📄 হাদীছ থেকে
(১) হযরত আনাস বিন মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন وَلاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَحَاسَدُوا وَلاَ تَدَابَرُوا وَلاَ تَقَاطَعُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَانًا 'তোমরা পরস্পরে বিদ্বেষ করো না, হিংসা করো না, একে অপরকে পরিত্যাগ করো না, একে অপরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করো না। তোমরা পরস্পরে আল্লাহ্র বান্দা হিসাবে ভাই ভাই হয়ে যাও'।⁸ অত্র হাদীছে মানবতাকে হত্যাকারী কয়েকটি দুরারোগ্য ব্যাধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইসলামী সমাজকে ভিতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। এখানে চারটি বিষয় উল্লেখ করা হলেও তা মূলতঃ একটি থেকে উৎসারিত। আর তা হ'ল 'হিংসা'। এই মূল বিষবৃক্ষ থেকেই বাকীগুলি কাঁটাযুক্ত ও যন্ত্রণাদায়ক ডাল-পালার ন্যায় বেরিয়ে আসে। হাসান বাছরী বলেন, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে হিংসা রয়েছে। যতক্ষণ সেটি অবাধ্যতা ও যুলুমের দিকে সীমা অতিক্রম না করে, ততক্ষণ তা মানুষের কোন ক্ষতি করে না'।⁹
(২) হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, تُفْتَحُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ وَفِي رِوَايَةٍ : تُعْرَضُ الأَعْمَالُ فِي كُلِّ يَوْمٍ خَمِيسٍ وَاثْنَيْنِ فَيَغْفِرُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي ذَلِكَ الْيَوْمِ لِكُلِّ امْرِئٍ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا إِلَّا امْرَأَ كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ فَيُقَالُ ارْكُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا ارْكُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা সমূহ খোলা হয়। অন্য বর্ণনায় এসেছে, এ দু'দিন বান্দার আমলনামা আল্লাহ্র কাছে পেশ করা হয়। অতঃপর আল্লাহ্র সাথে কাউকে শরীক করেনি এমন সবাইকে মাফ করা হয়। কেবল ঐ দু'জন ব্যতীত যাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ বিদ্যমান রয়েছে। বলা হয়, এদের ছাড়, যতক্ষণ না এরা আপোষে মীমাংসা করে নেয়'।¹⁰
যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ করে, তার ঈমান হয় ত্রুটিপূর্ণ। হিংসা তার সমস্ত নেকীকে খেয়ে ফেলে যেমন আগুন ধীরে ধীরে কাঠকে খেয়ে ফেলে। এভাবে সে নিজের আগুনে নিজে জ্বলে-পুড়ে মরে। পরিণামে তার পূর্বে কৃত সৎকর্মসমূহের নেকীগুলিও ক্রমে নিঃশেষ হয়ে যায়। ঐ অবস্থায় তার মৃত্যু হ'লে সে নিঃস্ব অবস্থায় আল্লাহ্র কাছে চলে যায়।
টিকাঃ
৮. বুখারী, ফাৎহুলবারী, হা/৬০৭৬; মুসলিম হা/২৫৫৯; মিশকাত হা/৫০২৮।
৯. ফাৎহুল বারী হা/৬০৬৫।
১০. মুসলিম হা/২৫৬৫; মিশকাত হা/৫০২৯-৩০।
📄 সালাফে ছালেহীনের বক্তব্য সমূহ (৫টি)
(১) হযরত মু'আবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রাযিয়াল্লাহু 'আনহুমা) বলেন, كُلُّ النَّاسِ أَسْتَطِيعُ أَنْ أَرْضِيَهُ إِلَّا حَاسِدُ نِعْمَةٍ، فَإِنَّهُ لَا يُرْضِيْهِ إِلَّا زَوَالُهَا 'সকল মানুষকে আমি খুশী করতে সক্ষম, কেবল হিংসুক ব্যতীত। কেননা সে অন্যের নে'মত দূর না হওয়া পর্যন্ত খুশী হয় না'।¹¹
(২) তাবেঈ বিদ্বান মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (৩৩-১১০ হিঃ) বলেন, দুনিয়াবী কোন ব্যাপারে আমি কোন ব্যক্তিকে হিংসা করি না। কেননা সে ব্যক্তি যদি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহ'লে আমি কিভাবে দুনিয়াবী বিষয়ে তাকে হিংসা করব? অথচ জান্নাতের তুলনায় দুনিয়া অতীব তুচ্ছ। আর যদি ঐ ব্যক্তি জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহ'লে আমি কিভাবে তাকে দুনিয়াবী বিষয়ে হিংসা করব? অথচ ঐ ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে?¹²
(৩) অন্যতম তাবেঈ হাসান বাছরী (২১-১১০ হিঃ) বলেন, হিংসুকের চাইতে বড় কোন যালেমকে আমি দেখিনি যে মযলুমের মতোই। কেননা সে বেঁচে থাকে। অথচ দুঃখ তার অবশ্যম্ভাবী এবং দুশ্চিন্তা তার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী'।¹³
(৪) আবু হাতেম দারেমী (মৃঃ ৩৫৪ হিঃ) বলেন, জ্ঞানীর উপর ওয়াজিব হ'ল সর্বাবস্থায় হিংসা হ'তে দূরে থাকা। কেননা হিংসার সবচাইতে নীচু স্তর হ'ল তাক্বদীরের উপর সন্তুষ্টি পরিত্যাগ করা এবং আল্লাহ স্বীয় বান্দার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তার বিপরীত কামনা করা। তিনি বলেন, الحسد من أخلاق اللئَامِ، وتركه من أفعال الكرام، ولكلِّ حريقٍ مُطْفِى، ونارُ الحسدِ لا تَطْفَأُ হিংসা হ'ল নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের চরিত্র এবং তা পরিত্যাগ করা হ'ল মর্যাদাবান ব্যক্তিদের কর্ম। আর প্রত্যেক আগুনের নির্বাপক আছে। কিন্তু হিংসার আগুন নির্বাপিত হয় না'।¹⁴
(৫) আবুল লাইছ সমরকন্দী (মৃঃ ৩৭৩ হিঃ) বলেন, হিংসাকৃত ব্যক্তির আগেই হিংসুকের নিকট পাঁচটি শাস্তি পৌঁছে যায়। (ক) দুশ্চিন্তা, যা বিচ্ছিন্ন হয় না। (খ) কষ্ট, যার কোন পুরস্কার পাওয়া যায় না। (গ) তিরষ্কার, যাকে প্রশংসা করা হয় না (ঘ) আল্লাহ্র ক্রোধ অর্জন করা এবং (ঙ) তার জন্য (কল্যাণ কর্মের) তাওফীকের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া।¹⁵
টিকাঃ
১১. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাক্কু ৫৯/২০০ পৃঃ।
১২. বায়হাক্বী, যুহৃদ আল-কাবীর ৩১৫ পৃঃ।
১৩. ইবনু আব্দি রব্বিহী, আল-ইকুদুল ফারীদ ২/২৭০ পৃঃ।
১৪. আবু হাতেম দারেমী, রওযাতুল উক্বালা ১৩৪ পৃঃ।
১৫. শিহাবুদ্দীন আবশীহী, আল-মুসতাত্বরাফ ২২১ পৃঃ।
📄 হিংসার পরিণাম
(ক) দুনিয়াবী পরিণতি :
হিংসুক ব্যক্তি অন্যকে ক্ষতি করার আগে সে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কেননা (১) শুরুতেই সে হিংসার আগুনে জ্বলতে থাকে। হিংসা দূর না হওয়া পর্যন্ত এটাই তার জন্য স্থায়ী দুনিয়াবী শাস্তি। (২) তার চেহারা সর্বদা মলিন থাকে। তার সাথে তার পরিবারে হাসি ও আনন্দ থাকে না। (৩) অন্যের ক্ষতি করার চক্রান্তে ও ষড়যন্ত্রে সে সর্বদা ব্যস্ত থাকে। প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে সে সর্বদা ভীত ও সন্ত্রস্ত থাকে। নিশুতি রাতে বাঁশঝাড়ে কঞ্চির শব্দে কল্পিত জিনের ভয়ে হার্টফেল করার মত হিংসুক ব্যক্তিও সর্বদা কল্পিত শত্রুর ভয়ে আড়ষ্ট থাকে। (৪) তারই মত লোকেরা তার বন্ধু হয়। ফলে সৎ সঙ্গ থেকে সে বঞ্চিত হয়। (৫) ঘুণ পোকা যেমন কাঁচা বাঁশকে ভিতর থেকে কুরে কুরে খায়, হিংসুক ব্যক্তির অন্তর তেমনি হিংসার আগুন কুরে কুরে খায়। এক সময় সে ধ্বংস হয়ে যায়, যেমন ঘুণে ধরা বাঁশ হঠাৎ ভেঙ্গে পড়ে শেষ হয়ে যায়।
বিশ্বে যত অশান্তি তার অন্যতম প্রধান কারণ হ'ল পারস্পরিক হিংসা ও প্রতিহিংসা। হিংসা ও বিদ্বেষ মানবতাকে হত্যা করে। হিংসুক ব্যক্তি কোন অবস্থায় শান্তি পায় না। তার কোন সৎবন্ধু জোটে না। সে কখনোই সুপথপ্রাপ্ত হয় না। তার হৃদয়-মন থাকে সর্বদা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মত। যেখান থেকে সর্বদা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র, ধোঁকা ও মিথ্যাচারের দুর্গন্ধযুক্ত স্ফুলিঙ্গ সমূহ নির্গত হয়। সে সর্বদা নিজেকে বিজয়ী ভাবে। অথচ সেই-ই সবচেয়ে পরাজিত। সে নিজেকে বীর ভাবে, অথচ সেই-ই সবচেয়ে ভীরু। ভীত-চকিত সর্পের ন্যায় সে তার কল্পিত প্রতিপক্ষকে ছোবল মারার জন্য সর্বদা ফণা উঁচিয়ে থাকে। এভাবে আমৃত্যু সে হিংসার আগুনে জ্বলতে থাকে। ফলে হিংসা-বিদ্বেষ অন্যকে হত্যা করার আগে হিংসুককে হত্যা করে। এদিক দিয়ে বিচার করলে হিংসাকেই বড় ন্যায় বিচারক বলতে হয়। কেননা সে সর্বাগ্রে হিংসুককে শাস্তি দেয়, অতঃপর অন্যকে। হিংসুক ব্যক্তি শত চেষ্টায়ও তা গোপন রাখতে পারে না। কেননা শত্রুকে ঘায়েল করার পূর্বে সে নিজেই ঘায়েল হয়। যার নমুনা তার চেহারায় ও কর্মে ফুটে ওঠে। জনৈক কবি তাই বলেন,
يا حاسداً لي على نعمتي + أتدري على من أسأت الأدب
أسأت على الله في فعله + لأنك لم ترضَ لي ما قسم
فأخزاك ربي بأن زادني + وسد عليك وجوه الطلب
(১) 'হে হিংসুক ব্যক্তি! যে আমার নে'মতে হিংসা করে থাক। তুমি কি জানো তুমি কার সাথে মন্দ আচরণ করো? (২) তুমি আল্লাহ্ কর্মকে মন্দ বলে থাক। কেননা তিনি আমাকে যা (রহমত) বণ্টন করেছেন তুমি তাতে সন্তুষ্ট নও। (৩) অতএব আমার প্রভু তোমাকে লাঞ্ছিত করুন এ কারণে যে তিনি আমাকে রহমত বেশী দিয়েছেন। আর তোমার উপরে তা বন্ধ করেছেন'।¹⁶
সৎকর্মশীল ঈমানদারগণ হিংসার শিকার হন। তারা আসামী হন, কিন্তু সহজে বাদী হন না। যুগে যুগে এটাই ঐতিহাসিকভাবে সত্য। এজন্য প্রবাদ বাক্য হয়ে রয়েছে, هل مَاتَ الْبُخَارِيُّ غَيْرَ مَحْسُودٍ ؟ 'ইমাম বুখারী কি হিংসুকের হামলা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করতে পেরেছেন'? অন্য একজন পণ্ডিত বলেন, الناسُ حاسدٌ ومحسود، ولكلِّ نعمة حسود ‘মানুষ হিংসুক ও হিংসাকৃত। আর প্রত্যেক নে'মতের জন্যই হিংসুক রয়েছে'। এর পরেও প্রকৃত মুমিনগণ পাল্টা হিংসা করেন না। বিদ্বেষ করেন না। বরং প্রতিপক্ষের হেদায়াত কামনা করেন। কবি কুমায়েত আল-আসাদী বলেন,
إن يحسدونني فإني غير لائمهم + قبلي من الناس أهل الفضل قد حُسدُوا
فدام لي ولهم ما بي وما بهم + ومات أكثرنا غيظاً بما يجد
أنا الذي يجدوني في صدورهم + لا أرتقي صدراً منها ولا أرِدُ
(১) তারা যদি আমাকে হিংসা করে, পাল্টা আমি তাদের নিন্দা করব না। কেননা আমার পূর্বে বহু কল্যাণময় ব্যক্তি হিংসার শিকার হয়েছেন। (২) অতএব আমার ও তাদের সঙ্গে (আল্লাহ্র রহমত) যা ছিল, তা থাকবে। অথচ আমাদের অধিকাংশ মানুষ মারা গেছে যা সে পেয়েছে তাতে ক্রুদ্ধ অবস্থায়। (৩) আমি সেই ব্যক্তি যে, তারা আমাকে সর্বদা তাদের বুকের মধ্যে পাবে। যেখান থেকে আমি না ফিরে গেছি, না অবতরণ করেছি'।¹⁷
(খ) আখেরাতের পরিণতি :
মৃত্যুর পর কবরে তাকে গ্রাস করে ভয়াবহ আযাব। অতঃপর কিয়ামতের দিন সে উঠবে ভীত-নমিত ও মলিন চেহারায় অধোমুখি হয়ে। আল্লাহ বলেন, وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ - تَرْهَقُهَا فَتَرَةٌ أُوْلَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ 'বহু মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধূলি-ধূসরিত'। 'কালিমালিপ্ত'। তারা হ'ল অবিশ্বাসী পাপিষ্ঠ' ('আবাসা ৮০/৪০-৪২)। তাদেরকে দেখে যেমন দুনিয়াতে চেনা যেত। আখেরাতেও তেমনি চেনা যাবে। যেমন আল্লাহ বলেন, يُعْرَفُ الْمُجْرِمُونَ بِسِيمَاهُمْ فَيُؤْخَذُ بِالنَّوَاصِي وَالْأَقْدَامِ 'অপরাধীদের চেনা যাবে তাদের চেহারা দেখে। অতঃপর তাদেরকে পাকড়াও করা হবে কপালের চুল ও পা ধরে' (রহমান ৫৫/৪১)।
টিকাঃ
১৬. মুছত্বফা হাশেমী, জাওয়াহিরুল আদব ২/৪৮৭।
১৭. জাওয়াহিরুল আদব ২/২৭০।
📄 হৃদয়কে হিংসামুক্ত রাখার উপায় সমূহ (৯টি)
(১) আল্লাহ্র আশ্রয় প্রার্থনা করা: হিংসা হ'ল শয়তানী আমল। শয়তান সর্বদা মানুষকে প্ররোচনা দিয়ে থাকে। তাই তার হাত থেকে বাঁচার জন্য শয়তানের প্রতি তীব্র ঘৃণা থাকা এবং তার বিরুদ্ধে প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকা আবশ্যক। অতএব যখনই কারু প্রতি হিংসার উদ্রেক হয়, তখনই আঊযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রজীম বলে আল্লাহ্ আশ্রয় গ্রহণ করবে এবং বাম দিকে তিনবার থুক মারবে।¹⁸ আল্লাহ বলেন, وَإِمَّا يَتَرَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ 'অতঃপর শয়তান যখনই তোমাকে কুমন্ত্রণা দেয়, তখনই তুমি আল্লাহ্ আশ্রয় প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শোনেন ও জানেন' (হামীম সাজদাহ ৪১/৩৬)।
(২) হিংসার বুদ্বুদ হৃদয়ে উত্থিত হওয়ার সাথে সাথে তা মুছে ফেলা এবং অন্যদিকে মন দেওয়া। কেননা এটি মনের মধ্যে গোপনে আসে ও দ্বীনকে শেষ করে দেয়। যুবায়ের ইবনুল 'আওয়াম (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, دَبَّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الأُمَمِ قَبْلَكُمُ الْحَسَدُ وَالْبَغْضَاءُ هِيَ الْحَالِقَةُ لاَ أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعْرَ وَلَكِنْ تَحْلِقُ الدِّينَ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا أَفَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِمَا يُثَبِّتُ ذَاكُمْ لَكُمْ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ 'তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের রোগ তোমাদের মধ্যে গোপনে প্রবেশ করবে। আর তা হ'ল হিংসা ও বিদ্বেষ, যা সবকিছুর মুণ্ডনকারী। আমি বলছি না, চুল মুণ্ডনকারী। বরং তা হবে দ্বীনকে মুণ্ডনকারী। যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না ঈমান আনবে। আর তোমরা ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালবাসবে। আমি কি তোমাদের খবর দিব না, কোন বস্তু তোমাদের মধ্যে ভালবাসাকে দৃঢ় করবে? তোমরা পরস্পরে বেশী বেশী সালাম কর'।¹⁹ আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِيَّاكُمْ وَسُوءَ ذَاتِ الْبَيْنِ فَإِنَّهَا الْحَالِقَةُ قَالَ أَبُو عِيسَى يَعْنِي الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ 'তোমরা পারস্পরিক বিদ্বেষের মন্দ হ'তে বেঁচে থাক। কেননা এটি দ্বীনের মুণ্ডনকারী'।²⁰
(৩) তাক্বদীরের ভাল-মন্দের উপর সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ বান্দাকে নে'মত দেন তাকে পরীক্ষার জন্য। মুমিন এতে খুশী হয় ও শুকরিয়া আদায় করে। সে বিপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং এর উত্তম প্রতিদান কামনা করে। কিন্তু কাফির-মুনাফিক এতে ক্রুদ্ধ হয় এবং অন্যকে হিংসা করে। আল্লাহ বলেন, أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُم بَعْضاً سُخْرِيّاً وَرَحْمَتُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ 'তারা কি তোমার প্রতিপালকের রহমত বণ্টন করে? আমরাই পার্থিব জীবনে তাদের জীবিকা বণ্টন করি এবং তাদেরকে একে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নীত করি। যাতে তারা পরস্পরে কাজ নিতে পারে। আর তারা যা জমা করে, তার চাইতে তোমার প্রতিপালকের রহমত অনেক উত্তম' (যুখরুফ ৪৩/৩২)।
(৪) আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধ মেনে চলা : যত কষ্টই হৌক বা যত কঠিনই হৌক, আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধ মেনে নিয়ে হিংসা থেকে নিবৃত্ত হওয়া আবশ্যক। আল্লাহ বলেন, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا 'আমার রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর। আর যা থেকে নিষেধ করেন, তা বর্জন কর' (হাশর ৫৯/৭)। তিনি আরো বলেন, وَمَن يُطِعِ اللهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আর সেটাই হ'ল মহা সফলতা' (নিসা ৪/১৩)। কেননা আল্লাহ্ নিষেধাজ্ঞা মেনে নিয়ে তার রহমত লাভ করা পার্থিব সকল কিছুর চাইতে উত্তম। আল্লাহ বলেন, هُنَالِكَ الْوَلَايَةُ لِلَّهِ الْحَقِّ هُوَ خَيْرٌ ثَوَابًاً وَخَيْرٌ عُقْباً 'সবকিছুর অভিভাবকত্ব আল্লাহ্। যিনি সত্য। পুরস্কার দানে ও পরিণাম নির্ধারণে তিনিই শ্রেষ্ঠ' (কাহফ ১৮/৪৪)।
(৫) হিংসার জ্বলন সম্পর্কে চিন্তা করা: হিংসুক ব্যক্তি হিংসার আগুনে নিজেই জ্বলে মরে এবং সে কেবল নিজেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তার অন্তরে সুখ বলে কিছু থাকে না। সর্বদা অন্যের ধ্বংস চিন্তায় বিভোর থাকায় নিজেকেই সে ধ্বংস করে ফেলে। সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তা তাকে দৈহিক ও মানসিক রোগীতে পরিণত করে। কোন ব্যাপারেই সে স্বাভাবিক ও সুন্দর সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আশপাশের সবাইকে সে তার শত্রু ভাবতে থাকে। হিংসায় বুঁদ হওয়ার ফলে সে সর্বদা অস্বাভাবিক আচরণ করে। আল্লাহ বলেন, وَلَا يَحِيقُ الْمَكْرُ السَّيِّئُ إِلَّا بِأَهْله 'কুট চক্রান্ত কেবল তার মালিককেই পরিবেষ্টন করে থাকে' )ফাত্বির ৩৫/৪৩)। তিনি বলেন, قُلْ مُوْتُوا بِغَيْظِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ '(হে নবী) তুমি বল, তোমরা নিজেদের আক্রোশে জ্বলে-পুড়ে মরো। আল্লাহ অন্তরের বিষয়ে সম্যক অবগত' (আলে ইমরান ৩/১১৯)। এভাবে হিংসায় যে কোন ফায়েদা নেই সেটা চিন্তা করলে মানুষ এই নোংরা স্বভাব থেকে ফিরে আসবে।
(৬) লোকে তাকে ঘৃণা করে, এটা উপলব্ধি করা: হিংসা ভিতরের বস্তু। যা দেখা যায় না। কিন্তু সেটি প্রকাশ পায় মানুষের কর্মে ও আচরণে। যেমন আল্লাহ বলেন, قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ 'তাদের মুখ দিয়ে বিদ্বেষ প্রকাশ পায়। আর যা তাদের বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, তা আরও অনেক বেশী' (আলে ইমরান ৩/১১৮)। অতএব হিংসুক ব্যক্তি যত দ্রুত তার প্রতি মানুষের ঘৃণা বুঝতে পারবে, সে তত দ্রুত ফিরে আসবে।
(৭) আল্লাহ্র সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হিংসা বর্জন করা: যখন মানুষ জানবে যে, হিংসায় জাহান্নাম ও তা পরিত্যাগে জান্নাত, তখন সে চিরস্থায়ী জান্নাত পাওয়ার আশায় ক্ষণস্থায়ী তুচ্ছ বস্তু পরিত্যাগ করবে। আল্লাহ বলেন, وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى 'যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি হ'তে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাত তার ঠিকানা হবে' (নাযে'আত ৭৯/৪০-৪১)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ 'যা তোমার উপকারে আসবে, সেদিকে তুমি প্রলুব্ধ হও'।²¹
(৮) সকল কাজের বিনিময় আল্লাহ্র নিকটে কামনা করা : মুসলমানকে আল্লাহ্ পথে সংগ্রামে পরস্পরকে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় থাকতে বলা হয়েছে (ছফ ৬১/৪)। এটা কেবল তখনই সম্ভব, যখন হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত মনে আমরা পরস্পরকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারব এবং এর বিনিময় স্রেফ আল্লাহ্র নিকটে কামনা করব । যেমন প্রত্যেক নবী বলেছেন, وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ 'আমি তোমাদের কাছে কোন বিনিময় চাই না। আমার বিনিময় তো কেবল বিশ্বপালক আল্লাহ্র নিকটেই রয়েছে' (শো'আরা ২৬/১০৯, ১২৭. ১৪৫, ১৬৪, ১৮০)।
(৯) এছাড়া নিম্নোক্ত দো'আটি পড়া আবশ্যক। যা আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদীকে শিখিয়ে দিয়েছেন, رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبَنَا غِلَا لِلَّذِيْنَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَعُوْفٌ رَحِيمٌ 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ও আমাদের সেইসব ভাইকে তুমি ক্ষমা কর, যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে। আর তুমি আমাদের অন্তরে মুমিনদের বিরুদ্ধে কোনরূপ বিদ্বেষ সঞ্চার করো না। হে আমাদের পালনকর্তা! নিশ্চয়ই তুমি স্নেহশীল ও দয়াবান' (হাশর ৫৯/১০)।
টিকাঃ
১৮. মুসলিম হা/২২০৩; মিশকাত হা/৭৭, ঈমান অধ্যায় 'মনের খটকা' অনুচ্ছেদ।
১৯. তিরমিযী হা/২৫১০, মিশকাত হা/৫০৩৯, হাদীছ হাসান।
২০. তিরমিযী হা/২৫০৮; মিশকাত হা/৫০৪১।
২১. মুসলিম হা/২৬৬৪, মিশকাত হা/৫২৯৮।