📄 অগ্নিপরীক্ষা
তিনি যতই সত্যের পথে আহ্বান করতে লাগলেন, ততবেশি তারা তাঁর শত্রুতা করতে লাগল। কিছু নরাধম ঈমানদার-বিশ্বাসীদেরকে প্রহার, আগুনে শোয়ানো, গলায় রশি বেঁধে টানাহেঁচড়া, পাথর বর্ষণ প্রভৃতি শান্তি দিতে শুরু করে। কিন্তু রাসূল সবার জন্য দু'আ করতেন, কারো থেকে প্রতিশোধ নিতেন বৈদেশিক প্রতিশোধ নিতেন না। রাতের পর রাত আল্লাহ্র দরবারে তাদের হেদায়াতের জন্য দু'আ করতেন। একবার তিনি মক্কার লোকদের থেকে নিরাশ হয়ে তায়েফ শহরে চলে গেলেন। আশা ছিলো ওখানের মানুষ যদি ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করে। কিন্তু তায়েফের লোকেরা এই মহামানবকে অপমান করল। দুষ্ট ও বখাটে ছেলেদেরকে তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিল। এরা তাঁকে নানা ধরনের গাল-মন্দ করে। পবিত্র দেহে পাথর নিক্ষেপ করে, এতে তিনি আহত হয়ে যান। আঘাতের ফলে তাঁর পা থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহে যখন কোথাও একটু বসতেন, ওই দুষ্টছেলেরা এসে আবার উঠিয়ে দিতো। তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে কোন বদদু'আ করেননি। বরং এই দু'আ করেছেন- হে মালিক! এদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং হেদায়েত দান করুন, এরা তো জানে না।
আল্লাহ্ বাণী ও বার্তা পৌঁছানোর অপরাধে তাঁকে নিজ শহর মক্কা ছাড়তে হয়েছে। চলে যেতে হয়েছে মাতৃভূমি ছেড়ে মদীনায়। মদীনায় থাকার সময়েও মক্কাবাসীরা তাঁকে শেষ (হত্যা) করার জন্য বারবার সৈন্য প্রেরণ করেছে।
📄 সত্যের জয়
সত্য চিরকাল বিজয়ী থাকে। এখানেও তার বিপরীত হয়নি। দীর্ঘ তেইশ বছরের কঠোর সাধনার পর তিনি সবার ওপর বিজয়ী হলেন। সত্যের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ আহ্বান সারা আরবের মানুষকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে নিয়ে এসেছিল। সারা পৃথিবীতে একটি অবিস্মরণীয় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলে সকল স্তরের মানুষ এক আল্লাহ্ অনুগত দাসে পরিণত হয়েছিল।
📄 অন্তিম উপদেশ
মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে প্রায় সোয়া লক্ষ সাহাবী সঙ্গীদের নিয়ে তিনি হজ্ব পালন করেন। এখানে তিনি সকল মানুষের সামনে অন্তিম উপদেশ প্রদান করেন। একথাও বলেছিলেন, মৃত্যুর পর যখন তোমাদের আমলের হিসাব নেয়া হবে, তখন আমার সম্পর্কেও তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে-'আমি কি আল্লাহ্র দ্বীন এবং সত্যের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছি'? সবাই বললেন, নিঃসন্দেহে আপনি পৌঁছিয়েছেন। তিনি আকাশের দিকে আঙুল উঠিয়ে তিনবার বললেন, আল্লাহ্! তুমি সাক্ষী থেকো, তুমি সাক্ষী থেকো, তুমি সাক্ষী থেকো। এরপর তিনি লোকজনকে লক্ষ্য করে বললেন, এই সত্য ধর্ম যাদের কাছে পৌঁছেছে, তারা যেন ওই ব্যক্তির কাছে পৌঁছিয়ে দেয়, যাদের কাছে তা পৌঁছায় নি। তিনি একথাও বলেছেন, আমি সর্বশেষ নবী। আমার পরে আর কোন নবী আসবে না। তিনিই সেই শেষ নবী, নরাশংস ও কল্কি অবতার, যাঁর অপেক্ষায় আপনারা বসে আছেন। পবিত্র কুরআনে আছে, “যাদেরকে আমি গ্রন্থ দিয়েছি, তারা সেই (পয়গম্বরকে) তাদের সন্তানের মতোই চিনে। নিঃসন্দেহে তাদের একটি দল সত্য গোপন করে।”
ভাইজান! এ কথা সত্য যে, প্রতিটি মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর মৃত্যুর পর কী হবে এ বিষয়ে আপনাকে কিছু জানাতে চাই। আপনি কি শুনবেন?
রমেশ: অবশ্যই শুনবো, বলুন আপনি。
আব্দুল্লাহ: দেখুন ভাই! সব চেয়ে বড় সত্য হলো, এই চিরন্তন মালিক তাঁর সত্যগ্রন্থ কোরআনুল কারীমে একটি সত্যের বাণী আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন: “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে”। -সূরা-আনকাবূত: ৫৭ এ বাণীতে তিনি দু'টি জিনিস আমাদেরকে বুঝিয়েছেন, প্রথমাংশে বলেছেন, 'প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।' মৃত্যু এমন অমোঘ সত্য, যা শুধু সকল ধর্ম ও মতের অনুসারীই কেবল নয় বরং ধর্মত্যাগী নাস্তিক-মুরতাদরাও তা অস্বীকার করে না। মৃত্যুর থাবার সামনে সবাই নত। বিচরণশীল প্রাণীরাও মৃত্যুর বাস্তবতা অনুধাবন করে মৃত্যুর ভয় আছে বলে বিড়াল দেখে ইঁদুর পালায় এবং চাপা পড়ার ভয়ে গাড়ি দেখে কুকুর দৌঁড়ে পালায়ন করে। সকল সন্দেহ-সংশয়ের ঊর্ধ্বে মৃত্যুর হাতছানি সকল প্রাণীকে আলিঙ্গন করবে।
📄 মৃত্যুর পর কী হবে?
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে একটি চরম সত্য আমাদের সামনে উদ্ভাসিত করে দেয়া হয়েছে যা মানুষ বুঝতে পারলে পৃথিবীর রং বদলে যাবে। পৃথিবী তার শৃঙ্খলা ফিরে পাবে। সে সত্যটা হলো মৃত্যুর পর তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে, দুনিয়ার সকল কর্মের প্রতিদান দেয়া হবে। মৃত্যুর পর পচে গলে নিঃশেষ হবে না। হিসাব-নিকাশের জন্য পুনরায় সৃষ্টি না হয়ে অন্য কোন প্রাণীর দেহে আত্মপ্রকাশ করবে, বিষয়টি এমন নয়। সুস্থ বিবেকের কাছে এমন দাবি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না。
রমেশ : আব্দুল্লাহ ভাই! দেখুন আমরা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করি। অর্থাৎ আমরা মৃত্যুর পর আবার জন্মগ্রহণ করব। যদি এই দুনিয়াতে ভালো কাজ করে যাই তাহলে ব্রাহ্মণ বা ভালো কিছু হয়ে পুনরায় জন্মগ্রহণ করব। আর যদি পাপ করে থাকি, তাহলে কুকুর বিড়াল বা কীট-পতঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করবো।
আব্দুল্লাহ: রমেশ ভাই! আপনার জেনে রাখা দরকার: পুনর্জন্মের মতবাদ বেদের মধ্যে নেই। পরবর্তীতে 'পুরাণ' এর মধ্যে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। পুনর্জন্মের বিশ্বাসে এ কথাই বুঝতে চাই যে, মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্যগুলো পিতা থেকে পুত্র এবং পুত্র থেকে তার পুত্রের মধ্যে স্থানান্তরিত হতে থাকে। মূলত পূনর্জন্মের মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে, এক শ্রেণীর মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য।
মহানআল্লাহতা'আলা মানব জাতিকে সৃষ্টির পর তাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ রাখেননি। অভিশপ্ত শয়তান প্রথমে ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের মধ্যে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ সৃষ্টি করে। ধর্মের নামে দলিত ও নিজ সম্প্রদায় 'শূদ্রদের সেবা গ্রহণকারী ও তাদেরকে নিচু জাত সাব্যস্তকারী' ধর্মের ঠিকাদারদের কাছে যখন তারা জানতে চাইলেন, আমাদের সৃষ্টিকর্তা একজন, তিনি যেহেতু নাক, কান, চোখ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আমাদেরকে একই রকম বানিয়েছেন, তাহলে আপনারা নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ এবং আমাদেরকে নিচুজাত বানালেন কেন? ধর্ম ব্যবসায়ীরা তখন নিজেদের স্বার্থরক্ষার তাগিদে পূনর্জন্মের দোহাই দিয়ে এই ফর্মুলা তৈরি করে দিলেন যে, 'পূর্বের জীবনের কর্মফলই তোমাদেরকে নিচু বানিয়ে দিয়েছে।' তখন থেকে এই মতবাদের জন্ম হয়। এই মতবাদের দৃষ্টিতে সমস্ত আত্মা পূনঃসৃষ্টি হয়ে কর্মফলের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর আকৃতি ধারণ করে আবার পৃথিবীতে আত্মপ্রকাশ করে, মারাত্মক অন্যায়কারীরা উদ্ভিদ (বনস্পতি) রূপে পূনর্জন্ম লাভ করে এবং সৎকর্মশীলরা পূনর্জন্মের চক্র থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায়।