📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 বৈশ্য

📄 বৈশ্য


বৈশ্যগণ হলেন ব্যবসায়ী শ্রেণী, কৃষি-ব্যবসা দ্বারা সমাজের ধন-সম্পদের উৎপাদক ও পালক। তাদের কাজ হলো দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, কল- কারখানা ইত্যাদির মালিক হওয়া এবং পরিচালনা করা। এরা ছিল তারা দ্রাবিড়দের মধ্যে যারা আর্যদের সমর্থন করেছিল। হিন্দুধর্মের বিশ্বাস হলো- ব্রহ্মার উরু থেকে বৈশ্য এর সৃষ্টি।

টিকাঃ
০-সিন্ধু থেকে হিন্দু-১১১

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 শূদ্র

📄 শূদ্র


শূদ্রগণ হলেন সেবক শ্রেণী; পরিশ্রমের দ্বারা সমাজের সেবক ও পোষক। তাদের কাজ হলো উপরিউক্ত তিনশ্রেণীর সেবা করা, তাদের চাকরগিরী করা। এরা ছিল হিন্দুস্তানে দ্রাবিড়দের মধ্যে যারা আর্যদের বিরোধিতা করেছিল। এরা সবচেয়ে নিম্ন শ্রেণীর মানুষ। ক্ষত্রিয়গণের যদি তাদের ছায়ায় পা পড়ে যায় বা তাদের স্পর্শ লাগে তাহলে তারা নাপাক হয়ে যায়। কোন পূজা-অর্চনা করা বা কোন অনুষ্ঠানে বা মন্দিরে যাবার তাদের কোন অধিকার নেই। তারা সবচেয়ে নির্যাতিত ও নিপিড়ীত। এদের দায়িত্ব বেশি, অধিকার কম। হিন্দুধর্মের বিশ্বাস- শূদ্রের সৃষ্টি হলো ব্রহ্মার পা থেকে। তাই তারা পায়ের জাত, নিচু জাত।

টিকাঃ
০-সিন্ধু থেকে হিন্দু-১১১

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব

📄 ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব


হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণের স্থান কেবল অন্যান্য জাতের ওপরেই নয়, বরং ব্রহ্মার মুখ থেকে সৃষ্ট হওয়ার কারণে সে সৃষ্টির প্রভু। সে বেদ ধারণ করবে। কারণ ধর্মের জন্যই তার জন্ম। পৃথিবীর যা কিছু সম্পদ, সবই ব্রাহ্মণের সম্পত্তি। নিজের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য সবকিছু সে একাই পাওয়ার যোগ্য। সে যা খায়, যা পরিধান করে, সবই তার নিজের। কারণ, সবকিছুতেই তার একচ্ছত্র অধিকার। অন্যেরা যা ভোগ করে, তার মূলে রয়েছে ব্রাহ্মণের দয়া। ব্রাহ্মণেরা অধিকার দিয়েছে বলেই তারা সেটুকু ভোগ করতে পারছে।

ব্রাহ্মণ মূর্খ হলেও তাতে অসুবিধার কোন কারণ নেই। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, অগ্নি দেখা যাক বা না যাক, তা মহাদেবতা। তেমনি ব্রাহ্মণ বিদ্যান হোক বা না হোক, সে সব সময় মহাদেবতা। শ্মশানের অগ্নি যেমন দূষিত হয় না, তেমনি সমুদয় কুৎসিত কাজে লিপ্ত থাকলেও ব্রাহ্মণ সদা পূজনীয়, সব মানুষের পরমদেবতা। কেবল জন্মের দাবিতেই ব্রাহ্মণের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। জন্মের দ্বারাই সে দেবতাদের দেবতা। তার উপদেশই লোকের কাছে প্রমাণ্য। কারণ, তা হলো দেবভিত্তিক।

অধ্যয়ন (বেদের চর্চা)। অধ্যাপন (বেদজ্ঞান দান করা), যাজন (পৌরহিত্য) এবং প্রতিগ্রহ (দান গ্রহণ) এ সবের অধিকার কেবল ব্রাহ্মণের। বেদ পাঠ করার অধিকার অন্য দুই বর্ণের দ্বিজদের আছে, তবে বিদ্যাদানের অধিকার তাদের নেই। শূদ্রের জ্ঞান লাভের কোন অধিকার নেই। কোন ব্রাহ্মণ তাকে বেদের জ্ঞান দান করলে সে ব্রাহ্মণ এক বছর যাবহারী হয়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবে।

জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের কারণে ব্রাহ্মণকে বিবাহের বেলায়ও কিছুটা বাড়তি সুবিধা দেয়া হয়েছে। হিন্দু সমাজে বিবাহ রীতি আটটি ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস ও পৈশাচ বিবাহ। এ সব রীতির মধ্যে প্রথম ছ'টি দ্বারা ব্রাহ্মণ পুরুষ স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে, ক্ষত্রিয় কেবল চারটি এবং বৈশ্য ও শূদ্র মাত্র তিনটি রীতি গ্রহণ করতে পারে।

ব্রাহ্মণকে সমাজস্বীকৃত ছ'টি বিবাহ রীতি ব্যবহারের সুযোগ দেয়াতে সে যে কোন সময় নিজের পছন্দমতো স্ত্রী সংগ্রহ করতে পারে। এসব রীতিতে পিতা পাত্রকে কন্যা দান করতে পারে, পাত্র-পাত্রী নিজেরাই একে অপরকে পছন্দ করতে পারে, কিংবা পাত্রীর অমতেই পুরুষ বলপূর্বক হরণ কিংবা ধর্ষণ করে তাকে অধিগত করতে পারে। ফলে যাদের ক্ষেত্রে যতগুলো বেশি রীতি প্রযুক্ত, স্ত্রীরত্নের ভাণ্ডারটি তাদের ততই সমৃদ্ধ হয়ে পাবার সুযোগ।

মনুসংহিতায় ব্রাহ্মণদের জন্য কায়িক পরিশ্রম না করেই অনায়াসে বিলাসী জীবনযাপনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণকে ধনদান করলে দাতা স্বর্গে স্থান পাবে। ব্রাহ্মণদের কাজও সহজ: যাজন (পৌরহিত্য), অধ্যাপনা (দেবজ্ঞান দান) এবং প্রতিগ্রহ (দান গ্রহণ বা ভিক্ষাবৃত্তি) ব্রাহ্মণকে কেবল অন্নই নয় তার সাথে দক্ষিণাও দিতে হবে। ধনরত্ন, ভোজ্য ও দক্ষিণা দেবার উপদেশ রাজাকেও দেয়া হয়েছে। আবার তাকে ভিক্ষায় নারীও দেয়া যেতে পারে।

ব্রাহ্মণদের ব্যাপারে রাজাদের জন্য রয়েছে বিশেষ নির্দেশ। বলা হয়েছে- রাজা ব্রাহ্মণদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন, তিনি ব্রাহ্মণদের সেবা করবেন, তাদের আদেশ মেনে চলবেন, ইত্যাদি। রাজা কোন অবস্থায়ই এমন কাজ করবেন না যা ব্রাহ্মণের ক্রোধের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বিচারব্যবস্থায়ও ব্রাহ্মণদের জন্য রয়েছে অনেকটা বাড়তি সুবিধা। অন্য ত্রিবর্ণের সাক্ষীকে নানা ধরনের মানসিক, সামাজিক ও ধর্মীয় চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে। ব্রাহ্মণ সাক্ষীকে কিন্তু কেবল অনুরোধ করা যাবে, আপনি কী জানেন, তা বলুন। ব্রাহ্মণের যে কোন অপরাধে সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে তার ধনরত্নসহ অক্ষত দেহে নির্বাসন দেয়া। ব্রাহ্মণ সম্বন্ধে মনুসংহিতার প্রথম অধ্যায়ের কিছু শ্লোকের বিবরণ দেওয়া হলো- ক. স্রষ্টা ব্রাহ্মণদেরকে মুখ থেকে সৃষ্টি করেছেন। খ. স্থাবর-জমির মধ্যে প্রাণী শ্রেষ্ঠ প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিজীবীরা শ্রেষ্ঠ। বুদ্ধিমানদের মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ আর মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ। গ. পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই ব্রাহ্মণের সম্পত্তি। শ্রেষ্ঠত্ব অভিজাত্ব হেতু ব্রাহ্মণ সবই পাওয়ার যোগ্য ইত্যাদি।

টিকাঃ
-আল আদয়ান ফিল হিন্দ, পৃ-৫২১, অশোক কুমার লিখিত হিন্দুধর্ম, পৃ-১৯
০ মনুসংহিতা, ১ম অধ্যায় ৩১নং সিন্ধু থেকে হিন্দু-১১২

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 শূদ্রের নীচতা

📄 শূদ্রের নীচতা


শূদ্র (দাস) সম্প্রদায়ের স্থান সমাজের সর্ব নীচের ধাপে। কারণ তাদের জন্ম স্রষ্টার পা থেকে। স্রষ্টা তার জন্য মাত্র একটি কাজ নির্দিষ্ট করেছেন আর তা হলো অন্য ত্রিবর্ণের লোকদের, অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের সেবা করা। অন্যান্য বর্ণের লোকেরা যেসব পথে স্বর্গে যেতে পারে শূদ্রের জন্য তা খোলা নেই। তার জন্য স্বর্গলাভ করার একমাত্র পথ দেবজ্ঞ ব্রাহ্মণ, গৃহস্থ ও কীর্তিমান ব্রাহ্মণদের সেবা করা।

জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই শূদ্রকে ছোট করে দেখার নির্দেশ শাস্ত্রে রয়েছে। ব্রাহ্মণদের জন্য শুভসূচক নামকরণের কথা বলা হয়েছে, অথচ শূদ্রের জন্য বলা হয়েছে নিন্দাবাচক নাম ও দাসবাচক উপনাম রাখতে।

বিবাহের যে বিধান হিন্দুশাস্ত্রে রয়েছে, শূদ্রের জন্য তা-ও বৈষম্যমূলক। পূর্বে উল্লিখিত আট ধরনের বিবাহের মধ্যে যেসব পদ্ধতি ব্রাহ্মণদের জন্য অশুভ বলা হয়েছে, শূদ্রের জন্য সেগুলোই করণীয় হিসেবে নির্দেশ রয়েছে। উচ্চবর্ণের পুরুষ নিম্নবর্ণের কন্যা বিবাহ করতে পারে, কিন্তু তার উল্টোটা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ।

হিন্দুশাস্ত্রে যে বিচারব্যবস্থা রয়েছে শূদ্রের জন্য তা কেবল বৈষম্যমূলক নয়, নিপীড়নমূলকও। শূদ্র যে অপরাধই করুক না কেন, তার সাজা সব সময়ই চরম। সে কোন ব্রাহ্মণকে চোর বলে গালি দিলে তার শান্তি মৃত্যুদণ্ড। আবার ব্রাহ্মণ যদি শূদ্রকে একই গালি দেয় তবে তার দণ্ড মাত্র বারো পণ। তার মানে, যে অপরাধের জন্য একপক্ষের শান্তি মৃত্যুদণ্ড, সেই একই অপরাধ করলে অপর পক্ষের জরিমানা করা হবে মাত্র বারো পণ। যদি কোন শূদ্র পাপবাচক শব্দ উচ্চারণ করে কর্কশভাবে কোন দ্বিজকে গালি দেয়, তবে তার জিহ্বা কেটে ফেলতে হবে। যদি সে নাম বা জাতি উল্লেখ করে দ্বিজকে গালি দেয়, তবে তার মুখের মধ্যে দশ আঙ্গুল লম্বা জ্বলন্ত লৌহশলাকা ঢুকিয়ে দিতে হবে।

কোন শূদ্র যদি ব্রাহ্মণকে ধর্মোপদেশ দেয় তবে তার মুখে ও কানে উত্তপ্ত তেল ঢেলে দিতে হবে। একটু সাহস করে যদি সে ব্রাহ্মণের সঙ্গে একই আসনে বসতে চায় তবে উত্তপ্ত লৌহশলাকা দ্বারা কটিদেশ পুড়িয়ে দিয়ে তাকে নির্বাসন দেয়া হবে। যদি সে ব্রাহ্মণের ধন অপহরণ করে বা তাকে শারীরিকভাবে কষ্ট দেয় তবে নাক-কান কেটে তাকে কষ্টদায়কভাবে হত্যা করতে হবে। নিম্নবর্ণের কোন লোক যদি উচ্চবর্ণের কোন নারীকে ধর্ষণ করে তবে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে কোন ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য শূদ্রকন্যাকে ধর্ষণ করলে তার দণ্ড হবে মাত্র সহস্রপণ আর ব্রাহ্মণের বেলায় তা হবে মাত্র পাঁচশ পণ। এভাবে জাতগত পার্থক্যের কারণে একই অপরাধের শাস্তিও ভিন্ন হয়। শূদ্রকে কোন অবস্থায়ই ধর্মীয় উপদেশ দেয়া যাবে না। এমন অপরাধ যে করবে, সে অসংবৃত নামক নরকে নিক্ষিপ্ত হবে।

প্রায়শ্চিত্তের বেলায় শূদ্রকে বিড়াল কুকুর, নেউল, কাক, পেঁচা, ব্যাঙ প্রভৃতির সমতুল্য করা হয়েছে। উচ্চবর্ণের কোন লোক এসব ইতর প্রাণীকে বধ করলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়, শূদ্র হত্যার বেলায়ও তা করার বিধান রয়েছে।

শূদ্র যেহেতু অপবিত্র, কাজেই সে ব্রাহ্মণদের থেকে দূরে থাকে। সে প্রতিমাসে একবার চুল কাটাবে, যাতে সহজেই তাকে চিনা যায়। এর কারণ, ব্রাহ্মণরা যাতে সবসময় নিজেদের পবিত্রতা রক্ষার জন্য তার থেকে দূরে থাকতে পারে, তা নিশ্চিত করা। মৃত্যুর পরও শূদ্রের শূদ্রত্ব বহাল থাকবে। ব্রাহ্মণের মৃতদেহকে নগরের পশ্চিম দ্বার দিয়ে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় কিন্তু শূদ্রকে নিতে হয় দক্ষিণ দ্বার দিয়ে।

দেখা যাক, মনু শূদ্রদের সম্পর্কে কী বলে? ১. শূদ্রদের বা দাসদের নিজস্ব কোন সম্পত্তি রাখার অধিকার নেই। ২. দাস ও শূদ্রদের ধর্ম ব্রাহ্মণ অবাধে নিজের কাজে প্রয়োগ করবে। ৩. শূদ্র অর্থসঞ্চয় করতে পারবে না। কারণ তার সম্পদ থাকলে সে গর্বভরে ব্রাহ্মণের উপর অত্যাচার করতে পারে। ৪. প্রভুর উচ্ছিষ্ট তা ভক্ষ্য। ৫. দাস বৃত্তি থেকে শূদ্রের কোন মুক্তি নেই। ৬. যজ্ঞের কোন দ্রব্য শূদ্র পাবে না। ৭. যে পথে উচ্চ বর্ণের লোকেরা যাতায়াত করে সে পথে মৃত শূদ্রদেরও বহন করা যাবে না।

টিকাঃ
০ মনুসংহিতা, ১ম অধ্যায় ৩১নং সিন্ধু থেকে হিন্দু-১১২

ফন্ট সাইজ
15px
17px