📄 আঞ্চলিক দেবতা
হিন্দুধর্মে কিছু কিছু অঞ্চলে বিশেষ বিশেষ দেবতার পূজা হয়। যেমন- বাংলাদেশে দুর্গাপূজা অত্যন্ত আড়ম্বরের সাথে পালিত হয়। অযোধ্যার দশরথের পুত্র রামচন্দ্রের পূজা উত্তর ভারতে অধিক হয়। রাম ও রাবণের মধ্যে মরণপণ যুদ্ধ হয়। উত্তর ভারতে শ্রীরামচন্দ্রের পূজা বেশি হয়। দক্ষিণ ভারতে রাবণের পূজা হয় অধিক। দক্ষিণ-মধ্যভারতে, মহারাষ্ট্রে গণেশের পূজা হয় অধিক।
শুধু যে ভারত উপমহাদেশে অঞ্চলভেদে দেব দেবীর পূজারীদের ভিন্নরূপ আনুগত্য থাকে তা নয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অঞ্চলভেদে, গোত্রভেদে, ভিন্ন ভিন্ন দেবতার পূজা হয়। এমনকি একই পরিবারে দু'ব্যক্তি দু'জন দেবতার পূজা করতে পারেন। হিন্দু ধর্মীয় দেবতাগণ অদৃশ্য নন।
📄 দেবতাদের অবস্থান
বিশ্বনাথ কাশীতে, শ্রীকৃষ্ণ বৈকুণ্ঠে ও কালীঘাটে, জগন্নাথ পুরীতে, গয়াসর গয়াতে, বাসুকী পাতালে, সর্পদেবতা নাগলোকে, বরুণ পানিতে, পবনদেবতা বায়ুতে, সীতা যোনী কামাখ্যায়, মহাদেব কলাগাছে, দুর্গা বটগাছে, কৃষ্ণ-ঠাকুর কদমগাছে এবং শিব-পার্বতী বেলগাছে অবস্থান করেন। নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করায় এ সব দেবতাকে বলা হয় স্থানীয় দেবতা।
📄 দেবতাদের দৈহিক বৈচিত্র্য
দেবতাদের মধ্যে নানা ধরনের দৈহিক বৈচিত্র্য দেখা যায়। চন্দ্র আকারে যক্ষ্মার মতো, শুক্রাচার্য একচক্ষুবিশিষ্ট, গণেশ হস্তির মস্তকবিশিষ্ট, ইন্দ্র একশ যোনীবিশিষ্ট, অহল্যা পাথরসম কঠিন এবং জটসুর জটধারী অনুরূপভাবে, নারায়ণ গোলাকার পাথরের মতো, ব্রহ্মা রক্ত রঙের চার চক্ষুবিশিষ্ট, মহাদেব রঙে সাদা ও চারমুখী, দুর্গা দশহাতবিশিষ্ট, জগন্নাথ বিকলাঙ্গ, গণপতির উদর স্ফীত, চমুণ্ডের হাতে মাথা, কালীর রঙে কালো এবং কৃষ্ণ শ্যামবর্ণবিশিষ্ট। এদের ছাড়াও দৈহিক বৈচিত্র্য বিশিষ্ট আরও দেবদেবী রয়েছেন।
📄 রাগের দেবতা
মহাদেব ভীষণভাবে রেগে গিয়ে এক সময় তার শ্বশুরের সারাটি দেহে প্রস্রাব করে দিয়েছেন। ভৃগু পা দিয়ে ভগবানের বুকে আঘাত করেছিলেন। পরশুরাম পৃথিবীকে কুড়াল দিয়ে আঘাত করে ক্ষত্রিয়দের একুশবার বিতাড়ন করেছিলেন। গৌতম অহল্যাকে পাথরে রূপান্তরিত করেছিলেন। তিনিই ইন্দ্রের দেহে এক হাজার যোনি সৃষ্টি করেছিলেন। দুর্বাশা অভিশাপ দিয়ে হরষ রাজাকে চণ্ডালে পরিণত করেছিলেন। চমুণ্ড দেহ থেকে নিজের মাথাকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। জাহ্নমুনি গঙ্গার সব পানি পান করেছিলেন। এসব কাজ করার মূলে ছিল রাগ। এ কারণে এসব দেবতাদেরকে বলা হয় রাগের দেবতা। এ প্রসঙ্গে শিব ও তার স্ত্রী পার্বতীর রাগের কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়।
একবার স্নান করার সময় পার্বতী নিজের দেহের ময়লা ও ব্যবহৃত তেল দিয়ে একটি মানবদেহ তৈরি করেন। পরে গঙ্গাজলের ছিটা দিয়ে তিনি তাতে প্রাণের সঞ্চার করেন। এভাবেই তার পুত্র গণেশের জন্ম হয়। গণেশকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে পার্বতী নির্দেশ দিলেন, তিনি স্নান করার সময় কেউ যেন গৃহে প্রবেশ করতে না পারে, আর যদি কেউ প্রবেশ করতে চায় তবে তাকে যেন বাধা দেয়া হয়। এমনি সময় পার্বতীর স্বামী শিব বাড়িতে আসলেন এবং গৃহে প্রবেশ করতে চাইলেন। গণেশ তার প্রবেশে বাধা দিলেন। শিব কঠিন ভাবে রেগে গিয়ে গণেশের মাথাটি কেটে ফেললেন। স্নান সেরে বাইরে এসে পার্বতী দেখলেন, গণেশের ঘাড়ের উপর মাথা নেই তখন পুত্রশোকে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। পার্বতীর অশ্রুবর্ষণ দেখে শিবের মনে দয়ার উদ্রেক হলো। তিনি একটি হাতিকে হত্যা করে তার মাথা এনে গণেশের ঘাড়ের উপর বসিয়ে দিলেন এভাবেই গণেশ হাতির মাথা লাভ করলেন।
শিবের রাগের আরেকটি ঘটনা। নিজেদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ এ নিয়ে একবার ব্রহ্মা ও শিবের মধ্যে বিতর্ক চলছিল। ব্রহ্মা দাবি করলেন, তিনি শিবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এ কথাটি শোনামাত্র ভীষণভাবে রেগে গিয়ে শিব ব্রহ্মার পঞ্চম মাথাটি কেটে ফেললেন। কিন্তু কাজটি করে শিব নিজের জন্য একটি বিপদ ডেকে আনলেন। তার হাতে ব্রহ্মার মাথাটি এমনভাবে লেগে থাকল যে অনেক চেষ্টা করেও তিনি তা সরাতে পারলেন না। এ বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য শিব বেনারস চলে গেলেন। বেনারসের পবিত্রতা ও মাহাত্ম্য এত বেশি যে, সেখানে যাওয়ার পরই শিব হাত থেকে ব্রহ্মার মাথাটি সরাতে পারলেন। উল্লেখ্য, বেনারস হিন্দু তীর্থস্থানগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার এটাই কারণ।
শিবের স্ত্রী পার্বতীর রাগও কম ছিল না। ভীষণভাবে রেগে গিয়ে তিনি এক সময় আত্মহত্যা করলেন। পরে দুর্গা নামে পুনর্জন্ম লাভ করার পর তার ইচ্ছে হলে, আবার স্ত্রী হিসেবে শিবের সাথে মিলিত হবেন। শিবের নিকট গিয়ে দুর্গা দেখলেন, তিনি গভীর ধ্যানে মগ্ন আছেন, তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পেরে দুর্গা তার সামনে বসে পড়ে গভীর তপস্যা আরম্ভ করলেন। তপস্যায় সফল হলেন। দুর্গার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে দেবতারা শিবের নিকট কামদেবতাকে পাঠালেন। কামদেবতা শিবের মনে দারুণভাবে যৌনক্ষুধা আনালেন দুর্গার সাথে সংগম করার জন্য। এভাবেই দুর্গা আবার শিবের স্ত্রী হতে পারলেন।