📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 স্রষ্টা সম্পর্কে বিশ্বাস

📄 স্রষ্টা সম্পর্কে বিশ্বাস


হিন্দুরা একজনকেই ঈশ্বর মানে, তবে তার শক্তিকে বিভিন্ন জনের কাছে ভাগ করে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য হলো ঈশ্বর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপ নিয়ে আসেন। যেমন:

সৃষ্টিকর্তাঃ ব্রহ্মা
হিন্দুধর্মের, প্রধান তিন দেবতার একজন; অন্য দুজন বিষ্ণু ও শিব। বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা 'প্রজাপতি' নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। ঋগ্বেদসহ বৈদিক সাহিত্যের অন্যান্য গ্রন্থে ব্রহ্মার উল্লেখ পাওয়া যায়। অনন্তশয্যায় শয়ান বিষ্ণুর নাভিকমল থেকে তাঁর প্রকাশ। তিনি বৈদিক যজ্ঞের অন্যতম পুরোহিত এবং সাধারণত চতুর্মুখ, চতুর্ভুজ ও হংসবাহনরূপে কল্পিত। তিনি উন্নত দেহের অধিকারী এবং তাঁর গায়ের রং রক্তাভ গৌরবর্ণ। তাঁর চার হাতে থাকে কমন্ডলু, গ্রক্, ঘৃতপাত্র বা পুস্তক এবং অক্ষমালা। বিবাহের লগ্নপত্রে, সূতিকাগৃহে, শিশুর জন্মের ষষ্ঠ দিনে এবং বাস্তপ্রতিষ্ঠার সময় ব্রহ্মাকে স্মরণ করা হয়।

কুম্ভকারের চক্রে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে ব্রহ্মার পূজা হয়। এছাড়া বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেও ব্রহ্মাপূজার আয়োজন করা হয়। পূজার স্বাভাবিক উপকরণের সঙ্গে বিশেষভাবে লাল ফুলের ব্যবস্থা থাকে। এ পূজার নির্দিষ্ট কোন তারিখ নেই এবং পূজার সময় ঢাক বাজানো হয় না। উপমহাদেশের বাইরেও চীন, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা স্থানে ব্রহ্মার ভাস্কর্য লক্ষিত হয়।

ঈশ্বরের একটি রূপ ব্রহ্ম। ব্রহ্মারূপে ঈশ্বর সৃষ্টি করেন। সৃষ্টি করা তাঁর কাজ। বিশ্বের সবকিছু তিনি সৃষ্টি করেছেন। তার হাতে জলপাত্র, স্রক (মালা) মৃতপাত্র এবং জপমালা থাকে। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সকল শুভ কাজে ব্রহ্মার উদ্দেশে পূজা দেয়া হয়। হিন্দু বিবাহের লগ্নপত্রে, সূতিকাগৃহে, শিশু জন্মের ষষ্ঠদিনে, বাস্তব প্রতিষ্ঠার সময় ব্রহ্মাকে স্মরণ করে পূজা দেয়ার রীতি ব্যাপক।

পালনকর্তা বিষ্ণু
বিষ্ণু (সংস্কৃত: বিষ্ণু) হিন্দু বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবতা। আদি শংকর প্রমুখ স্মার্ত পণ্ডিতদের মতে, বিষ্ণু ঈশ্বরের পাঁচটি প্রধান রূপের অন্যতম। আবার তৈত্তিরীয় শাখা ও ভগবতগীতা আদি শ্রুতিশাস্ত্রে তাঁকে সর্বোচ্চ ঈশ্বরের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

হিন্দুরা বিশ্বাস করে, বিষ্ণু সমগ্রনামে বিষ্ণুকে পরমাত্মা ও পরমেশ্বর বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁকে সর্ব জীব ও সর্ববস্তুতে পরিব্যাপ্ত সত্ত্বা; অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তথা অনাদি অনন্ত সময়ের প্রভু; সকল অস্তিত্বের স্রষ্টা ও ধ্বংসকারী; বিশ্বচরাচরের ধারক, পোষক ও শাসক এবং বিশ্বের সকল বস্তুর উৎস পুরুষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

পুরাণ অনুসারে, বিষ্ণুর গাত্রবর্ণ ঘন মেঘের ন্যায় নীল (ঘনশ্যাম); তিনি চতুর্ভুজ এবং শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ধারী। ভগবতগীতা গ্রন্থে বিষ্ণুর বিশ্বরূপেরও বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

পুরাণে বিষ্ণুর দশাবতারেরও বর্ণনা রয়েছে। বিষ্ণুর এই দশ প্রধান অবতারের মধ্যে নয়জনের জন্ম অতীতে হয়েছে এবং এক জনের জন্ম ভবিষ্যতে কলিযুগের শেষলগ্নে হবে বলে হিন্দুরা বিশ্বাস করেন। বিষ্ণু সহস্রনামে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার উক্তিতে বিষ্ণুকে "সহস্রকোটি যুগ ধারিনে" বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ, বিষ্ণুর অবতারগণ সকল যুগেই জন্মগ্রহণ করে থাকেন। ভগবতগীতা অনুসারে, ধর্মের পালন এবং দুষ্টের দমন ও পাপীর ত্রাণের জন্য বিষ্ণু অবতাররূপ ধারণ করেন। হিন্দুদের প্রায় সকল শাখাসম্প্রদায়ে, বিষ্ণুকে বিষ্ণু বা রাম, কৃষ্ণ প্রমুখ অবতারের রূপে পূজা করা হয়।

হিন্দুধর্মের ত্রিমূর্তি ধারণায় ব্রহ্মাকে বিশ্বচরাচরের সৃষ্টির প্রতীক, বিষ্ণুকে স্থিতির প্রতীক ও শিবকে ধ্বংসের প্রতীক রূপে কল্পনা করা হয়েছে। ভাগবত পুরাণ মতে, ত্রিমূর্তির এই তিন দেবতার মধ্যে বিষ্ণুর পূজাই সর্বাপেক্ষা অধিক ফলপ্রদ। বিষ্ণু পুরাণ অনুসারে ভগবান বিষ্ণুই সর্বোচ্চ ঈশ্বর। ভগবান বিষ্ণু থেকেই ব্রহ্মা এবং শিবের উৎপত্তি।

টিকাঃ
[সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়]
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে।

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 ধ্বংসকর্তা

📄 ধ্বংসকর্তা


শিব হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান দেবতা। ঈশ্বরের সৃজন, পালন ও সংহার এই ত্রিশক্তি যথাক্রমে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব এই তিন দেবতারূপে পরিচিত। ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন, বিষ্ণু পালন করেন আর শিব ধ্বংস করেন। এই সৃজন- পালন-সংহার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই জগৎসংসার চলমান আছে।

শিব অনার্য দেবতা, অর্থাৎ আর্যদের ভারত আগমনের পূর্বে ভারতের আদিম জনগোষ্ঠীর দেবতা ছিলেন শিব। তিনি খুব প্রভাবশালী ছিলেন, তাই আর্যসমাজে তাঁর স্থান হয়েছে। বেদে তিনি রুদ্র নামে উল্লিখিত হয়েছেন। এই রুদ্রই পরবর্তীকালে শিব বা মহাদেব নামে বহুল পরিচিতি লাভ করে।

শিবের সঙ্গে সমাজের একেবারে সাধারণ মানুষের নিবিড় সম্পর্ক দেখা যায়। তাঁর পার্ষদরা সমাজের নিম্ন শ্রেণীর প্রতিনিধি। তাঁর নিজের চলাফেরা, কাজকর্ম এমনকি পোশাক-পরিচ্ছদেও কৌলীন্যের ছাপ নেই। তাঁর পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম ও মৃগচর্মের উত্তরীয়, মাথায় জটা, গলদেশে সর্পের উপবীত এবং হাতে নানা রকম অস্ত্রশস্ত্র। বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীতে জানা যায় যে, দারিদ্র্যের কারণে তাঁকে ভিক্ষাও করতে হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় তিনি প্রাচীন ভারতের একটি পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি অল্পতেই রুষ্ট, আবার অল্পতেই তুষ্ট হন। এজন্য তাঁকে ভোলানাথও বলা হয়। তাঁর মধ্যে একটি শিশুসুলভ কোমল মন লক্ষ করা যায়। কারও দুঃখকষ্ট এবং আবেদনে তিনি অতি সহজেই সাড়া দেন। তাই তাঁর বরে বৃত্র, বাণ প্রভৃতি অসুর অত্যাচারী হয়ে উঠলে শেষে ইন্দ্র, বিষ্ণু প্রভৃতির হাতে তারা নিহত হয়। কোন কিছুর প্রতি তাঁর কোন মোহ নেই। পুরাণাদির বর্ণনায় দেখা যায় শিব একা নন; তাঁর দাম্পত্য জীবনের সঙ্গিনী হচ্ছেন সতী (পরে পার্বতী, উমা বা দূর্গা); কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতী তাঁদের পুত্রকন্যা। শিবের এই সংসার-জীবনের সঙ্গে বাঙালির সংসার-জীবনের বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বাঙালির জামাই-মেয়ে যেমন শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে যায়, তেমনি শিব- পার্বতীকেও দেখা যায় শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে যেতে। এমনটি অন্য কোন দেবতার ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

শিব জগতের কল্যাণের জন্য অনেক দুঃসাহসিক কাজ করেছেন। যেমন সমুদ্রমন্থনে উত্থিত তীব্র বিষ কণ্ঠে ধারণ করে তিনি পৃথিবীকে রক্ষা করেছেন। এতে তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে গেলে তাঁর নাম হয় নীলকণ্ঠ। ত্রিপুর নামক অসুরকে বধ করায় তাঁর নাম হয় ত্রিপুরারি। বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শিবের আরও অনেক নাম হয়। যেমন সকল দেবতার শ্রেষ্ঠ বলে তিনি মহাদেব। তাঁর প্রধান অস্ত্র ত্রিশূল, তাই তাঁর এক নাম শূলপাণি। পিনাক নামক ধনু ধারণ করেন বলে তাঁর অপর নাম হয় পিনাকী। সকল ভূত (জীব)-এর ঈশ্বর বলে তিনি ভূতনাথ বা ভূতেশ নামেও পরিচিত।

শিবের ধ্বংসকারী অস্ত্রের নাম পাশুপত। প্রলয়কালে তিনি বিষাণ ও ডমরু বাজিয়ে সব কিছু ধ্বংস করেন, তাই তাঁর অপর নাম মহাকাল। তবে ধ্বংস থেকেই আবার নতুন সৃষ্টির শুরু বলে শিবকে মঙ্গলের দেবতাও বলা হয়। তিনি একাধারে মহাযোগী, সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী ও কঠোর তপস্যাকারী। তাঁর তপস্যাস্থল হিমালয়। কৈলাস তাঁর আবাস ভূমি। ধ্বংসের সময় তিনি যে তান্ডব নৃত্য করতেন তা আধুনিক নৃত্যকলার একটি অঙ্গ। এজন্য তিনি নটরাজ নামেও খ্যাত। নৃত্যশিল্পীদের নিকট তাঁর নটরাজ মূর্তি উপাস্য দেবতার মতো। তাঁর অপর নাম আশুতোষ, যেহেতু তিনি অল্পতেই তুষ্ট হন। ভক্তিভরে শুধু একটি বিল্বপত্র দিলেই তিনি খুশি। তবে তাঁর আত্মসম্মানবোধও কম নয়। শ্বশুর দক্ষের যজ্ঞস্থলে স্বামী নিন্দায় ক্ষুব্ধ সতী দেহ ত্যাগ করলে শিব দক্ষযজ্ঞ লন্ডভন্ড করে দেন। তিনি যখন শোকোন্মত্ত অবস্থায় সতীর মৃত দেহ স্কন্ধে নিয়ে নৃত্য করছিলেন, তখন বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর মৃতদেহ খন্ড-বিখন্ড করে ফেলেন। সেই খন্ডগুলি ভারতের যে যে স্থানে পতিত হয়, সে সে স্থান ৫১টি পীঠ ও ২৬টি উপপীঠ বা তীর্থস্থানে পরিণত হয়।

শিবপুরাণ, লিঙ্গপুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থে শিব স্বয়ং ঈশ্বররূপে বন্দিত হয়েছেন। এছাড়া সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় তাঁর কাহিনী নিয়ে অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছে। বাংলা মঙ্গলকাব্যের দেবখন্ডে শিবের কাহিনী একটি আবশ্যিক বিষয়রূপে গৃহীত হয়েছে। শিবের গাজন এক সময় ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির অন্যতম প্রধান উৎসব ছিল। বর্তমানেও কোন কোন অঞ্চলে এ উৎসব পালিত হয়। হিন্দুদের ধর্ম, সংস্কৃতি এবং বিশ্বাস-ভক্তিতে আজও শিবের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়বদ্ধ। ভারতের ন্যায় বাংলাদেশেও শিবচতুদর্শী তিথিতে ভক্তগণ শিবরাত্রিব্রত উদ্যাপনসহ শিবলিঙ্গে অর্ঘ্য নিবেদন করে এবং কোথাও কোথাও এ উপলক্ষে মেলাও বসে। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে শিবের মন্দির রয়েছে。

টিকাঃ
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে।

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 পর্যালোচনা:

📄 পর্যালোচনা:


১. আপনারাই দেখলেন একজন মানুষ যিনি বিবাহ করেছেন। ছেলে মেয়ে জন্ম দিয়েছেন। শশুর বাড়ি গিয়েছেন। ইত্যাদি। এমন লোক আবার প্রভু হয় কীভাবে?
২. শিবই যদি ধ্বংসকর্তা হয় তাহলে তিনি দুনিয়াতে আসার আগে কে ধ্বংস করতো?
৩. শিবই যদি ধ্বংসকর্তা হন তাহলে তাকে কে ধ্বংস করলো? পক্ষান্তরে আল্লাহ্ হলেন এমন এক সত্তা, যিনি এক, তার কোন সন্তান নেই, তিনিও কারো সন্তান নন। রক্ষাকর্তা, ধ্বংসকর্তা সবকিছু তিনিই। আর তিনিই হলেন আল্লাহ্。

অতএব আমরা হিন্দু ভাইদেরকে দাওয়াত দিব যে, শিবের এই ক্ষমতা, আল্লাহ্র পরিচয় দিয়ে তাদেরকে দাওয়াত দিব।

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 শ্রীকৃষ্ণ

📄 শ্রীকৃষ্ণ


কৃষ্ণ (সংস্কৃত: কৃষ্ণ) হলেন হিন্দু ধর্মানুসারীদের আরাধ্য বিশিষ্ট একজন দেবতা। তিনি বিষ্ণুর অষ্টম অবতার রূপে খ্যাত। কখনো কখনো তাঁকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর ('পরম সত্ত্বা') অভিধায় ভূষিত করা হয় এবং হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবতগীতার প্রবর্তক হিসাবে মান্য করা হয়। হিন্দু বর্ষপঞ্জী অনুসারে প্রতিবছর ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী (জন্মাষ্টমী) তিথিতে তাঁর জন্মোৎসব পালন করা হয়。

বিভিন্ন হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, তিনি ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দানকারী একজন প্রাচীন ভারতীয় রাজপুত্র ও রাজা। খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীর পূর্বযুগে প্রচলিত কৃষ্ণধর্ম প্রাচীন বৈদিক ধর্মজ হয়েও খ্রিস্টীয় যুগের শুরু থেকেই ভক্তিবাদের মায়াবী চেতনায় "ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারী" হয়ে উঠেছেন উপাস্য অবতার। এই ধর্মের, বিভিন্ন সম্প্রদায় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষ্ণের পূজা করে থাকে। যদিও বেদ কিংবা উপনিষদে কৃষ্ণ নামের উল্লেখ পাওয়া যায় না। একাধিক বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে তাঁকে বিষ্ণুর অবতার রূপে গণ্য করা হয়; অন্যদিকে কৃষ্ণধর্মে অন্যান্য সম্প্রদায়গুলিতে তাঁকে স্বয়ং ভগবান মর্যাদা দেওয়া হয়। কিন্তু এই কৃষ্ণধর্মের অনুসারীগণ সনাতন হিন্দু শাস্ত্রের মূল বেদ তথা উপনিষদ থেকে অনেকটাই ভিন্নপন্থী。

কৃষ্ণ শব্দের অর্থ কালো বা ঘন নীল। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রে, অনেকেই কৃষ্ণ শব্দটি সর্বাকর্ষক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে করেন। ভাগবত পুরাণে কৃষ্ণকে প্রায়শই বংশী-বাদনরত এক কিশোরের রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার ভগবতগীতায়, তিনি এক পথপ্রদর্শক এবং সহায়ক তরুণ রাজপুত্র। সমগ্র মহাভারত কাব্যে, তিনি একজন কূটনীতিজ্ঞ হিসাবে পাণ্ডবপক্ষে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের রথের সারথিরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন। হিন্দু দর্শন ও ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে কৃষ্ণ-সংক্রান্ত উপাখ্যানগুলি বহুধা পরিব্যাপ্ত। তাঁকে কল্পনা করা হয়ে থাকে বিভিন্ন রূপে: কখনো শিশুদেবতা, কখনো রঙ্গকৌতুকপ্রিয়, কখনো আদর্শ প্রেমিক, কখনো দিব্য নায়ক, আবার কখনো বা সর্বোচ্চ ঈশ্বর। কৃষ্ণ-সংক্রান্ত উপাখ্যানগুলি মূলত লিখিত আছে মহাভারত, হরিবংশ, ভাগবত পুরাণ ও বিষ্ণু পুরাণ গ্রন্থে。

চতুর্থ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকেই বাসুদেব, কৃষ্ণ ও গোপাল প্রভৃতি কৃষ্ণের নানা রূপের পূজাকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীতেই দক্ষিণ ভারতে কৃষ্ণভক্তি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। উত্তর ভারতে কৃষ্ণধর্ম সম্প্রদায়গুলি সুপ্রতিষ্ঠিত হয় মোটামুটি একাদশ শতাব্দী নাগাদ। দশম শতাব্দী থেকেই ভক্তি আন্দোলনের ক্রমবিস্তারের ফলে কৃষ্ণ শিল্পকলার এক মূখ বিষয় হয়ে ওঠেন। উড়িষ্যায় জগন্নাথ, মহারাষ্ট্রে বিঠোবা, রাজস্থানে শ্রীনাথজি প্রভৃতি কৃষ্ণের রূপগুলিকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক ভক্তিসংস্কৃতিও বিকাশলাভ করে।

হিন্দুধর্মে ব্যাপকভাবে পূজিত দেবতাদের অন্যতম হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ। বিষ্ণুর অষ্টম অবতাররূপে পৃথিবীতে তাঁর আগমন এবং আপন মহিমায় তিনি শ্রেষ্ঠতম। বৈদিক সাহিত্য ও ঋগবেদে কৃষ্ণের বহুল উল্লেখ রয়েছে ইন্দ্রবিরোধী এক অনার্য যোদ্ধারূপে। জন্মসূত্রে ছিলেন অনার্য, পরে আর্য সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং তাঁকে একত্র করেই বৈষ্ণব ধারার প্রবর্তন হয়। শ্রীকৃষ্ণ একজন আদর্শ চরিত্রের ঐতিহাসিক পুরুষ। ধর্মপ্রবক্তা ও সংস্কারকরূপে হিন্দুধর্মে ভীষণরূপে শ্রদ্ধেয়। হরি বংশ পুরাণ ও শ্রীমদ্ভগবতগীতায় বিশেষত ভগবদগিতার দশম ও একাদশ খণ্ডে শ্রীকৃষ্ণের সমগ্র জীবন বর্ণিত হয়েছে। মথুরায় তখন এক অত্যাচারী রাজা ছিল। তার নাম ছিল কংশ। কংশ শ্রীকৃষ্ণের মাতুল হলেও ভবিষ্যৎ গণনায় জানতে পেরে ছিল যে কৃষ্ণের মৃত্যু হবে। আর এ জন্যই রাজা কংশ ভগ্নি ও ভগ্নিপতি দেবকী ও বাসুদেবকে কারাগারে নিক্ষেপ করে এবং নিজের হাতে বোনের সন্তানদের হত্যা করে। কৃষ্ণকে যমুনা নদীর অপর পারে গোকুলায় পাচার করে দেয় কোন এক হৃদয়বান ব্যক্তি। গোকুলায় কৃষ্ণ নন্দ ও তদীয় স্ত্রী যশোদার গৃহস্থ ঘরে বড় হতে থাকে। রাখাল যুবকরূপে কৃষ্ণ গোকুলে থেকে বাঁশিতে মধুর সুর সৃষ্টি করে গোপকন্যা ও গোপস্ত্রীদের ঘর থেকে বেরিয়ে তার বাঁশির সৃষ্ট সুরের তালে নৃত্য করতে উদ্বুদ্ধ করতেন। গোপী নারীদের সঙ্গে শ্রীকৃণের এই সময়ে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় বিশেষ করে গোপ কন্যা ও গোপস্ত্রী রাধার সঙ্গে সেটাই ভারতীয় বেদান্ত দর্শনের জীবাত্মা পরমাত্মা সম্পর্ক, মূল তন্ত্র।

ফন্ট সাইজ
15px
17px