📄 রাবণ কর্তৃক জটায়ুর পক্ষচ্ছেদন
রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ দক্ষিণ দিকে যাত্রা করেন। গোদাবরী নদীর তীরে পঞ্চবটী বনে বাড়ি নির্মাণ করে সেখানেই বসবাস করতে থাকেন তাঁরা। একদিন রাবণের ভগিনী সুর্পনখা সেই বনে ভ্রমণ করতে করতে রাম ও লক্ষ্মণের সাক্ষাৎ পেলেন। সুর্পনখা সুন্দরী রমণীর ছদ্মবেশে রাম ও লক্ষ্মণকে প্রলুব্ধ করতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন। তখন ক্রোধে অন্ধ হয়ে সীতাকে ভক্ষণ করতে গেলে লক্ষ্মণ খড়গাঘাতে সুর্পনখার নাক ও কান ছেদ করে দিল। সুর্পনখার অপর রাক্ষস ভাই খর ও দুষণ এই সংবাদ পেয়ে সসৈন্যে রাম ও লক্ষ্মণকে আক্রমণ করলেন। কিন্তু রাম সসৈন্যেই বধ করলেন খর-দুষণকে।
রাবণ এই সংবাদ পেয়ে ভগিনীর অপমানের প্রতিশোধ কল্পে সীতাকে অপহরণ করার পরিকল্পনা করলেন। এই কাজে তাঁকে সাহায্য করলেন মারীচ নামে এক মায়াবী রাক্ষস। মারীচ স্বর্ণমগের ছদ্মবেশ ধরে সীতার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। হরিণটির রূপে মোহিত হয়ে তিনি রামের নিকট হরিণটি প্রার্থনা করে বসলেন। হরিণটিকে ধরতে গেলেন রাম। খানিকবাদে তিনি শুনতে পেলেন, রাম আর্তচিৎকার করছেন। আসলে মায়াবী মারীচ রামের কণ্ঠ নকল করে আর্তনাদ করেছিল। ভীত হয়ে সীতা লক্ষ্মণকে রামের সন্ধানে যেতে অনুরোধ করলেন। রাম যে অপরাজেয় সে কথা লক্ষ্মণ সীতাকে বারংবার বোঝাতে চাইলেন। কিন্তু সীতা সে কথায় কর্ণপাত করলেন না। অবশেষে কুটিরের চারিদিকে একটি গণ্ডী কেটে সীতাকে সেই গণ্ডীর বাইরে যেতে নিষেধ করে লক্ষ্মণ গেলেন রামের সন্ধানে। রাবণ এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন। তিনি ঋষির ছদ্মবেশে এসে সীতার নিকট ভিক্ষা প্রার্থনা করলেন। রাবণের ছলনা বুঝতে না পেরে সীতা গণ্ডীর বাইরে এসে তাঁকে ভিক্ষা দিতে গেলে দুষ্ট রাবণ বলপূর্বক সীতাকে অপহরণ করে নিজ রথে তুলে নিলেন।
জটায়ু নামে একটি শকুন জাতীয় রামভক্ত পক্ষী সীতার অপহরণ দেখতে পেয়ে সীতাকে উদ্ধার করতে গিয়ে রাবণের হাতে গুরুতর আহত এবং ভূপাতিত হল। রাবণ সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে লঙ্কায় অশোক কানন নামক বনে নজরবন্দী করে একদল চেড়ীর (রাক্ষসী) তত্ত্বাবধানে রাখলেন। তিনি সীতাকে বিবাহ করতে চাইলেন। কিন্তু রামের প্রতি নিবেদিতপ্রাণা সীতা সেই কুপ্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। এদিকে রাম ও লক্ষ্মণ মৃত্যুপথযাত্রী জটায়ুর কাছে সীতাহরণের সংবাদ পেলেন এবং অবিলম্বে সীতাকে উদ্ধার করার জন্য যাত্রা করলেন। যাত্রাপথে শবরী নামে এক বৃদ্ধা তপস্বিনী তাঁদের সুগ্রীব ও হনুমানের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিলেন।
বানরবীর তথা সুগ্রীবের অনুগামী হনুমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল রাম ও লক্ষ্মণের। সুগ্রীব ছিলেন কিষ্কিন্ধার নির্বাসিত এক রাজপদপ্রার্থী। রাম সুগ্রীবের সঙ্গে মিত্রতা করলেন। রাম এবং সুগ্রীব, বালীকে হত্যার জন্য পরিকল্পনা করলেন। তারা ঠিক করলেন যে যখন সুগ্রীব বালীকে দ্বন্দযুদ্ধে আহ্বান করবে তখন রাম বালীকে হত্যা করবে। সেই পরিকল্পনা মতো সুগ্রীব বালীকে দ্বন্দযুদ্ধে আহ্বান করলো এবং রাম তাকে পিছন থেকে তীর ছুঁড়ে হত্যা করলেন, কারণ ইন্দ্রের বরে বালীকে সামনে থেকে মারা অসম্ভব ছিল। তখন মরণাপন্ন বালী রামকে প্রশ্ন করলো যে সে কেন তাকে হত্যা করলো? রাম তার প্রশ্নের উত্তরে বললেন যে সে অন্যায়ভাবে সুগ্রীবকে রাজ্যচ্যুত করে তার স্ত্রী তারাকে বলপূর্বক নিজের রানী করেছে। তাই এই অধর্মের ফলে তার মৃত্যু হলো। তখন বালী তার অন্যায় বুঝতে পারলো এবং মহানুভব রামের হাতে মৃত্যুর জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে মৃত্যুবরণ করলো। রামের সহায়তায় সুগ্রীব নিজ ভ্রাতা বালীকে হত্যা করে কিষ্কিন্ধার সিংহাসনে আরোহণ করলেন। রামের সহায়তার বিনিময়ে সুগ্রীব চতুর্দিকে সীতার অনুসন্ধানে বানর দল পাঠালেন। উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমগামী দলগুলি ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল। অঙ্গদ ও হনুমানের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণগামী দলটি শেষে সম্পাতি নামে এক শকুন জাতীয় পক্ষীর নিকট সংবাদ পেলেন যে রাবণ সীতাকে লঙ্কায় নিয়ে গিয়ে বন্দী করে রেখেছেন।
হনুমানের নিকট সীতার সংবাদ পেয়ে রাম ও লক্ষ্মণ বানর সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণ সমুদ্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। সমুদ্রতীরে রাবণের অনুতপ্ত ভ্রাতা বিভীষণ তাঁদের পক্ষে যোগ দিলেন। অঙ্গদ, জাম্বুবান প্রমুখ বানরেরা সমুদ্রের উপর একটি সেতু বন্ধন করলেন। সেই সেতুপথে রাম সসৈন্যে লঙ্কায় প্রবেশ করলেন। এই সেতুটিই রামসেতু নামে পরিচিত। লঙ্কায় রাম ও রাবণের মধ্যে এক দীর্ঘ যুদ্ধ সংঘটিত হল। যুদ্ধান্তে রাবণ নিহত হলেন। রাম বিভীষণকে লঙ্কার সিংহাসনে স্থাপন করলেন।
সীতার সঙ্গে রামের মিলন হল। কিন্তু দীর্ঘদিন রাক্ষসগৃহে বসবাসকারী সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে সতীত্ব প্রমাণ করতে বললেন রাম। সীতা অগ্নিতে প্রবেশ করলেন। স্বয়ং অগ্নিদেব আবির্ভূত হয়ে রামের নিকট সীতার পবিত্রতার কথা ঘোষণা করলেন। অগ্নিপরীক্ষার উপাখ্যানটি বাল্মীকি ও তুলসীদাসের রামায়ণে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। [৪৭] যাই হোক, এরপর বনবাসের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ অযোধ্যায় ফিরে আসেন। সেখানে রামের রাজ্যাভিষেক হয়।
রাজা হওয়ার পর রাম অনেক কাল সীতাকে নিয়ে সুখে সংসার করেন। এদিকে অগ্নিপরীক্ষিতা হওয়া সত্ত্বেও সীতাকে নিয়ে অযোধ্যায় নানান গুজব ছড়াতে শুরু করে। এই সব রটনায় বিচলিত হয়ে রাম সীতাকে নির্বাসনে পাঠান। সন্তানসম্ভবা সীতা আশ্রয় নেন ঋষি বাল্মীকির আশ্রমে। সেখানেই তাঁর যমজ পুত্রসন্তান লব ও কুশের জন্ম হয়। লব-কুশকে তাঁদের পিতৃপরিচয় জানানো হয় না। তাঁরা গ্রহণ করে বাল্মীকির শিষ্যত্ব।
বাল্মীকি লব ও কুশকে রামায়ণ গান শিক্ষা দেন। ইতোমধ্যে রাম অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করলে বাল্মীকি লব ও কুশকে নিয়ে যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হন। লব ও কুশ সভায় রামায়ণ গান গেয়ে শোনান। সীতার বনবাসের গান শুনে রাম দুঃখিত হন। তখন বাল্মীকি সীতাকে নিয়ে আসেন রামের সম্মুখে। কিন্তু রাম সকলের সম্মুখে সীতাকে পুনরায় অগ্নিপরীক্ষা দিতে বললে অপমানিতা সীতা মাতা ধরিত্রীকে আহ্বান জানান। মাটি বিদীর্ণ হয়। দেবী ধরিত্রী উঠে এসে সীতাকে নিয়ে পাতালে চলে যান। এরপর রাম জানতে পারেন যে লব ও কুশ আসলে তাঁরই সন্তান। পরে মর্ত্যে অবতাররূপে তাঁর কাজ শেষ হলে রাম পুত্রদ্বয়ের হাতে শাসনভার ছেড়ে দিয়ে সরযূ নদীতে আত্মবিসর্জন করে বৈকুণ্ঠে ফিরে আসেন। মনে করা হয়, এই উত্তরকাণ্ডের অংশটি পরবর্তীকালে বাল্মীকি রামায়ণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল。
টিকাঃ
৪৭. [পাদটীকা মূল টেক্সটে বিস্তারিত নেই]
📄 হিন্দুধর্মের আরও কিছু গ্রন্থ
১. আদি পুরাণ ২. নৃসিংহ পুরাণ ৩. বায়ু পুরাণ ৪. শিব পুরাণ ৫. ধর্ম পুরাণ ৬. দুর্বাস পুরাণ ৭. নারদ পুরাণ ৮. নন্দি কেশর পুরাণ ৯. উশন পুরাণ ১০. কপিল পুরাণ ১১. বরুন পুরাণ ১২. শাস্ত্র পুরাণ ১৩. কালিকা পুরাণ ১৪. মহেশ্বর পুরাণ ১৫. মারীচ পুরাণ ১৬. পরাশর পুরাণ ১৭. দেব পুরাণ ১৮. ভাস্কর পুরাণ ১৯. বিষ্ণু পুরাণ ২০. কল্কি পুরাণ ২১. দেবী ভাগবত ২২. শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ।
📄 অন্যান্য গ্রন্থ
১. রামায়ণ ২. মহাভারত ৩. ব্রাহ্মণ সংহিতা ৪. মনু সংহিতা ৫. পরাশর সংহিতা ৬. গোবিন্দ মঙ্গল ৭. প্রভাস খণ্ড ৮. দশ অবতার ৯. পাতনুস গ্রন্থ ১০. হরি বংশ ১১. মোহ মুদগর ১২. শ্রীমদ্ভাগবত গীতা ১৩. পুরোহিত দর্পণ ১৪. চণ্ডিপাঠ ১৫. গীত রত্নাবলী ১৬. বৃহৎ সারাবলী।