📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 হযরত মুহাম্মদ ﷺ -এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত

📄 হযরত মুহাম্মদ ﷺ -এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত


আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগের কথা। আখেরী পয়গাম্বর (অন্তিম অবতার) সৌদি আরবের পবিত্র মক্কানগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের কয়েক মাস পূর্বে তিনি পিতৃহারা হন। মমতাময়ী মায়ের ছায়াও তিনি খুব বেশি দিন উপভোগ করতে পারেননি। প্রথমে দাদা আব্দুল মুত্তালিব, তার মৃত্যুর পর চাচা আবু তালেব তাঁকে লালন-পালন করেন। নিঃসঙ্গ, নীরব এই মানুষটিই একদিন মক্কানগরীর সকল মানুষের চোখের তারায় পরিণত হলেন।

তিনি বড় হতে লাগলেন আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসাও বাড়তে লাগলো। তিনি ঈমানদার, সত্যবাদী নামে অভিহিত হলেন। বহু মূল্যবান সম্পদ লোকেরা তাঁর কাছে নিশ্চিন্তে আমানত রেখে দিতো। তিনি পরস্পরের ঝগড়া-বিবাদ মিটিয়ে দিতেন। একবার আল্লাহ্র পবিত্র ঘর কাবা শরীফের নির্মাণ কাজ চলছিল। কা'বাঘরের এক কোণে 'হাজরে আসওয়াদ' নামে মূল্যবান পবিত্র একটি পাথর আছে। যখন সেই পাথর যথাস্থানে রাখার পালা আসল, তখন সবাই এই মহান কাজে অংশীদার হয়ে সৌভাগ্যবান হওয়ার আশা ব্যক্ত করল। মক্কার সমস্ত গোত্রপ্রধানরা এগিয়ে এলেন। যুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির রূপ নিল। তখন একজন বুদ্ধিমান প্রবীণ এই সমাধান পেশ করলেন, আগামী দিন যে ব্যক্তি সবার আগে কা'বা ঘরে আসবে, সেই এই দায়িত্ব পালন করবে। তার পরামর্শ গৃহীত হলো। সবাই প্রস্তুতি নিল। সেদিন সবার আগে আগমনকারী ছিলেন হযরত মুহাম্মদ। সবাই আনন্দে সমস্বরে বলে উঠল, আমাদের মাঝে ঈমানদার (বিশ্বস্ত) এবং সবচেয়ে সত্যবাদী মানুষটি এসে গেছেন। আমরা সবাই তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত। তিনি একটি চাদর বিছিয়ে তাতে পাথরটি রেখে বললেন, এবার সব গোত্রের অধিপতিরা চাদরের এক এক কোণ ধরুন। পাথর দেয়ালের কাছে পৌঁছে গেলে তিনি নিজ হাতে তা যথাস্থানে বসিয়ে দিলেন। তাঁর এই কৌশলের কারণে আশু যুদ্ধের ভয়াবহতা হতে সবাই পরিত্রাণ পেল।

লোকেরা সকল কাজে তাঁকে সবার আগে রাখতো। তিনি সফরে-ভ্রমণে বের হলে সবাই অস্থির হয়ে যেতো। তিনি সফর থেকে ফিরে এলে তাঁকে ঘিরে লোকেরা খুশিতে কান্নাকাটি শুরু করে দিত। তখন আল্লাহ্ পবিত্র ঘর কা'বা শরীফে ৩৬০টি মূর্তি ছিলো। আরবজুড়ে ছিল মানুষ মানুষে ভেদাভেদ, চুরি-ডাকাতি, শরাব, খুন-খারাবি, যিনা-ব্যভিচার, নারী ও অসহায়ের ওপর অন্যায়-অবিচার ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল।

৪০ বছর বয়সে আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতার মাধ্যমে তাঁর ওপর কোরআন শরীফ অবতরণ করা শুরু করেন। তাঁকে রাসূল হিসেবে মনোনীত করার সুসংবাদ জানিয়ে দেন এবং মানুষকে আল্লাহ্ একত্ববাদের প্রতি আহ্বান করার মহান দায়িত্ব অর্পণ করেন。

সত্যের আহবান
নবুওয়াত তথা আল্লাহ্ বাণী পৌঁছানোর মহান দায়িত্ব কাঁধে আসার পর, তিনি একটি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে সবাইকে ডাক দিলেন। তাঁর ডাক শুনে সবাই ছুটে এলো। কারণ, এটা ছিল সত্যবাদী বিশ্বস্ত মানুষের আওয়াজ। সমবেত লোকজনকে তিনি প্রশ্ন করেন, আমি যদি তোমাদেরকে বলি, এই পাহাড়ের পেছনে বিশাল এক সৈন্যবাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণের জন্য ধেয়ে আসছে, তোমরা কি তা বিশ্বাস করবে? সবাই একবাক্যে বলল, আপনার কথা কে অবিশ্বাস করতে পারে। আপনি কখনো মিথ্যা বলেন না। আর তাছাড়া পাহাড়ের চূড়া থেকে আপনি তো পেছনে দেখতেই পাচ্ছেন। অতঃপর তিনি উপস্থিত জনতাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। মূর্তিপূজা নিষেধ করলেন এবং মরণের পর জাহান্নামের আগুনের ভীতি প্রদর্শন করলেন。

আব্দুল্লাহ : রমেশ ভাই আপনি কি জানেন মানুষের সবচেয়ে বড় ব্যাধি কী?

রমেশ: আপনিই বলুন সেটা কী?

আব্দুল্লাহ: শুনুন তাহলে মানুষের একটি মারাত্মক ব্যাধি হলো, পূর্বসূরিদের ভ্রান্তধারণা-বিশ্বাসকে অন্ধের মতো অনুসরণ করে। সুস্থ বিবেক ও যুক্তি-তর্কের সামনে অসারতা প্রমাণ হলেও বাপ-দাদার কীর্তি-কলাপ মানুষ ছাড়তে পারে না। পূর্ববর্তীদের রীতি-রেওয়াজ পরিত্যাগ তো দূরের কথা, কারো কথাই তারা শুনতে নারাজ। একারণেই রাসূল-কে চল্লিশ বছর পর্যন্ত সত্যবাদী, বিশ্বাসী বলে সম্মান প্রদর্শনের পরও মক্কার লোকেরা তাঁর শত্রুহয়ে গেলো।

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 অগ্নিপরীক্ষা

📄 অগ্নিপরীক্ষা


তিনি যতই সত্যের পথে আহ্বান করতে লাগলেন, ততবেশি তারা তাঁর শত্রুতা করতে লাগল। কিছু নরাধম ঈমানদার-বিশ্বাসীদেরকে প্রহার, আগুনে শোয়ানো, গলায় রশি বেঁধে টানাহেঁচড়া, পাথর বর্ষণ প্রভৃতি শান্তি দিতে শুরু করে। কিন্তু রাসূল সবার জন্য দু'আ করতেন, কারো থেকে প্রতিশোধ নিতেন বৈদেশিক প্রতিশোধ নিতেন না। রাতের পর রাত আল্লাহ্র দরবারে তাদের হেদায়াতের জন্য দু'আ করতেন। একবার তিনি মক্কার লোকদের থেকে নিরাশ হয়ে তায়েফ শহরে চলে গেলেন। আশা ছিলো ওখানের মানুষ যদি ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করে। কিন্তু তায়েফের লোকেরা এই মহামানবকে অপমান করল। দুষ্ট ও বখাটে ছেলেদেরকে তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিল। এরা তাঁকে নানা ধরনের গাল-মন্দ করে। পবিত্র দেহে পাথর নিক্ষেপ করে, এতে তিনি আহত হয়ে যান। আঘাতের ফলে তাঁর পা থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহে যখন কোথাও একটু বসতেন, ওই দুষ্টছেলেরা এসে আবার উঠিয়ে দিতো। তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে কোন বদদু'আ করেননি। বরং এই দু'আ করেছেন- হে মালিক! এদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং হেদায়েত দান করুন, এরা তো জানে না।

আল্লাহ্ বাণী ও বার্তা পৌঁছানোর অপরাধে তাঁকে নিজ শহর মক্কা ছাড়তে হয়েছে। চলে যেতে হয়েছে মাতৃভূমি ছেড়ে মদীনায়। মদীনায় থাকার সময়েও মক্কাবাসীরা তাঁকে শেষ (হত্যা) করার জন্য বারবার সৈন্য প্রেরণ করেছে।

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 সত্যের জয়

📄 সত্যের জয়


সত্য চিরকাল বিজয়ী থাকে। এখানেও তার বিপরীত হয়নি। দীর্ঘ তেইশ বছরের কঠোর সাধনার পর তিনি সবার ওপর বিজয়ী হলেন। সত্যের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ আহ্বান সারা আরবের মানুষকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে নিয়ে এসেছিল। সারা পৃথিবীতে একটি অবিস্মরণীয় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলে সকল স্তরের মানুষ এক আল্লাহ্ অনুগত দাসে পরিণত হয়েছিল।

📘 হিন্দু ভাইদের দাওয়াত দেয়ার পথ ও পদ্ধতি 📄 অন্তিম উপদেশ

📄 অন্তিম উপদেশ


মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে প্রায় সোয়া লক্ষ সাহাবী সঙ্গীদের নিয়ে তিনি হজ্ব পালন করেন। এখানে তিনি সকল মানুষের সামনে অন্তিম উপদেশ প্রদান করেন। একথাও বলেছিলেন, মৃত্যুর পর যখন তোমাদের আমলের হিসাব নেয়া হবে, তখন আমার সম্পর্কেও তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে-'আমি কি আল্লাহ্র দ্বীন এবং সত্যের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছি'? সবাই বললেন, নিঃসন্দেহে আপনি পৌঁছিয়েছেন। তিনি আকাশের দিকে আঙুল উঠিয়ে তিনবার বললেন, আল্লাহ্! তুমি সাক্ষী থেকো, তুমি সাক্ষী থেকো, তুমি সাক্ষী থেকো। এরপর তিনি লোকজনকে লক্ষ্য করে বললেন, এই সত্য ধর্ম যাদের কাছে পৌঁছেছে, তারা যেন ওই ব্যক্তির কাছে পৌঁছিয়ে দেয়, যাদের কাছে তা পৌঁছায় নি। তিনি একথাও বলেছেন, আমি সর্বশেষ নবী। আমার পরে আর কোন নবী আসবে না। তিনিই সেই শেষ নবী, নরাশংস ও কল্কি অবতার, যাঁর অপেক্ষায় আপনারা বসে আছেন। পবিত্র কুরআনে আছে, “যাদেরকে আমি গ্রন্থ দিয়েছি, তারা সেই (পয়গম্বরকে) তাদের সন্তানের মতোই চিনে। নিঃসন্দেহে তাদের একটি দল সত্য গোপন করে।”

ভাইজান! এ কথা সত্য যে, প্রতিটি মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর মৃত্যুর পর কী হবে এ বিষয়ে আপনাকে কিছু জানাতে চাই। আপনি কি শুনবেন?

রমেশ: অবশ্যই শুনবো, বলুন আপনি。

আব্দুল্লাহ: দেখুন ভাই! সব চেয়ে বড় সত্য হলো, এই চিরন্তন মালিক তাঁর সত্যগ্রন্থ কোরআনুল কারীমে একটি সত্যের বাণী আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন: “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে”। -সূরা-আনকাবূত: ৫৭ এ বাণীতে তিনি দু'টি জিনিস আমাদেরকে বুঝিয়েছেন, প্রথমাংশে বলেছেন, 'প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।' মৃত্যু এমন অমোঘ সত্য, যা শুধু সকল ধর্ম ও মতের অনুসারীই কেবল নয় বরং ধর্মত্যাগী নাস্তিক-মুরতাদরাও তা অস্বীকার করে না। মৃত্যুর থাবার সামনে সবাই নত। বিচরণশীল প্রাণীরাও মৃত্যুর বাস্তবতা অনুধাবন করে মৃত্যুর ভয় আছে বলে বিড়াল দেখে ইঁদুর পালায় এবং চাপা পড়ার ভয়ে গাড়ি দেখে কুকুর দৌঁড়ে পালায়ন করে। সকল সন্দেহ-সংশয়ের ঊর্ধ্বে মৃত্যুর হাতছানি সকল প্রাণীকে আলিঙ্গন করবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px