📄 অমুসলিম ভাইদের দাওয়াত দেয়ার গুরুত্ব
আল্লাহ তা'আলা তাঁর নেয়ামতকে সকল মানুষের জন্য সহজলভ্য করেছেন। বাতাস সকল মানুষের জন্য। পানি সকল মানুষের জন্য। চন্দ্র-সূর্য সবকিছু সকল মানুষের জন্য। আর ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য হবে? এটা হতেই পারে না। সকল মানুষের জন্য আল্লাহ্র কাছে গ্রহণযোগ্য ধর্ম হলো ইসলাম। তাই ইসলামকে জানা ও মানা হিন্দু, খ্রিস্টানসহ সকল অমুসলিম ও মুসলিমদের অধিকার এবং জরুরি। চলুন দেখি কুরআন এ ব্যাপারে কী বলে?
📄 ইসলাম কাদের জন্য?
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র নিকট গ্রহণযোগ্য ধর্ম একমাত্র ইসলাম। কোন অমুসলিম যদি পরকালের সফলতার জন্য ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মকে অনুসরণ করে, তাহলে সে কি সফল হবে? মুক্তি পাবে? না কখনও না। আল্লাহ্তা'আলা বলেন-
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَামِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ
অর্থ: যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম কামনা করবে, তার থেকে তা কখনই কবুল করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
এখন প্রশ্ন হলো, এই কথা কি অমুসলিমরা জানে যে, ইসলাম তাদেরও ধর্ম? জানে না। মুসলমানরা জানে। কারণ তারা কুরআন পড়ে। অমুসলিমরা তো আর কুরআন পড়ে না। আমরা মুসলমানরা কি অমুসলিমদেরকে বলেছি যে, ভাই! আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, কারণ ইসলাম আপনারই ধর্ম। আপনার মালিকের পক্ষ থেকে আসা ধর্ম যদি আপনি না মানেন, তাহলে আপনাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামে জ্বলতে হবে। আমরা কি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি?
বন্ধুগণ! অমুসলিমদেরকে কারা দাওয়াত দিবে? এখন কি কোন নবী আসবেন তাদেরকে দাওয়াত দিতে? না কি কোন ফেরেশতা আসবে? কেউ আসবেন না, এই দায়িত্ব আমাদেরই, আমাদেরকেই দাওয়াত দিতে হবে। সকল মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব হলো আমাদের মুসলমানদের। আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করি, তিনি যেন আমাদেরকে দাওয়াতের হক আদায় করার তৌফিক দান করেন। আমিন!!
টিকাঃ
১. আলে-ইমরান: ০৩:৮৫
📄 আল্লাহ কাদের ?
কোন অমুসলিম ভাইকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বলুন তো আপনার স্রষ্টা বা মালিক কে? কেউ বলবেন ঈশ্বর, কেউ বলবেন ভগবান, কেউ বলবেন মালিক। মুসলমানরা বলবে আমাদের মালিকের নাম হলো আল্লাহ্। এই উত্তর কি সঠিক? আল্লাহ কি শুধু মুসলমানদের স্রষ্টা? না, তিনি হলেন সকল মানুষের স্রষ্টা ও মালিক। তারই ইবাদত করতে হবে। দেখুন, এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা কী বলেন- কুরআনে হাকীমে আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তাঁর ইবাদতের হুকুম দিতে গিয়ে এরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
অর্থঃ হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার এবাদত কর, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায়, তোমরা পরহেজগারি অর্জন করতে পারবে।
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলা (يا ايها الناس) (ইয়া আইয়্যুহান নাস) শব্দ ব্যবহার করেছেন। যার অর্থ, হে মানুষগণ! এখানে "الناس" (নাস) শব্দ দ্বারা রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে আসবে, সকল মানুষ অন্তর্ভুক্ত। এখানে না আছে কোন যুগের শর্ত, না আছে কোন নির্দিষ্ট অঞ্চল। বরং আল্লাহ তা'আলা সকল মানুষকে নির্দেশ দিচ্ছেন। হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ সকল অমুসলিমরাও মানুষ। পৃথিবীর সাতশত ষাট কোটি মানুষের সকলেই মানবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সাতশত ষাট কোটি মানুষ সকলেই কি আল্লাহকে মানে? সকলেই কি আল্লাহর ইবাদত করে? অথবা কমপক্ষে সকলের এতটুকু কি জানা আছে যে, আমাদেরকে এক আল্লাহ্রই ইবাদত করতে হবে? যদি উত্তর 'না' হয় তাহলে কোন মুসলমানের পক্ষ থেকে অমুসলিম ভাইদের কাছে কি এ কথা পৌঁছানো হয়েছে? অমুসলিমদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব কার? অবশ্যই মুসলমানদের। আমরা কি তাদের কাছে এই দাওয়াত পৌঁছিয়েছি? কখনও কি অমুসলিম ভাইকে বলেছি? ভাই! আপনার মালিক হলেন আল্লাহ্, তাকেই মানতে হবে। মুসলমানের উচিত, তারা সকল মানুষের কাছে আল্লাহর পয়গাম ও দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেবে। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তৌফিক দান করুন।
মুহাম্মাদ (সা.) কাদের নবী?
কোন অমুসলিমকে যদি প্রশ্ন করা হয়, বলুন তো! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাদের নবী? তারা বলবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের নবী। এমনিভাবে মুসলমানদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বলুন তো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাদের নবী? তখন তারা বলবে তিনি তো আমাদেরই নবী। এই উত্তরগুলো কি সঠিক? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি শুধু মুসলমানদেরই নবী? চলুন আমরা কুরআনে হাকীমকে জিজ্ঞাসা করি, কুরআন এ ব্যাপারে কী বলে? কুরআনে হাকীমে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ: বলে দাও, হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ্ প্রেরিত রাসূল, সমগ্র আসমান ও জমিনে তার রাজত্ব। একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কারো উপাসনা নয়। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা সবাই বিশ্বাস স্থাপন করো আল্লাহর ওপর, তাঁর প্রেরিত উম্ম্মী নবীর ওপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহ্ এবং তাঁর সমস্ত কালামের ওপর। তাঁর অনুসরণ কর যাতে সরল পথপ্রাপ্ত হতে পার।
আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে النَّاسُ 'মানুষ' শব্দ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, ইয়াহুদী ইত্যাদি, সকলেরই নবী হলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কারণ তারা সকলেই মানুষ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কি জানে বা মনে করে যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরও নবী? না, কখনও না। তারা জানে না। জানবে কীভাবে? তারা তো কুরআন পড়ে না। মুসলমানরা কুরআন পড়ে। কিন্তু আমরা কোন দিন কোন অমুসলিমকে বলি নি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরও নবী। এর জন্য অপরাধী হলাম আমরাই।
উপরিউক্ত আয়াতে লক্ষ করলে আরো একটি বিষয় দেখতে পাওয়া যায়। এখানে جَمِيعًا শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ হলো 'সবাই'। এখানে বিশেষভাবে মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে কোন শব্দ প্রয়োগ করা হয়নি। অতএব, আমাদের জন্য উচিত, আমরা নিজেরা ভুল ধারণা পোষণ করবো না এবং অন্য মানুষের ভুলটি ভাঙিয়ে দিবো। চলুন, আমরা সকল মানুষের কাছে এই পয়গাম পৌঁছিয়ে দেই। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাদের হক আদায় করার তৌফিক দান করুন।
টিকাঃ
১. বাকারা-২১
২. আ'রাফ: আয়াত: ১৫৮
📄 কুরআন কাদের?
কুরআন সম্পর্কে আমাদের মাঝে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে। কোন হিন্দু ভাইকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, বলুন তো কুরআন কাদের গ্রন্থ? উত্তরে তারা বলবে এটা মুসলমানদের গ্রন্থ। আমাদের গ্রন্থ হলো গীতা, রামায়ন, ইত্যাদি। খ্রিস্টান ভাইয়েরা এমন প্রশ্নের উত্তরে বলবে আমাদের কিতাব হলো বাইবেল। আর কুরআন হলো মুসলমানদের কিতাব। ঠিক কোন মুসলমানকে যদি প্রশ্ন করা হয়, বলুন তো কুরআন কাদের জন্য? তাহলে মুসলমানরাও বলবে, কুরআন আমাদের জন্য। চলুন কুরআনকে জিজ্ঞাসা করি, কুরআন এ ব্যাপারে কি বলে, আল্লাহ তা'আলা বলেন-
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ
অর্থ: রমযান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।
উক্ত আয়াতে প্রতি লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, هُدًى لِلنَّاسِ (সমগ্র মানব জাতির জন্য হেদায়েত) বলা হয়েছে। তাতে শুধু মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে বলা হয়নি যে, তা কেবল তোমাদের জন্য পথ প্রদর্শক। অতএব, আমরা যদি মনে করি যে, আল-কুরআন শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ, তাহলে তা হবে নিছক ভুল ধারণা। আবার একই প্রশ্ন উঠবে পৃথিবীর সকল অমুসলিম তারা কি জানে এই কিতাব তাদের জন্য পথ পদর্শক? এর উত্তরে আপনি নিজেই বলবেন অবশ্যই তারা জানে না।
কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্য হলো সকল মানুষের হেদায়েত। শুধু মুসলমানের হেদায়েতের জন্য অবতীর্ণ হয়নি। আল্লাহ তা'আলা সকল মানুষকে তার ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু শুধু ২০ ভাগ মানুষ মুসলমান এবাদত করবে? এমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য পাঠিয়েছেন। কিন্তু মাত্র ২০ ভাগ মানুষ তার ওপর ঈমান আনে। ঠিক কুরআন আল্লাহ তা'আলা সকল মানুষের জন্য পাঠিয়েছেন। কিন্তু এর অনুসারী মাত্র ২০ ভাগ। বাকি ৮০ ভাগ অমুসলিম তাদের এটাও তো জানা নেই যে, আল্লাহ তাদের প্রতিপালক। তাদেরকে আল্লাহ্রই ইবাদত করতে হবে। এও জানে না যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরও নবী। কুরআন তাদের হেদায়েতের জন্য এসেছে এটাও তাদের জানা নেই।
এখন প্রশ্ন হলো, আল্লাহ তা'আলা কি ৮০ ভাগ অমুসলিমদের জন্য আরো কোন ধর্ম পাঠাবেন? তাদের জন্য কি আরো কোন রাসূল আসবেন? না, কখনও না। কারণ আল্লাহ তা'আলার নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম হলো ইসলাম। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন আল্লাহ্র শেষ রাসূল। তার পরে আর কোন নবী- রাসূল আসবেন না। ওহীর ধারাবাহিকতা শেষ হয়ে গিয়েছে। আর নতুন কোন কিতাব তো আসার প্রশ্নই আসে না। এখন দেখতে হবে ৮০ ভাগ অমুসলিমদের কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছানো এবং তাদেরকে আল্লাহ্র দিকে দাওয়াত দেওয়ার দায়িত্ব কাদের? আল্লাহ তা'আলা কি মুসলমানদেরকে শুধু মুসলমানদের এসলাহের জন্যই পাঠিয়েছেন? নাকি অমুসলিমদের পর্যন্ত ইসলাম পৌঁছিয়ে দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন?
টিকাঃ
১. বাকারাহ: আয়াত: ১৮৫