📄 সরস্বতীপূজা
সরস্বতীপূজা হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, সরস্বতী দেবী অজ্ঞতা বিদূরিত করে জ্ঞান দান করেন। এজন্য হিন্দু শিক্ষার্থীরা বিদ্যালাভের আশায় সরস্বতীর অর্চনা করে। তারা মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমীতে (শুক্লপক্ষের পঞ্চম তিথিতে) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজা করে। পূজার সময় আশীর্বাদ লাভের আশায় পূজাবেদীর ওপর পাঠ্যপুস্তক ও কলম-পেন্সিল রাখা হয়।
📄 লক্ষ্মীপূজা
লক্ষ্মীপূজা হিন্দুদের বিশ্বাস লক্ষ্মী হচ্ছেন সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের দেবী। দুর্গাপূজার পর পূর্ণিমাতে লক্ষ্মী পূজা করা হয়, হিন্দুদের ধারণা এ দিন রাতে দেবী দ্বারে দ্বারে আশীর্বাদ নিয়ে আসেন এবং এ রাতে না ঘুমিয়ে দেবীর ধ্যান-আরাধনায় মগ্ন থাকলে তার অনুগ্রহ লাভ করা যায়। লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে বাড়ি-ঘরে বিভিন্ন রকম আল্পনা আঁকা হয়। বিশেষ করে ঘরের দরজা থেকে শুরু করে লক্ষ্মীর আসন এবং ধান-চালের গোলা পর্যন্ত ছোট ছোট পায়ের ছাপ দেয়া হয়। এটা লক্ষ্মীর গমনের প্রতীকরূপে কল্পিত। সবার ঘরে বা মূর্তিতে লক্ষ্মীর পূজা করা হয়।
📄 চরকপূজা
চরকপূজা বাংলা সালের শেষ দিনকে বলা হয় চৈত্রসংক্রান্তি। এ দিনটি হিন্দুদের নিকট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দুদের বিশ্বাস, এ দিনে স্নান, দান, ব্রত, উপাসনা প্রভৃতি ক্রিয়াকর্ম পুণ্যজনক। চৈত্রসংক্রান্তির প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে চরক পূজা। চরকপূজার সময় শুলফোঁড়া, বাণফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চরকগাছে (উঁচু করে পোতা কাঠে) ঘোরা, আগুণে হাঁটা ও ছুরির ওপর লাফানো, দেহকে তীরবিদ্ধ করা অগ্নিনৃত্য প্রভৃতি সব ভয়ঙ্কর ও কষ্টসাধ্য দৈহিক কলা-কৌশল দেখানো হয়।
📄 শিবলিঙ্গ পূজা
শিবলিঙ্গ পূজা অন্যতম প্রধান হিন্দুদেবতা শিবের পূজার জন্য বিভিন্ন মন্দিরে নিয়মিত ব্যবস্থা আছে। আসলে শিবের পূজা করা হয় না, করা হয় তার লিঙ্গের পূজা। বিভিন্ন মন্দিরে তার জননেন্দ্রিয় বা লিঙ্গের যে প্রতীক রাখা হয়, তাকে বলা হয় শিবলিঙ্গ। যে মন্দিরে শিবলিঙ্গ থাকে তাকে বলা হয় শিবমন্দির। ভারতের বারটি তীর্থস্থান শিবলিঙ্গের জন্য প্রসিদ্ধ। এসব স্থানের লিঙ্গগুলোকে বলা হয় জ্যোতির্লিঙ্গ। হিন্দুদের বিশ্বাস, "প্রভাতে এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের পুণ্য নাম স্মরণে সপ্তজন্মকৃত পাপের স্খলন হয়। শিবের ভক্ত শৈবগণই শিবলিঙ্গ পূজা করে থাকেন।
বাংলাদেশের শৈবগণও কোন কোন স্থানে শিবলিঙ্গ পূজা করে থাকেন। এসব স্থানের মধ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ ধাম খ্যাত। প্রতি বছর দোলপূর্ণিমার রাতে সেখানে অবস্থিত শিবমন্দিরে বহু পুণ্যার্থী পূজা অর্চনা করতে সমবেত হন। সাধারণভাবে প্রত্যহ যেসব শিবলিঙ্গ পূজিত হয়ে থাকে, যোনিপীঠ সেগুলো আকারে দেড় হতে দুই ইঞ্চির ঊর্ধ্বে হয় না। এ ক্ষেত্রে সাধারণত যোনিপীঠকে রৌপ্য ব্রোঞ্জ দ্বারা পৃথকভাবে নির্মাণ করা হয়। পূজার সময় পাথর নির্মিত লিঙ্গ মূর্তিটিকে এর মধ্যে স্থাপন করা হয়। লিঙ্গটিকে যোনীর (স্ত্রীলিঙ্গের) প্রতীকের মধ্যস্থলে এমনভাবে স্থাপন করা হয় যাতে দেখা যায়, তা খাড়া অবস্থায় আছে। শিবমন্দিরে প্রতিদিন পানি, দুধ ও ভাং (যা শিব পছন্দ করেন) দিয়ে শিবের লিঙ্গের প্রতিমাকে স্নান করানো হয়। পরে এর সামনে নানা ধরনের খাবার পরিবেশন করা হয়। পূজা করার সময় প্রতিমাটির সামনে ফুল, আগর এবং কাপড় রাখা হয়। শৈবিক উপদলে নারীগণ স্নানের সময় মাটি দিয়ে শিবলিঙ্গের একটি প্রতীক তৈরি করে এবং প্রতীকটির দিকে মাথা নত করে প্রণাম জানায়।
শিবের পরিবর্তে তার লিঙ্গের পূজা করা হয় কেন? এমন প্রশ্ন জাগা খুবই স্বাভাবিক। এ সম্পর্কে শাস্ত্রে দুটো কাহিনী উল্লেখ আছে। পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে যে, ভৃগু নামক এক ঋষির অভিশাপের ফলেই শিবের এ দশা হয়েছে। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব, প্রধান এ তিন দেবতার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম কে, তা জানার জন্য একসময় ভৃগুকে পাঠনো হয়েছিল। তিনি যখন শিবের ঘরের সামনে গেলেন, তখন দারোয়ান তাকে এই বলে ঘরে ঢুকতে দিল না যে, তার প্রভু শিব নিজ স্ত্রী পার্বতীর সাথে সঙ্গমরত আছেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ভৃগুর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি শিবকে অভিশাপ দিয়ে বললেন, হে শংকর, যেহেতু পার্বতীর আলিঙ্গনকে প্রধান্য দিতে গিয়ে তুমি আমাকে অপমান করেছ, কাজেই তোমার পূজা পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ আকারে হবে।
অপর একটি কাহিনীতে বলা হয়েছে, কয়েকজন ঋষির অভিশাপের ফলেই শিব পূজা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং তার স্থলে তার লিঙ্গ পূজ্য হয়েছে। স্ত্রী পার্বতীর মৃত্যুর পর শিব দারুণভাবে শোকাগ্রস্ত হয়েছিলেন। এ সময় তিনি উন্মাদের মতো বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করতে থাকেন এবং নানা আশ্রমে গিয়ে স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন। শিবের রূপ দেখে এসব আশ্রমের ঋষিদের স্ত্রীগণ তার প্রতি দারুণভাবে আসক্ত হয়। শিবকে পাওয়ার জন্য তার পিছু নিয়ে তারা নানা স্থানে ঘুরতে থাকে। স্ত্রীদের এ অবস্থা দেখে ঋষিগণ খুবই অপমানিত বোধ করেন এবং শিবকে অভিশাপ দেন। এ অভিশাপের ফলেই শিব পুরুষত্ব হারিয়ে ফেলেছিলেন।
পুরুষত্ব হারিয়ে শিব দারুণভাবে চিন্তাগ্রস্ত হলেন। তার এ বিপদ দেখে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু এগিয়ে আসলেন এবং ঋষিদের অভিশাপ প্রত্যাহার করতে এই মর্মে সম্মত হলেন যে, শিব নিজে কোন উপাসনা লাভ করবেন না বরং তার উপাসনার বস্তু হবে তার লিঙ্গ। এভাবেই শিবলিঙ্গ মানুষ ও দেবতাদের পূজার বস্তু হয়েছে। ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত প্রাক্তন ব্রাহ্মণ পুরোহিত আবুল হুসেন ভট্টাচার্য শিবলিঙ্গ পূজা প্রসঙ্গে লিখেছেন, "হিন্দু শাস্ত্রানুযায়ী একমাত্র নিজ নিজ স্বামী ছাড়া নারীদের আর কোন উপাস্য নেই কিন্তু বিধবা নারীদের বেলায় এই নিয়মের ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়। তাদের জন্য বান-লিঙ্গের পূজা, জপতপ এবং ভাগবত গ্রন্থ পাঠের অধিকার স্বীকৃতি হয়েছে। তবে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে যে, স্বামী জ্ঞানেও বাণ-লিঙ্গের পূজা করতে হবে। এ পূজার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, এক সময় মহাদেব (বাণেশ্বর শিব) এবং পার্বতী (দুর্গা) সঙ্গমরত ছিলেন, সে সময় মহাদেবের উত্তেজনা এমনভাবে বৃদ্ধি পায় যে, পার্বতীর জীবন নাশের উপক্রম হয়ে পড়ে। পার্বতীর প্রার্থনায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এগিয়ে আসে এবং নিজ হস্তস্থিত সুদর্শন চক্র দ্বারা উভয়ের গুপ্ত অঙ্গ কেটে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। উভয় গুপ্তাঙ্গের মিলিত সংস্করণই 'বানলিঙ্গ' নামে আখ্যায়িত হয়ে হিন্দু সমাজ কর্তৃক পূজিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন মন্দিরে ছোট বড় নানা আকারের প্রস্তর নির্মিত বাণলিঙ্গ রয়েছে এবং পূজিত হয়ে আসছে। দৈনন্দিনপূজার বেলায় মাটি দিয়ে নিজহাতে গড়া লিঙ্গ পূজাই অধিক পুণ্যজনক এবং শাস্ত্রসম্মত। সাধারণত বিধবা দিগকেই ওটা গড়তে হয়। উভয় লিঙ্গের মিলিত এই সংস্করণকে নিজ হাতে গড়া এবং পূজা করার বেলায় অন্তত যৌবনবতী-বিধবাদিগের মনে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া যে খুবই স্বাভাবিক, কোন স্বস্তি-প্রাজ্ঞ এবং চিন্তাশীল ব্যক্তি সে কথা অস্বীকার করতে পারেন না।"