📄 ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস
হিন্দু ধর্মে সংস্কারের উদ্দেশ্যে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে এর মধ্যে ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা বা দেবতা তিনজন। আর অন্যান্য সকল দেব- দেবী তাদের অধীন। তিনজন সৃষ্টিকর্তার মধ্যে একজন সৃষ্টিকর্তা। একজন অভিভাবক রব। আর অপরজন হলেন ধ্বংসকারী। এই তিন সৃষ্টিকর্তার নাম যথাক্রমে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিবা।
ব্রহ্মা হলো সৃষ্টিকর্তা ও দেবতা। এই দেবতাকে সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা হিসেবে গণ্য করা হয়। এ জন্য তার অবস্থানও অনেক উঁচুতে। উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ব্রহ্মাকে হিন্দুদের ধর্মীয় জীবনে কোনো বিশেষ গুরত্ব দেওয়া হয় না। আজমীরে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাচীন আর্য মন্দির ছাড়া এই দেবতার মন্দির ভারতে অপ্রসিদ্ধ ও খুবই কম।
দ্বিতীয় খোদা বা দেবতার নাম বিষ্ণু যার অর্থ হলো অভিভাবক বা পরিচালনাকারী। হিন্দুদের মতে ব্রহ্মা ছিলেন এই সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা। আর এই জগতের রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং পরিচালনাকারী হলেন বিষ্ণু। বিষ্ণু দয়ালুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন বলে তাকে বিষ্ণু বলে। যিনি সৃষ্টির রক্ষণাবেক্ষণ এবং সাহায্য- সহযোগিতার জন্যে সময়ে সময়ে মানুষ বা বিভিন্ন বস্তুর আকৃতিতে পৃথিবীতে আগমন করে থাকেন। যাকে অবতারও বলে থাকে।
তৃতীয় দেবতা বা অবতার হলো শিব। শিব অর্থ, ধ্বংসকারী। ইতিহাসবিদদের মতে এ দেবতার বিশ্বাস সে সব প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত যা আজও বিদ্যমান। সিন্ধু প্রদেশ উদ্ভবের ইতিহাস থেকে এ কথার প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায়, শিবা অথবা তার মতো অন্য কোনো দেবতার উপাসনা প্রাচীন যুগেও করা হতো। হিন্দুদের মধ্যে এই দেবতার একটি ভয়ংকর অবস্থান রয়েছে। তার সম্পর্কে হিন্দুদের ধারণা হলো, কঠোরতা ও বড়ত্বের কারণে সবাইকে তার সামনে নাকি ঝুঁকতে হতো। তাই তাকে শিব বা ধ্বংসকারী উপাস্য বলা হয়। আর হয়ত এ জন্যই পুরুষের গুপ্তাঙ্গকে এর উপাসনার জন্য চয়ন করা হয়েছে। তার স্ত্রী পার্বতী, হিন্দুরা এরও পূজা করে। হিন্দুরা পার্বতীর বিভিন্ন আকৃতি বানিয়ে পূজা করে। যেমন, উমা, কালি, দুর্গা। উমার আকৃতিতে পার্বতীকে একজন দয়ালু মা হিসেবে গণ্য করা হয়। কালির আকৃতিকে সৃষ্টির পরিবর্তন, স্থিতি ও ধ্বংসের পূজ্যকে বুঝায়। আর দুর্গার আকৃতিতে তাকে এক ভয়ানক দেবী মনে করা হয়।
📄 অবতারবাদের ধারণা
অবতার শব্দটি দুটি শব্দের সমষ্টি। 'অব' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নিচে, আর 'তার' দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আসা বা অতিবাহিত হওয়া। অর্থাৎ অবতার মানে হলো, যে নিচে নেমে এসেছে। কিছু সংখ্যক হিন্দু স্কলারদের মতানুযায়ী অবতার মানে সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি বা জমিনে তাঁর অবতরণ। এর দ্বারা উদ্দেশ্য, পৃথিবীতে যে কোনো আকৃতিতে দেবতা বা সৃষ্টিকর্তার আগমন। এই মতাদর্শ অনুযায়ী হিন্দুরা বিশ্বাস করে যে, সৃষ্টিকর্তা ভালো লোকদের সাহায্য করা, ধর্মের উপর টিকিয়ে রাখা এবং অন্যায়- অবিচার মিটিয়ে দেয়া ইত্যাদির জন্যে অধিকাংশ সময় মানুষ এবং অন্যান্য বস্তুর আকৃতিতে পৃথিবীতে আগমন করেন। এর জন্যে সৃষ্টিকর্তা যে কোনো আকৃতিই ধারণ করতে পারেন। হিন্দু ধর্মের এই গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস বেদের কোথাও পাওয়া যায় না। তবে, পুরাণ এবং গীতার মধ্যে এর আলোচনা পাওয়া যায়।
📄 অসংখ্য দেব- দেবি
দেবতা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা বা এমন পবিত্র সত্তা যার মধ্যে সৃষ্টিকর্তার গুণ রয়েছে। শক্তিশালী ও প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী হলে, তিনি দেবতা হবার যোগ্যতা রাখেন৷ দেবতার স্ত্রীলিঙ্গ হলো দেবি। ইংরেজিতে দেবতার জন্যে গড শব্দ ব্যবহার করা হয় ছোটো হাতের g (god) দিয়ে। যেখানে বড় হাতের G দিয়ে God ব্যবহার হয় আল্লাহ তাআলার জন্যে।
হিন্দু ধর্ম মতে, দেবতা হলো এমন সম্মানিত উপাস্য, যার মাধ্যমে সৃষ্টিজীব বিভিন্ন ধরণের উপকার লাভ করে থাকে। হিন্দুইজম বইয়ের লেখক মাস্টার গোড এর গবেষণা মতে, বেদসমূহে তেত্রিশটি দেবতার উল্লেখ ছিলো৷ কিন্তু বর্তমান হিন্দুধর্ম মতে দেবতা বা উপাস্যদের সংখ্যা তেত্রিশ কোটি বলা হয়। এর মধ্যে চন্দ্র, সূর্য, আগুন, হনুমান রাম ও কৃষ্ণ প্রসিদ্ধ। দেবীদেরকে মূলত সৃষ্টিকর্তার প্রেমিকা বা স্ত্রী হিসেবে মানা হয়। এই দেবিদের মধ্যে রামের স্ত্রী, সীতা কৃষ্ণ'র প্রেমিকা রাধা, ব্রহ্মার স্ত্রী স্বরস্বতী, শিবের স্ত্রী পার্বতী, কৃষ্ণের স্ত্রী রুক্মিণী এবং এগুলো ছাড়াও প্রাচীন সভ্যতার সাথে নিজেদের উৎসর্গ করা দেবীগণ দূর্গা এবং গঙ্গাও প্রসিদ্ধ।
📄 শিরকের মধ্যে একত্ববাদ, একত্ববাদের মধ্যে শিরক
গতানুগতিক হিন্দু ধর্মে অসংখ্য সৃষ্টি, উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের প্রতিচ্ছবি দেবতাদেরকে গ্রহণযোগ্য উপাস্য মনে করা হয়। হিন্দুদের মতে, এক সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করলে অন্যান্য দেবতাদের অস্বীকার করতে হবে, এটা আবশ্যক নয়। বরং তারা অন্যান্য দেবতাদেরকে তাদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট দেবতার অধীন মনে করে থাকে। বেদের বর্ণনা মতে, অগ্নি, বিষ্ণু, শিব মূলত একই সৃষ্টিকর্তা। পূজারীরা তাকে ভিন্ন ভিন্ন নাম দিয়েছে। ঋগ্বেদ পড়লে বিষয়টা স্পষ্ট হয়। অর্থাৎ পূজারীরা এক খোদাকেই বিভিন্ন নামে ডেকে থাকে।