📄 ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ
বেদ শব্দের অর্থ হলো জানা, জ্ঞান লাভ করা। সংস্কৃত ভাষায় বিদ্যমান বেদ পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্মীয় গ্রন্থ। যা আনুমানিক দু' হাজার বছরে হিন্দুরা লিপিবদ্ধ করে। বেদ লিপিবদ্ধের সময়সীমা নিয়ে অনেক মতানৈক্যও রয়েছে। কিন্তু কিছু সংখ্যক ইতিহাসবিদগণের মত হলো, বেদ লেখার শুরু ২০০০ খ্রিস্টপূর্বে হয়েছে এবং এটি আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টপূর্ব সন পর্যন্ত পূর্ণতা লাভ করে। এরপর কয়েক যুগ পরে গ্রন্থটিকে লিখিত পুস্তক আকারে তৈরি করা হয়। বেদের প্রাচীন সংখ্যার ব্যাপারে হিন্দু পণ্ডিতদের মধ্যে প্রচণ্ড মতবিরোধ রয়েছে।
পণ্ডিতদের স্বীকৃত চারটি গ্রন্থ রয়েছে: ঋগ্বেদ, অথর্ববেদ, সামবেদ, যজুবেদ। কিছু মতানৈক্য ও বৈপরীত্য ছাড়া এই চার প্রকারের বেদকেই সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। কেননা হিন্দু ধর্মের ভিত্তি এই বেদসমূহের উপরেই। এই চারো বেদের মধ্য থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য বেদ হলো ঋগ্বেদ। এরপর অথর্ববেদ এরপর সামবেদ আর সর্বশেষ পর্যায়ের হলো যজুবেদ। অন্যান্য বেদসমূহের অধিকাংশ অংশ ঋগ্বেদ থেকেই নেয়া হয়েছে। এ সকল বেদের মধ্যে দেবতা সম্পর্কীয় প্রশংসা বাক্য এবং বিভিন্ন পদ্ধতির প্রার্থনার বর্ণনা পাওয়া যায়। এমনিভাবে যজুবেদের মধ্যে পশু বলি এবং শুভ দিনে পাঠ করার মন্ত্র। সামবেদে গীত। অথর্ববেদে অধিকাংশই যাদু- মন্ত্র ইত্যাদির শিক্ষা পাওয়া যায়।
📄 বেদসমূহের ঋষি
বেদসমূহের লেখকদের মহাঋষি বলা হয়। ঋষি অর্থ হলো মন্ত্রদ্রষ্টা। মন্ত্র হলো পূজায় বেদ কিংবা অন্যান্য গ্রন্থ থেকে উচ্চারিত শ্লোক। যেগুলো দ্বারা দেবতাদের উপাসনা করা হয়। দ্রষ্টা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ঐ চিন্তা ও ধ্যান যা বেদবাণী পড়ার সময় ঋষিদের মস্তিষ্কে ছবির মতো ভেসে উঠে। ঋষিরা মন্ত্রের পাঠকও হয়ে থাকেন। ঋষিরা শ্লোক ও কবিতার মাধ্যমে দেবতাদের উপাসনা করে।
হিন্দু পণ্ডিতদের অধিকাংশের অভিমত হলো, বেদ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় অনেক কবিই লিপিবদ্ধ করেছেন। তাদের মতে, প্রাচীন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিগণ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সত্য বিষয়াবলী শুনতে পেরেছিলেন। এরপর তারা সেগুলোকে পুস্তকের রুপ দেন। এই ঋষিদের মধ্যে আর্য, ব্রাহ্মণ এবং প্রাচীন ভারতের অনেক ঘরানার লোকজনও যুক্ত ছিলেন। বেদ থেকে এ কথা জানা যায়, ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মুখনিঃসৃত ভাষা থেকে এসব সংস্কৃত শ্লোক ও কবিতার উৎপত্তি। আর্য সম্প্রদায়ের বিশ্বাস হলো, "বেদ মূলত চারজন ঋষি তথা অগ্নি, অনিল (বায়ু), আদিত্য (অদিতির পুত্র), অঙ্গিরা (বৃহস্পতির পিতা), সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক লাভ করেছিলেন। তবে, ঋষিরা মন্ত্রের স্রষ্টা নয়। বরং মন্ত্রের অর্থ ও ব্যাখ্যা বর্ণনাকারী"।
📄 উপনিষদ
বেদের পরে হিন্দুদের কাছে উপনিষদের স্থান। উপনিষদ মূলত ঐ সকল বক্তব্যের সমষ্টি যা হিন্দু যাযাবররা নির্জন জঙ্গলে তাদের শিষ্যদের সামনে পেশ করেছিলো। কিন্তু হিন্দুরা এটাকে ঐশীগ্রন্থ মনে করে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাচীন উপনিষদে বেদের বিভিন্ন ব্যাখ্যা একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতিতে পাওয়া যায়। উপনিষদের উদ্ধৃতিগুলো কোনো দার্শনিক ব্যক্তির দর্শনের মতো মনে হয়। ঐতিহাসিকদের মতানুসারে উপনিষদের বক্তব্যসমূহ ৯০০- ৭০০ খ্রিস্টপূর্বের মধ্যকার কোনো এক সময়ে বিন্যস্ত করা হয়। বেদের মতো উপনিষদ এর সংখ্যা নিয়েও মতানৈক্য দেখা যায়। কোনো কোনো বর্ণনার ভিত্তিতে এর সংখ্যা এক শতো আটটি বলা হয়ে থাকে। অথচ আবার কেউ কেউ উপনিষদের সংখ্যা বারোটিও বলে থাকে।
📄 পুরাণ
উপনিষদের পর পুরাণের অবস্থান। আর এটিকেও বেদের মত ঐশীগ্রন্থ মনে করা হয়। বেদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও এটি অনেক বিশদ এবং সহজ ভাবে বুঝে আসার মত একটি গ্রন্থ। এতে অনেক দেবতাদের ঘটনাবলী রয়েছে। এর সাথে সাথে এতে গণিতশাস্ত্র, জ্যোতিবিদ্যা, ইতিহাস, ভূগোল সম্বন্ধীয় জ্ঞানও রয়েছে। পুরাণের ইতিহাস বলে, এটি বেদের যুগেই লিপিবদ্ধ হয়েছে৷ তাছাড়া বেদ এবং পুরাণ দু' টাতেই একই আলোচনা পাওয়া যায়। পুরাণ অধ্যায়ন করলে এটাও বুঝা আসে, এর অস্তিত্ব বেদেরও পূর্বে ছিলো৷ পুরাণসমূহের সংখ্যা আঠারোটি৷ যাতে আনুমানিক আট লাখেরও বেশি কবিতা রয়েছে। এর মধ্যে প্রসিদ্ধ হচ্ছে বৈষ্ণব পুরাণ ভগবত পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ এবং মৎস্য পুরাণ। এগুলোতে অনেক ঋষিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়। হিন্দুদের মাঝে সাধারণভাবে প্রচলিত আছে, পুরাণ নাকি স্বয়ং ভগবানের কথা। আর কোনো মহাঋষি এই কথাগুলোকে শুধু বিন্যস্ত করেছেন মাত্র।