📄 পুরাণ
উপনিষদের পর পুরাণের অবস্থান। আর এটিকেও বেদের মত ঐশীগ্রন্থ মনে করা হয়। বেদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও এটি অনেক বিশদ এবং সহজ ভাবে বুঝে আসার মত একটি গ্রন্থ। এতে অনেক দেবতাদের ঘটনাবলী রয়েছে। এর সাথে সাথে এতে গণিতশাস্ত্র, জ্যোতিবিদ্যা, ইতিহাস, ভূগোল সম্বন্ধীয় জ্ঞানও রয়েছে। পুরাণের ইতিহাস বলে, এটি বেদের যুগেই লিপিবদ্ধ হয়েছে৷ তাছাড়া বেদ এবং পুরাণ দু' টাতেই একই আলোচনা পাওয়া যায়। পুরাণ অধ্যায়ন করলে এটাও বুঝা আসে, এর অস্তিত্ব বেদেরও পূর্বে ছিলো৷ পুরাণসমূহের সংখ্যা আঠারোটি৷ যাতে আনুমানিক আট লাখেরও বেশি কবিতা রয়েছে। এর মধ্যে প্রসিদ্ধ হচ্ছে বৈষ্ণব পুরাণ ভগবত পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ এবং মৎস্য পুরাণ। এগুলোতে অনেক ঋষিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়। হিন্দুদের মাঝে সাধারণভাবে প্রচলিত আছে, পুরাণ নাকি স্বয়ং ভগবানের কথা। আর কোনো মহাঋষি এই কথাগুলোকে শুধু বিন্যস্ত করেছেন মাত্র।
📄 মনুধর্ম শাস্ত্র
মনুধর্ম শাস্ত্র মূলত এমন একটি নীতিমালা, হিন্দু ধর্মে যা ধর্মীয় শাস্ত্রের মর্যাদা রাখে৷ যেমন মুসলিমগণের নিকট কুরআন ও হাদিসের ফিকহি মাসায়েলের গুরুত্ব ও মর্যাদা রয়েছে। মনু ধর্ম শাস্ত্রে হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন রেওয়াজ- প্রথা, নিয়ম ও নীতিমালা ইত্যাদি বর্ণনা করা হয়। হিন্দু ধর্মের শিক্ষিত সমাজে এর প্রচলনটা বেশি রয়েছে। নীতিমালার সামষ্টিক দিক দিয়ে এই শাস্ত্রটি ভারতের সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। যে প্রভাব আজও হিন্দু সমাজে বহাল রয়েছে। অধিকাংশ ইতিহাসবিদদের মতানুসারে এই মনুশাস্ত্রের বর্তমান রুপ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে সামনে আসে।
মনুশাস্ত্রকে মনুস্মৃতিও বলে। মনু হলেন একজন প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রকার ঋষি। অনেক হিন্দুদের ধারণা, মনু হলেন পাঁচ সহস্রাধিক বছরব্যাপী প্রবহমান হিন্দুশাস্ত্রমালার নেতৃস্থানীয় ও বিস্তৃত প্রভাবক মনুসংহিতা বা মনুস্মৃতির রচয়িতা। এ মনু যদি মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতার রচয়িতা হয়ে থাকেন তাহলে তাঁর সময়কাল ছিলো ন্যূনতম ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তবে, এর আধুনিক রূপ অনেক পরেই তবে অস্তিত্বে আসে৷ মনুর দিকে সম্বন্ধ করেই এই শাস্ত্রীয় নীতিমালা সংবলিত গ্রন্থটি মনুস্মৃতি নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। কিন্তু এর লেখকের ব্যাপারে ধারণাপ্রসূত অনেক কিছু বলা হলেও ঐতিহাসিক সূত্রে এর লেখকের ব্যাপারে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মিলে না।
📄 মহাভারত
যদিও মহাভারতকে বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয় না। কিন্তু হিন্দুদের কাছে এটি সর্ববৃহৎ এবং এবং সর্বোচ্চ সম্মানিত গ্রন্থ। দুই লাখ পনেরো হাজার কবিতার সমষ্টি মহাভারত সাহিত্যে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কাব্য গ্রন্থ। এটি মূলত হস্তিনাপুরের দুই বংশের গৃহবিবাদ কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যকার সংঘটিত বড় একটি যুদ্ধের কাহিনী। এই কাহিনীর মধ্যে জুয়া খেলায় পরাজিত পঞ্চপাণ্ডব প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে ছয় হাজার লোকের সাথে যুদ্ধ করে এবং ভগবানের অবতার শ্রীকৃষ্ণের সাহায্যে পাণ্ডু যুদ্ধে জয়লাভ করে। মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী ভারতের সকল জেলার সৈনিকরা এই যুদ্ধে অংশ নেয়। এই যুদ্ধ ভারতীয়দেরকে দুই গ্রুপে ভাগ করে দেয়। এক গ্রুপ সত্যের পক্ষে অর্থাৎ পাণ্ডুদের সাহায্যকারী। অপরপক্ষ কুরুদের পক্ষ নেয়। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাণ্ডবরা বিজয় লাভ করে। কিছু হিন্দু পাণ্ডব যেমন মোহন দাস গান্ধী, স্বামী পরমানন্দ, স্বামী আরানন্ধ। মহাভারতে বর্ণিত এসব কাহিনি কোনো বাস্তবিক যুদ্ধের বর্ণনা ছিলো না। বরং নিজেদের নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চিত্রকাহিনি। যেটিকে মহাভারত গীতার মধ্যে একটি উদাহরণস্বরূপ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ইতিহাসবিদদের কথা অনুযায়ী মহাভারত বাস্তব ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। মহাভারত শ্লোকগুলোকে ব্যাসদেব লিখিত বলা হয়ে থাকে। যিনি তার শিষ্য উইশম পাইনকে এটি শিখিয়েছিলেন। এ জন্যে এটির পুরোপুরি বিন্যস্ত হওয়ার যুগ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী বলা যেতে পারে। তবে, পুস্তক আকারে তৈরি হয় এরও অনেক যুগ পরে।
📄 ভগবত গীতা
গীতা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কাব্য। এই গ্রন্থ মহাভারতেরই অংশ। এটি ঐ সমস্ত কথাবার্তার সমষ্টি যেগুলো প্রাচীন হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিদের মধ্যকার সংঘটিত হয়েছিলো। অর্জুন এবং শ্রী কৃষ্ণের মধ্যকার মহাভারতে হওয়া কথোপকথন খুব প্রসিদ্ধ, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে অনেক চারিত্রিক দিকনির্দেশনামূলক কথা বলেছিলেন। গীতা হিন্দুদের কাছে সবচেয়ে বেশি পঠিত গ্রন্থ। বৈদিক সময়কালের পরে লিখিত হওয়ার কারণে গীতাকে ঐশী গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা হয় না। কিন্তু এর উত্তম নীতিমালা, শিক্ষা এবং ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কারণে গীতা বেদ থেকেও অনেকাংশে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।