📄 পূজা-পার্বণ
দেবদেবীকে ভক্তি জানানোর জন্য হিন্দুদের যে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়, পূজা বলতে তাই বোঝায়। 'পূজা' শব্দটির আভিধানিক অর্থ পুষ্পকর্ম অর্থাৎ পুষ্প চন্দন দিয়ে অভীষ্ট দেবতার নিকট নিজেকে উৎসর্গ করা এবং তার সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন করা। হিন্দু পণ্ডিতদের মতে, পূজা বলতে মূর্তিপূজাকেই বোঝায় আর মূর্তিপূজাকে বলা হয় ঈশ্বরের সাকার উপাসনা।
📄 মূর্তিপূজার উদ্ভাবন ও প্রচলন
একথা বলা যায় যে বৈদিক যুগে মূর্তি পূজার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। না আছে কোন মন্দির ও মঠের দলিল। বৈদিক যুগের শুরুর দিকে মানুষ প্রকৃতির শক্তির কাছে মাথা নত করতো ও তাদের পূজা অর্চনা করার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে ওই শক্তিগুলোর মূর্তি বানিয়ে তাদের পূজা অর্চনা করা, তাদের সামনে কান্নাকাটি ও সাহায্য প্রার্থনা করার কোন ইতিহাস পাওয়া যায় না। অমুসলিম গবেষকগণ যারা বৈদিক ধর্মের ওপর গবেষণা করেছে, এবং উপাস্যের সংখ্যা ও প্রাকৃতিক শক্তির পূজার ওপর সবিস্তর লেখালেখি করেছেন। তারাও একথা স্বীকার করেছেন যে, বৈদিক যুগে কোন মূর্তির পূজা ছিলো না এবং কোন মঠ ও মন্দিরও ছিলো না।
মূর্তিপূজার উদ্ভব সম্পর্কে জ্ঞানমঞ্জুরীতে লেখা আছে- “বৈদিক যুগের শেষের দিকে আর্য ঋষিদের মাধ্যমে মূর্তিপূজা শুরু হয়”।
মূর্তি পূজা ও উদ্ভাবন সম্পর্কে হিন্দুইজম গ্রন্থে লেখা আছে- “এ কথাতো বলা মুশকিল যে, মূর্তি পূজা কবে থেকে শুরু হয়েছে। পরবর্তীতে অবস্থা এমন হলো যে, কোন জাগতিক আকৃতি সামনে রাখা ব্যতীত পূজা-অর্চনা অসম্ভব মনে করা হতো। এক পর্যায়ে অবস্থা এমন হলো যে, সামনে যা কিছু শক্তিশালী পেত তাকেই পূজা অর্চনা করা শুরু করতো। হিন্দুদের এই বস্তু পূজা তাদেরকে আসল একত্ববাদ থেকে বহু দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সেখানে ইসলাম তাদেরকে সুবর্ণ সুযোগ দান করেছে। তাদের জন্য পূজার জন্য বাহ্যিক রূপ হওয়া আবশ্যক হয়ে গেছে। এই চিন্তা-চেতনার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ডক্টর গন্তাওয়ালীবান লিখেছেন- পুরো বিশ্বের সমস্ত জাতির মধ্যে হিন্দুদের জন্য বাহ্যিক রূপের পূজা করা আবশ্যক। এভাবেই আস্তে আস্তে চলে আসে বিভিন্ন কল্পনা ও মূর্তি পূজা।”
টিকাঃ
১. দেখুন ভারতীয় দর্শন এক রূপরেখা-৩৫
২. জ্ঞানমঞ্জুরী-১৩৮
📄 মূর্তিপূজা
মূর্তিপূজা হিন্দু ধর্মের বৈশিষ্ট্য। বেদ, উপনিষদ, পুরাণে মূর্তিপূজার কোন উল্লেখই নেই। মূর্তিপূজা হিন্দুধর্মে কখন প্রবর্তন হয়েছিল তা অস্পষ্ট হলেও বর্তমানে মূর্তিপূজা হিন্দুধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোন্ যুগ- শতাব্দী থেকে মূর্তিপূজা শুরু হলো তা অস্পষ্ট এবং অজানা। কিন্তু কোন্ গ্রন্থ থেকে শুরু হলো তার ইঙ্গিত রয়েছে। অনেকের মতে, গ্রীসে মূর্তিপূজা ছিল। আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের পরেই গ্রীক প্রভাবে ভারতে মূর্তিপূজা শুরু হয়। এটা সাধারণভাবে গৃহীত একটি সত্য। মহেঞ্জোদারোতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় দেবতাদের মূর্তি পাওয়া যায়। মহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত একটি মূর্তিকে ধারণা করা হয় এটা শিবমূর্তির প্রতীক। কারো কারো মতে, ভারতে মূর্তিপূজা শুরু হয় বৌদ্ধধর্ম প্রচারের পর থেকে। বৌদ্ধধর্মে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্পষ্ট। বৌদ্ধের প্রধান শিস্য আনন্দ। আনন্দ তার প্রভু বুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- ঈশ্বর বা প্রভু বলে কোন সত্তা আছেন কি? মহাজ্ঞানী বুদ্ধ বলেছিলেন আমি কি বলেছি ঈশ্বর নেই? আনন্দ পুনরায় জিজ্ঞাসা করেন তাহলে প্রভু! আমি কি ভাববো ঈশ্বর আছেন? এবার বুদ্ধ বুদ্ধিমত্তার সাথে জবাব দিলেন আমি কি বলেছি ঈশ্বর আছেন? অর্থাৎ ঈশ্বর আছেন কি নেই- এর কোনটাই বুদ্ধ বলেননি। হয়ত বুদ্ধই ছিলেন ঈশ্বর অথবা ঈশ্বরের নবম অবতার। হিন্দুগণ এক ও অদ্বিতীয় সর্ব শক্তিমান ঈশ্বরে বিশ্বাস করলেও এখন পর্যন্ত ঈশ্বরের কোন মূর্তি কেউ দেখেনি। তবে যে কোন প্রাণীর পূজাকে ঈশ্বরের পূজা বলে ধারণা করা হয়। কারণ, সব কিছুই ঈশ্বর থেকে এসেছে অথবা ঈশ্বর থেকেই সৃষ্টি অথবা সৃষ্টির প্রেরণা থেকেই পাওয়া গেছে। এর ফলে এক ঈশ্বরের পূজা অসংখ্য মূর্তি পূজায় পরিগণিত হয়েছে।
📄 বৈদিক দেবতা পূজা
হিন্দুধর্মে এক ঈশ্বরবাদের সঙ্গে সঙ্গে বহু ঈশ্বর এবং দেবদেবীর অস্তিত্বের স্বীকৃতি আছে। ঈশ্বর এবং দেব-দেবীগণ শুধুই যে স্বর্গে থাকেন তা নয়, তারা পৃথিবীতে আবির্ভূত হন-মানব সন্তান হিসেবে। যেমন হয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীরামচন্দ্র।