📄 দেবতাদের বাহন পূজা
দেবতাগণ পদব্রজে চলেন না। যদিও তাঁরা ইচ্ছা করলেই যেকোন স্থানে যেকোন সময় হাজির হতে পারেন। কল্পনা করলেই তাদেরকে পাওয়া যায়। যেহেতু তাঁরা বাহনে চলেন এবং বাহনগুলো তাদের অতি পছন্দনীয়, তাই দেবতাদের বাহন পূজাও করতে হয়।
বাহন ছাড়া সাধারণত দেবদেবীর আগমন এবং নির্গমন হয় না। তাই, তাদের পূজার সময় বাহনেরও ব্যবস্থা করতে হয়। যদি উপাসক ও ভক্তগণ তাদের গৃহে দেবদেবীর আগমন নিশ্চিত করতে চান এবং ঐকান্তিক ভাবে কামনা করেন, তবে তাদের বাহনের পূজাও করতে হবে। এতো পূজা করতে হলে চলার পথ হয়তো মসৃণ হয় না। কারণ, ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাহনের বিষয় ভুলে গেলেও দেবতার অসম্মান ও পাপ হয়।
📄 দেবতাদের বাহন
হিন্দুধর্মে শুধু যে দেবতাদের পূজা করা হয়, তা নয়। দেবতাদের বাহন হিসেবে যে সমস্ত পশু পক্ষী আছে সেগুলোর পূজা করা হয়। ইঁদুর হলো গণেশের বাহন। গণেশ হলেন মহাদেবী পার্বতীর পুত্র। তাঁর আকৃতি মানুষের মতো, যদিও মস্তকটি হাতির। এরূপ একজন দেবতার বাহন হলো ইঁদুর যা যুক্তিতে মিলে না। কিন্তু যে অঞ্চলে গণেশের পূজা প্রচলিত, ওই অঞ্চলে ইঁদুরেরও পূজা করা হয়। নিঃশ্বাসে জীবন, বিশ্বাসে ধর্ম, ভক্তিতে মুক্তি, সমালোচনায় পাপ। হস্তি, হনুমান, বানর, বৃষ, গাভী, ইত্যাদি ছাড়াও অন্যান্য প্রাণী যেমন- ঈগল, পেঁচা, ময়ূর, সাপ পূজা প্রচলিত আছে। বটবৃক্ষ, তুলসী গাছ, পাহাড়-পর্বত, নদী, বৃক্ষপত্র, ইত্যাদিও পূজার লক্ষ্যবস্তু অথবা পূজার সামগ্রী হিসাবে গণ্য। দেবী লক্ষ্মীর বাহন হলো পেঁচা পাখি। যে অঞ্চলে লক্ষ্মীপূজা বেশি হয়, সে অঞ্চলে পেঁচাকে বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা হয়। দেবী সরস্বতীর বাহন রাজহাঁস। বিনয়ী দেবেশ্বর ব্রহ্মার বাহন পাতিহাঁস। দুর্গার বাহন সিংহ। ইন্দ্রের বাহন হস্তী। বিষ্ণুর বাহন গরুড় পাখি। কার্তিকের বাহন ময়ূর। যমরাজের বাহন কুকুর। দেবী মনসার বাহন সাপ। মহাদেব শিবের বাহন ষাঁড় বা বৃষ। গঙ্গার বাহন মকর। বিশ্ব কর্মার বাহন ঢেঁকি। দেবী শীতলার বাহন গাধা। এরূপভাবে অন্যান্য দেবদেবীরও বাহন আছে।
টিকাঃ
১. দেবদেবীর পরিচয়-৩২
📄 শিবের বাহন নন্দিষাঁড়
নন্দি নামক একটি বৃষ (ষাঁড়)-কে মহাদেব শিব বাহন হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাই ষাঁড়ের পূজা করা হয়। উত্তর ভারতে বানরের পূজা হয় বেশি। সরস্বতীর বাহন হল রাজহাঁস। শিক্ষার্থীদের নিকট হাঁস প্রিয়। ব্রহ্মার বাহন পাতিহাঁস। শিক্ষার্থীগণ ব্রহ্মার অতি প্রিয়। পূজারীগণ পূজার মধ্যে শিবদেবতা এবং শিবদেবতার বাহনকে একত্র করে ফেলেন। তাই শিব পূজার সঙ্গে সঙ্গে নীললক্ষ্মী বা বৃষপূজাও সাধিত হয়। শিবপূজাকালে বাহন এবং বাহিতের পার্থক্য লুপ্ত হয়। বাহন এবং মহাদেব শিবকে একই স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। যেমন- ঋষিগণ শিবপূজায় বলেন, হে দেব! তুমি বৃষরূপী ভগবান। হে নীলবৃষ! তুমি বিশ্ব পালকগণের পালক এবং সনাতন তুমি বিঘ্ন হত্যাকারী, তুমি ত্রাণকর্তা, ধর্মরূপী মহাপ্রভু। হে নীল বৃষ! তুমি নাথ। তুমি সিদ্ধ। তুমি গণকপ্রদ। তুমি সর্ববৈরী নিশুধন। জগৎ সুধা বিধায়ক, সৌরশ্রেষ্ঠ ও মহাবল। তুমি শুভ। অগ্রে পার্বতীসহ কৈলাশ পর্বত ধারণ করেছ। তুমি বেদময় বেদাত্মা। তুমি দেবস্তত্য।
টিকাঃ
১. দেবদেবীর পরিচয়, পৃ-৪৭
📄 পূজার শ্লোক
শিব পূজাকালে যে সমস্ত শ্লোক পাঠ করা হয়, তা অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধারস মিশ্রিত। একটি শ্লোকের অর্থ নিম্নরূপ- যিনি দেব মহেশ্বর, তিনি এই বৃষ বা ষাঁড়রূপ ধারণকারী। এই চতুষ্পদ নীলবৃষই পঞ্চশহর। এই বৃষ দর্শন বা জপের ফলে পুণ্য লাভ হয়। নীলবৃষের পূজা করা হলে সমস্ত জগৎ পূজিত হয়। নীলবৃষকে ঘাস বা পানীয় প্রদান করা হলে জগৎ আপ্যায়িত হয়। এই নীলবৃষ সর্বদা সনাতন বেদমন্ত্র দ্বারা অর্চিত হয়ে থাকে। পূজার মধ্যে বলা হয়- হে মহাদেব! তুমি বৃষরূপী ভগবান। যে তোমার সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ করে অথবা পাপাচার করে, সে অবশ্যই বৃষ এবং কৌরব নরকে পৌঁছবে। যে তোমাকে পদ দ্বারা স্পর্শ করে, সে ক্ষীপ্ত ঘাস ও তুষণী নরকে যাবে।