের দো'আ কবুল করেছিলেন এবং কুয়ায় সাক্ষাৎ মৃত্যু থেকে উঠিয়ে আল্লাহ ইউসুফকে মিসরের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন।

(২) আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসা করা: আল্লাহ বলেন, وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللهُ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْراً 'যে ব্যক্তি আল্লাহ্র উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হন। আল্লাহ তার আদেশ পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন' (তালাক ৬৫/৩)। বস্তুতঃ এটাই হল সবচেয়ে বড় উপায়।

(৩) হিংসুক ব্যক্তির প্রতি সদাচরণ করা: আল্লাহ বলেন, وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ 'ভাল ও মন্দ সমান নয়। তুমি ভাল দিয়ে মন্দকে প্রতিরোধ কর। তাহ'লে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত হয়ে যাবে' (হামীম সাজদাহ ৪১/৩৪)। আবুদ্দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَلا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ؟ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ صَلاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ فَإِنَّ فَسَادَ ذَاتِ الْبَيْنِ هِيَ الْحَالِقَةُ 'আমি কি তোমাদেরকে ছিয়াম-ছাদাক্বা ও ছালাতের চেয়েও উত্তম কোন বিষয়ের খবর দিব? আর তা হ'ল পারস্পরিক বিবাদ মিটিয়ে দেওয়া। কেননা পরস্পরের বিবাদ দ্বীনকে মুণ্ডনকারী'।²²

(৪) গোনাহ থেকে তওবা করা : বিপদাপদ বান্দার নিজের কারণেই এসে থাকে (আলে ইমরান ৩/১৬৫)। সে নিজের অজান্তেই অনেক গোনাহ করে থাকে। অথবা জেনেশুনে কিংবা বাধ্য হয়ে করে। আর বান্দা যা জানে, তার চাইতে বহুগুণ বেশী গোনাহ তার রয়েছে, যা সে জানে না। অমনিভাবে যেসব গোনাহের কথা তার স্মরণে আছে, তার চাইতে বহুগুণ বেশী গোনাহ তার স্মরণে থাকে না। তাই সর্বদা বান্দাকে জানা-অজানা সকল পাপের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয় এবং খালেছ অন্তরে তওবা করতে হয়। তাতে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে হিংসুক ব্যক্তির অনিষ্ট হতে তাকে রক্ষা করে থাকেন। আল্লাহ বলেন, ثُمَّ نُنَجِّي رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُواْ كَذَلِكَ حَقًّا عَلَيْنَا تُنجِ الْمُؤْمِنِينَ 'অতঃপর আমরা নাজাত দিয়ে থাকি আমাদের রাসূলদের এবং একইভাবে মুমিনদের। কেননা আমাদের উপর হক হ'ল মুমিনদের নাজাত দেওয়া' (ইউনুস ১০/১০৩)। তিনি বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوْحاً عَسَى رَبُّكُمْ أَن يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ يَوْمَ لاَ يُخْزِي اللَّهُ النَّبِيَّ وَالَّذِينَ آمَنُوْا مَعَهُ نُوْرُهُمْ يَسْعَى بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ يَقُولُوْنَ رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُوْرَنَا وَاغْفِرْ لَنَا إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ 'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্র নিকট বিশুদ্ধভাবে তওবা কর। যাতে তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের পাপ সমূহ মোচন করে দেন এবং তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করান, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়। যেদিন আল্লাহ স্বীয় নবী ও তার সাথী মুমিনদের লজ্জিত করবেন না। তাদের নূর তাদের সম্মুখে ও ডাইনে ধাবিত হবে। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণতা দান কর এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর। নিশ্চয়ই তুমি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান' (তাহরীম ৬৬/৮)।

কিয়ামতের দিন পুলছেরাত পার হবার সময় স্ব স্ব নেক আমল অনুযায়ী মুমিনদের সম্মুখে জ্যোতি থাকবে এবং তাদের ডান হাতে আমলনামা থাকবে। যেখানে জান্নাতের সুসংবাদ থাকবে। এ সময় মুনাফিকদের সম্মুখে জ্যোতি নিভে যাবে। তখন মুমিনগণ আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা করবে, যেন পুলছেরাত পার হওয়া পর্যন্ত তাদের জ্যোতি অব্যাহত থাকে। আর এটা তারা ঐসময় বলবে, যখন মুনাফিকরা মুমিনদের উদ্দেশ্যে বলবে, 'তোমরা একটু থামো। আমরা তোমাদের থেকে কিছু জ্যোতি নিয়ে নিই। বলা হবে, তোমরা পিছনে ফিরে গিয়ে জ্যোতি তালাশ কর'... (হাদীদ ৫৭/১৩)। বস্তুতঃ আল্লাহ মুমিনদের জন্য জ্যোতিকে অব্যাহত রাখবেন।²³ আর এসবই হবে তাদের খালেছ তওবার ফল হিসাবে। আনাস (রাঃ) বলেন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, كُلُّ ابْنِ آدَمَ حَطَّاءُ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ 'প্রত্যেক আদম সন্তান ভুলকারী এবং ভুলকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হ'ল তওবাকারীগণ'।²⁴

(৫) সকল চিন্তাকে আল্লাহ্র উপর ছেড়ে দেওয়া: হিংসা কারু কোন ক্ষতি করতে পারে না আল্লাহ্র হুকুম ব্যতীত। যেমন তিনি বলেন, وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ 'যদি আল্লাহ তোমার কোন অকল্যাণ করেন, তবে তা দূর করার কেউ নেই তিনি ব্যতীত। আর যদি তিনি তোমার প্রতি কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তবে তার অনুগ্রহকে ফিরিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে যা চান তাকে তা দান করে থাকেন। বস্তুতঃ তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান' (ইউনুস ১০/১০৭)।

ওহোদ যুদ্ধে দান্দান মুবারক শহীদ হলে মুখের রক্ত মুছতে মুছতে রাসূল (ছাঃ) দুঃখ করে বলেছিলেন, كَيْفَ يُفْلِحُ قَوْمٌ شَجُّوا وَجْهَ نَبِيِّهِمْ ঐ জাতি কিভাবে সফলকাম হবে যারা তাদের নবীর চেহারাকে রক্তাক্ত করেছে'? এছাড়াও তিনি সেদিন চারজন কাফের নেতার নাম ধরে তাদের বিরুদ্ধে লা'নত করেছিলেন। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ আয়াত নাযিল করে বলেন, لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ 'তিনি তওবা করবেন না শাস্তি দিবেন, সে ব্যাপারে তোমার কিছুই করার নেই। কারণ ওরা সীমালংঘনকারী' (আলে ইমরান ৩/১২৮)। পরে দেখা গেল ঐ চারজন নেতাকে আল্লাহ ইসলাম কবুলের তাওফীক দান করেন এবং মৃত্যু অবধি তাদের ইসলাম সুন্দর ছিল'।²⁵

উপরোক্ত আয়াত নাযিলের মাধ্যমে রাসূল (ছাঃ)-কে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ যে যালেমদের শাস্তি দিবেনই, সে ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়েছে। এর দ্বারা কুনূতে নাযেলাহ পাঠ নিষেধ করা হয়নি। কেননা ওহোদের ঘটনার পরের বছর ৪র্থ হিজরীর ছফর মাসে সংঘটিত রাজী' ও বি'রে মা'ঊনার মর্মন্তুদ ঘটনায় বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে যথাক্রমে ১০ জন ও ৭০ জন শ্রেষ্ঠ ছাহাবীর অসহায়ভাবে শাহাদাত বরণের পর তিনি হত্যাকারী সম্প্রদায়গুলির বিরুদ্ধে একমাস ব্যাপী প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতে কুনূতে নাযেলাহ পাঠ করেন।²⁶ আল্লাহ অবশ্যই হিংসুক যালেমকে শাস্তি দিবেন দুনিয়াতে ও আখেরাতে। দুনিয়াতে মযলূমের জীবদ্দশায় বা তার মৃত্যুর পরে এ শাস্তি হবে। যেমন রাসূল (ছাঃ)-এর জীবদ্দশায় হিংসুক আবু জাহলরা শাস্তি পেয়েছে এবং তাঁর মৃত্যুর পরে ভণ্ডনবী মুসায়লামা কাযযাব আবুবকর (রাঃ)-এর সময় ইয়ামামার যুদ্ধে নিহত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَلَنُذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ (এবং আমরা) কঠিন শাস্তি দেওয়ার আগে আমরা অবশ্যই (দুনিয়াতে) তাদেরকে লঘু শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাব। যাতে তারা ফিরে আসে' (সাজদাহ ৩২/২১)।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন যে, আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার কোন প্রিয় বান্দার (مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا) সাথে দুশমনী করল, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের (فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ) ঘোষণা দিলাম'।²⁷ অতএব মুমিনের প্রতি হিংসাকারীর শাস্তির বিষয়টি আল্লাহ্র উপর ছেড়ে দেওয়াই উত্তম। তিনি হেদায়াত করবেন, যেমন ওহোদ যুদ্ধের কাফের নেতাদের করেছিলেন। অথবা ইহকালে ও পরকালে চরম শাস্তি দিবেন, 'যেরূপ শাস্তি কেউ দিতে পারে না' (ফজর ৮৯/২৫-২৬)।

টিকাঃ
২২. তিরমিযী হা/২৫০৯; আবুদাঊদ হা/৪৯১৯; মিশকাত হা/৫০৩৮।
২৩. ইবনু জারীর, ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা হাদীদ ১২-১৩ এবং তাহরীম ৮ আয়াত।
২৪. তিরমিযী হা/২৪৯৯, ইবনু মাজাহ হা/৪২৫১; মিশকাত হা/২৩৪১।
২৫. আহমাদ হা/১৪১০৪, তিরমিযী হা/৩০০২-০৫; ঐ চারজন ছিলেন আবু সুফিয়ান, হারেছ বিন হিশাম, ছাফওয়ান বিন উমাইয়া (তিরমিযী হা/৩০০৪) এবং সুহায়েল বিন আমর (বুখারী হা/৪০৭০)।
২৬. বুখারী, মুসলিম, আবুদাউদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/১২৮৯-৯১ 'কুনূত' অনুচ্ছেদ।
২৭. বুখারী হা/৬৫০২; মিশকাত হা/২২৬৬।

📘 হিংসা ও অহংকার > 📄 মুসলমানদের উন্নতির কারণ

📄 মুসলমানদের উন্নতির কারণ


ইসলামের সোনালী যুগে মুসলমানদের উন্নতি ও বিশ্ব বিজয়ের মূলে কারণ ছিল তাদের পারস্পরিক মহব্বত-ভালোবাসা ও বিদ্বেষমুক্ত হৃদয়ের সৃদৃঢ় বন্ধন। তারা অন্যের দুঃখ-বেদনাকে নিজের সাথে ভাগ করে নিতেন। তারা অন্যের জন্য সেটাই ভালবাসতেন, যেটা নিজের জন্য ভালবাসতেন। হযরত আনাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, وَالَّذِي نَفْسِي بِيَده لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ 'যেই সত্তার হাতে আমার জীবন, তার কসম করে বলছি, তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য ঐ বস্তু ভালবাসবে, যা সে নিজের জন্য ভালবাসে'।²⁸ এ বিষয়ে মক্কার মুহাজির মুসলমানদের জন্য মদীনার আনছারগণের অনন্য ত্যাগের দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তাদের প্রশংসায় আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ '(মুহাজিরদের আগমনের) পূর্ব থেকেই মদীনায় বসবাস করত এবং ঈমান এনেছিল, তারা (আনছাররা) মুহাজিরদের ভালবাসে এবং তাদেরকে যা (সম্পদ ও উচ্চ সম্মান) দেওয়া হয়েছে, তা পাওয়ার জন্য নিজেদের অন্তরে কোনরূপ প্রয়োজন অনুভব করে না। আর তারা নিজেদের উপরে তাদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তাদের নিজেদেরই ছিল অনটন। বস্তুতঃ যারা হৃদয়ের কার্পণ্য হ'তে মুক্ত, তারাই সফলকাম' (হাশর ৫৯/৯)। এমনকি যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যু পথযাত্রী মুসলিম সৈনিক তৃষ্ণার্ত অন্য সৈনিকের স্বার্থে নিজে পানি পান না করেই প্রাণত্যাগ করে মৃত্যুর দুয়ারে মানবতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে গেছেন। যেমন ইয়ারমুকের যুদ্ধে ঘটেছিল।²⁹ ইতিহাসে এর কোন তুলনা নেই।

আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) বলেন, আমরা একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে বসে আছি। এমন সময় তিনি বললেন, يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ 'এখন তোমাদের নিকট একজন জান্নাতী মানুষের আগমন ঘটবে'। অতঃপর আনছারদের একজন ব্যক্তি আগমন করল। যার দাড়ি দিয়ে ওযূর পানি টপকাচ্ছিল ও তার বাম হাতে জুতা জোড়া ছিল। দ্বিতীয় দিন ও তৃতীয় দিন রাসূল (ছাঃ) একই রূপ বললেন এবং পরক্ষণে একই ব্যক্তির আগমন ঘটলো। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মজলিস থেকে উঠলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল 'আছ তাঁর পিছু নিলেন। ...আনাস (রাঃ) বলেন, আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বলেন যে, আমি তার বাসায় একরাত বা তিন রাত কাটাই। কিন্তু তাকে রাতে ছালাতের জন্য উঠতে দেখিনি। কেবল ফজরের জন্য ওযু করা ব্যতীত। তাছাড়া আমি তাকে সর্বদা ভাল কথা বলতে শুনেছি। এভাবে তিনদিন তিনরাত চলে গেলে আমি তার আমলকে হীন মনে করতে লাগলাম (كدْتُ أَنْ أَحْتَقْرَ عَمَلَهُ)। আমি তখন ঐ ব্যক্তিকে বললাম, আপনার সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) এই কথা বলেছিলেন এবং আমিও আপনাকে গত তিনদিন যাবৎ লক্ষ্য করছি। কিন্তু আপনাকে বড় কোন আমল করতে দেখলাম না (فَلَمْ أَرَكَ تَعْمَلُ كَبِيرَ عَمَلٍ)। তা'হলে কোন বস্তু আপনাকে ঐ স্থানে পৌঁছিয়েছে, যার সুসংবাদ আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) আমাদেরকে শুনিয়েছেন। তিনি বললেন, আমি যা করি তাতো আপনি দেখেছেন। অতঃপর যখন আমি চলে আসার জন্য পিঠ ফিরাই, তখন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, مَا هُوَ إِلَّا مَا رَأَيْتَ غَيْرَ أَنِّي لَا أَجِدُ فِي نَفْسِي لِأَحَدٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ غلاً وَلَا أَحْسُدُ أَحَداً عَلَى خَيْرٍ أَعْطَاهُ اللَّهُ إِيَّاهُ 'আপনি যা দেখেছেন, তাতো দেখেছেন। তবে আমি আমার অন্তরে কোন মুসলিমের প্রতি কোনরূপ বিদ্বেষ রাখি না এবং আমি কারু প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত কোন কল্যাণের উপর হিংসা পোষণ করি না'। একথা শুনে আব্দুল্লাহ বিন আমর বললেন, هَذِهِ الَّتِي بَلَغَتْ بِكَ وَهِيَ الَّتِي لَا نُطِيقُ 'এটিই আপনাকে উক্ত স্তরে পৌঁছেছে। এটি এমন এক বস্তু যা আমরা করতে সক্ষম নই।³⁰

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, لَا يَجْتَمَعَانِ فِي قَلْبِ عَبْدِ الإِيْمَانُ وَالْحَسَدُ 'কোন বান্দার অন্তরে ঈমান ও হিংসা একত্রিত হতে পারে না'।³¹ অর্থাৎ মুমিনের অন্তরে হয় ঈমান থাকবে, নয় হিংসা থাকবে। ঈমানদারের অন্তরে হিংসা থাকবে না, হিংসুকের অন্তরে ঈমান থাকবে না। মুমিন কখনো হিংসুক নয়, হিংসুক কখনো মুমিন নয়। অর্থাৎ পূর্ণ মুমিন নয়। হিংসা মুমিনদের পরস্পরে ভাই হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এই বাধা দূর না করা পর্যন্ত মুমিন সমাজ আপোষে ভাই ভাই হ'তে পারবে না।

মুমিন সর্বদা অন্যের শুভ কামনা করে। যেমন সে সর্বদা নিজের শুভ কামনা করে। যেমন তামীম দারী (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, الدِّينُ النَّصِيْحَةُ 'দ্বীন হ'ল নছীহত'।³² অর্থাৎ এখলাছ। যা পরস্পরের শুভ কামনা ও অকল্যাণ প্রতিরোধের মাধ্যমে অর্জিত হয়। হযরত জারীর বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট বায়'আত করেছিলাম ছালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা এবং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য শুভ কামনার উপর'।³³

বস্তুতঃ প্রথম যুগের মুসলমানেরা ছিলেন পারস্পরিক ভালোবাসায় একটি দেহের ন্যায়। যারা পরস্পরকে সাহায্য করতেন। পরস্পরের দোষ গোপন করতেন। পরস্পরের ব্যথায় সমব্যথী হ'তেন। নু'মান বিন বাশীর (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, তুমি মুমিনদের পারস্পরিক দয়া, ভালবাসা ও স্নেহকে দেখবে একটি দেহের ন্যায়। যার এক অঙ্গ ব্যথাতুর হলে সর্বাঙ্গ ব্যথাতুর হয় অনিদ্রা ও জ্বরের মাধ্যমে'।³⁴ নিঃসন্দেহে তারা ছিলেন আল্লাহ্র পথে সংগ্রামে পারস্পরে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায়, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন (ছফ ৬১/৪)। এযুগেও মুসলিম উম্মাহ্র উন্নতি ও অগ্রগতির সেটাই হ'ল আবশ্যিক পূর্বশর্ত।

টিকাঃ
২৮. বুখারী হা/১৩, মুসলিম হা/৪৫; মিশকাত হা/৪৯৬১।
২৯. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/১১।
৩০. হাকেম পৃঃ ৩/৭৯ হা/৪৩৮০, হাকেম ছহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তাকে সমর্থন করেছেন। আহমাদ হা/১২৭২০, আরনাঊত্ব ছহীহ বলেছেন; আলবানী প্রথমে ছহীহ পরে যঈফ বলেছেন (তারাজু'আতুল আলবানী হা/৪৮)।
৩১. নাসাঈ হা/৩১০৯, সনদ হাসান।
৩২. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ, মিশকাত হা/৪৯৬৬।
৩৩. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ, মিশকাত হা/৪৯৬৭।
৩৪. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৫৩।

📘 হিংসা ও অহংকার > 📄 হিংসুকদের চটকদার যুক্তিসমূহের কিছু নমুনা

📄 হিংসুকদের চটকদার যুক্তিসমূহের কিছু নমুনা


হিংসুক ব্যক্তি তার চাকচিক্যপূর্ণ কথা ও আকর্ষণীয় যুক্তির মাধ্যমে সত্যকে মিথ্যা বলে ও মিথ্যাকে সত্য বলে। এ বিষয়ে (১) ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর শিষ্য খ্যাতনামা তাবেঈ ইকরিমা (মৃঃ ১০৭ হিঃ) বিগত যুগে বনু ইস্রাঈলদের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, তাদের মধ্যে তিনজন বিখ্যাত কাযী বা বিচারপতি ছিলেন। পরে তাদের একজন মারা গেলে অন্যজন তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি বিচারকার্য চালাতে থাকলেন। এমন সময় একদিন আল্লাহ জনৈক ফেরেশতাকে পাঠালেন। যিনি ঘোড়ায় চড়ে একজন ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। যে ব্যক্তি বাছুরসহ তার গাভীকে পানি পান করাচ্ছিল। ফেরেশতা বাছুরটিকে তার দিকে ডাক দিলেন। তাতে বাছুরটি ঘোড়ার পিছে পিছে চলল। তখন ঐ লোকটি ছুটে এসে তার বাছুরটিকে ফিরিয়ে নিতে চাইল এবং বলল, হে আল্লাহ্র বান্দা! এটি আমার বাছুর এবং আমার এই গাভীর বাচ্চা। ফেরেশতা বললেন, বরং ওটা আমার বাছুর এবং আমার এই ঘোড়ার বাচ্চা। কেউ দাবী না ছাড়লে অবশেষে তারা কাযীর কাছে গেলেন। বাছুরের মালিক বলল, এই লোকটি আমার বাছুরের পাশ দিয়ে যাবার সময় তাকে ডাকল, আর বাছুরটি তার পিছে পিছে চলে গেল। অথচ বাছুরটি আমার। কিন্তু এখন সে আমাকে ফেরৎ দিচ্ছে না। উত্তরে বিবাদী ফেরেশতা বললেন এমতাবস্থায় যে, তার হাতে তিনটি বেত ছিল। যার অনুরূপ কোন বেত সচরাচর দেখা যায় না। তার মধ্যে একটি বেত তিনি বিচারকের হাতে দিয়ে বললেন, আপনি এটা দিয়ে আমাদের মাঝে ফায়ছালা করুন। বিচারক বললেন, কিভাবে? বিবাদী বললেন, আমরা বাছুরটাকে ঘোড়া ও গাভীর পিছনে ছেড়ে দিব। অতঃপর বাছুরটি যার পিছে পিছে যাবে, সেটি তার হবে। বিচারক সেটাই করলেন। দেখা গেল যে, বাছুরটি ঘোড়ার পিছু নিল। তখন বিচারক বাছুরটি ঘোড়ার বলে রায় দিলেন। বাছুরের মালিক এ রায় মানল না। সে বলল, আমি আরেকজন বিচারকের কাছে যাব। সেখানে গিয়ে উভয়ে পূর্বের মত বাছুরটিকে নিজের বলে দাবী করল এবং আগের মত যুক্তি প্রদর্শন করল। সেখানেও একই রায় হ'ল। তখন বাদী তাতে রাযী না হয়ে তৃতীয় বিচারকের কাছে গেল। বিবাদী তাকে এবার তৃতীয় বেতটি দিলেন। কিন্তু তিনি তা নিতে অস্বীকার করলেন এবং বললেন, আমি আজকে তোমাদের বিচার করব না। তারা বলল, কেন করবেন না? তিনি বললেন, কেননা আমি আজ ঋতুবতী। বিবাদী ফেরেশতা একথা শুনে বলে উঠলেন, সুবহানাল্লাহ! পুরুষ লোক কখনো ঋতুবতী হয়? তখন বিচারক বললেন, ঘোড়া কখনো গরুর বাছুর জন্ম দেয়? অতঃপর তিনি বাছুরটিকে গাভীর মালিককে দিয়ে দিলেন। এবার ফেরেশতা বললেন, আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করেছেন। তিনি তোমার উপর খুশী হয়েছেন এবং ঐ দুই বিচারকের উপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন'।³⁵

(২) মক্কার নেতাদেরকে শয়তান যুক্তি শিখিয়ে দিল। সেমতে তারা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে গিয়ে প্রশ্ন করল, মৃত বকরীকে কে হত্যা করে? জওয়াবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আল্লাহ। তখন শয়তান বলল, দেখ তোমরা যেটা যবহ কর, সেটা হালাল। আর আল্লাহ যেটা যবহ করেন, সেটা হারাম। তাহ'লে তোমরাই আল্লাহ্র চেয়ে উত্তম। তখন আয়াত নাযিল হ'ল, وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ 'যে সব পশু (যবহের সময়) তার উপর আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা হয় না, সেগুলি থেকে তোমরা খেয়োনা। নিশ্চয়ই এটি পাপ। আর শয়তানেরা তাদের বন্ধুদের কুমন্ত্রণা দেয়, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিতর্ক করে। (মনে রেখ) যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তাহ'লে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হয়ে যাবে' (আন'আম ৬/১২১; তাফসীর ইবনু কাছীর)।

টিকাঃ
৩৫. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৯/২৫৬।

📘 হিংসা ও অহংকার > 📄 হিংসুকদের কিছু দৃষ্টান্ত (৮টি)

📄 হিংসুকদের কিছু দৃষ্টান্ত (৮টি)


(১) ইবলীসের হিংসা : আদম (আঃ)-এর উচ্চ মর্যাদা দেখে ইবলীস হিংসায় জ্বলে উঠেছিল। সে নিজেকে আদমের চাইতে শ্রেষ্ঠ দাবী করে তাঁকে সম্মানের সিজদা করেনি। সে যুক্তি দিয়ে বলেছিল, خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ 'আল্লাহ তুমি আমাকে আগুন দিয়ে তৈরী করেছ এবং আদমকে তৈরী করেছ মাটি দিয়ে' (আ'রাফ ৭/১১-১২)। অতএব আগুন কখনো মাটিকে সিজদা করতে পারে না। তার এই যুক্তিবাদের ফলে সে অভিশপ্ত হয় এবং জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়। এভাবে আসমানে প্রথম হিংসা করে ইবলীস এবং সেই-ই প্রথম আদম ও হাওয়াকে বিভ্রান্ত করে। ফলে তারাও জান্নাত থেকে আল্লাহ্র হুকুমে নেমে যান। আদমের ও তার সন্তানদের প্রতি ইবলীসের উক্ত হিংসা আজও অব্যাহত রয়েছে। যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত থাকবে আল্লাহ্র অনুমতিক্রমে (আরাফ ৭/১৩-১৫; হিজর ১৫/৩৩-৩৮)।

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, الحاسد شبيه بإبليس، وهو في الحقيقة من أتباعه؛ لأنه يطلب ما يحبه الشيطان من فساد الناس وزوال نعم الله عنهم، كما أن إبليس حسد آدم لشرفه وفضله، وأبى أن يسجد له حسدا، فالحاسد من جند إبليس 'হিংসুক ব্যক্তি ইবলীসের ন্যায়। সে শয়তানের অনুসারী। কেননা সে শয়তানের চাহিদা মতে সমাজে বিশৃংখলা ও অশান্তি সৃষ্টি করতে চায় এবং অন্যের উপর আল্লাহ্র নে'মতসমূহের ধ্বংস কামনা করে। যেমন ইবলীস আদমের উচ্চ মর্যাদা ও তার শ্রেষ্ঠত্বকে হিংসা করেছিল এবং তাকে সিজদা করতে অস্বীকার করেছিল। অতএব হিংসুক ব্যক্তি ইবলীসের সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত।³⁶

(২) হাবীলের প্রতি কাবীলের হিংসা :
আদম-পুত্র কাবীল তার ছোট ভাই হাবীলকে হত্যা করেছিল হিংসা বশে। কারণ আল্লাহভীরু হাবীলের কুরবানী আল্লাহ কবুল করেছিলেন। কিন্তু দুনিয়াদার কাবীলের কুরবানী আল্লাহ কবুল করেননি। অথচ এতে হাবীলের কিছুই করার ছিলনা। এতদসত্ত্বেও কাবীল তাকে হত্যা করে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, '(হে নবী!) তুমি লোকদের নিকট আদমের দুই পুত্রের ঘটনা সত্য সহকারে বর্ণনা কর। যখন তারা কুরবানী পেশ করে। অতঃপর একজনের কুরবানী কবুল হয়, কিন্তু অপর জনের কুরবানী কবুল হয়নি। তখন সে বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। জবাবে সে বলল, আল্লাহ তো কেবল মুত্তাক্বীদের কুরবানী কবুল করে থাকেন'। 'যদি তুমি আমার দিকে হাত বাড়াও আমাকে হত্যা করার জন্য, আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য তোমার দিকে হাত বাড়াবো না। আমি বিশ্বচরাচরের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি' (মায়েদাহ ৫/২৭-২৮)।

বলা বাহুল্য, এটাই ছিল মানবেতিহাসের প্রথম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। সেকারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ক্বিয়ামত পর্যন্ত যত হত্যাকাণ্ড হবে, তার পাপের একটা অংশ ক্বাবীলের আমলনামায় লেখা হবে। কেননা সেই-ই প্রথম এর সূচনা করেছিল।³⁷ এভাবে আসমানে প্রথম হিংসা করেছিল ইবলীস এবং যমীনে প্রথম হিংসা করেছিল কাবীল। তাই ভাল-র প্রতি হিংসা চিরন্তন।

(৩) ইউসুফের প্রতি তার ভাইদের হিংসা :
নবী ইউসুফের ১০ জন বিমাতা ভাই ছিল। যারা ছিল তার আপন খালার সন্তান। ইউসুফ ও বেনিয়ামীনের মা মারা যাওয়ায় মাতৃহারা দুই শিশুপুত্রের প্রতি পিতা নবী ইয়াকুবের পিতৃস্নেহ স্বভাবতই বেশী ছিল। তন্মধ্যে ইউসুফের প্রতিই তাঁর আসক্তি ছিল বেশী তার অলৌকিক গুণাবলীর কারণে। তদুপরি শিশুকালে ইউসুফের দেখা স্বপ্নবৃত্তান্ত শোনার পর পিতা তার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং অজানা আশংকায় তাকে সর্বক্ষণ চোখের উপর রাখতেন। ফলে বিমাতা ভাইয়েরা তার প্রতি হিংসায় জ্বলে ওঠে এবং শিশু ইউসুফকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। উক্ত বিষয়ে সূরা ইউসুফ নাযিল হয়। যাতে পূরা ঘটনা সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে (দ্রঃ নবীদের কাহিনী ১ম খণ্ড)।

(৪) ইহুদী-নাছারাদের হিংসা :
এরাই ইসলাম ও ইসলামের নবীর প্রতি সবচেয়ে বেশী হিংসাকারী। তাদের বংশ বনু ইসহাক থেকে শেষনবী না হয়ে বনু ইসমাঈলের কুরায়েশ বংশ থেকে হওয়ায় তারা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি হিংসায় অন্ধ ছিল। অথচ তাদের কিতাব তাওরাত-ইনজীলে শেষনবী হিসাবে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমন ও তাঁর পূর্ণ পরিচয় আগেই বর্ণিত হয়েছে (আ'রাফ ৭/১৫৭)। কিন্তু তারা তাঁর উচ্চ মর্যাদাকে বরদাশত করতে পারেনি। ফলে তারা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অনুসারী মুমিনদের চাইতে মক্কার কাফিরদের অধিকতর হেদায়াতপ্রাপ্ত বলতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। যেমন আল্লাহ বলেন, أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِيْنَ أُوتُوا نَصِيبًا مِنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُوْنَ بِالْحِبْتِ وَالطَّاغُوْتِ وَيَقُولُوْنَ لِلَّذِينَ كَفَرُوْا هَؤُلَاءِ أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلاً - أُوْلَئِكَ الَّذِيْنَ لَعَنَهُمُ اللهُ وَمَنْ يَلْعَنِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ نَصِيرًا - 'তুমি কি তাদেরকে দেখোনি যাদেরকে ইলাহী কিতাবের কিছু অংশ দেওয়া হয়েছে, যারা প্রতিমা ও শয়তানের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং কাফিরদের বলে যে, তারাই মুমিনদের চাইতে অধিক সুপথপ্রাপ্ত'। 'এদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাৎ করেছেন। আর আল্লাহ যাকে অভিসম্পাৎ করেন, তার জন্য তুমি কোন সাহায্যকারী পাবে না' (নিসা ৪/৫১-৫২)।

মুমিনদের প্রতি হিংসা ছাড়াও তারা তাদেরকে ইসলাম ত্যাগ করে ইহুদী-নাছারাদের দলভুক্ত হওয়ার আকাংখা পোষণ করে। যেমন আল্লাহ বলেন, وَدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُم مِّن بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّاراً حَسَداً مِّنْ عِندِ أَنفُسِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ‘সত্য প্রকাশিত হওয়ার পরেও অন্তর্নিহিত বিদ্বেষ বশতঃ আহলে কিতাবদের অনেকে তোমাদেরকে ঈমান আনার পরেও কাফির বানাতে চায়। এমতাবস্থায় তোমরা ওদের ক্ষমা কর এবং এড়িয়ে চল আল্লাহ্র আদেশ না আসা পর্যন্ত। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর উপরে ক্ষমতাবান' (বাক্বারাহ ২/১০৯)। ইবনু কাছীর বলেন, অত্র আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ আহলে কিতাবদের রীতি-নীতি অনুসরণ করা হ'তে বিরত থাকার ব্যাপারে মুমিনদের সাবধান করেছেন। গোপনে ও প্রকাশ্যে তারা যে সর্বদা মুসলমানদের শত্রুতা করবে, সেটাও জানিয়ে দিয়েছেন। মুসলমানদের ও তাদের নবীর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা জানা সত্ত্বেও তারা এটা করে থাকে স্রেফ হিংসার বশবর্তী হয়ে' (ঐ, তাফসীর)। আল্লাহ বলেন, وَلَن تَرْضَى عَنكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ قُلْ إِنَّ هُدَى اللهِ هُوَ الْهُدَى وَلَئِنِ اتَّبَعْتَ أَهْوَاءهُم بَعْدَ الَّذِي جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ مَا لَكَ مِنَ اللَّهِ مِن وَلِيٍّ وَلَا نَصِيرٍ 'ইহূদী ও খ্রিষ্টানরা কখনোই তোমার উপরে খুশী হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মের অনুসারী হবে। তুমি বল, নিশ্চয়ই আল্লাহ্র দেখানো পথই সঠিক পথ। আর যদি তুমি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর, তোমার নিকটে (অহি-র) জ্ঞান এসে যাওয়ার পরেও, তবে আল্লাহ্ কবল থেকে তোমাকে বাঁচাবার মতো কোন বন্ধু বা সাহায্যকারী নেই' (বাক্বারাহ ২/১২০)। এখানে শেষনবী (ছাঃ)-কে বলা হ'লেও তা মূলতঃ উম্মতে মুহাম্মাদীকে বলা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহ্র প্রতি ইহুদী-খ্রিষ্টান অপশক্তির অতীত ও বর্তমান আচরণ অত্র আয়াতের বাস্তব প্রমাণ বহন করে।

(৫) কুরায়েশ কাফিরদের হিংসা :
আল্লাহ স্বীয় নবী মুহাম্মাদকে নবুঅত ও রিসালাত দ্বারা সম্মানিত করেছেন। কিন্তু তাঁর নিজ বংশ কুরায়েশ নেতারা হিংসায় জ্বলে ওঠে তাঁর এই উচ্চ মর্যাদার কারণে। তাদের ধারণা মতে নবুঅতের সম্মান তাদের মত নেতাদের পাওয়া উচিৎ ছিল। যেমন আল্লাহ বলেন, وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ - أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ؟ 'আর তারা বলে যে, এই কুরআন কেন নাযিল হলো না দুই জনপদের কোন বড় নেতার উপরে? (অর্থাৎ মক্কার নেতা আবু জাহল অথবা ত্বায়েফের নেতা ওরাওয়া ইবনু মাসউদের উপর)'? 'তবে কি তোমার প্রতিপালকের রহমত তারাই বণ্টন করবে?' (যুখরুফ ৪৩/৩১-৩২)। কুরায়েশ নেতারা কিরূপ শ্রেষ্ঠত্বের কাঙাল ছিল যে, নিজেদের বংশে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবীকে পেয়েও তারা সর্বদা তাঁকে হত্যার চক্রান্ত করেছে। তারা তাঁর বিরুদ্ধে নানা অপবাদ দিয়েছে ও যুদ্ধ করেছে কেবল উক্ত মর্যাদা নিজেরা না পাওয়ার হিংসা থেকেই।

(৬) মুনাফিকদের হিংসা :
মুনাফিকরা ইসলাম যাহির করে ও কুফরীকে অন্তরে লালন করে। তাদের হৃদয় সর্বদা খাঁটি মুমিনদের বিরুদ্ধে হিংসা-বিদ্বেষ ও কপটতায় পূর্ণ থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন, إِنْ تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِنْ تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ 'যদি তোমাদের কোন কল্যাণ স্পর্শ করলে তারা নাখোশ হয়। আর তোমাদের কোন অমঙ্গল হলে তারা খুশী হয়। কিন্তু যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও আল্লাহভীরু হও, তাহলে ওদের চক্রান্ত তোমাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে, সবই আল্লাহ্ আয়ত্তাধীনে রয়েছে'। (আলে ইমরান ৩/১২০)।

মক্কায় মূলতঃ কাফির ও মুসলমানদের সংঘর্ষ ছিল। কিন্তু মদীনায় গিয়ে যোগ হয় ইহুদী ও মুনাফিকদের কপটতা। যা ছিল কাফিরদের ষড়যন্ত্রের চাইতে মারাত্মক। ৩য় হিজরীতে ওহোদের যুদ্ধে গমনকারী এক হাযার মুসলিম বাহিনীর মধ্য থেকে সাড়ে তিনশ' মুনাফিকের পশ্চাদগমন ছিল এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে আল্লাহভীরু নেতাদের জন্য এর মধ্যে রয়েছে অমূল্য উপদেশ ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। অথচ সর্বদা মুনাফিকরা ভাবে যে, তারাই লাভবান। যদিও প্রকৃত অর্থে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। তারা ভাবে তাদের চতুরতা কেউ ধরতে পারবে না। অথচ তারাই সবচেয়ে বোকা। কেননা দেরীতে হলেও তাদের কপটতা প্রকাশ হয়ে পড়ে। যেমন আল্লাহ বলেন, أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ أَنْ لَنْ يُخْرِجَ اللَّهُ أَضْغَانَهُمْ - وَلَوْ نَشَاءُ لَأَرَيْنَاكَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُمْ بِسِيمَاهُمْ وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ - وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِيْنَ مِنْكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُمْ - 'যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ তাদের হৃদয়ের গোপন বিদ্বেষ কখনোই প্রকাশ করে দেবেন না'? 'আমরা চাইলে তোমাকে তাদের দেখাতাম। তখন তুমি তাদের চেহারা দেখে চিনতে পারতে এবং তাদের কথার ভঙ্গিতে তুমি তাদের অবশ্যই বুঝে নিতে। বস্তুতঃ আল্লাহ তোমাদের কর্মসমূহ সম্যক অবগত'। 'আর আমরা অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা নেব। যতক্ষণ না আমরা (প্রমাণসহ) জানতে পারব তোমাদের মধ্যে কারা সত্যিকারের মুজাহিদ এবং কারা সত্যিকারের ধৈর্যশীল। বস্তুতঃ আমরা তোমাদের অবস্থা সমূহ যাচাই করে থাকি' (মুহাম্মাদ ৪৭/২৯-৩১)।

পরপর তিনটি আয়াতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মুনাফিকদের গোপন বিদ্বেষ সাময়িকভাবে চাপা থাকলেও তা অবশেষে প্রকাশিত হয়। আর এর মাধ্যমেই আল্লাহ তার পথের প্রকৃত মুজাহিদ ও দৃঢ়চিত্ত বান্দাদের পরীক্ষা নেন। এভাবে তিনি সর্বাবস্থায় মুমিন ও মুনাফিকের কার্যক্রম যাচাই করে থাকেন।

বস্তুতঃ মুনাফিকদের কপটতা মুমিনদের সরলতা ও স্বচ্ছতার প্রতি হিংসা থেকে উদ্ভূত হয়। আর মুমিনদের প্রতি মুনাফিকদের এই হিংসা চিরন্তন।

(৭) নেতৃত্বের প্রতি হিংসা :
নেতৃত্বের প্রতি হিংসা করা ও তার বিরুদ্ধে অন্যকে উসকে দেওয়া শয়তানের অন্যতম প্রধান কাজ। কারণ এর ফলেই সমাজে বিভক্তি ও অশান্তি সৃষ্টি হয়। আর সেটাই হ'ল শয়তানের প্রধান কাম্য। ইসলামী নেতৃত্ব নির্বাচনে এর কোন সুযোগ নেই। কারণ এখানে যোগ্য ও তাক্বওয়াশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে দল ও প্রার্থীবিহীনভাবে নেতৃত্ব নির্বাচন হয়। এখানে নেতৃত্বের জন্য আকাংখী হওয়া যায় না, লোভ করা যায় না বা প্রার্থী হওয়া যায় না।³⁸ নেতা পরামর্শ নিবেন। কিন্তু পরামর্শ মানতে তিনি বাধ্য নন (আলে ইমরান ৩/১৫৯)। তিনি শরী'আত বিরোধী কোন নির্দেশ দিতে পারেন না।³⁹ নেতার কোন কাজ অপসন্দনীয় হ'লে ছবর করবে। কেননা যদি কেউ জামা'আত থেকে এক বিঘত পরিমাণ বের হয়, অতঃপর মৃত্যুবরণ করে, তাহ'লে সে জাহেলী মৃত্যু বরণ করবে'।⁴⁰ ফলে ইসলামী সমাজে অবাধ্যতা ও বিদ্রোহের কোন সুযোগ নেই। এর অন্যতম প্রধান কারণ হ'ল আমীরের ইসলামী নির্দেশ পালনের মধ্যে নেকী পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে। যেমন আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهُ ، وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ عَصَى اللَّهُ ، وَمَنْ يُطِعِ الأَمِيرَ فَقَدْ أَطَاعَنِي ، وَمَنْ يَعْصِ الْأَمِيرَ فَقَدْ عَصَانِي 'যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহ্র আনুগত্য করল। আর যে ব্যক্তি আমার অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহ্র অবাধ্যতা করল। যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করল, সে আমার আনুগত্য করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের অবাধ্যতা করল, সে আমার অবাধ্যতা করল...।⁴¹ এরপরেও শয়তান সেখানে কাজ করে এবং নানা অজুহাত বের করে সংগঠনে ও সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে।

(৮) ভাল-র প্রতি হিংসা :
মানুষ অনেক সময় ভাল-র প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে। যেমন নবী-রাসূলগণের প্রতি, ইসলামের প্রতি, কুরআন ও হাদীছের প্রতি, সমাজের সত্যসেবী দ্বীনদারগণের প্রতি এবং বিশেষ করে সমাজ সংস্কারক মুত্তাক্বী আলেমগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা পাপাচারী মানুষের স্বভাবগত বিষয়। যেমন (ক) সৃষ্টির সূচনায় প্রথম পাপ ছিল আদম (আঃ)-এর প্রতি ইবলীসের হিংসার পাপ। আদমের উচ্চ সম্মান দেখে সে হিংসায় জ্বলে উঠেছিল। তাকে আদমের প্রতি সম্মানের সিজদা করতে বলা হলে সে করেনি। ফলে সে জান্নাত থেকে চিরকালের মত বিতাড়িত হয় (বাক্বারাহ ২/৩৪-৩৮)। অনুরূপভাবে (খ) আদম-পুত্র কাবীল তার ভাই হাবীলকে হত্যা করে হিংসা বশে। কারণ পশুপালক হাবীল ছিল মুত্তাকী পরহেযগার ও শুদ্ধ হৃদয়ের মানুষ। সে আল্লাহকে ভালবেসে তার সর্বোত্তম দুম্বাটি আল্লাহ্র ওয়াস্তে কুরবানীর জন্য পেশ করে। অথচ তার কৃষিজীবী ভাই কাবীল তার ক্ষেতের ফসলের নিকৃষ্ট একটা অংশ কুরবানীর জন্য পেশ করে। ফলে আল্লাহ তারটা কবুল না করে হাবীলের উৎকৃষ্ট কুরবানী কবুল করেন এবং আসমান থেকে আগুন এসে তা উঠিয়ে নিয়ে যায়। এতে ক্বাবীল হিংসায় জ্বলে ওঠে ও হাবীলকে হত্যা করে (মায়েদাহ ৫/২৭-৩০)। পরবর্তীকালে (গ) ইহূদী-নাছারাগণ শেষনবীকে চিনতে পেরেও এবং তাঁকে শ্রেষ্ঠ জেনেও মানেনি স্রেফ হিংসা বশে (বাক্বারাহ ২/১৪৬)।

(ঘ) আবু জাহল শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সত্য বলে স্বীকার করেও মেনে নেয়নি তার বনু মখযূম গোত্রে জন্ম না হয়ে বনু হাশেম গোত্রে জন্ম হওয়ার কারণে এবং নিজেদের নেতৃত্ব হারানোর ভয়ে।⁴²

(ঙ) যুগে যুগে অসংখ্য সত্যসেবী আলেম ও নেতা নির্যাতিত হয়েছেন স্রেফ কুচক্রীদের হিংসার কারণে। তারা নিজেদের হিংসা গোপন করার জন্য ভাল-র বিরুদ্ধে নানাবিধ মিথ্যা রটনা করে। তাকে নানাভাবে কষ্ট দেয়, এমনকি দেশত্যাগে বাধ্য করে ও হত্যার চেষ্টা করে। যেমন শেষনবী (ছাঃ)-এর বিরুদ্ধে তাঁর বিরোধীরা করেছিল। অথচ তিনি এজন্য আদৌ দায়ী ছিলেন না। যদিও প্রবাদ আছে যে, ‘এক হাতে তালি বাজে না'। 'যা রটে, তার কিছু না কিছু ঘটে'। 'দশ যেখানে আল্লাহ সেখানে'। অথচ নবী-রাসূলগণ ও তাঁদের নিখাদ অনুসারী সৎকর্মশীল নেতা ও নেককার মুমিন নর-নারীদের বিরুদ্ধে যাবতীয় ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত একপক্ষীয় হয়ে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে যেসব রটানো হয়, সবই মিথ্যা। সকল যুগে এর অসংখ্য নযীর রয়েছে। বর্তমান যুগেও এমন নযীরের কোন অভাব নেই।

টিকাঃ
৩৬. ইবনুল কাইয়িম, বাদায়ে 'উল ফাওয়ায়েদ ২/২৩৪।
৩৭. বুখারী হা/৩৩৩৫, মুসলিম হা/১৬৭৭; মিশকাত হা/২১১ 'ইল্ম' অধ্যায়।
৩৮. বুখারী হা/২২৬১, মুসলিম হা/১৭৩৩; মিশকাত হা/৩৬৮৩ 'নেতৃত্ব ও বিচার' অধ্যায়।
৩৯. মুসলিম হা/১৮৩৮, মিশকাত হা/৩৬৬২ 'নেতৃত্ব ও বিচার' অধ্যায়।
৪০. বুখারী হা/৭১৪৩, মুসলিম হা/১৮৪৯; মিশকাত হা/৩৬৬৮ 'নেতৃত্ব ও বিচার' অধ্যায়।
৪১. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৬১ 'নেতৃত্ব ও বিচার' অধ্যায়।
৪২. বায়হাক্বী, দালায়েলুন নবুঅত ২/২০৬; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ৩/৬৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00