📄 দুঃশাসন কর্তৃক দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ
দুর্যোধনের নির্দেশে দুঃশাসন অন্তঃপুর থেকে দ্রৌপদীকে কেশাকর্ষণ করে সভায় টেনে আনেন, অথচ সভায় উপস্থিত ধার্মিক ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর, পাণ্ডবরা ধর্মসংকটে পড়ে বিচারের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করতে পারেন না। কর্ণও কৌরবদের সায় দিয়ে দ্রৌপদীকে অপমান করেন। যদিও কৌরব ভ্রাতা বিকর্ণ এর প্রতিবাদ করেন। এবার দুঃশাসন দ্রৌপদীকে সর্বসমক্ষে বস্ত্রহীন করতে গেলে অসহায় দ্রৌপদী ভগবান কৃষ্ণকে স্মরণ করেন। কৃষ্ণ মায়ার প্রভাবে দ্রৌপদীর গায়ে কাপড় জড়িয়ে তাঁর সম্মান রক্ষা করেন।
তখন ধৃতরাষ্ট্র ভয়ভীত হয়ে পাণ্ডবদের সকল সম্পত্তি ফিরিয়ে দেন। স্বাভাবিকভাবেই, দুর্যোধন অসন্তুষ্ট হয় ও পুনর্বার পাশা আয়োজিত হয়। এবার পাণ্ডবরা হেরে গেলে তাঁদের জন্য ১২ বছরের বনবাস ও ১ বছরের অজ্ঞাতবাস নির্ধারিত হয়। স্থির হয়, এই সময়কালে কৌরবরা পাণ্ডবদের সমস্ত সম্পত্তি ভোগ করবে। অজ্ঞাতবাসের সময় পাণ্ডবদের নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে হবে, কিন্তু কৌরবদের দ্বারা সেই পরিচয় আবিষ্কৃত হলে পাণ্ডবদের আবার ১২ বছর বনবাস ভোগ করতে হবে।
📄 বনবাস ও অজ্ঞাতবাস
এরপর পাণ্ডবরা ১২ বছর বিভিন্ন বনে ভ্রমণ করতে থাকেন। এই সময় তাঁদের নানা বিপদের সম্মুখীন হতে হয়, তবে সমস্ত বিপদকে জয় করে পাণ্ডবরা তাঁদের বনবাসকাল সম্পূর্ণ করেন।
অজ্ঞাতবাসের সময় পাণ্ডবরা ছদ্মবেশে মৎস্যদেশে বিরাট রাজার রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করেন। যুধিষ্ঠির কঙ্ক (রাজার সভাসদ), ভীম বল্লভ (রন্ধনশালার পাচক), অর্জুন বৃহন্নলা (রাজকুমারীদের সঙ্গীত শিক্ষক), নকুল গ্রন্থিক (অশ্বশালা রক্ষক), সহদেব তন্ত্রিপাল (গাভীশালা রক্ষক) ও দ্রৌপদী সৈরিন্ধ্রী (রানির দাসী) নাম গ্রহণ করে ছদ্মবেশে বসবাস করতে থাকেন। এই সময় বিরাটের শ্যালক কীচক দ্রৌপদীকে অপমান করেন ও ভীম তাঁকে হত্যা করেন। কৌরবরা পাণ্ডবদের অবস্থান আঁচ করতে পেরে মৎস্যরাজ্যে আসেন ও যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু তাঁরা পাণ্ডবদের ঠিক সেই সময় শনাক্ত করেন, যখন অজ্ঞাতবাসের সময় পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। এরপর বিরাট তাঁর কন্যা উত্তরার সাথে অর্জুন-সুভদ্রার পুত্র অভিমন্যুর বিবাহ দেন।
এবার পাণ্ডবরা তাঁদের হারানো অধিকার ফিরে পেতে চাইলে কৌরবরা তা প্রত্যার্পণ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। ফলে পাণ্ডব ও কৌরবদের মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
📄 কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চিত্র, আঙ্কোর ভাট মন্দির, কম্বোডিয়া
কুরুরাষ্ট্রে সামন্তপঞ্চকে কুরুক্ষেত্র নামে এক পুণ্যক্ষেত্রে মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়। পাণ্ডব ও কৌরবদের উদ্যোগে সমস্ত আর্যাবতের রাজ্যসমূহ দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। কৃষ্ণ তথা দ্বারকার সাহায্য প্রার্থনায় অর্জুন ও দুর্যোধন উভয়েই একই সময়ে দ্বারকায় যান। কিন্তু কৃষ্ণের ভ্রাতা বলরাম যুদ্ধে অংশ না নিয়ে তীর্থযাত্রার সিদ্ধান্ত নেন। আর কৃষ্ণ উভয়দলের আবেদন রক্ষাহেতু অস্ত্রধারণ না করার প্রতিজ্ঞা করে পাণ্ডবদের পরামর্শদাতা রূপে নিজে পাণ্ডবপক্ষে যোগ দেন এবং কৌরবপক্ষে দ্বারকার দুর্জয়নারায়ণী সেনা দান করেন। আপাতদৃষ্টিতে এতে কৌরবপক্ষই লাভবান হলেও স্বয়ং ধর্মরক্ষক ভগবান বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণ নিজে পাণ্ডবপক্ষে থাকায় তারাই লাভবান হয়।
এদিকে কৃষ্ণ যুদ্ধ না করলেও যুদ্ধে অর্জুনের রথের সারথির ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি পাণ্ডবদের শান্তিদূত রূপে কৌরবদের কাছে পাণ্ডবদের জন্য পাঁচটি গ্রাম ভিক্ষা করেন। কিন্তু দুর্যোধন কঠোরভাবে ঐ প্রস্তাব অস্বীকার করে বলেন, “বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী”।
অর্জুনের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চিত্র, আঙ্কোর ভাট মন্দির, কম্বোডিয়া
অতঃপর যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু যুদ্ধের প্রাক্কালে নিজের আত্মীয়-স্বজনদের সাথেই সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হবে দেখে মহাবীর অর্জুন জাগতিক মোহের বশে পড়ে যুদ্ধে হতে বিরত হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্ত্রত্যাগ করেন। এমতাবস্থায় পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রিয়সখা অর্জুনকে পুনরুজ্জীবিত করবার জন্য কিছু মহান উপদেশ প্রদান করেন ও অর্জুন পুনরায় অস্ত্রধারণ করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই উপদেশগুলিই হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ 'ভগবতগীতা' হিসেবে গণ্য হয়। শ্রীকৃষ্ণ জানান, মহাযুদ্ধে অধর্মের বিনাশহেতু ভগবান নিজেই রয়েছেন, অর্জুন তার উপলক্ষ মাত্র। এরপর তিনি অর্জুনকে তাঁর দিব্য 'বিশ্বরূপ' প্রদর্শন করান।
প্রথমে যুদ্ধ পাণ্ডব ও কৌরবপক্ষে যথাক্রমে ধৃষ্টদ্যুম্ন ও ভীষ্মকে সেনাপতি পদে বরণ করা হয়। উভয়পক্ষই এই সময় যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য নীতিভঙ্গ করতে থাকে।
ভীষ্ম প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে উঠলে স্বয়ং কৃষ্ণ তাকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে 'যুদ্ধে যোগদান না করার' প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন। যুদ্ধের ১০ম দিনে অর্জুন শিখণ্ডীকে (পূর্বজন্মে অম্বা) সাথে রেখে নিরস্ত্র ভীষ্মের ওপর ক্রমাগত বাণবর্ষণ করতে থাকেন ও এই বাণ দ্বারা ভীষ্ম শরশয্যায় শায়িত হয় ও তার পতন ঘটে। কৌরব পক্ষের সেনাপতি হন অস্ত্রগুরু দ্রোণ। অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু কৌরবদের চক্রব্যূহে প্রবেশ করলেও বের হবার উপায় না জানায় একা 'সপ্তরথী'র সাথে যুদ্ধ করে নিহত হয়। এরপর কৃষ্ণের মন্ত্রণায় ভীম অশ্বত্থামা নামে একটি হাতিকে মারে ও সত্যবাদী যুধিষ্ঠির দ্রোণকে তাঁর পুত্রের মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ জানায় ("অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ।”)। শোকে দ্রোণ অস্ত্রত্যাগ করলে দ্রৌপদীর ভ্রাতা ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁকে বধ করেন। ভীম দুঃশাসনের বুক চিরে রক্তপান করেন। সেনাপতি কর্ণ সারথি হিসেবে পান মহাবীর শল্যকে। কর্ণ ও অর্জুনের প্রবল দ্বৈরথ হয়। কর্ণ-অর্জুনের যুদ্ধে কর্ণের রথের চাকা মাটিতে বসে যায় ও কর্ণ চাকা তুলতে গেলে অর্জুন তাঁকে বধ করেন। যুধিষ্ঠির শল্যকে ও সহদেব শকুনিকে বধ করেন। একে একে সবার মৃত্যু হয়। শেষে ভীম কৃষ্ণের ইঙ্গিতে অন্যায়ভাবে গদা দ্বারা দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করে তাঁকে বধ করেন। কিন্তু গভীর রাতে অশ্বত্থামা পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ করে দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র, ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতিদের হত্যা করেন। ক্রুদ্ধ পাণ্ডবেরা অশ্বত্থামার মস্তকের মণি হরণ করেন ও জরাগ্রস্ত অমর অশ্বত্থামা নিরুদ্দিষ্ট হন। এই রূপে ১৮ দিনের মহাযুদ্ধে পাণ্ডবেরা জয়ী ঘোষিত হন।
যদুবংশ ধ্বংস ও মহাপ্রস্থান
এরপর যুদ্ধে মৃতদের সৎকারের সময় আসে। শতপুত্র হারানোর শোকে গান্ধারী কৃষ্ণকে এই মহাধ্বংসের জন্য দায়ী করেন ও কৃষ্ণকে অভিশাপ দেন যে, কুরুবংশের মতই কৃষ্ণের যদুবংশও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। অবশেষে যুধিষ্ঠিরকে রাজপদে অভিষিক্ত করা হয়। শরশয্যায় শায়িত ভীষ্মও এরপর স্বর্গে গমন করেন। যুধিষ্ঠির যুদ্ধজনিত পাপখণ্ডন করার জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেন। তাঁর রাজত্বে সুখ, শান্তি, শক্তি, সমৃদ্ধি সবই ছিল। এরপর ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী, কুন্তী ও বিদুর বানপ্রস্থ গ্রহণ করে অরণ্যচারী হন ও পরে তাঁদের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু ৩৬ বছর পর গান্ধারীর অভিশাপের ফলস্বরূপ কৃষ্ণের যদুবংশের সদস্যরা প্রভাস তীর্থে মদ্যপ অবস্থায় পরস্পরের সাথে অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে মুষল যুদ্ধে প্রাণ হারান। বলরাম শেষনাগ রূপে দেহত্যাগ করেন এবং সামান্য এক ব্যাধের নিক্ষিপ্ত শরে কৃষ্ণ নির্বাণপ্রাপ্ত হন। এমনকি দ্বারকা নগরীও সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়। এসমস্ত অশুভ লক্ষণ প্রত্যক্ষ করে পাণ্ডবেরা রাজ্যত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন ও অভিমন্যুর পুত্র পরীক্ষিৎকে সিংহাসনে বসিয়ে পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী হিমালয়ের পথে গমন করেন। কুকুররূপী ধর্ম তাদের পেছনে এই যাত্রায় সঙ্গী হন। এটি 'মহাপ্রস্থান' নামে পরিচিত। কিন্তু নিজেদের জীবনের কিছু ত্রুটি থাকার দরুন যুধিষ্ঠির বাদে কেউই স্বশরীরে স্বর্গে যেতে পারেন না, পথেই তাঁদের মৃত্যু হয়। তবে দ্রোণকে মিথ্যা বলবার জন্য যুধিষ্ঠিরকেও একবার নরক দর্শন করতে হয়। এইভাবে তাঁরা সুখে-শান্তিতে স্বর্গসুখ ভোগ করতে থাকেন।
বঙ্গানুবাদ
বাংলা ভাষায় মহাভারত সর্বপ্রথম কে অনুবাদ করেন, তা বলা জটিল। তবে, বাংলাতে সর্বাধিক জনপ্রিয় ও সুপ্রচলিত যে অনুবাদটি রয়েছে, তা সপ্তদশ শতকে 'কাশীরাম দাস' নামক এক কবি 'পয়ার কাব্য ছন্দে' রচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। প্রিয় পাঠক! আপনারাই চিন্তা করেন একটি ধর্মীয় গ্রন্থ এখানে শুধু একটি পরিবারের কাহিনী মাত্র। এটা মানব সমাজের কি উপকার হবে। এটা তো আল্লাহর কালামও নয়। একজন মানুষের লেখা বই। এটা আবার ধর্মীয় গ্রন্থ হয় কীভাবে? হিন্দুধর্মের দুটো পৌরাণিক মহাকাব্যের অন্যতম হচ্ছে মহাভারত। মহাভারতের মূল বিষয় হচ্ছে একটি যুদ্ধ যা পাণ্ডুর পাঁচ পুত্র এবং তার বৈমাত্রেয় ভাই ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। একটি ব্যতিক্রম ছাড়া পুরো জাতি এ যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পাণ্ডুর পাঁচ পুত্র যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল সহদেবকে বলা হয় পাণ্ডব। এরাই হলেন মহাভারতের প্রধান চরিত্র। একদিন শিকারে গিয়ে পাণ্ডু দুটো হরিণকে যেতে দেখলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি নর হরিণটিকে তীর দিয়ে আহত করলেন। প্রকৃতপক্ষে এ হরিণ-যুগল ছিল মানুষ এবং আহত হরিণটি ছিল একজন ঋষি। আহত হওয়ার সাথে সাথে ঋষি অভিশাপ দিলেন; কোন নারীর সাথে সংগম করলে পাণ্ডু মারা যাবেন। পুত্র লাভের জন্য পাণ্ডুর দারুণ আগ্রহ ছিল। কিন্তু মৃত্যুর ভয়ে তিনি দুই স্ত্রী কুন্তী ও মাদ্রী থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চললেন। যেহেতু পুত্রসন্তান লাভ না করলে পরকালে অকল্যাণ আছে কাজেই পাণ্ডু কুন্তীকে নির্দেশ দিলেন, যে কোন পুরুষের সাথে সহবাস করে পুত্রসন্তান জন্ম দিতে। ধর্ম, বায়ু ও ইন্দ্রের সাথে সহবাস করে কুন্তী গর্ভবতী হলেন। তার গর্ভে জন্মলাভ করল- যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুন নামে তিনটি পুত্র সন্তান। পাণ্ডুর অপর স্ত্রী মাদ্রী যখন দেখলেন, তার সতীন কুন্তী তিনটি পুত্র সন্তান জন্ম দিয়েছে, তখন তার মনেও পুত্র সন্তান লাভের জন্য দারুণ আগ্রহ দেখা দিল। অশ্বদেবের সাথে সহবাস করে তিনিও গর্ভবতী হলেন এবং দুজন যমজ সন্তান- নকুল ও সহদেবকে জন্ম দিলেন। পাণ্ডুর দুই স্ত্রী যে পাঁচজন পুত্র সন্তান জন্ম দিলেন, তাদেরকে দেবতা পুত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ যাদের ঔরসে তাদের জন্ম, তারা সবাই ছিলেন দেবতা। মহাভারতের বহু স্থানে ধর্মীয় আলোচনা রয়েছে। এ কারণেই এ মহাকাব্যকে পবিত্র শাস্ত্র সমূহের অন্যতম বিবেচনা করা হয়।
হিন্দুদের ধারণা, বেদব্যাসই মহাভারত রচনা করেছিলেন কিন্তু এ ধারণা অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। পণ্ডিতদের বিশ্বাস, এত বিরাট আকারের মহাকাব্যটির পূর্ণতা লাভের জন্য কয়েক শতাব্দী সময়ের প্রয়োজন ছিল। মহাভারতের আলোচ্য অনেক বিষয়ই বৈদিক যুগের এবং অবশিষ্টাংশ ক্রমে ক্রমে মধ্যযুগ পর্যন্ত প্রায় হাজার বছরের মধ্যে সংযুক্ত হয়েছিল।
📄 শ্রীমদ্ভাগবতগীতা
শ্রীমদ্ভাগবতগীতা বা গীতা হলো হিন্দুদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ধর্মগ্রন্থ। এটা হিন্দু ধর্মের বাইবেল হিসেবে পরিচিত। শ্রীমদ্ভাগবতগীতা মহাভারতেরই অংশ। এর রচয়িতা হলেন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস।
গীতা মহাভারতেরই অংশ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের প্রতি শ্রীকৃণের উপদেশাবলী গীতাতে সংকলিত হয়েছে। মহাভারত মানব রচিত হলেও গীতা ঈশ্বরপ্রদত্ত বাণী হিসেবেই প্রদত্ত এবং গৃহীত। সমাজে হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সমাদৃত এবং গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে গীতা বিবেচিত।
গীতা গ্রন্থটির উপরে হিন্দুধর্ম বিশেষজ্ঞগণ সবচেয়ে বেশি গবেষণা করেছেন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন এবং ভাষ্য রচনা করেছেন। গীতার উপরে এবং গীতা সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা ও গবেষণা এবং গীতচর্চা শুধু ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ এবং বিদগ্ধ ব্যক্তিরাই করেছেন তা নয়। সাধারণ পাঠক এবং লেখকদের ধর্মচর্চার জন্য গীতা অবশ্য পাঠ্যগ্রন্থ। ধর্মীয় নির্দেশনা হিসেবে গীতাই ধরা হয় নির্ভুল গ্রন্থ এবং বাস্তব জীবনের দিক নির্দেশনা।
গীতার মূল বিষয় বস্তু হলো কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক মহাযোদ্ধা এবং মহাবীর অর্জুনকে প্রদত্ত উপদেশাবলী। গীতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে- হক, সত্য, ন্যায় এবং ইনসাফের জন্য প্রয়োজনবোধে নিজের আত্মীয়, বংশীয় এবং অতি আপনজনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে এবং অস্ত্র ধারণ করতে হবে। এটা শুধু সংগত নয়, বরং অবশ্য করণীয় ধর্মীয় কর্তব্য। এ দায়িত্ব পালন না করা, অবহেলা করা অথবা তা থেকে বিরত থাকা ধর্ম মতে মহাপাপ। এতে ঈশ্বরের অভিশাপে অভিশপ্ত হতে হয়। এটা গীতার একটি মহা শিক্ষা।
মহেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ বিষ্ণুর অবতার হিসেবে অর্জুনকে বলেন- সমস্ত বিষয়ে অবগত না হলেও যা সত্য, যা ন্যায়, যা ধর্মীয় মূল্যবোধ ভিত্তিক, তা করতে হবে। এর পরিণতি যাই হোক না কেন। এরূপ ক্ষেত্রে ঐশ্বরিক নির্দেশ পালন করাই মানুষের কর্তব্য। এই কর্তব্য পালন করতে হবে। ভালো-মন্দ, সঙ্গত, অসঙ্গত, ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা ও বিতর্ক ঈশ্বরের উপর ছেড়ে দিতে হবে।
অধিকাংশ হিন্দুর নিকট, হিন্দুধর্মের মূলকথা রয়েছে গীতায়। এর নৈতিকতা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের। গীতার প্রধান বাণী হলো জীবন ও আত্মার পরিত্রাণ প্রাপ্তি। এজন্য যে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা হোক না কেন- উদ্দেশ্য ঠিক থাকলে সকল পথ ও পদ্ধতি বৈধ। গীতার মর্মবাণী অনুসারে যাই করা হোক না কেন- ঈশ্বরের সন্তোষ এবং ঈশ্বর প্রাপ্তির লক্ষ্যে- তবে তা বিবেচিত হবে সঙ্গত।
নর হত্যা করা বা ব্যভিচার করা হলেও যদি তা করা হয় ঈশ্বরের সন্তোষ এবং ঈশ্বর প্রাপ্তির লক্ষ্যে- তবে তা বিবেচিত হবে সঙ্গত।
গীতার এরূপ শিক্ষণীয় বিষয়গুলো বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করা হয় বা করা যায়। যে কোন কর্মই হোক না কেন- তার পরিণতি নির্ভর করবে উদ্দেশ্য ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপর। গীতাকে একটি ধর্মতত্ত্ব ভিত্তিক উপনিষদ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
গীতার দর্শনের মধ্যে হিন্দু ধর্মের জাতিভেদ প্রথার পরিপূর্ণ সমর্থন রয়েছে। ড. বাবা সাহেব বি.আর. আম্বেদকর এর ধারণা হলো অব্রাহ্মণ এবং অস্পৃশ্য দলিতদের শোষণকে যুক্তি গ্রাহ্য করার উদ্দেশেই ব্রাহ্মণগণ গীতা রচনা করেছেন।
গীতা হলো পাণ্ডুর পুত্র অর্জুন এবং তার বন্ধু ঈশ্বরের অবতার শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে আলোচনা ও কথোপকথনের সংকলন। মহাভারতের যুদ্ধে ক্লান্ত অর্জুনের পরামর্শ দাতা, দার্শনিক ও রথচালক ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ।
টিকাঃ
-হিন্দু ধর্ম-৬৪