📄 হৃদয়কে হিংসামুক্ত রাখার উপায় সমূহ (৯টি)
(১) আল্লাহ্র আশ্রয় প্রার্থনা করা: হিংসা হ'ল শয়তানী আমল। শয়তান সর্বদা মানুষকে প্ররোচনা দিয়ে থাকে। তাই তার হাত থেকে বাঁচার জন্য শয়তানের প্রতি তীব্র ঘৃণা থাকা এবং তার বিরুদ্ধে প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকা আবশ্যক। অতএব যখনই কারু প্রতি হিংসার উদ্রেক হয়, তখনই আঊযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রজীম বলে আল্লাহ্ আশ্রয় গ্রহণ করবে এবং বাম দিকে তিনবার থুক মারবে।¹⁸ আল্লাহ বলেন, وَإِمَّا يَتَرَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ 'অতঃপর শয়তান যখনই তোমাকে কুমন্ত্রণা দেয়, তখনই তুমি আল্লাহ্ আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শোনেন ও জানেন' (হামীম সাজদাহ ৪১/৩৬)।
(২) হিংসার বুদ্বুদ হৃদয়ে উত্থিত হওয়ার সাথে সাথে তা মুছে ফেলা এবং অন্যদিকে মন দেওয়া। কেননা এটি মনের মধ্যে গোপনে আসে ও দ্বীনকে শেষ করে দেয়। যুবায়ের ইবনুল 'আওয়াম (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, دَبَّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الأُمَمِ قَبْلَكُمُ الْحَسَدُ وَالْبَغْضَاءُ هِيَ الْحَالِقَةُ لاَ أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعْرَ وَلَكِنْ تَحْلِقُ الدِّينَ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا أَفَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِمَا يُثَبِّتُ ذَاكُمْ لَكُمْ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ 'তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের রোগ তোমাদের মধ্যে গোপনে প্রবেশ করবে। আর তা হ'ল হিংসা ও বিদ্বেষ, যা সবকিছুর মুণ্ডনকারী। আমি বলছি না, চুল মুণ্ডনকারী। বরং তা হবে দ্বীনকে মুণ্ডনকারী। যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমান আনবে। আর তোমরা ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালবাসবে। আমি কি তোমাদের খবর দিব না, কোন বস্তু তোমাদের মধ্যে ভালবাসাকে দৃঢ় করবে? তোমরা পরস্পরে বেশী বেশী সালাম কর'।¹⁹ আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِيَّاكُمْ وَسُوءَ ذَاتِ الْبَيْنِ فَإِنَّهَا الْحَالِقَةُ قَالَ أَبُو عِيسَى يَعْنِي الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ 'তোমরা পারস্পরিক বিদ্বেষের মন্দ হ'তে বেঁচে থাক। কেননা এটি দ্বীনের মুণ্ডনকারী'।²⁰
(৩) তাক্বদীরের ভাল-মন্দের উপর সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ বান্দাকে নে'মত দেন তাকে পরীক্ষার জন্য। মুমিন এতে খুশী হয় ও শুকরিয়া আদায় করে। সে বিপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং এর উত্তম প্রতিদান কামনা করে। কিন্তু কাফির-মুনাফিক এতে ক্রুদ্ধ হয় এবং অন্যকে হিংসা করে। আল্লাহ বলেন, أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُم بَعْضاً سُخْرِيّاً وَرَحْمَتُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ 'তারা কি তোমার প্রতিপালকের রহমত বণ্টন করে? আমরাই পার্থিব জীবনে তাদের জীবিকা বণ্টন করি এবং তাদেরকে একে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নীত করি। যাতে তারা পরস্পরে কাজ নিতে পারে। আর তারা যা জমা করে, তার চাইতে তোমার প্রতিপালকের রহমত অনেক উত্তম' (যুখরুফ ৪৩/৩২)।
(৪) আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধ মেনে চলা : যত কষ্টই হৌক বা যত কঠিনই হৌক, আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধ মেনে নিয়ে হিংসা থেকে নিবৃত্ত হওয়া আবশ্যক। আল্লাহ বলেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا 'আমার রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর। আর যা থেকে নিষেধ করেন, তা বর্জন কর' (হাশর ৫৯/৭)। তিনি আরো বলেন, وَمَن يُطِعِ اللهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আর সেটাই হ'ল মহা সফলতা' (নিসা ৪/১৩)। কেননা আল্লাহ্ নিষেধাজ্ঞা মেনে নিয়ে তার রহমত লাভ করা পার্থিব সকল কিছুর চাইতে উত্তম। আল্লাহ বলেন, هُنَالِكَ الْوَلَايَةُ لِلَّهِ الْحَقِّ هُوَ خَيْرٌ ثَوَابًاً وَخَيْرٌ عُقْباً 'সবকিছুর অভিভাবকত্ব আল্লাহ্। যিনি সত্য। পুরস্কার দানে ও পরিণাম নির্ধারণে তিনিই শ্রেষ্ঠ' (কাহফ ১৮/৪৪)।
(৫) হিংসার জ্বলন সম্পর্কে চিন্তা করা: হিংসুক ব্যক্তি হিংসার আগুনে নিজেই জ্বলে মরে এবং সে কেবল নিজেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তার অন্তরে সুখ বলে কিছু থাকে না। সর্বদা অন্যের ধ্বংস চিন্তায় বিভোর থাকায় নিজেকেই সে ধ্বংস করে ফেলে। সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তা তাকে দৈহিক ও মানসিক রোগীতে পরিণত করে। কোন ব্যাপারেই সে স্বাভাবিক ও সুন্দর সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আশপাশের সবাইকে সে তার শত্রু ভাবতে থাকে। হিংসায় বুঁদ হওয়ার ফলে সে সর্বদা অস্বাভাবিক আচরণ করে। আল্লাহ বলেন, وَلَا يَحِيقُ الْمَكْرُ السَّيِّئُ إِلَّا بِأَهْله 'কুট চক্রান্ত কেবল তার মালিককেই পরিবেষ্টন করে থাকে' )ফাত্বির ৩৫/৪৩)। তিনি বলেন, قُلْ مُوْتُوا بِغَيْظِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ '(হে নবী) তুমি বল, তোমরা নিজেদের আক্রোশে জ্বলে-পুড়ে মরো। আল্লাহ অন্তরের বিষয়ে সম্যক অবগত' (আলে ইমরান ৩/১১৯)। এভাবে হিংসায় যে কোন ফায়েদা নেই সেটা চিন্তা করলে মানুষ এই নোংরা স্বভাব থেকে ফিরে আসবে।
(৬) লোকে তাকে ঘৃণা করে, এটা উপলব্ধি করা: হিংসা ভিতরের বস্তু। যা দেখা যায় না। কিন্তু সেটি প্রকাশ পায় মানুষের কর্মে ও আচরণে। যেমন আল্লাহ বলেন, قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ 'তাদের মুখ দিয়ে বিদ্বেষ প্রকাশ পায়। আর যা তাদের বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, তা আরও অনেক বেশী' (আলে ইমরান ৩/১১৮)। অতএব হিংসুক ব্যক্তি যত দ্রুত তার প্রতি মানুষের ঘৃণা বুঝতে পারবে, সে তত দ্রুত ফিরে আসবে।
(৭) আল্লাহ্র সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হিংসা বর্জন করা: যখন মানুষ জানবে যে, হিংসায় জাহান্নাম ও তা পরিত্যাগে জান্নাত, তখন সে চিরস্থায়ী জান্নাত পাওয়ার আশায় ক্ষণস্থায়ী তুচ্ছ বস্তু পরিত্যাগ করবে। আল্লাহ বলেন, وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى 'যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি হ'তে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাত তার ঠিকানা হবে' (নাযে'আত ৭৯/৪০-৪১)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ 'যা তোমার উপকারে আসবে, সেদিকে তুমি প্রলুব্ধ হও'।²¹
(৮) সকল কাজের বিনিময় আল্লাহ্র নিকটে কামনা করা : মুসলমানকে আল্লাহ্ পথে সংগ্রামে পরস্পরকে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় থাকতে বলা হয়েছে (ছফ ৬১/৪)। এটা কেবল তখনই সম্ভব, যখন হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত মনে আমরা পরস্পরকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারব এবং এর বিনিময় স্রেফ আল্লাহ্র নিকটে কামনা করব । যেমন প্রত্যেক নবী বলেছেন, وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ 'আমি তোমাদের কাছে কোন বিনিময় চাই না। আমার বিনিময় তো কেবল বিশ্বপালক আল্লাহ্র নিকটেই রয়েছে' (শো'আরা ২৬/১০৯, ১২৭. ১৪৫, ১৬৪, ১৮০)।
(৯) এছাড়া নিম্নোক্ত দো'আটি পড়া আবশ্যক। যা আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদীকে শিখিয়ে দিয়েছেন, رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبَنَا غِلَا لِلَّذِيْنَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَعُوْفٌ رَحِيمٌ 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ও আমাদের সেইসব ভাইকে তুমি ক্ষমা কর, যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে। আর তুমি আমাদের অন্তরে মুমিনদের বিরুদ্ধে কোনরূপ বিদ্বেষ সঞ্চার করো না। হে আমাদের পালনকর্তা! নিশ্চয়ই তুমি স্নেহশীল ও দয়াবান' (হাশর ৫৯/১০)।
টিকাঃ
১৮. মুসলিম হা/২২০৩; মিশকাত হা/৭৭, ঈমান অধ্যায় 'মনের খটকা' অনুচ্ছেদ।
১৯. তিরমিযী হা/২৫১০, মিশকাত হা/৫০৩৯, হাদীছ হাসান।
২০. তিরমিযী হা/২৫০৮; মিশকাত হা/৫০৪১।
২১. মুসলিম হা/২৬৬৪, মিশকাত হা/৫২৯৮।
📄 হিংসুকের অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায় সমূহ (৫টি)
(১) হিংসায় ছবর করা ও পাল্টা হিংসা না করা : আল্লাহ বলেন, وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوْا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا 'যদি তোমরা ছবর কর ও আল্লাহভীরুতা অবলম্বন কর, তাহ'লে ওদের চক্রান্ত তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না' (আলে ইমরান ৩/১২০)। শিশু ইউসুফকে বাঘে খেয়েছে বলে তার মিথ্যা রক্ত মাখানো জামা দেখানোর পর পিতা ইয়াকূব (আঃ) ছেলেদের বলেছিলেন, 'তোমাদের মন তোমাদেরকে একটা (মিথ্যা) কাহিনী বানিয়ে দিয়েছে। অতএব এখন ছবর করাই উত্তম। আর তোমরা যেসব কাহিনী শুনাচ্ছ, সে বিষয়ে আল্লাহই আমার একমাত্র সাহায্যস্থল' (ইউসুফ ১২/১৮)। আল্লাহ ইয়াকূবের দো'আ কবুল করেছিলেন এবং কুয়ায় সাক্ষাৎ মৃত্যু থেকে উঠিয়ে আল্লাহ ইউসুফকে মিসরের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন।
(২) আল্লাহ্র উপর পূর্ণ ভরসা করা: আল্লাহ বলেন, وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللهُ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْراً 'যে ব্যক্তি আল্লাহ্র উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হন। আল্লাহ তার আদেশ পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন' (তালাক ৬৫/৩)। বস্তুতঃ এটাই হল সবচেয়ে বড় উপায়।
(৩) হিংসুক ব্যক্তির প্রতি সদাচরণ করা: আল্লাহ বলেন, وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ 'ভাল ও মন্দ সমান নয়। তুমি ভাল দিয়ে মন্দকে প্রতিরোধ কর। তাহ'লে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত হয়ে যাবে' (হামীম সাজদাহ ৪১/৩৪)। আবুদ্দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَلا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ؟ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ صَلاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ فَإِنَّ فَسَادَ ذَاتِ الْبَيْنِ هِيَ الْحَالِقَةُ 'আমি কি তোমাদেরকে ছিয়াম-ছাদাক্বা ও ছালাতের চেয়েও উত্তম কোন বিষয়ের খবর দিব? আর তা হ'ল পারস্পরিক বিবাদ মিটিয়ে দেওয়া। কেননা পরস্পরের বিবাদ দ্বীনকে মুণ্ডনকারী'।²²
(৪) গোনাহ থেকে তওবা করা : বিপদাপদ বান্দার নিজের কারণেই এসে থাকে (আলে ইমরান ৩/১৬৫)। সে নিজের অজান্তেই অনেক গোনাহ করে থাকে। অথবা জেনেশুনে কিংবা বাধ্য হয়ে করে। আর বান্দা যা জানে, তার চাইতে বহুগুণ বেশী গোনাহ তার রয়েছে, যা সে জানে না। অমনিভাবে যেসব গোনাহের কথা তার স্মরণে আছে, তার চাইতে বহুগুণ বেশী গোনাহ তার স্মরণে থাকে না। তাই সর্বদা বান্দাকে জানা-অজানা সকল পাপের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয় এবং খালেছ অন্তরে তওবা করতে হয়। তাতে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে হিংসুক ব্যক্তির অনিষ্ট হতে তাকে রক্ষা করে থাকেন। আল্লাহ বলেন, ثُمَّ نُنَجِّي رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُواْ كَذَلِكَ حَقًّا عَلَيْنَا تُنجِ الْمُؤْمِنِينَ 'অতঃপর আমরা নাজাত দিয়ে থাকি আমাদের রাসূলদের এবং একইভাবে মুমিনদের। কেননা আমাদের উপর হক হ'ল মুমিনদের নাজাত দেওয়া' (ইউনুস ১০/১০৩)। তিনি বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوْحاً عَسَى رَبُّكُمْ أَن يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ يَوْمَ لاَ يُخْزِي اللَّهُ النَّبِيَّ وَالَّذِينَ آمَنُوْا مَعَهُ نُوْرُهُمْ يَسْعَى بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ يَقُولُوْنَ رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُوْرَنَا وَاغْفِرْ لَنَا إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ 'হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্র নিকট বিশুদ্ধভাবে তওবা কর। যাতে তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের পাপ সমূহ মোচন করে দেন এবং তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করান, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়। যেদিন আল্লাহ স্বীয় নবী ও তার সাথী মুমিনদের লজ্জিত করবেন না। তাদের নূর তাদের সম্মুখে ও ডাইনে ধাবিত হবে। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণতা দান কর এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর। নিশ্চয়ই তুমি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান' (তাহরীম ৬৬/৮)।
কিয়ামতের দিন পুলছেরাত পার হবার সময় স্ব স্ব নেক আমল অনুযায়ী মুমিনদের সম্মুখে জ্যোতি থাকবে এবং তাদের ডান হাতে আমলনামা থাকবে। যেখানে জান্নাতের সুসংবাদ থাকবে। এ সময় মুনাফিকদের সম্মুখে জ্যোতি নিভে যাবে। তখন মুমিনগণ আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা করবে, যেন পুলছেরাত পার হওয়া পর্যন্ত তাদের জ্যোতি অব্যাহত থাকে। আর এটা তারা ঐসময় বলবে, যখন মুনাফিকরা মুমিনদের উদ্দেশ্যে বলবে, 'তোমরা একটু থামো। আমরা তোমাদের থেকে কিছু জ্যোতি নিয়ে নিই। বলা হবে, তোমরা পিছনে ফিরে গিয়ে জ্যোতি তালাশ কর'... (হাদীদ ৫৭/১৩)। বস্তুতঃ আল্লাহ মুমিনদের জন্য জ্যোতিকে অব্যাহত রাখবেন।²³ আর এসবই হবে তাদের খালেছ তওবার ফল হিসাবে। আনাস (রাঃ) বলেন রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, كُلُّ ابْنِ آدَمَ حَطَّاءُ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ 'প্রত্যেক আদম সন্তান ভুলকারী এবং ভুলকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হ'ল তওবাকারীগণ'।²⁴
(৫) সকল চিন্তাকে আল্লাহ্র উপর ছেড়ে দেওয়া: হিংসা কারু কোন ক্ষতি করতে পারে না আল্লাহ্র হুকুম ব্যতীত। যেমন তিনি বলেন, وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ 'যদি আল্লাহ তোমার কোন অকল্যাণ করেন, তবে তা দূর করার কেউ নেই তিনি ব্যতীত। আর যদি তিনি তোমার প্রতি কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তবে তার অনুগ্রহকে ফিরিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে যা চান তাকে তা দান করে থাকেন। বস্তুতঃ তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান' (ইউনুস ১০/১০৭)।
ওহোদ যুদ্ধে দান্দান মুবারক শহীদ হলে মুখের রক্ত মুছতে মুছতে রাসূল (ছাঃ) দুঃখ করে বলেছিলেন, كَيْفَ يُفْلِحُ قَوْمٌ شَجُّوا وَجْهَ نَبِيِّهِمْ ঐ জাতি কিভাবে সফলকাম হবে যারা তাদের নবীর চেহারাকে রক্তাক্ত করেছে'? এছাড়াও তিনি সেদিন চারজন কাফের নেতার নাম ধরে তাদের বিরুদ্ধে লা'নত করেছিলেন। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ আয়াত নাযিল করে বলেন, لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ 'তিনি তওবা করবেন না শাস্তি দিবেন, সে ব্যাপারে তোমার কিছুই করার নেই। কারণ ওরা সীমালংঘনকারী' (আলে ইমরান ৩/১২৮)। পরে দেখা গেল ঐ চারজন নেতাকে আল্লাহ ইসলাম কবুলের তাওফীক দান করেন এবং মৃত্যু অবধি তাদের ইসলাম সুন্দর ছিল'।²⁵
উপরোক্ত আয়াত নাযিলের মাধ্যমে রাসূল (ছাঃ)-কে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ যে যালেমদের শাস্তি দিবেনই, সে ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়েছে। এর দ্বারা কুনূতে নাযেলাহ পাঠ নিষেধ করা হয়নি। কেননা ওহোদের ঘটনার পরের বছর ৪র্থ হিজরীর ছফর মাসে সংঘটিত রাজী' ও বি'রে মা'ঊনার মর্মন্তুদ ঘটনায় বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে যথাক্রমে ১০ জন ও ৭০ জন শ্রেষ্ঠ ছাহাবীর অসহায়ভাবে শাহাদাত বরণের পর তিনি হত্যাকারী সম্প্রদায়গুলির বিরুদ্ধে একমাস ব্যাপী প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতে কুনূতে নাযেলাহ পাঠ করেন।²⁶ আল্লাহ অবশ্যই হিংসুক যালেমকে শাস্তি দিবেন দুনিয়াতে ও আখেরাতে। দুনিয়াতে মযলূমের জীবদ্দশায় বা তার মৃত্যুর পরে এ শাস্তি হবে। যেমন রাসূল (ছাঃ)-এর জীবদ্দশায় হিংসুক আবু জাহলরা শাস্তি পেয়েছে এবং তাঁর মৃত্যুর পরে ভণ্ডনবী মুসায়লামা কাযযাব আবুবকর (রাঃ)-এর সময় ইয়ামামার যুদ্ধে নিহত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَلَنُذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ (এবং আমরা) কঠিন শাস্তি দেওয়ার আগে আমরা অবশ্যই (দুনিয়াতে) তাদেরকে লঘু শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাব। যাতে তারা ফিরে আসে' (সাজদাহ ৩২/২১)।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন যে, আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার কোন প্রিয় বান্দার (مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا) সাথে দুশমনী করল, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের (فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ) ঘোষণা দিলাম'।²⁷ অতএব মুমিনের প্রতি হিংসাকারীর শাস্তির বিষয়টি আল্লাহ্র উপর ছেড়ে দেওয়াই উত্তম। তিনি হেদায়াত করবেন, যেমন ওহোদ যুদ্ধের কাফের নেতাদের করেছিলেন। অথবা ইহকালে ও পরকালে চরম শাস্তি দিবেন, 'যেরূপ শাস্তি কেউ দিতে পারে না' (ফজর ৮৯/২৫-২৬)।
টিকাঃ
২২. তিরমিযী হা/২৫০৯; আবুদাঊদ হা/৪৯১৯; মিশকাত হা/৫০৩৮।
২৩. ইবনু জারীর, ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা হাদীদ ১২-১৩ এবং তাহরীম ৮ আয়াত।
২৪. তিরমিযী হা/২৪৯৯, ইবনু মাজাহ হা/৪২৫১; মিশকাত হা/২৩৪১।
২৫. আহমাদ হা/১৪১০৪, তিরমিযী হা/৩০০২-০৫; ঐ চারজন ছিলেন আবু সুফিয়ান, হারেছ বিন হিশাম, ছাফওয়ান বিন উমাইয়া (তিরমিযী হা/৩০০৪) এবং সুহায়েল বিন আমর (বুখারী হা/৪০৭০)।
২৬. বুখারী, মুসলিম, আবুদাউদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/১২৮৯-৯১ 'কুনূত' অনুচ্ছেদ।
২৭. বুখারী হা/৬৫০২; মিশকাত হা/২২৬৬।
📄 মুসলমানদের উন্নতির কারণ
ইসলামের সোনালী যুগে মুসলমানদের উন্নতি ও বিশ্ব বিজয়ের মূলে কারণ ছিল তাদের পারস্পরিক মহব্বত-ভালোবাসা ও বিদ্বেষমুক্ত হৃদয়ের সৃদৃঢ় বন্ধন। তারা অন্যের দুঃখ-বেদনাকে নিজের সাথে ভাগ করে নিতেন। তারা অন্যের জন্য সেটাই ভালবাসতেন, যেটা নিজের জন্য ভালবাসতেন। হযরত আনাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, وَالَّذِي نَفْسِي بِيَده لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ 'যেই সত্তার হাতে আমার জীবন, তার কসম করে বলছি, তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য ঐ বস্তু ভালবাসবে, যা সে নিজের জন্য ভালবাসে'।²⁸ এ বিষয়ে মক্কার মুহাজির মুসলমানদের জন্য মদীনার আনছারগণের অনন্য ত্যাগের দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তাদের প্রশংসায় আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ '(মুহাজিরদের আগমনের) পূর্ব থেকেই মদীনায় বসবাস করত এবং ঈমান এনেছিল, তারা (আনছাররা) মুহাজিরদের ভালবাসে এবং তাদেরকে যা (সম্পদ ও উচ্চ সম্মান) দেওয়া হয়েছে, তা পাওয়ার জন্য নিজেদের অন্তরে কোনরূপ প্রয়োজন অনুভব করে না। আর তারা নিজেদের উপরে তাদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তাদের নিজেদেরই ছিল অনটন। বস্তুতঃ যারা হৃদয়ের কার্পণ্য হ'তে মুক্ত, তারাই সফলকাম' (হাশর ৫৯/৯)। এমনকি যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যু পথযাত্রী মুসলিম সৈনিক তৃষ্ণার্ত অন্য সৈনিকের স্বার্থে নিজে পানি পান না করেই প্রাণত্যাগ করে মৃত্যুর দুয়ারে মানবতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে গেছেন। যেমন ইয়ারমুকের যুদ্ধে ঘটেছিল।²⁹ ইতিহাসে এর কোন তুলনা নেই।
আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) বলেন, আমরা একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে বসে আছি। এমন সময় তিনি বললেন, يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ 'এখন তোমাদের নিকট একজন জান্নাতী মানুষের আগমন ঘটবে'। অতঃপর আনছারদের একজন ব্যক্তি আগমন করল। যার দাড়ি দিয়ে ওযূর পানি টপকাচ্ছিল ও তার বাম হাতে জুতা জোড়া ছিল। দ্বিতীয় দিন ও তৃতীয় দিন রাসূল (ছাঃ) একই রূপ বললেন এবং পরক্ষণে একই ব্যক্তির আগমন ঘটলো। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মজলিস থেকে উঠলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল 'আছ তাঁর পিছু নিলেন। ...আনাস (রাঃ) বলেন, আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বলেন যে, আমি তার বাসায় একরাত বা তিন রাত কাটাই। কিন্তু তাকে রাতে ছালাতের জন্য উঠতে দেখিনি। কেবল ফজরের জন্য ওযু করা ব্যতীত। তাছাড়া আমি তাকে সর্বদা ভাল কথা বলতে শুনেছি। এভাবে তিনদিন তিনরাত চলে গেলে আমি তার আমলকে হীন মনে করতে লাগলাম (كدْتُ أَنْ أَحْتَقْرَ عَمَلَهُ)। আমি তখন ঐ ব্যক্তিকে বললাম, আপনার সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) এই কথা বলেছিলেন এবং আমিও আপনাকে গত তিনদিন যাবৎ লক্ষ্য করছি। কিন্তু আপনাকে বড় কোন আমল করতে দেখলাম না (فَلَمْ أَرَكَ تَعْمَلُ كَبِيرَ عَمَلٍ)। তা'হলে কোন বস্তু আপনাকে ঐ স্থানে পৌঁছিয়েছে, যার সুসংবাদ আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) আমাদেরকে শুনিয়েছেন। তিনি বললেন, আমি যা করি তাতো আপনি দেখেছেন। অতঃপর যখন আমি চলে আসার জন্য পিঠ ফিরাই, তখন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, مَا هُوَ إِلَّا مَا رَأَيْتَ غَيْرَ أَنِّي لَا أَجِدُ فِي نَفْسِي لِأَحَدٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ غلاً وَلَا أَحْسُدُ أَحَداً عَلَى خَيْرٍ أَعْطَاهُ اللَّهُ إِيَّاهُ 'আপনি যা দেখেছেন, তাতো দেখেছেন। তবে আমি আমার অন্তরে কোন মুসলিমের প্রতি কোনরূপ বিদ্বেষ রাখি না এবং আমি কারু প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত কোন কল্যাণের উপর হিংসা পোষণ করি না'। একথা শুনে আব্দুল্লাহ বিন আমর বললেন, هَذِهِ الَّتِي بَلَغَتْ بِكَ وَهِيَ الَّتِي لَا نُطِيقُ 'এটিই আপনাকে উক্ত স্তরে পৌঁছেছে। এটি এমন এক বস্তু যা আমরা করতে সক্ষম নই।³⁰
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, لَا يَجْتَمَعَانِ فِي قَلْبِ عَبْدِ الإِيْمَانُ وَالْحَسَدُ 'কোন বান্দার অন্তরে ঈমান ও হিংসা একত্রিত হতে পারে না'।³¹ অর্থাৎ মুমিনের অন্তরে হয় ঈমান থাকবে, নয় হিংসা থাকবে। ঈমানদারের অন্তরে হিংসা থাকবে না, হিংসুকের অন্তরে ঈমান থাকবে না। মুমিন কখনো হিংসুক নয়, হিংসুক কখনো মুমিন নয়। অর্থাৎ পূর্ণ মুমিন নয়। হিংসা মুমিনদের পরস্পরে ভাই হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এই বাধা দূর না করা পর্যন্ত মুমিন সমাজ আপোষে ভাই ভাই হ'তে পারবে না।
মুমিন সর্বদা অন্যের শুভ কামনা করে। যেমন সে সর্বদা নিজের শুভ কামনা করে। যেমন তামীম দারী (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, الدِّينُ النَّصِيْحَةُ 'দ্বীন হ'ল নছীহত'।³² অর্থাৎ এখলাছ। যা পরস্পরের শুভ কামনা ও অকল্যাণ প্রতিরোধের মাধ্যমে অর্জিত হয়। হযরত জারীর বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট বায়'আত করেছিলাম ছালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা এবং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য শুভ কামনার উপর'।³³
বস্তুতঃ প্রথম যুগের মুসলমানেরা ছিলেন পারস্পরিক ভালোবাসায় একটি দেহের ন্যায়। যারা পরস্পরকে সাহায্য করতেন। পরস্পরের দোষ গোপন করতেন। পরস্পরের ব্যথায় সমব্যথী হ'তেন। নু'মান বিন বাশীর (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, তুমি মুমিনদের পারস্পরিক দয়া, ভালবাসা ও স্নেহকে দেখবে একটি দেহের ন্যায়। যার এক অঙ্গ ব্যথাতুর হলে সর্বাঙ্গ ব্যথাতুর হয় অনিদ্রা ও জ্বরের মাধ্যমে'।³⁴ নিঃসন্দেহে তারা ছিলেন আল্লাহ্র পথে সংগ্রামে পারস্পরে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায়, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন (ছফ ৬১/৪)। এযুগেও মুসলিম উম্মাহ্র উন্নতি ও অগ্রগতির সেটাই হ'ল আবশ্যিক পূর্বশর্ত।
টিকাঃ
২৮. বুখারী হা/১৩, মুসলিম হা/৪৫; মিশকাত হা/৪৯৬১।
২৯. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/১১।
৩০. হাকেম পৃঃ ৩/৭৯ হা/৪৩৮০, হাকেম ছহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তাকে সমর্থন করেছেন। আহমাদ হা/১২৭২০, আরনাঊত্ব ছহীহ বলেছেন; আলবানী প্রথমে ছহীহ পরে যঈফ বলেছেন (তারাজু'আতুল আলবানী হা/৪৮)।
৩১. নাসাঈ হা/৩১০৯, সনদ হাসান।
৩২. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ, মিশকাত হা/৪৯৬৬।
৩৩. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ, মিশকাত হা/৪৯৬৭।
৩৪. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৫৩।
📄 হিংসুকদের চটকদার যুক্তিসমূহের কিছু নমুনা
হিংসুক ব্যক্তি তার চাকচিক্যপূর্ণ কথা ও আকর্ষণীয় যুক্তির মাধ্যমে সত্যকে মিথ্যা বলে ও মিথ্যাকে সত্য বলে। এ বিষয়ে (১) ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর শিষ্য খ্যাতনামা তাবেঈ ইকরিমা (মৃঃ ১০৭ হিঃ) বিগত যুগে বনু ইস্রাঈলদের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, তাদের মধ্যে তিনজন বিখ্যাত কাযী বা বিচারপতি ছিলেন। পরে তাদের একজন মারা গেলে অন্যজন তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি বিচারকার্য চালাতে থাকলেন। এমন সময় একদিন আল্লাহ জনৈক ফেরেশতাকে পাঠালেন। যিনি ঘোড়ায় চড়ে একজন ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। যে ব্যক্তি বাছুরসহ তার গাভীকে পানি পান করাচ্ছিল। ফেরেশতা বাছুরটিকে তার দিকে ডাক দিলেন। তাতে বাছুরটি ঘোড়ার পিছে পিছে চলল। তখন ঐ লোকটি ছুটে এসে তার বাছুরটিকে ফিরিয়ে নিতে চাইল এবং বলল, হে আল্লাহ্র বান্দা! এটি আমার বাছুর এবং আমার এই গাভীর বাচ্চা। ফেরেশতা বললেন, বরং ওটা আমার বাছুর এবং আমার এই ঘোড়ার বাচ্চা। কেউ দাবী না ছাড়লে অবশেষে তারা কাযীর কাছে গেলেন। বাছুরের মালিক বলল, এই লোকটি আমার বাছুরের পাশ দিয়ে যাবার সময় তাকে ডাকল, আর বাছুরটি তার পিছে পিছে চলে গেল। অথচ বাছুরটি আমার। কিন্তু এখন সে আমাকে ফেরৎ দিচ্ছে না। উত্তরে বিবাদী ফেরেশতা বললেন এমতাবস্থায় যে, তার হাতে তিনটি বেত ছিল। যার অনুরূপ কোন বেত সচরাচর দেখা যায় না। তার মধ্যে একটি বেত তিনি বিচারকের হাতে দিয়ে বললেন, আপনি এটা দিয়ে আমাদের মাঝে ফায়ছালা করুন। বিচারক বললেন, কিভাবে? বিবাদী বললেন, আমরা বাছুরটাকে ঘোড়া ও গাভীর পিছনে ছেড়ে দিব। অতঃপর বাছুরটি যার পিছে পিছে যাবে, সেটি তার হবে। বিচারক সেটাই করলেন। দেখা গেল যে, বাছুরটি ঘোড়ার পিছু নিল। তখন বিচারক বাছুরটি ঘোড়ার বলে রায় দিলেন। বাছুরের মালিক এ রায় মানল না। সে বলল, আমি আরেকজন বিচারকের কাছে যাব। সেখানে গিয়ে উভয়ে পূর্বের মত বাছুরটিকে নিজের বলে দাবী করল এবং আগের মত যুক্তি প্রদর্শন করল। সেখানেও একই রায় হ'ল। তখন বাদী তাতে রাযী না হয়ে তৃতীয় বিচারকের কাছে গেল। বিবাদী তাকে এবার তৃতীয় বেতটি দিলেন। কিন্তু তিনি তা নিতে অস্বীকার করলেন এবং বললেন, আমি আজকে তোমাদের বিচার করব না। তারা বলল, কেন করবেন না? তিনি বললেন, কেননা আমি আজ ঋতুবতী। বিবাদী ফেরেশতা একথা শুনে বলে উঠলেন, সুবহানাল্লাহ! পুরুষ লোক কখনো ঋতুবতী হয়? তখন বিচারক বললেন, ঘোড়া কখনো গরুর বাছুর জন্ম দেয়? অতঃপর তিনি বাছুরটিকে গাভীর মালিককে দিয়ে দিলেন। এবার ফেরেশতা বললেন, আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করেছেন। তিনি তোমার উপর খুশী হয়েছেন এবং ঐ দুই বিচারকের উপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন'।³⁵
(২) মক্কার নেতাদেরকে শয়তান যুক্তি শিখিয়ে দিল। সেমতে তারা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে গিয়ে প্রশ্ন করল, মৃত বকরীকে কে হত্যা করে? জওয়াবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আল্লাহ। তখন শয়তান বলল, দেখ তোমরা যেটা যবহ কর, সেটা হালাল। আর আল্লাহ যেটা যবহ করেন, সেটা হারাম। তাহ'লে তোমরাই আল্লাহ্র চেয়ে উত্তম। তখন আয়াত নাযিল হ'ল, وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ 'যে সব পশু (যবহের সময়) তার উপর আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করা হয় না, সেগুলি থেকে তোমরা খেয়োনা। নিশ্চয়ই এটি পাপ। আর শয়তানেরা তাদের বন্ধুদের কুমন্ত্রণা দেয়, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিতর্ক করে। (মনে রেখ) যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তাহ'লে তোমরা অবশ্যই মুশরিক হয়ে যাবে' (আন'আম ৬/১২১; তাফসীর ইবনু কাছীর)।
টিকাঃ
৩৫. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৯/২৫৬।