📄 হিন্দুদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রুপ
হিন্দু বলে যারা নিজেদেরকে পরিচয় দেয় তারা বহু ভাগে বিভক্ত। তাদের আকিদা বিশ্বাসও ভিন্ন, নিম্নে কয়েকটি গ্রুপের নাম ও আকীদাসহ সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো। যেমন-
১. ব্রাহ্ম কুমারী
তারা শিব লিঙ্গের পূজা করে না, বেদকে মানে না। তাদের প্রধান ধর্মনেতা হয় মহিলা। তাকে বেহেন্জী বলে সম্বোধন করা হয়। তাদের মধ্যে একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ হলে প্রথমে (সালাম) দেয়, ডান হাতের আঙুলের মাথাগুলি গুটিয়ে নতশীরে বলে 'ওঁম শান্তি' অর্থাৎ আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। প্রতি উত্তরেও ওঁম শান্তি বলা হয়। তারা নিজেদের ধর্মের প্রচার করে। যা সনাতন বা অন্য কেউ করে না। তাদের ধর্ম গ্রহণ করলে চিরকুমার বা চিরকুমারী থাকতে হয়। বিবাহিত হলে বিবাহ বন্ধন ছেদ করতে হয়। তাদের মূল উপাসনা হলো ধ্যান (মুরাকাবা)। এই গ্রুপটির অস্তিত্ব বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। ইন্ডিয়াতে তাদের ভালো প্রচলন আছে। তাদের প্রধান কার্যালয় হলো উত্তর প্রদেশের রামপুরা এস্টেটে।
একটি মজার ঘটনা
২০০৩ ইং সনে রামপুরা ইউ,পি, ইন্ডিয়ায় ড. আব্দুল্লাহ তারেক সাহেবের কাছে বিভিন্ন ধর্মের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য হযরত মাওলানা কালীম সিদ্দিকী দা.বা.-এর নির্দেশে ফুলাত মাদরাসার ছাত্রদের সাথে আমরা দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দু'জন বাংলাদেশি সাথী অংশগ্রহণ করি। সেখানে বিভিন্ন ধর্মের প্রশিক্ষণের সাথে তাদের মন্দিরে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলার সুযোগ থাকতো। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের যাওয়া হয় ব্রাহ্মকুমারী গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে, তার নাম হলো “প্রজাপতি ব্রাহ্মকুমারী বিশ্ববিদ্যালয়”। তারা আমাদেরকে লাল গালিচা বিছিয়ে রাস্তা থেকে তাদের উপাসনালয় পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। আমরা সুন্দর ভাবে শৃঙ্খলার সাথে বসে গেলাম। এবার তাদের ধর্ম সম্পর্কে তাদের মুখ থেকে বিভিন্ন আলোচনা শুনলাম। তাদের আচার-আচরণ দেখে মনে হলো তারা মুসলমানদের পূর্ণ আখলাক গ্রহণ করেছে। যদি আমরা মুসলমানরা, আমাদের মূল আখলাকের সাথে মেহনত করতাম, তাহলে অমুসলিম বিশ্বের চিত্র পাল্টে যেতো। যাহোক মূলকথায় ফিরে আসি।
তাদের একটি বিশ্বাস হলো কেয়ামত সংঘটিত হবে না। কারণ মানুষ মৃত্যুবরণ করে পুনরায় জন্মগ্রহণ করে, যুগ পরিবর্তন হয়। তাদের যুগ চারটি, যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। অধম গ্রন্থকার বেহেন্জীকে প্রশ্ন করলাম যে, বেহেন্জী ! মনে করুন দুনিয়ার সকল মানুষ আপনাদের ধর্ম গ্রহণ করল, তাহলে তো সকলকে কুমার বা কুমারী হতে হবে। ফলে জন্মের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে যাবে। এক সময় দেখা যাবে, দুনিয়ায় কোন মানুষই থাকবে না। তাহলে তো মানুষের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে। অথচ, আপনাদের বর্ণনা অনুযায়ী কলি যুগের পর আবার সত্যযুগ আসবে, যা অসম্ভব। আপনাদের বিশ্বাস ও বাস্তবতার মধ্যে স্ববিরোধ, এর উত্তর কী? তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলেন যে, “ইয়েহ মুমকিন নেহী কেহ সারে সনসারকে আদমী হামারে ধরম কবুল কারেঙ্গে।” এটা অসম্ভব যে, দুনিয়ার সকল মানুষ আমাদের ধর্ম গ্রহণ করবে। তো দুনিয়ার সকল মানুষ আমাদের ধর্মগ্রহণ করবেও না দুনিয়াও চিরকাল থাকবে। কেয়ামতও আসবে না। এই হলো তাদের ধর্মের অবস্থা। আমরা যদি তাদের দাওয়াত দিতে পারি তাহলে আশা করি তারা দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করবে।
📄 হিন্দুধর্মের আকীদা-বিশ্বাস
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 সৃষ্টি সম্পর্কে বিশ্বাস
শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণের প্রথম স্কন্ধের তৃতীয় অধ্যায়-এ উল্লেখ আছে। "সৃষ্টির প্রথমে ভগবান লোকসমূহ নির্মাণের ইচ্ছা করলেন। ইচ্ছা হওয়ামাত্রই তিনি মহৎ-তন্ত্রবাদিসম্পন্ন পুরুষরূপ গ্রহণ করলেন। তার মধ্যে দশ ইন্দ্রিয়, মন আর পঞ্চভূত- এই ষোলটি করা ছিল।।১।।
তিনি যখন কারনার্ণবে শায়িত হয়ে যোগনিদ্রায় নিদ্রিত ছিলেন, তখন তাঁর নাভিহ্রদ থেকে এক পদ্মের সৃষ্টি হলো, এবং সেই কমল থেকে প্রজাপতিগণের অধিপতি ব্রহ্মা উৎপন্ন হলেন।।২।।
ভগবানের সেই বিরাটরূপের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমূহের মধ্যেই সমস্ত লোকের কল্পনা করা হয়েছে, তাঁর সেই রূপ বিশুদ্ধ ও নিরতিশয় সত্তবময় শ্রেষ্ঠ রূপ।।৩।।
যোগীগণ দিব্যদৃষ্টি দিয়ে ভগবানের সেই রূপ দর্শন করেন। ভগবানের সেই রূপে অসংখ্য পদ, উরু, হস্ত ও মুখ থাকায় তা অতিশয় আশ্চর্যজনক, তার মধ্যে অসংখ্য মস্তক, অসংখ্য কর্ণ, অসংখ্য চক্ষু ও অসংখ্য নাসিকা রয়েছে এবং সেই রূপ অসংখ্য মুকুট, বস্ত্র ও কুণ্ডলাদি অলংকারে শোভিত।।৪।।
ভগবানের সেই পুরুষরূপ, যাকে নারায়ণ বলা হয়, অনেক অবতারের অক্ষ বীজস্বরূপ-এখান থেকেই সকল অবতারের প্রকাশ। এই রূপের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ দ্বারা দেবতা, পশুপক্ষী ও মনুষ্যাদি দেহের সৃষ্টি হয়।।৫।। ইত্যাদি।
টিকাঃ
--শ্রীমদ্ভাগবত মহাপূরাণ ১/৩/১-৫
📄 স্রষ্টা সম্পর্কে বিশ্বাস
হিন্দুরা একজনকেই ঈশ্বর মানে, তবে তার শক্তিকে বিভিন্ন জনের কাছে ভাগ করে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য হলো ঈশ্বর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপ নিয়ে আসেন। যেমন:
সৃষ্টিকর্তাঃ ব্রহ্মা
হিন্দুধর্মের, প্রধান তিন দেবতার একজন; অন্য দুজন বিষ্ণু ও শিব। বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা 'প্রজাপতি' নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। ঋগ্বেদসহ বৈদিক সাহিত্যের অন্যান্য গ্রন্থে ব্রহ্মার উল্লেখ পাওয়া যায়। অনন্তশয্যায় শয়ান বিষ্ণুর নাভিকমল থেকে তাঁর প্রকাশ। তিনি বৈদিক যজ্ঞের অন্যতম পুরোহিত এবং সাধারণত চতুর্মুখ, চতুর্ভুজ ও হংসবাহনরূপে কল্পিত। তিনি উন্নত দেহের অধিকারী এবং তাঁর গায়ের রং রক্তাভ গৌরবর্ণ। তাঁর চার হাতে থাকে কমন্ডলু, গ্রক্, ঘৃতপাত্র বা পুস্তক এবং অক্ষমালা। বিবাহের লগ্নপত্রে, সূতিকাগৃহে, শিশুর জন্মের ষষ্ঠ দিনে এবং বাস্তপ্রতিষ্ঠার সময় ব্রহ্মাকে স্মরণ করা হয়।
কুম্ভকারের চক্রে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে ব্রহ্মার পূজা হয়। এছাড়া বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেও ব্রহ্মাপূজার আয়োজন করা হয়। পূজার স্বাভাবিক উপকরণের সঙ্গে বিশেষভাবে লাল ফুলের ব্যবস্থা থাকে। এ পূজার নির্দিষ্ট কোন তারিখ নেই এবং পূজার সময় ঢাক বাজানো হয় না। উপমহাদেশের বাইরেও চীন, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা স্থানে ব্রহ্মার ভাস্কর্য লক্ষিত হয়।
ঈশ্বরের একটি রূপ ব্রহ্ম। ব্রহ্মারূপে ঈশ্বর সৃষ্টি করেন। সৃষ্টি করা তাঁর কাজ। বিশ্বের সবকিছু তিনি সৃষ্টি করেছেন। তার হাতে জলপাত্র, স্রক (মালা) মৃতপাত্র এবং জপমালা থাকে। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সকল শুভ কাজে ব্রহ্মার উদ্দেশে পূজা দেয়া হয়। হিন্দু বিবাহের লগ্নপত্রে, সূতিকাগৃহে, শিশু জন্মের ষষ্ঠদিনে, বাস্তব প্রতিষ্ঠার সময় ব্রহ্মাকে স্মরণ করে পূজা দেয়ার রীতি ব্যাপক।
পালনকর্তা বিষ্ণু
বিষ্ণু (সংস্কৃত: বিষ্ণু) হিন্দু বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবতা। আদি শংকর প্রমুখ স্মার্ত পণ্ডিতদের মতে, বিষ্ণু ঈশ্বরের পাঁচটি প্রধান রূপের অন্যতম। আবার তৈত্তিরীয় শাখা ও ভগবতগীতা আদি শ্রুতিশাস্ত্রে তাঁকে সর্বোচ্চ ঈশ্বরের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
হিন্দুরা বিশ্বাস করে, বিষ্ণু সমগ্রনামে বিষ্ণুকে পরমাত্মা ও পরমেশ্বর বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁকে সর্ব জীব ও সর্ববস্তুতে পরিব্যাপ্ত সত্ত্বা; অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তথা অনাদি অনন্ত সময়ের প্রভু; সকল অস্তিত্বের স্রষ্টা ও ধ্বংসকারী; বিশ্বচরাচরের ধারক, পোষক ও শাসক এবং বিশ্বের সকল বস্তুর উৎস পুরুষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
পুরাণ অনুসারে, বিষ্ণুর গাত্রবর্ণ ঘন মেঘের ন্যায় নীল (ঘনশ্যাম); তিনি চতুর্ভুজ এবং শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ধারী। ভগবতগীতা গ্রন্থে বিষ্ণুর বিশ্বরূপেরও বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
পুরাণে বিষ্ণুর দশাবতারেরও বর্ণনা রয়েছে। বিষ্ণুর এই দশ প্রধান অবতারের মধ্যে নয়জনের জন্ম অতীতে হয়েছে এবং এক জনের জন্ম ভবিষ্যতে কলিযুগের শেষলগ্নে হবে বলে হিন্দুরা বিশ্বাস করেন। বিষ্ণু সহস্রনামে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার উক্তিতে বিষ্ণুকে "সহস্রকোটি যুগ ধারিনে" বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ, বিষ্ণুর অবতারগণ সকল যুগেই জন্মগ্রহণ করে থাকেন। ভগবতগীতা অনুসারে, ধর্মের পালন এবং দুষ্টের দমন ও পাপীর ত্রাণের জন্য বিষ্ণু অবতাররূপ ধারণ করেন। হিন্দুদের প্রায় সকল শাখাসম্প্রদায়ে, বিষ্ণুকে বিষ্ণু বা রাম, কৃষ্ণ প্রমুখ অবতারের রূপে পূজা করা হয়।
হিন্দুধর্মের ত্রিমূর্তি ধারণায় ব্রহ্মাকে বিশ্বচরাচরের সৃষ্টির প্রতীক, বিষ্ণুকে স্থিতির প্রতীক ও শিবকে ধ্বংসের প্রতীক রূপে কল্পনা করা হয়েছে। ভাগবত পুরাণ মতে, ত্রিমূর্তির এই তিন দেবতার মধ্যে বিষ্ণুর পূজাই সর্বাপেক্ষা অধিক ফলপ্রদ। বিষ্ণু পুরাণ অনুসারে ভগবান বিষ্ণুই সর্বোচ্চ ঈশ্বর। ভগবান বিষ্ণু থেকেই ব্রহ্মা এবং শিবের উৎপত্তি।
টিকাঃ
[সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়]
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে।