📄 শূদ্রের নীচতা
শূদ্র (দাস) সম্প্রদায়ের স্থান সমাজের সর্ব নীচের ধাপে। কারণ তাদের জন্ম স্রষ্টার পা থেকে। স্রষ্টা তার জন্য মাত্র একটি কাজ নির্দিষ্ট করেছেন আর তা হলো অন্য ত্রিবর্ণের লোকদের, অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের সেবা করা। অন্যান্য বর্ণের লোকেরা যেসব পথে স্বর্গে যেতে পারে শূদ্রের জন্য তা খোলা নেই। তার জন্য স্বর্গলাভ করার একমাত্র পথ দেবজ্ঞ ব্রাহ্মণ, গৃহস্থ ও কীর্তিমান ব্রাহ্মণদের সেবা করা।
জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই শূদ্রকে ছোট করে দেখার নির্দেশ শাস্ত্রে রয়েছে। ব্রাহ্মণদের জন্য শুভসূচক নামকরণের কথা বলা হয়েছে, অথচ শূদ্রের জন্য বলা হয়েছে নিন্দাবাচক নাম ও দাসবাচক উপনাম রাখতে।
বিবাহের যে বিধান হিন্দুশাস্ত্রে রয়েছে, শূদ্রের জন্য তা-ও বৈষম্যমূলক। পূর্বে উল্লিখিত আট ধরনের বিবাহের মধ্যে যেসব পদ্ধতি ব্রাহ্মণদের জন্য অশুভ বলা হয়েছে, শূদ্রের জন্য সেগুলোই করণীয় হিসেবে নির্দেশ রয়েছে। উচ্চবর্ণের পুরুষ নিম্নবর্ণের কন্যা বিবাহ করতে পারে, কিন্তু তার উল্টোটা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ।
হিন্দুশাস্ত্রে যে বিচারব্যবস্থা রয়েছে শূদ্রের জন্য তা কেবল বৈষম্যমূলক নয়, নিপীড়নমূলকও। শূদ্র যে অপরাধই করুক না কেন, তার সাজা সব সময়ই চরম। সে কোন ব্রাহ্মণকে চোর বলে গালি দিলে তার শান্তি মৃত্যুদণ্ড। আবার ব্রাহ্মণ যদি শূদ্রকে একই গালি দেয় তবে তার দণ্ড মাত্র বারো পণ। তার মানে, যে অপরাধের জন্য একপক্ষের শান্তি মৃত্যুদণ্ড, সেই একই অপরাধ করলে অপর পক্ষের জরিমানা করা হবে মাত্র বারো পণ। যদি কোন শূদ্র পাপবাচক শব্দ উচ্চারণ করে কর্কশভাবে কোন দ্বিজকে গালি দেয়, তবে তার জিহ্বা কেটে ফেলতে হবে। যদি সে নাম বা জাতি উল্লেখ করে দ্বিজকে গালি দেয়, তবে তার মুখের মধ্যে দশ আঙ্গুল লম্বা জ্বলন্ত লৌহশলাকা ঢুকিয়ে দিতে হবে।
কোন শূদ্র যদি ব্রাহ্মণকে ধর্মোপদেশ দেয় তবে তার মুখে ও কানে উত্তপ্ত তেল ঢেলে দিতে হবে। একটু সাহস করে যদি সে ব্রাহ্মণের সঙ্গে একই আসনে বসতে চায় তবে উত্তপ্ত লৌহশলাকা দ্বারা কটিদেশ পুড়িয়ে দিয়ে তাকে নির্বাসন দেয়া হবে। যদি সে ব্রাহ্মণের ধন অপহরণ করে বা তাকে শারীরিকভাবে কষ্ট দেয় তবে নাক-কান কেটে তাকে কষ্টদায়কভাবে হত্যা করতে হবে। নিম্নবর্ণের কোন লোক যদি উচ্চবর্ণের কোন নারীকে ধর্ষণ করে তবে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে কোন ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য শূদ্রকন্যাকে ধর্ষণ করলে তার দণ্ড হবে মাত্র সহস্রপণ আর ব্রাহ্মণের বেলায় তা হবে মাত্র পাঁচশ পণ। এভাবে জাতগত পার্থক্যের কারণে একই অপরাধের শাস্তিও ভিন্ন হয়। শূদ্রকে কোন অবস্থায়ই ধর্মীয় উপদেশ দেয়া যাবে না। এমন অপরাধ যে করবে, সে অসংবৃত নামক নরকে নিক্ষিপ্ত হবে।
প্রায়শ্চিত্তের বেলায় শূদ্রকে বিড়াল কুকুর, নেউল, কাক, পেঁচা, ব্যাঙ প্রভৃতির সমতুল্য করা হয়েছে। উচ্চবর্ণের কোন লোক এসব ইতর প্রাণীকে বধ করলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়, শূদ্র হত্যার বেলায়ও তা করার বিধান রয়েছে।
শূদ্র যেহেতু অপবিত্র, কাজেই সে ব্রাহ্মণদের থেকে দূরে থাকে। সে প্রতিমাসে একবার চুল কাটাবে, যাতে সহজেই তাকে চিনা যায়। এর কারণ, ব্রাহ্মণরা যাতে সবসময় নিজেদের পবিত্রতা রক্ষার জন্য তার থেকে দূরে থাকতে পারে, তা নিশ্চিত করা। মৃত্যুর পরও শূদ্রের শূদ্রত্ব বহাল থাকবে। ব্রাহ্মণের মৃতদেহকে নগরের পশ্চিম দ্বার দিয়ে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় কিন্তু শূদ্রকে নিতে হয় দক্ষিণ দ্বার দিয়ে।
দেখা যাক, মনু শূদ্রদের সম্পর্কে কী বলে? ১. শূদ্রদের বা দাসদের নিজস্ব কোন সম্পত্তি রাখার অধিকার নেই। ২. দাস ও শূদ্রদের ধর্ম ব্রাহ্মণ অবাধে নিজের কাজে প্রয়োগ করবে। ৩. শূদ্র অর্থসঞ্চয় করতে পারবে না। কারণ তার সম্পদ থাকলে সে গর্বভরে ব্রাহ্মণের উপর অত্যাচার করতে পারে। ৪. প্রভুর উচ্ছিষ্ট তা ভক্ষ্য। ৫. দাস বৃত্তি থেকে শূদ্রের কোন মুক্তি নেই। ৬. যজ্ঞের কোন দ্রব্য শূদ্র পাবে না। ৭. যে পথে উচ্চ বর্ণের লোকেরা যাতায়াত করে সে পথে মৃত শূদ্রদেরও বহন করা যাবে না।
টিকাঃ
০ মনুসংহিতা, ১ম অধ্যায় ৩১নং সিন্ধু থেকে হিন্দু-১১২
📄 দলিতদের অস্পৃশ্যতা
উপরে উল্লিখিত চারটি জাত ছাড়াও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে আরেকটি জাত। এরা অচ্ছুৎ বা অস্পৃশ্য সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। এরা হলেন হিন্দু বর্ণবাদের সবচেয়ে নির্মম শিকার। কারণ সামাজিকভাবে তারা শূদ্রের চেয়ে অধম ও নিকৃষ্ট। হিন্দু মূলধারা থেকে তারা এত বিচ্ছিন্ন যে, জনসাধারণের ব্যবহার্য কুয়া ও পুকুর থেকে পানি নেয়া, সাধারণ পথে চলাফেরা করা বা সর্বজন ব্যবহার্য পার্কে বসা বা রেস্টুরেন্টে পানাহার করা, চতুবর্ণের লোকদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা, এসব অধিকার তাদের নেই। এদের স্থানও গ্রামের বাইরে। এদের সম্পদ বলতে থাকবে গাধা ও কুকুর। এরা পরিধান করবে মৃতব্যক্তির দেহ থেকে ফেলে দেয়া বস্ত্র আর আহার করবে ভাঙা বাসনে। লোহার অলংকার পরে এরা নানা স্থানে ঘুরে ঘুরে জীবন কাটাবে।
হিন্দু সমাজে অচ্ছুৎ (?) বা দলিত সম্প্রদায়ের লোককে এত বেশি অপবিত্র মনে করা হয় যে, এদের স্পর্শ, এমনকি ছায়াও অন্যান্য জাতের লোককে ধর্মচ্যুত করে দেয়। এজন্য হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে কড়া নির্দেশ রয়েছে অচ্ছুৎ দলিতগণ বর্ণহিন্দুদের থেকে দূরে থাকবে। তাদের আর্থিক লেনদেন এবং বিবাহ হবে নিজেদের মধ্যে। রাতের বেলা তারা গ্রামে বা নগরে প্রবেশ করতে পারবে না, দিনের বেলায় তারা কাজের জন্য গ্রামে বা নগরে ঢুকতে পারবে, তবে এ সময় তারা বিশেষ চিহ্ন ধারণ করবে যাতে দূর থেকে দেখলেই তাদেরকে চেনা যায়। ভারতের মোট লোক সংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হচ্ছে দলিত, যারা বর্ণ হিন্দুদের দৃষ্টিতে অস্পৃশ্য হাজারো বছর থেকে তারা রয়েছেন মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। মূর্খ হওয়ার কারণে তাদেরকে ঘৃণা করা হয়, অথচ একই সময় তাদের জন্য শিক্ষার দ্বার বন্ধ রাখা হয়। নিজেদের জীবিকা নির্বাহের পথ বেছে নেয়া বা সর্বসাধারণের সুযোগ সুবিধা ভোগ করার অধিকার তাদের নেই। মুচী, ঝাড়ুদার, চণ্ডাল প্রভৃতি পেশার লোকই এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এদের কাজের মধ্যে আরো রয়েছে লাওয়ারিশ মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া, দণ্ডিত লোকদের হত্যা করে বিনিময়ে মৃত ব্যক্তিটির বস্ত্র, শয্যা ও অলংকার নেয়া, মৃত পশুর চামড়া খোসানো ইত্যাদি।
বৃটিশ সরকার অচ্ছুৎ বা অস্পৃশ্য হিসেবে পরিচিত এ জনগোষ্ঠীর নাম দিয়েছিল তফসিলি সম্প্রদায়। গান্ধী তাদের নাম দিয়েছিলেন 'হরিজন'। হরিজন মানে 'ঈশ্বরের সন্তান' হলেও শব্দটি জারজ সন্তান অর্থে ব্যবহৃত হয়। কারণ, হিন্দু মন্দিরে দেবদাসী নামক যেসব মহিলা বেশ্যাবৃত্তির কাজে নিয়োজিত থাকত, তাদের সন্তাদেরও বলা হতো হরিজন। তাই গান্ধীর দেয়া হরিজন নামটি বর্জন করে তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের জন্য নাম রেখেছে দলিত। দলিত মানে নিপীড়িত।
টিকাঃ
০ সিন্ধু থেকে হিন্দু-১১১-১১২