📄 দাওয়াত দেয়ার দায়িত্ব কাদের?
অমুসলিমদের দাওয়াত দেয়ার দায়িত্ব প্রতিটি মুসলমানের। আমরা অনেকে মনে করি এই দায়িত্ব শুধু ওলামায়ে কেরামের। না ভাই! বরং এই দায়িত্ব সকল মুসলমানের। আল্লাহ তা'আলা বলেন- “তোমরা উত্তম জাতি তোমাদেরকে বের করা হয়েছে মানুষের জন্য”। কিন্তু এখানে বলেননি যে, হে ওলামায়ে কেরাম! তোমরা উত্তম জাতি। বরং এখানে সকল মুসলমানদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন-"আমার কাছ থেকে একটি বাক্য হলেও মানুষের কাছে পৌঁছে দাও।” এখানে বলা হয়নি, হে ওলামায়ে কেরাম! তোমরা পৌঁছে দাও। উপরে উল্লিখিত আয়াত ও হাদীস দ্বারা বুঝা যায় এই দায়িত্ব সকল মুসলমানের উপর অর্পিত হয়েছে। অতএব বোঝা গেল, আপনি ইঞ্জিনিয়ার হোন, আর ডাক্তার হোন, কৃষক হোন আর দিন-মজুর হোন, যেই হোন না কেন, আপনাকে নিজের আত্মশুদ্ধির চিন্তা করতে হবে এবং অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দিতে হবে। আল্লাহ তা'আলা অমুসলিমদের কাছে তাদের হক পৌঁছিয়ে দেয়ার তৌফিক দান করুন।
টিকাঃ
১. আলে ইমরান:১১০
📄 অমুসলিমদের দাওয়াত দেয়া মানবতার দাবি
মানব থেকে মানবতা, প্রতিটি মানুষের মানবতার দাবি হলো, সে অন্য মানুষের উপকার করবে। আর কেউ যদি কোন বিপদে পড়ে তাহলে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবে। আমরা মুসলমানগণ জানি, প্রতিটি অমুসলিম মৃত্যুর পর চিরস্থায়ী জাহান্নামী। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّমَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ শَرُّ الْبَرِيَّةِ
অর্থ: নিশ্চয়ই কিতাবীদের মধ্য থেকে যারা কুফরী করেছে এবং মুশরিকরা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারা সৃষ্টির অধম।
প্রিয় পাঠক! আপনার প্রতিবেশী হিন্দু বা খ্রিস্টানদের বাড়িতে যদি আগুন লেগে যায়, তাহলে আপনি কি বসে থাকবেন নাকি আগুন নিভাতে যাবেন? অবশ্যই আগুন নিভাতে যাবেন। আল্লাহ না করুন, যদি কোন মুসলিম মহল্লায় আগুন লেগে যায়, তাহলে প্রতিবেশী অমুসলিম ভাইয়েরা কি বসে থাকবেন নাকি আগুন নিভাতে আসবেন? অবশ্যই আগুন নিভাতে আসবে। দেখুন! আমরা দুনিয়াতে ক্ষণস্থায়ী আগুন থেকে উদ্ধার করার জন্য মানবতার পরিচয় দিয়ে থাকি। কিন্তু একটু কি ভেবেছি যে, দুনিয়ার আগুনে জ্বলে যদি কারো ত্বক নষ্ট হয়ে যায় বা ঘর-বাড়ি পুড়ে ছারখার হয়ে যায়, তাহলে ওষুধ দ্বারা পুনরায় ত্বক ফিরিয়ে আনা সম্ভব। নতুন ও উত্তম বাড়ি বানানো সম্ভব। কিন্তু যে ভাইটি ইসলাম গ্রহণ না করে, চিরস্থায়ী আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছে, যার থেকে ফিরানো বা বাঁচানোর কোন পথ নেই, সেই চিরস্থায়ী আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য কি কখনো ভেবেছি?
প্রিয় পাঠক! আমাদের অনেক অমুসলিম বন্ধু আছেন, যাদের সাথে একত্রে চলা-ফেরা করি। একই অফিসে চাকরি করি। তার দোকান থেকে কেনাকাটা করি। তার বিপদে-আপদে সহযোগিতার হাত বাড়াই। একথাও জানি- এই ভাইটি মৃত্যুর পর চিরস্থায়ী আগুনে জ্বলবে।
প্রিয় পাঠক! আমাদের কেমন মানবতা? আমার সামনে আমার এক ভাই বা বোন জাহান্নামের চিরস্থায়ী আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছে, কিন্তু কোন দিন এই ভাইটিকে বলিনি যে, ভাই! তুমি যে পথে চলছো এটা জাহান্নামের পথ। কোন দিন তাকে জান্নাতের পথ ইসলাম দেখাইনি। কেমন জানি তাকে আগুনে জ্বলতে দেখেও আমি চুপ হয়ে আছি। এটা আমাদের কেমন মানবতা? আর কত দিন এভাবে দেখবো? বলুন! এভাবে আর কত দিন বসে বসে তাদেরকে আগুনে ঝাঁপ দিতে দেখবো? চলুন, আর সময় নেই, আমার কাছে যদি সত্যিকার মানবতা থাকে, তাহলে আমার প্রতিবেশী অমুসলিমকে আগুনে জ্বলতে দিব না। আমাদের দায়িত্ব হলো তাকে জান্নাতের পথ দেখিয়ে দেয়া। মানা না মানা তার ব্যাপার। দাওয়াত পাওয়া তাদের অধিকার। গ্রহণ করা-না করা তাদের এখতিয়ার। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাদের আমানত 'ইসলাম' তাদের পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়ে ওদেরকে চিরস্থায়ী আগুন থেকে বাঁচানোর মাধ্যম বানিয়ে নিন এবং আমাদের উপর তিনি খুশি হয়ে যান। আমীন।
টিকাঃ
১. সূরা-বাইয়্যিনাহ:৬
📄 রাসূল ﷺ-এর সব চেয়ে প্রিয় সুন্নাত
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সবচেয়ে বড় সুন্নাত ছিল দাওয়াত। বিশেষত অমুসলিম ভাই-বোনদের মাঝে দাওয়াত। তিনি ১০০ ভাগ অমুসলিমের মাঝে দাওয়াতী কাজ শুরু করেছেন। অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন এবং যারা মুসলমান হয়েছেন, তাদের ইসলাহ ও সংশোধন করেছেন। ঐতিহাসিক বিদায় হজ্বের ভাষণে সাহাবা (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন- হে রাসূলুল্লাহ, আপনার অবর্তমানে আমাদের কী কাজ? নবী করীম বললেন, আমার যা কাজ ছিল তোমাদেরও একই কাজ। উত্তর শুনে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন দেশে দাওয়াত দিতে ছড়িয়ে পড়লেন। এখন প্রশ্ন হলো তারা বিভিন্ন দেশে সফর করে কাদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন? অবশ্যই অমুসলিমদের কাছে ইসলাম প্রচার করেছেন এবং লোকেরা দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।
মোটকথা, নবীজীর সবচেয়ে বড় আশা ছিল প্রতিটি মানুষ যেন ইসলাম গ্রহণ করে। হিন্দ ইবনে আবি হালা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা আখিরাতের চিন্তা করতেন এবং উম্মতের ফিকির করতেন। তিনি উম্মতের দরদে এতো অস্থির ছিলেন যে, আল্লাহ তা'আলা সান্ত্বনা দিয়ে আয়াত অবতীর্ণ করলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন-
لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ
অর্থ: তারা ঈমান আনছে না এই দুঃখে হয়ত তুমি নিজের জীবন শেষ করে দিবে।
এখানে, আল্লাহ তা'আলা নবীজীর চিন্তার কারণ উল্লেখ করে বলেন- أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ তারা কেন মুসলমান হচ্ছে না, কেন ঈমান আনছে না। বলুন তো ঐ সময়ে কারা ঈমান আনছিল না? মুসলিমগণ না অমুসলিমগণ? অবশ্যই অমুসলিমরা; কাফের ও মুশরিকরা। আমরা কি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী হিসেবে কোন দিন প্রতিবেশী অমুসলিমদেরকে চিরস্থায়ী জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য ফিকির করেছি? ঈমানহীন লোকদেরকে ঈমানের দাওয়াত দেওয়া কি নবীজীর সুন্নত নয়? তাদের জন্য ফিকির করা কি আমাদের দায়িত্ব নয়? অবশ্যই নবীজীর সুন্নত ও আমাদের বড় দায়িত্ব। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে নববী দরদ ও উম্মতের ফিকির দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
১. শুআরা-৩
📄 মুসলিম উম্মাহর বর্তমান সমস্যার সমাধান
এই উম্মতের পরাজয়, ভীতি ও অপদস্থতার আধ্যাত্মিক চিকিৎসা কেবল এটাই যে, এ উম্মত নিজের অবস্থান জানবে এবং দাওয়াতকে জীবনের উদ্দেশ্য বানাবে। আর সকল মানুষকে কুফর ও শিরকের অন্ধকার থেকে বের করে আনা নিজের উদ্দেশ্য জানবে। আর নিজেদেরকে দা'ঈ উম্মত হিসেবে প্রমাণ করবে। এই উম্মতের চিকিৎসা হলো ইসলামের দাওয়াত। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের অভিজ্ঞতা হলো- যে নেতা কেবল নিজের ভোটের নিরাপত্তার চিন্তা করে, সে নিজের ক্ষমতা ও অবস্থানকে বাঁচাতে পারে না। বরং উত্তম ও সফল রাজনীতিবিদ হলেন তিনি, যিনি অপর দলের ভোট কেটে নিজের দলে শামিল করার চিন্তা করেন। অনুরূপভাবে যে শাসক কেবল নিজের দেশের সীমান্ত রক্ষার চিন্তা করে, ধীরে ধীরে সে নিজের রাজ্যও হারিয়ে বসে। এর বিপরীতে যে শাসক নিজ রাজ্যকে বর্ধিত করার চিন্তা করে এবং অতিরিক্ত এলাকা দখল করার উদ্দেশ্যে সচেষ্ট থাকে, যদি সে নিজ রাজ্য ও রাজত্ব বৃদ্ধি করতে নাও পারে কমপক্ষে নিজ রাজ্য অবশ্যই নিরাপদ থাকবে।
এই বিবেচনায় মুসলিম উম্মতের স্থায়িত্ব ও নেতৃত্বের জন্য এটা আবশ্যক যে, নিজ মুসলমান ভাইয়ের উপর মেহনত করে তাদের ঈমান ও ইসলামের ওপর দৃঢ় অবস্থানে স্থির রাখার চিন্তাই কেবল নয়, অপরাপর সম্প্রদায়কেও ইসলামের দাওয়াত দিয়ে নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি সদস্যকে ঈমানহীনতা ও ধর্মহীনতা থেকে বাঁচানোর ফিকির ও প্রশিক্ষণের গুরুত্ব কোন ক্রমেই কম নয়। কিন্তু কেবল এটাকেই উদ্দেশ্য ধরে নেয়া কখনই যথেষ্ট হতে পারে না। বরং মুসলিম উম্মাহ্র ঈমানকে দৃঢ় করার জন্য এবং ধর্মীয় জাগরণের জন্য অন্যদের মাঝে দাওয়াতী কাজ করাও অত্যন্ত জরুরি।
এ পর্যন্ত বর্ণিত বিস্তৃত বিবরণে এ কথা সুস্পষ্ট হয়েছে যে, সর্বপ্রকারের চিন্তা অনুসারে মুসলিম উম্মাহর সকল সমস্যার সমাধান কেবলমাত্র ইসলামের দাওয়াত। কিন্তু পার্থিব সমস্যা সমাধানের জন্য দাওয়াত দেয়া না উপকারী, না ফলপ্রসূ, আর না প্রশংসিত ও গ্রহণযোগ্য। আমাদের তো নিজেদের সম্পর্ক মহান রব-এর সাথে দৃঢ় করার ও দয়ালু অভিভাবক রাসূল-এর অনুগ্রহকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার এবং নিজের আত্মার সম্পর্ক তাঁর সাথে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যেই দাওয়াতের কাজকে হৃদয়ে ধারণ করা উচিত।