📄 হিন্দু ধর্মের পরিচয়
হিন্দুধর্ম কী? এ প্রশ্নের উত্তরে বিভিন্ন জন বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। এখানে কয়েকটি মত তুলে ধরা হলো। যেমন- ডা. উদার কৃষ্ণ লিখেন 'হিন্দু ধর্ম হিন্দুদের ন্যায় জীবনযাপনের একটি পদ্ধতি। যাতে একদিকে চিন্তা-চেতনার দিক দিয়ে রয়েছে পূর্ণ স্বাধীনতা, অন্য দিকে রাষ্ট্রের নিয়মিত রূসম-রেওয়াজ পূর্ণ করার ওপর বাধ্য করা হয়।'
শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে যে, বেদে যা বলা হয়েছে তা হিন্দু ধর্ম। বেদে ধর্মের একটি সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে 'ধর্ম হলো যার দ্বারা মানুষের ইহকাল ও পরকাল সফলতা অর্জন হয়।' সাধারণত যারা দেবদেবী তথা মূর্তির পূজা করে তাদেরকেই আমরা হিন্দু বলে চিনি।
টিকাঃ
০-হিন্দুইজম খণ্ডঃ ০৪ পৃষ্ঠা-০৯, হিন্দুধর্ম ও মূল্যবোধ-পৃ-৫, হিন্দুধর্ম ও মূল্যবোধ-পৃ-৫, আদয়ানুল হিন্দ-পৃ.৫৩০, জ্ঞান মঞ্জুরী-২০
📄 হিন্দুধর্মের ইতিহাস
হিন্দু ধর্মের সঠিক গোড়াপত্তন সময়টা কোন ইতিহাস পাঠে জানা যায় না। তবে ড. বেদপ্রকাশ উপাধ্যায় এর রচিত কল্কি অবতার বইয়ের ৩৪ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ হতে ২০০০ বছরের মধ্যে ইহা এক প্রাচীন ধর্ম। আল বিরুনীর ভারত তত্ত্বের মতে ৪৫০০ বৎসর। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে ৫৬০০ বৎসর, ৭৩০০ বৎসর, মতান্তরে ১৮০০০ বৎসর। এই ধর্মের মূল, দুঃখবাদ ও জন্মান্তরবাদ। পিতৃলোক হতে ৮৪,০০০০০ (চুরাশিলক্ষ) যোনি ভ্রমণ।
অন্য এক ইতিহাসে আমরা জানতে পারি হিন্দু ধর্ম ভারতে আসে আর্যদের সঙ্গে। হিন্দু ধর্ম আর্য ধর্ম নামেও খ্যাত। ভারত উপমহাদেশের আদিবাসীগণ ছিলেন মূলত দ্রাবিড় জাতীয়। তাদের গাত্রবর্ণ ছিল হালকা কালো বর্ণ থেকে গাঢ় কৃষ্ণ বর্ণ। দ্রাবিড় জাতীয় ভারতীয়গণ আর্যদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে দাক্ষিণাত্যে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কেউ কেউ পূর্ব ভারতে, ইন্দোনেশিয়ার মালদ্বীপে এবং শ্রীলংকায়ও বসতি স্থাপন করেন। দ্রাবিড়দের ধর্ম সম্বন্ধে তেমন কিছু সুস্পষ্ট পাওয়া যায় না।
📄 আর্যদের ভারতে প্রবেশ
খ্রিস্টের জন্মের কয়েক শতাব্দী পূর্বে ইন্দো-ইউরোপিয়ান আর্যগণ ভারতে প্রবেশ করা শুরু করেন। যদিও আর্যগণ প্রাচীন ভারতবাসীদেরকে তাদের রচনায় বর্বর, অনার্য এবং দস্যু নামে অভিহিত করেন, তবুও তারা কৃষ্ণ বর্ণীয় দ্রাবিড়দের দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হন। বলা হয় পরাৎপর শ্রী কৃষ্ণ আর্য-ধর্মীয় সম্রাট হলেও তার ইতিহাস দ্রাবিড় থেকেই শুরু হয়। পরাৎপর শব্দের অর্থ সর্বশ্রেষ্ঠ। হিন্দুধর্ম মতে শ্রীকৃষ্ণ হলেন পরম স্রষ্টা। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব কৃষ্ণের সৃষ্ট দেবতা。
আর্যগণ ছিলেন ফর্সা, গৌর বর্ণীয়। শ্রী কৃষ্ণ গৌর বর্ণীয় নন, বরং কৃষ্ণ বর্ণীয়। আর্যদের মধ্যে অন্যদেরকে উপেক্ষা ও ঘৃণার ভাব আছে। স্রষ্টার ধারণা পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে আছে। কিন্তু তাদের দেবতা বা ঈশ্বর শ্রী কৃষ্ণ বর্ণীয় নন।
আর্যগণ ইরান অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। ইরানীগণও নিজেদেরকে আর্য বা এরিয়ান বলে দাবি করেন। ইরানী আর্যদের গাত্রবর্ণ ইউরোপিয়ানদের মতো। তারা নিজেদেরকে ভারতীয় থেকে জন্মগত বা বংশগত ভাবে উন্নততর মনে করেন। যেমন উত্তর ভারতীয় আর্য হিন্দুগণ দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়, তামিল বা অন্য বর্ণের হিন্দুদের থেকে নিজেদেরকে উন্নততর হিন্দু মনে করেন। পরবর্তীকালে ইরানী আর্যগণ, ভারত উপমহাদেশকে বলতেন হিন্দ এবং এ হিন্দের অধিবাসীদেরকে বলতেন হিন্দু।
📄 হিন্দুধর্মের জাতিভেদ প্রথা
ইসলাম ধর্মের ভিত্তি হলো কিছু ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর। কিন্তু হিন্দু ধর্মের ভিত্তি হলো জাত-পাতের ওপর।
হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন মত, পথ এবং জাতি-গোষ্ঠী আছে। সকলের মধ্যে প্রযোজ্য একটি স্বাধীন প্রথা বা সিস্টেম হলো জাতিভেদ প্রথা। সকল হিন্দু চারটি প্রধান জাতিতে বিভক্ত। এগুলো হলো- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র। কিন্তু চার বর্ণের ব্রাহ্মণ্য প্রথাটি হিন্দুর বিশ্বাসে এখনও দৃঢ়মূল। এই দৃঢ়মূল ভিত্তির বদৌলতে হিন্দু এখন প্রধান প্রধান ৪৬৩৫টি জাতিগত উপজাতিতে বিভক্ত। উল্লেখ্য এই ৪৬৩৫টি জাত উপজাত উপর থেকে নিচে (পিরামিড) এই ক্রমে স্তরে স্তরে সাজানো। একটি অপরটি থেকে পারস্পরিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও আলাদা। এক জাতের সাথে আর এক জাতের বৈবাহিক বা সামাজিক কোন সম্পর্ক নেই। তাদের রয়েছে যার যার সমাজ রীতি-নীতি। সংস্কার বা কুসংস্কার। সামাজিক গতিশীলতার পথ এখানে রুদ্ধ। কারণ অর্থ বিদ্যা এবং ক্ষমতা এর কোনোটাই সাধারণ ভাবে এক জাতির লোকদের অপর জাতিতে উন্নীত করতে পারে না। ব্যবস্থাটি জন্মগত ও বংশগত হওয়ায় একজনের জন্ম যে জাতে তার মৃত্যুও হয় সেই জাতে।