📄 রাগের দেবতা
মহাদেব ভীষণভাবে রেগে গিয়ে এক সময় তার শ্বশুরের সারাটি দেহে প্রস্রাব করে দিয়েছেন। ভৃগু পা দিয়ে ভগবানের বুকে আঘাত করেছিলেন। পরশুরাম পৃথিবীকে কুড়াল দিয়ে আঘাত করে ক্ষত্রিয়দের একুশবার বিতাড়ন করেছিলেন। গৌতম অহল্যাকে পাথরে রূপান্তরিত করেছিলেন। তিনিই ইন্দ্রের দেহে এক হাজার যোনি সৃষ্টি করেছিলেন। দুর্বাশা অভিশাপ দিয়ে হরষ রাজাকে চণ্ডালে পরিণত করেছিলেন। চমুণ্ড দেহ থেকে নিজের মাথাকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। জাহ্নমুনি গঙ্গার সব পানি পান করেছিলেন। এসব কাজ করার মূলে ছিল রাগ। এ কারণে এসব দেবতাদেরকে বলা হয় রাগের দেবতা। এ প্রসঙ্গে শিব ও তার স্ত্রী পার্বতীর রাগের কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়।
একবার স্নান করার সময় পার্বতী নিজের দেহের ময়লা ও ব্যবহৃত তেল দিয়ে একটি মানবদেহ তৈরি করেন। পরে গঙ্গাজলের ছিটা দিয়ে তিনি তাতে প্রাণের সঞ্চার করেন। এভাবেই তার পুত্র গণেশের জন্ম হয়। গণেশকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে পার্বতী নির্দেশ দিলেন, তিনি স্নান করার সময় কেউ যেন গৃহে প্রবেশ করতে না পারে, আর যদি কেউ প্রবেশ করতে চায় তবে তাকে যেন বাধা দেয়া হয়। এমনি সময় পার্বতীর স্বামী শিব বাড়িতে আসলেন এবং গৃহে প্রবেশ করতে চাইলেন। গণেশ তার প্রবেশে বাধা দিলেন। শিব কঠিন ভাবে রেগে গিয়ে গণেশের মাথাটি কেটে ফেললেন। স্নান সেরে বাইরে এসে পার্বতী দেখলেন, গণেশের ঘাড়ের উপর মাথা নেই তখন পুত্রশোকে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। পার্বতীর অশ্রুবর্ষণ দেখে শিবের মনে দয়ার উদ্রেক হলো। তিনি একটি হাতিকে হত্যা করে তার মাথা এনে গণেশের ঘাড়ের উপর বসিয়ে দিলেন এভাবেই গণেশ হাতির মাথা লাভ করলেন।
শিবের রাগের আরেকটি ঘটনা। নিজেদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ এ নিয়ে একবার ব্রহ্মা ও শিবের মধ্যে বিতর্ক চলছিল। ব্রহ্মা দাবি করলেন, তিনি শিবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এ কথাটি শোনামাত্র ভীষণভাবে রেগে গিয়ে শিব ব্রহ্মার পঞ্চম মাথাটি কেটে ফেললেন। কিন্তু কাজটি করে শিব নিজের জন্য একটি বিপদ ডেকে আনলেন। তার হাতে ব্রহ্মার মাথাটি এমনভাবে লেগে থাকল যে অনেক চেষ্টা করেও তিনি তা সরাতে পারলেন না। এ বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য শিব বেনারস চলে গেলেন। বেনারসের পবিত্রতা ও মাহাত্ম্য এত বেশি যে, সেখানে যাওয়ার পরই শিব হাত থেকে ব্রহ্মার মাথাটি সরাতে পারলেন। উল্লেখ্য, বেনারস হিন্দু তীর্থস্থানগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার এটাই কারণ।
শিবের স্ত্রী পার্বতীর রাগও কম ছিল না। ভীষণভাবে রেগে গিয়ে তিনি এক সময় আত্মহত্যা করলেন। পরে দুর্গা নামে পুনর্জন্ম লাভ করার পর তার ইচ্ছে হলে, আবার স্ত্রী হিসেবে শিবের সাথে মিলিত হবেন। শিবের নিকট গিয়ে দুর্গা দেখলেন, তিনি গভীর ধ্যানে মগ্ন আছেন, তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পেরে দুর্গা তার সামনে বসে পড়ে গভীর তপস্যা আরম্ভ করলেন। তপস্যায় সফল হলেন। দুর্গার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে দেবতারা শিবের নিকট কামদেবতাকে পাঠালেন। কামদেবতা শিবের মনে দারুণভাবে যৌনক্ষুধা আনালেন দুর্গার সাথে সংগম করার জন্য। এভাবেই দুর্গা আবার শিবের স্ত্রী হতে পারলেন।
📄 প্রেমের দেবতা
রাধা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী ব্যতীত আরও এক হাজার গোপিনীর সাথে কৃষ্ণ প্রেম করেছিলেন। সতীর সাথে প্রেম করতে গিয়ে মহাদেব মাতাল হয়ে গিয়েছিলেন। গঙ্গার সাথে প্রেম করতে গিয়ে তিনি দুর্গার দ্বারা অভিশপ্ত হয়েছিলেন এবং হিমালয়ের কন্যা পার্বতীর সাথে প্রেম করতে গিয়ে দারুণভাবে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। নারায়ণ তুলসীর সাথে প্রেম করতে গিয়ে পাথরে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। অহল্যার সাথে প্রেম করার কারণে দেবরাজ ইন্দ্রের দেহে এক হাজার যোনি (স্ত্রী জননেন্দ্রিয়) হয়েছিল। কয়েকজন ঋষির স্ত্রীর সাথে প্রেম করার কারণে শিবকে নিজের লিঙ্গ হারাতে হয়েছিল। কৃষ্ণের প্রেমে আসক্ত হওয়ার কারণে জগাই মাধাই পার্থিব বিষয়াদির প্রতি চরমভাবে উদাসীন হয়েছিলেন। হরি প্রেমে আসক্ত হয়ে নিমাই সংসারত্যাগী হয়েছিলেন। সর্বত্র প্রেম বিতরণের কাজ যারা করেন তারা হলেন; মেনকা, রতি এবং রম্ভ। প্রেমের রাজা এবং রাণীও আছে। রাজা হলেন মদন এবং রাণী হলেন রতি।
📄 বিপদকালীন দেবতা
এমন কিছু দেবতা আছেন যাদের নিকট বিশেষ বিশেষ বিপদের সময় প্রার্থনা করা হয়। এদের মধ্যে রয়েছেন মনসা (সাপ দংশন করলে), জুরাসুর (জ্বর হলে) শীতলা (কলেরা ও বসন্ত দেখা দিলে), ইটে-কুমার (চুলকানি ও চর্মরোগ হলে), দুর্গা (যেকোন বিপদের সময়-) গণেশ (ব্যবসায়িক উন্নতির জন্য।) কার্তিক (শত্রু থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য) এবং গঙ্গা (নৌকাডুবির ভয় হলে)। এরা হলেন ভয়কালীন দেবতা।
📄 অস্ত্রধারী দেবতা
কোন কোন দেবতারা বিশেষ বিশেষ অস্ত্র ব্যবহার করেন। এরা হলেন মহাদেব (ত্রিশূল) কৃষ্ণ (চক্র), বলরাম (লাঙল), পরশুরাম (কুড়াল), রাম (তীর) নারায়ণ (শঙ্খ, গদা, চক্র, পদ্ম), কার্তিক (ধনুর্বান), ইন্দ্র (বজ্র), দুর্গা (খড়গ), ভীম (গদা), মনসা (সাপ) এরা এবং আরও কয়েকজন দেবতা অস্ত্রধারী হিসেবে পরিচিত।